৬০০ পুরুষকে বিষ দিয়ে হত্যা করে এই নারী

৬০০ পুরুষকে বিষ দিয়ে হত্যা করে এই নারী

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:২৬ ৪ মে ২০২০   আপডেট: ১৪:৫৪ ৪ মে ২০২০

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

সময়টা ছিল ১৭ শতক। সেসময় ইতালিতে শত শত পুরুষ এক অজানা কারণে মারা যেতে শুরু করে। সবার মৃত্যুর উপসর্গই ছিল একই রকম। শারীরিক অসুস্থতা, পেটে ব্যথা, শরীর ক্লান্ত হয়ে যাওয়াই ছিল তাদের মূল উপসর্গ। এরপর মৃত্যু। 

সাধারণ হার্ট অ্যাটাকেই মারা গিয়েছিল তারা। চিকিৎসকদের ঘুম হারাম হওয়ার উপক্রম। কিছুতেই তারা এর কোনো কূল কিনারা করতে পারছিল না। অন্যদিকে পুলিশও পাচ্ছে না কোনো তথ্য, ময়নাতদন্তেও পাওয়া যাচ্ছে না তেমন কোনো কারণ। তখন সবাই ধরেই নিল এটা কোনো গুপ্ত ভাইরাসের কারণেই হচ্ছে। 

তবুও পুলিশ, গোয়েন্দা আর গবেষকদের অনুসন্ধান চলতেই থাকে। এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে এতো মৃত্যুর আসল কারণ। এর পেছনে ছিলেন একজন নারী। যিনি পরোক্ষভাবে হত্যা করেছিলেন ৬০০ এর বেশি পুরুষকে। ইতিহাস তাকে সবচেয়ে সফল সিরিয়াল কিলার হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। 

জুলিয়া টোফানাএই নারীর নাম জুলিয়া টোফানা। তিনি ইতালির বাসিন্দা। তার জন্ম সাল নিয়ে রয়েছে ইতিহাসে নানা বিতর্ক। জুলিয়া খুব কম বয়সে তার বাবা মাকে হারান। ১৬৩৩ সালে জুলিয়ার মা তার বাবাকে হত্যা করে। আর সে অপরাধে তারও মৃত্যতুদণ্ড হয়। সেসময় নারীদের উপর খুব অত্যাচার করা হত। অনেকটা পণ্য হিসেবেই গণ্য করা হত তাদের। 

কারণ সেসময় পুরুষরা মূল্য দিয়ে বিয়ে করত। আর বিয়ের পর তারা স্ত্রীর উপর সব ধরনের অধিকারচর্চা করত। তাতে কেউ কোনো বাধা দিতে আসত না। এসময় নারীরা শারীরিক এবং মানসিক সব দিক থেকেই অত্যাচারিত হত। আর অত্যাচার থেকে বাঁচতেই জুলিয়ার মা তার বাবাকে হত্যা করে। তবে দুর্ভাগ্য যে সে বাঁচতে পারেনি। বরং হত্যার দায়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছিল। 

ভাবছেন হত্যা করার কি দরকার ছিল? বিবাহ বিচ্ছেদই তো খুব সহজ উপায় এ থেকে মুক্তি পাওয়ার। তবে সেসময় বিবাহ বিচ্ছেদ অনেকটা পাপ বলেই মনে করত ইতালিবাসী। এর থেকে বিধবা হওয়াও তখন ভালো ছিল। বিধবাদের সবাই সাধারণ চোখে দেখলেও বিবাহ বিচ্ছেদ তারা মানতে পারত না।

৬০০ পুরুষকে হত্যা করে এই নারীএরপর জুলিয়া একাই বড় হতে থাকেন। তখন সে একটি ফার্মেসিতে কাজ পায়। সেখানে মূলত তার কাজ ছিল বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরিতে সাহায্য করা। এখান থেকেই জুলিয়া বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের বিষয়ে রীতিমত দক্ষ হয়ে ওঠেন। সেসময় জুলিয়া একটি অ্যাকোয়া টোফানা নামক একটি বিষ তৈরি করেন। যা স্বাদ গন্ধহীন আর্সেনিক, সীসা এবং বিভিন্ন রাসায়নিক মিশ্রিত। 

ফার্মেসির কাজ ছেড়ে দিয়ে জুলিয়া প্রসাধনী তৈরি এবং বিক্রি শুরু করে। এর আড়ালে চলতে থাকে তার বিষের ব্যবসা। জুলিয়া মূলত অত্যাচারী পুরুষদের শায়েস্তা করতেই এটি বিক্রি করতেন। তার ক্রেতারা ছিল মূলত অত্যাচারে শিকার নারীরা। যারা তাদের স্বামীদের থেকে দিনের পর দিন অত্যাচারিত হয়ে আসছিল, এখন তারা মুক্ত হতে চায়। সেসব নারীদেরকেই মূলত জুলিয়া এই বিষ বিক্রি করত। 

এই বিষের সবচেয়ে ভালো দিক হলো এর কোনো রং বা গন্ধ ছিল না। তাই সহজেই নারীরা তাদের স্বামীর খাবারে এটি অল্প করে প্রতিদিন মিশিয়ে খায়ানোর মাধ্যমে মৃত্যু ঘটাতো। এভাবেই দিনের পর দিন নারীরা জুলিয়ার কাছ থেকে বিষ নিয়ে যেত। জুলিয়া প্রথম ফ্রান্সেস্কা লা সারদা নামে এক নারীর কাছে বিক্রি করে অ্যাকোয়া টোফানা। জুলিয়ার ৫০ বছরের জীবনে ৬০০ এর বেশি পুরুষকে হত্যা করেছিলেন। 

নির্যাতিত নারীদের কাছেই তিনি বিষটি বিক্রি করতেনতার নামের সঙ্গে মিলিয়েই সারাজীবনের পরিশ্রমে জুলিয়া অ্যাকোয়া টোফানা নামক বিষটি তৈরি করেন। তার বিষ বিক্রির বিষয়টি বেশ গোপনীয় ছিল। যে কেউ চাইলেই তার কাছ থেকে বিষ কিনতে পারত না। জুলিয়া তার ঠিকানা নিয়ে আগে ভালোভাবে খোঁজ নিতেন, আসলেই সেই নারী অত্যাচারিত কিনা। তারপর তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হত, কীভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে বিষটি প্রয়োগ করতে হবে সে বিষয়ে। 

এরপর নানা নির্দেশনাসহ দেয়া হত বিষের বোতল। দিনে দুই ফোঁটা করে খাওয়ানো হত এই বিষ। ধীরে ধীরে এই বিষ একজন মানুষকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেত। জুলিয়ার সঙ্গে এ কাজে তার মেয়েও তাকে সহযোগিতা করত। যদিও ইতিহাসে জুলিয়ার স্বামী কে ছিলেন সে হদিস মেলেনি। মা ও মেয়ে মিলে ভালোই বিষের ব্যবসা সামলাচ্ছিলেন। 

ভাবছেন হয়তো এতো বছর ধরে এমন ঘটনা ঘটছে অথচ জুলিয়া এবং ওই সব নারীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকল কীভাবে? এখানেও জুলিয়ায় বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়। জেনে অবাক হবেন, জুলিয়া অ্যাকোয়া টোফানা এমন একটি বোতলে রাখত যেটি দেখতে প্রসাধনীর অন্য সব বোতলগুলোর মতোই ছিল। আর এর গায়ে লেখা থাকত ত্বকে কীভাবে এটি ব্যবহার করা যায় তার দিক নির্দেশনা। ফলে যে কেউ দেখলে ভাবত এটি হয়ত কোনো প্রসাধনী পণ্য। 

তার মেয়েও বিষ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলএভাবেই পুলিশের চোখে ধুলা দিতে পেরেছিল তারা। ধারণা করা হয়, জুলিয়া তার স্বামীকে অ্যাকোয়া টোফানা দিয়েই মেরেছিল। ৫০ বছর ধরে মানুষের চোখে ধুলা দিয়ে চলছিল তার এই ব্যবসা। তবে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যান জুলিয়া। একবার একজন নারী তার কাছে অ্যাকোয়া টোফানা কিনতে আসেন। জুলিয়া অন্যবারের মতো এবারো সব খোঁজ খবর করে দেখেন সত্যিই ওই নারী তার স্বামীর দ্বারা অত্যাচারিত। এরপর তাকে প্রশিক্ষণ দেন জুলিয়া কীভাবে বিষ ব্যবহার করতে হবে।  

ওই নারী স্যুপের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তার স্বামীকে খেতে দেয়। এরপরই তার আবার স্বামীর প্রতি ভালোবাসার উদয় হয়। এ কারণে স্যুপ খাওয়ার আগেই তিনি তার স্বামীর হাত থেকে তা ফেলে দেন। এতে তার স্বামী রেগে যান এবং তাকে মারতে থাকেন। একসময় সে স্বীকার করে যে স্যুপে বিষ মেশানো ছিল। এরপর জুলিয়ার কথাও জানিয়ে দেয় সে। একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে জুলিয়ার সব অপকর্ম। জুলিয়া তার মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে এক গির্জায় আশ্রয় নেয়। 

সারা ইতালির মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এ খবর। তবে একটু বেশি রং ছড়িয়ে ছড়াতে থাকে খবর। এক সময় এই খবর রূপ নেয় পুরোই অন্যদিকে। সবাই তখন বলতে থাকে জুলিয়া একটি বিষ বানিয়েছে যা পানির মধ্যে মিশিয়ে সে সবাইকে মেরে ফেলতে চায়। আর এরপর পুরো শহরের দখল নেবে সে। এরপর সব মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে জুলিয়ার উপর। একসময় ধরা পড়ে জুলিয়া আর তার মেয়ে। জুলিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।  

আকোয়া টোফানা বিষ এমন বোতলেই বিক্রি করা হতসবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয়টি হলো, জুলিয়ার তৈরি অ্যাকোয়া টোফানা দিয়েই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। রোমের ক্যাম্পো দে ফিওরিতে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৬৫৯ সালে জুলিয়ার সঙ্গে তার মেয়ে এবং তার তিন কর্মচারীকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। পুলিশ সেসময় জুলিয়ার তৈরি সব বিষ ধ্বংস করে দেয়। তবে জুলিয়া কীভাবে এই বিষ তৈরি করেছিল তা আজো কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি। 

অ্যাকোয়া টোফানার মাত্র চার ফোঁটাই একজনকে মেরে ফেলতে যথেষ্ট ছিল। ছোট্ট শিশিতে থাকায় নারীরা তাদের ড্রেসিং টেবিলে অন্যান্য লোশন বা পারফিউমের পাশেই এটি রেখে দিত। মধ্যযুগ এবং আধুনিক ইউরোপের প্রথম দিকে কাউকে হত্যার জন্য বিশেষ করে নারীদের প্রধান অস্ত্র ছিল অ্যাকোয়া টোফানা। পরবর্তীতে অনেক শিল্পী তাদের আঁকা চিত্রতে অ্যাকোয়া টোফানা ফুটিয়ে তুলেছিলেন।  

অ্যাকোয়া টোফানায় ব্যবহৃত আর্সেনিক বিষ হিসেবে খুব মারাত্মক। ধারণা করা হয়, প্রাচীন রোমানরাও এটিকে নানা সময় ব্যবহার করত। কথিত আছে, সম্রাট অগাস্টাসের স্ত্রী এবং ক্লোডিয়াসের স্ত্রীকে খাবারে আর্সেনিক মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। 

সূত্র: মিডিয়ামডটকম

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস