Alexa ৬০ বছর ধরে চাঁদসহ তিন গ্রহে চলছে নিরুদ্দেশ-আত্মহত্যা-মৃত্যু!

৬০ বছর ধরে চাঁদসহ তিন গ্রহে চলছে নিরুদ্দেশ-আত্মহত্যা-মৃত্যু!

বিজ্ঞান ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:০১ ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২১:২৫ ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

চাঁদ, বুধ, মঙ্গল, শনি গ্রহে ৬০ বছর ধরেই চলেছে একের পর এক ‘মৃত্যু’! ‘নিরুদ্দেশ’ হয়ে যাওয়ার ঘটনা। এমনকী, ‘আত্মহত্যা’ও!

সেই ‘মিছিলের মুখগুলির মধ্যে রয়েছে রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন), আমেরিকা, জাপান, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ইসা), চীন, ইসরায়েল। হালে সেই মিছিলে ঢুকে পড়ল আরো একটি মুখ। ভারত। চন্দ্রযান-২-এর ল্যান্ডার ‘বিক্রম’।

চাঁদ, বুধ, মঙ্গল, শনিতে ‘মৃত্যু’ ও ‘আত্মহত্যা’র ঘটনার সূত্রপাত হয় ১৯৫৯ সালে। ৬০ বছর আগে। সেই ঘটনাও ঘটেছিল সেপ্টেম্বরেই। ১৩ তারিখে।

প্রথম নিখোঁজের নাম ‘লুনা-১’! 

জানুয়ারিতে রওনা হওয়া রুশ মহাকাশযান ‘লুনাক’ বা ‘লুনা-১’ চাঁদে পৌঁছতে গিয়ে পা হড়কেছিল। চাঁদের কক্ষপথে ঢুকতে না পেরে হারিয়ে গিয়েছিল এই সৌরমণ্ডলেই। বিজ্ঞানীরা এখনও পাননি লুনা-১-এর হদিশ। ৬০ বছর কেটে গেছে, রুশ লুনা-১ এখনও নিরুদ্দেশ। 

বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, সেই হারিয়ে যাওয়া লুনা-১ এখনও প্রদক্ষিণ করে চলেছে সূর্যকে।

তার ঠিক আট মাস পর, সেই ১৯৫৯-এই নামার সময় গতি সামলাতে না পেরে চাঁদের বুকেই মরণ ঝাঁপ মেরেছিল আরো একটি রুশ মহাকাশযান ‘লুনা-২’। তবে সেটি চাঁদের কক্ষপথে ঢুকে পড়তে পেরেছিল। সেটাই ছিল কোনো একটি মহাজাগতিক বস্তু থেকে অন্য একটি মহাজাগতিক বস্তুতে সভ্যতার প্রথম অনুপ্রবেশ।

চাঁদে যেখানে রয়েছে বিক্রম। গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্রদক্ষিণের সময় জায়গাটিকে চিহ্নিত (হলুদ দাগ) করেছে নাসার ‘এলআরও’।

তবে তা সে নিরুদ্দেশ হওয়াই বলা হোক বা মৃত্যু অথবা আত্মহত্যা, প্রতিটি ঘটনা থেকেই শিক্ষা নিয়েছে নাসা, ইসা, জাপান স্পেস এজেন্সি বা ‘জাক্সা’। প্রতিটি ঘটনাই মহাকাশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। এগিয়ে নিয়ে গেছে। এমনকী, কখনও কখনও জানা যায়নি মহাকাশযানগুলির সেই সব মৃত্যু ও আত্মহত্যার ঘটনাগুলি চাঁদ মুলুকে ঠিক কোথায় কোথায় ঘটেছে।

চাঁদে মৃত্যু-আত্মহত্যা!

১৯৬৯-এর ২০ জুলাই দুই মার্কিন মহাকাশচারী নিল আর্মস্ট্রং ও এডুইন অলড্রিন চাঁদের বুকে পা ছোঁয়ার কয়েক মাস আগে এক বার ‘ড্রেস রিহার্সাল’ চালায় নাসা। অ্যাপোলো-১০ মহাকাশযান পাঠিয়ে। কীভাবে নভোচারীদের নামানো হবে, তা পরখ করে দেখতে সেই মার্কিন মহাকাশযান থেকে একটি অংশকে চাঁদের বুকে আছড়ে ফেলা হয়েছিল। যা কার্যত ছিল একটি ‘মুন ইমপ্যাক্ট প্রোব’। তার নাম ছিল ‘স্নুপি’।

তার পর চাঁদের বুকে ‘আত্মহত্যা’র আরো একটি ঘটনা ঘটে। অ্যাপোলো-১১ অভিযানের মহাকাশচারীরা ফিরে আসার পর অরবিটার থেকে চাঁদের বুকে আছড়ে ফেলা হয়েছিল লুনার মডিউল ‘ইগল’কে। কতটা কেঁপে উঠতে পারে আমাদের উপগ্রহ, আছড়ে ফেললে তার বুক থেকে লাফিয়ে কতটা উঁচুতে উঠতে পারে কোনো লুনার মডিউল বা তার টুকরো টাকরা, তা বুঝতে ৬টি অ্যাপোলো মিশনের বেশ কিছু যন্ত্রপাতি ও সেই সব অভিযানে ব্যবহৃত রকেটগুলির বাতিল অংশগুলিকে আছড়ে ফেলা হয়েছিল চাঁদে।

মঙ্গল ছুঁতে গিয়েও আছড়ে পড়ার ধাক্কাটা প্রথম সইতে হয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকেই। ১৯৭১ সালে। মঙ্গলে ঢুকতে গিয়েছিল সোভিয়েতের ‘মার্স-২’ ল্যান্ডার মহাকাশযান। কিন্তু নামার সময় গতি সামলাতে না পেরে লাল গ্রহের বুকে আছড়ে পড়ে সেই সোভিয়েত ল্যান্ডার।

তারপরেই মঙ্গলে ঘটে নাসার একটি মহাকাশযানের মৃত্যুর ঘটনা। সেটা ১৯৯৯ সাল। সেই দুর্ঘটনার জন্য কোনো দায় ছিল না নাসার মঙ্গলযান ‘মার্স ক্লাইমেট অরবিটার’ (এমসিও)। যাবতীয় দোষ ছিল নাসার গ্রাউন্ড কন্ট্রোল রুমের। সেখান থেকে ‘কম্যান্ড’ দেয়ার সময় ইংরেজি ও মেট্রিক পদ্ধতির এককের মধ্যে হয়ে যায় ব্যাপক গন্ডগোল।

সেই বছরেরই শেষের দিকে আবার মঙ্গলে গিয়ে মৃত্যু হয় একটি মার্কিন মহাকাশযানের। তার নাম ছিল, ‘মার্স পোলার ল্যান্ডার’ (এমপিএল)। অবতরণের সময় যতটা আগে তার ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার কথা ছিল ‘সফ্‌ট ল্যান্ডিং’-এর, তা হয়নি। ফলে, হুড়মুড়িয়ে মঙ্গলের রুখুসুখু লাল মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়েছিল নাসার সেই ল্যান্ডার।

মাঝখানে বেশ কয়েকটা বছরের ব্যবধান। সেটা ২০১২। মঙ্গলের মাটি কেমন, বুঝতে নাসা রোভার পাঠাল লাল গ্রহে। ‘মিস কিউরিওসিটি’।

মঙ্গলে আত্মঘাতী ‘স্কাই ক্রেন’

তার পর মহাকাশযানের যে অংশটি থেকে কার্যত ছুঁড়ে ফেলে মঙ্গলের মাটিতে নামানো  হয়েছিল কিউরিওসিটি-কে, সেই ‘স্কাই ক্রেন’ অংশটিকে ইচ্ছা করেই লাল গ্রহের মাটিতে আছড়ে ফেলে নষ্ট করেছিল নাসা। কাজে লাগবে না বলে। যাকে কাজে লাগবে না তাকে জ্বালানি খরচ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার চেয়ে মহাকাশেই নষ্ট করা ভাল।

তাই ‘স্কাই ক্রেন’ আত্মঘাতী হয়েছিল! আজ থেকে সাত বছর আগে, লাল গ্রহের বুকে। সেটা এতটাই গতিবেগে গিয়ে আছড়ে পড়েছিল, যে তার আঘাতে লাল গ্রহের বুকে তৈরি হয়েছিল বিশাল একটি গহ্বর। কালো রঙের সেই গহ্বর এখনও দেখা যায় মঙ্গলের কক্ষপথ থেকে।

মৃত্যু-মিছিলে রয়েছে আরো মুখ!

সেখানেই শেষ নয়। মৃত্যু-মিছিলে রয়েছে আরো কয়েকটি মুখ! যেমন, ২০১৬-য় মঙ্গলে ‘পালকের ছোঁয়া’য় নামতে গিয়ে গতি সামলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়েছিল ইউরোপিয়ান স্পেস (ইসা) ও রুশ স্পেস এজেন্সির (রসকসমস) যৌথ উদ্যোগে পাঠানো ‘স্কিয়াপ্যারেলি’ ল্যান্ডার। তার ফলে, লাল় গ্রহের পিঠে তৈরি হয়েছিল আরও একটি ‘কলঙ্ক’। কালো দাগ।

শুক্রেও মৃত্যু, আত্মহত্যা...একের পর এক!

পৃথিবীর ‘যমজ বোন’ শুক্রেও ঘটেছে মহাকাশযানের মৃত্যুর ঘটনা। সেখানেও প্রথম নামটি সোভিয়েত মহাকাশযানের। গত শতাব্দীর ছয়, সাত ও আটের দশকে শুক্রে বেশ কয়েকটি মহাকাশযান পাঠিয়েছে রুশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘রসকসমস’। কিন্তু আজ থেকে ৫৩ বছর আগে, ১৯৬৬ সালে শুক্রে আছড়ে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশযান ‘ভেনাস-৩’।

মৃত্যু, আত্মহত্যার ঘটনা শুক্রেও!

আরও ২০ বছর পর ফের আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা ঘটে শুক্রের মুলুকে। অভিযান সফল হওয়ার পর জ্বালানি খরচ করে আর পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে কী হবে, সেই ভাবনা থেকেই শুক্রের বায়ুমণ্ডলে ইচ্ছা করে ঢুকিয়ে মহাকাশযান ‘ভেনাস এক্সপ্রেস’কে পুড়ে মরতে বাধ্য করে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি বা ইসা।

বুধ গ্রহে মৃত্যু হয়েছিল বার্তাবাহকের!

বিপত্তি ঘটেছে এই সৌরমণ্ডলে সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকা গ্রহটির মুলুকে গিয়েও। বুধের কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে জ্বালানি ফুরিয়ে যায় নাসার ‘মেসেঞ্জার’ মহাকাশযানের। ২০১৫ সালে তাকে জোরালো অভিকর্ষ বলের টানে টেনে আছড়ে মারে বুধ। তার উত্তর মেরুতে। যেখানে আছড়ে পড়ে মৃত্যু হয়েছিল ‘মেসেঞ্জারের, সেই ছবিও গ্রাউন্ড কন্ট্রোল রুমে পাঠিয়ে দিয়েছিল নাসার মহাকাশযান।

গ্রহাণুতে আত্মঘাতী ‘নিয়ার শুমেকার’

গ্রহাণুও বা বাদ যাবে কেন? তাকে চেনা, জানার কৌতূহলেরও মাসুল গুনতে হয়েছে সভ্যতাকে। ২০০১ সালে প্রথম কোনো গ্রহাণুতে পা ছুঁইয়েছিল সভ্যতা। গ্রহাণু ‘৪৩৩ ইরস’-এ পৌঁছেছিল নাসার যান ‘নিয়ার শুমেকার’। কিন্তু পা ছোঁয়ানোর পর অরবিটারে তার রেডিও সিগন্যাল পাঠানোর কাজটা শেষ করে উঠতে পারেনি ‘নিয়ার শুমেকার’। তার মৃত্যু হয়েছিল।

ধূমকেতুতেও আত্মঘাতী হয়েছে আমাদের পাঠানো মহাকাশযান। আজ থেকে ১৪ বছর আগে, ২০০৫-এ। নাসার ‘ডিপ ইমপ্যাক্ট’ মহাকাশযানকে ইচ্ছা করেই আছড়ে ফেলা হয়েছিল ধূমকেতু ‘৯পি/টেম্পল-১’-এর পিঠে। তার পিঠটা কেমন, তা বুঝতে।

মৃত্যুর ঘটনা ধূমকেতুতেও

বছর পাঁচেক আগেকার ঘটনা। ধূমকেতু ‘৬৭পি/চুরিয়ামোভ-গেরাশিমেঙ্কো’র পিঠে ‘রোসেটা’ মহাকাশযান থেকে ‘ফিলি’ ল্যান্ডার নামিয়েছিল ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি। কিন্তু নামার পর নিখোঁজ, নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল সেই ল্যান্ডার। তন্নতন্ন তল্লাশির পর বছর দুয়েক আগে অবশ্য খোঁজ মেলে সেই ল্যান্ডারের। কিন্তু তখন আর তার কোনো প্রাণ ছিল না।

ধূমকেতু ‘৬৭পি/চুরিয়ামোভ-গেরাশিমেঙ্কো’র পিঠে নেমে যেখানে হারিয়ে যায় ‘ফিলি’ ল্যান্ডার। ২০১৪-য়।

প্রাণ গিয়েছিল বৃহস্পতিতে!

বৃহস্পতি ছাড়িয়ে আমাদের সৌরমণ্ডলের বাইরের দিকে যেতে গিয়ে জ্বলেপুড়ে মহাকাশযানের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে একাধিক বার। বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডলে ঢুকে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়েছিল নাসার ‘গ্যালিলিও’ মহাকাশযান। ২০০৩ সালে।

শনিতে ঝাঁপ মেরেছিল ‘ক্যাসিনি’

আর দিুই বছর আগে শনির বলয়গুলিকে বাঁচানোর জন্য এই সৌরমণ্ডলের সুন্দরতম গ্রহের বায়ুমণ্ডলে ঝাঁপ মেরে আত্মঘাতী হয়েছিল নাসার মহাকাশযান ‘ক্যাসিনি’।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে