৫৬টি ঘর নির্মাণে দুর্নীতির ছোবল

৫৬টি ঘর নির্মাণে দুর্নীতির ছোবল

জামাল হোসেন খোকন, জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:০৯ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৭:১৩ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় গৃহহীনদের বিনামূল্যে ৫৬টি ঘর নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘর নির্মাণে নিম্নমানের ইট, বালু, রড, নকশা পরিবর্তন ও স্বচ্ছলদের মাঝে ঘর দেয়ায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।

জীবননগর উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ(টিআর) কর্মসূচির আওতায় গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় ৫৬টি ঘর হতদরিদ্রদের মধ্যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। দুই কক্ষ বিশিষ্ট প্রতিটি ঘর হবে ২০ ফুট লম্বা ও প্রস্থ আট ফুট। চারদিকে ইটের দেয়াল আর ওপরে টিনের ছাউনি। নিয়ম অনুযায়ী ঘরের ছাউনির কাজে মেহগুনি কিংবা কড়াই কাঠ ব্যবহার করতে হবে। ঘরের মেঝেতে তিন ইঞ্চি ঢালাই হবে। অন্যদিকে একই সঙ্গে নির্মিত রান্না ও টয়লেট হবে ১৩ ফুট। ব্যবহৃত ইট হবে এক নম্বর এবং টিন হতে হবে পয়েন্ট ৪৬ মিলিমিটার পুরুত্বের রঙিন ঢেউটিন। 

নানা অজুহাতে নির্মাণাধীন ঘরগুলোর নির্মাণ কাজ চলছে ধীরগতিতে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুবিধাভোগীদের মধ্যে ঘর হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটতে পারে। ঘর ও রান্নাঘরের মাঝখানে সাত ফুট করিডোর থাকতে হবে। যার ওপরে থাকবে টিনের ছাউনি। এ প্রকল্পের উপজেলা কমিটির সভাপতি হলেন ইউএনও এবং সদস্য সচিব প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও প্রতিটি ঘরই একটি প্রকল্প। প্রতিটি ঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে নয় সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি করা হয়েছে। গঠিত ওই কমিটি ঘর নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করবে।

উপজেলার বিভিন্ন ইউপিতে সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিটি ঘর নির্মাণে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র। এসব অনিয়ম-দুর্নীতি মেনেই সুবিধাভোগীরা ঘর পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন। ঘর নির্মাণের ব্যাপারে সুবিধাভোগীদের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় থাকায় তারা কিছু বলছেন না। আবার অনেক সুবিধাভোগী অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে আংশিক তথ্য দিলেও প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। 

দরিদ্রদের ঘর না দিয়ে সচ্ছল ব্যাক্তিদের থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ঘর দেয়া হয়েছে মর্মে অনেক চেয়ারম্যান-মেম্বারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। ঘর বরাদ্দ দিতে মোটা টাকা নেয়ার ব্যাপারে এলাকায় গুঞ্জন থাকলেও ভয়ে মুখ খুলছেন না ভুক্তভোগীরা। ঘর নির্মাণে সমস্ত ব্যয়ভার সরকার বহন করার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় ঘরের মাটি ও বালু ক্রয়ে টাকা দিতে হয়েছে ভুক্তভোগীদের এমনও অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলার বাঁকা ইউপির সুটিয়া গ্রামের রিপন হোসেনের অভিযোগ, তার থেকে ৪৭ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। ঘর নির্মাণে নকশা পরিবর্তন ও  নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

একাধিক সুবিধাভোগীদের দাবি তারা ঘরের ব্যাপারে মুখ খুললে পরে আর কোনো সুবিধা পাবেন না। আবার পরে কোনো ঝামেলায় পড়ে কিনা এমন আশঙ্কাও তাদের মধ্যে রয়েছে। টাকা নিয়ে ঘর বরাদ্দ দেয়ার ঘটনা বাঁকা ইউপি ছাড়াও অন্যান্য ইউপিতেও ঘটেছে। অধিকাংশ ঘরই দেয়া হয়েছে দলীয় বিবেচনা আর স্বজনপ্রীতিতে।

উপজেলার রায়পুর ইউপির নতুন চাকলার সুবিধাভোগী হাফিজুর রহমান হাফি জানান, আমরা মূর্খ মানুষ কীভাবে বুঝবো ইট-বালু ভালো দিচ্ছে নাকি খারাপ। ঘর নির্মাণে ব্যবহৃত রড অত্যন্ত নিম্নমানের। মিস্ত্রি মিঠু বলেছেন ১শ’ কেজি রড। আবার চেয়ারম্যান বলছেন ৮৫ কেজি। তবে আমরা কোনো কিছু মেপে দেখিনি।

বাঁকা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের প্রধান জানান, বিধি অনুযায়ী হতদরিদ্রদের মধ্যে সরকারি ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কারো থেকে কোনো টাকা নেয়া হয়নি। আমার নাম করে কেউ টাকা নিয়ে থাকলে তার দায়-দায়িত্ব তো আর আমি নেবো না। আমার নামে যারা এসব কাজ করে বেড়াচ্ছেন তারা কোনোভাবেই টাকা নেয়ার ব্যাপারটি প্রমাণ করতে পারবেন না। তবে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে প্রতিপক্ষরা সুবিধাভোগীদের নানাভাবে হুমকি দিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আদায়ের চেষ্টা করছেন। সবচেয়ে বড় কথা সব ইউপিতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলেও একটি চক্র শুধু মাঠে নেমেছে আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে।

এক ইউপি চেয়ারম্যান জানান, যেসব ইউপি ঘর বরাদ্দ পেয়েছে, তারা অনেকটাই বাধ্য হয়েই টাকা নিচ্ছে। কারণ প্রতি ঘরের অনুকূলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হয়। তাহলে তারা ওই টাকাটা পাবে কোথায়?

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের সহকারী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম টগর বলেন, আমি একা দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলার দায়িত্ব পালন করছি। একার পক্ষে দুটি অফিসের সব কাজ সামাল দেয়া কঠিন। তারপরও কাজের ব্যাপারে অভিযোগ যখন উঠেছে, তখন পরিদর্শন করে জড়িতদের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইউএনও সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাঁকা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের প্রধানের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে ঘর বরাদ্দ দেয়ার ব্যাপারে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকার ঘর নির্মাণের ব্যাপারে যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছে সেভাবেই করতে হবে। অন্যথায় অভিযোগ পাওয়া গেলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম