Alexa ৫২’র ৬৭ বছর

৫২’র ৬৭ বছর

প্রকাশিত: ১৫:২২ ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৬:২০ ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর পূর্ণ হবে এ বছর ২১  ফেব্রুয়ারি। ভাষা আন্দোলন শব্দটাই বলে দেয় কেন এই আন্দোলন।

বলে দেয়,  এ আন্দোলন ভাষার  জন্য, মাতৃভাষার মর্যাদাপূর্ণ  প্রতিষ্ঠার জন্য।  ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। তখনই বাঙালিরা মনে মনে শঙ্কিত ছিল, ভিন্ন ভাষা সংস্কৃতির একটা দেশের সঙ্গে তাদের মিল হবে তো!

কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল তাদের আশঙ্কা অমূলক নয়। পাকিস্তানের ক্ষমতালোভী শাসকরা অবিবেচনাপ্রসূত ও নীতি বহির্ভুত কাজ চালাতে থাকল একের পর এক। যা ছিল পূর্ব বাংলার জনগণের স্বার্থের প্রতিকূল। দেখা গেল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এমনকি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও আঘাত শুরু করল তারা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মেরুদন্ড ভাঙার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠল ক্ষমতাশ্রয়ীরা।

শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে সংখ্যালঘিষ্ঠের ভাষা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। আর তখন থেকেই শুরু  হল ভাষা আন্দোলনের।  বাংলার জনগণ তাদের প্রাণের ভাষা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার দাবিতে তুমুল আন্দোলনে যেতে বাধ্য হল। শিকার হল নির্যাতন আর জেল-জুলুমের। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রাণ হারালো সালাম, বরকত, রফিকসহ নাম না জানা শহিদেরা। এ আত্মত্যাগে  দেশব্যাপী আগুন জ্বলে উঠল । ছাত্র আন্দোলন পরিণত হলো ছাত্র-জনতার অপ্রতিরোধ্য গণ-আন্দোলনে। একুশে ফেব্রুয়ারি ঘোষিত হল ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে।  আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল ঢাকার বাইরে, সারাদেশে।

 ভাষা হলো সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যম। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বাহন। তাই ভাষার ওপর আঘাত এলে পুরো জাতি শঙ্কিত হয়ে ওঠে। হয় আতঙ্কিত। উদ্যোগী হয় আঘাত প্রতিহত করতে। সোজা কথায় কাজ না হলে এগিয়ে যায় রক্তাক্ত পথে। এগিয়ে যায় আত্মদানের রথে । একুশে ফেব্রুয়ারি প্রমাণ করেছে পূর্ব বাংলার জনগণের আচার-আচরণ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, জীবনচিন্তা স্বতন্ত্র। এই স্বাতস্ত্রকে সংরক্ষণ করতে জনগণ প্রাণ পর্যন্ত পণ করে বসে। এই স্বাতন্ত্র থেকেই সৃষ্টি হয় এক নতুন জাতীয়তাবোধের।

৫২’র ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬’র ছয়দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, তারপর ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ  বাঙালির জীবনে এক বিরাট ঘটনাবহুল অধ্যায়। একুশে ফেব্রুয়ারি এ জাতির জীবনে এক অমূল্য সম্পদ। আর এই অমূল্য সম্পদের সৃষ্টি হয়ে থাকে কোনো এক দুর্লভ মুহূর্তকে কেন্দ্র করে।

একুশে ফেব্রুয়ারি তেমনই এক দুর্লভ মুহূর্ত। যার ফলশ্রুতিতে এদেশে স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের  সূচনা হয়। ভাষা আন্দোলনই  পটভূমি ও গোড়াপত্তন করেছিল মুক্তিযুদ্ধের। অদম্য ত্যাগ তিতিক্ষা স্বীকার করে, অমিত তেজে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে দক্ষিণ-এশিয়ায় একমাত্র ভাষাভিত্তিক স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সৃষ্টি করে পূর্ব বাংলার মুক্তিপাগল জনগণ । পূর্ব বাংলার জনগণের হাতে আসে নতুন পতাকা রক্তরঞ্জিত পথে। তারা পায় নতুন পরিচয়, নতুন ঠিকানা।

ভাষা আন্দোলন আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘সর্বস্তরে বাংলা চাই’-এর মতো আবেগময়  স্লোগানে স্লোগানে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে ভাষাপ্রেমী জনগণ। পূর্ববাংলার বঞ্চিত, নিপীড়িত, অবহেলিত ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নতুন সংবিধানে উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদানে বাধ্য হয় । রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক বিজয় সূচিত হয় সেদিন। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো মহান ভাষা আন্দোলন দিবস একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই স্বীকৃতি বাঙালি জাতির আরেকটি বিশাল বিজয় । ইউনেসকো এই স্বীকৃতি দান করে বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনসমষ্টিকে কৃতজ্ঞতাপাশে বেধেছে। কৃতজ্ঞ করেছে বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি বাংলাভাষীকে। ১৮৮৬ সালের ১ মে শিকাগো নগরীর ‘ হে মার্কেটে’ কিছুসংখ্যক শ্রমজীবী আট ঘণ্টা শ্রমকালের দাবিতে আন্দোলনে  নেমেছিল। তাঁদের আত্মদানের মাধ্যমে বিশ্বময় স্বীকৃতি লাভ করেছে  মে দিবস। বাংলাদেশের দামাল ছেলেরাও তেমনি ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করে বাংলা ভাষার দাবিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

বর্তমানে বিশ্বের ২৫ কোটিরও বেশি লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। বাংলা ভাষা পৃথিবীর চার সহস্রাধিক ভাষার মধ্যে চতুর্থ বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। ফরাসি ভাষার চাইতেও বাংলাভাষী জনগণের সংখ্যা অনেক বেশি। এমনকি সা¤প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী লন্ডনে যেখানে ৩০৭টি ভাষায় মানুষ কথা বলে সেখানেও বাংলা হচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা। আফ্রিকা মহাদেশের সিয়েরা লিওন-এ বাংলাকে সে দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তাই ২০১৯ সালে শুধু বাংলাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় একুশে ফেব্রুয়ারি প্রতিপালিত হবে না, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ১৯৩টি দেশে পালিত হবে। বিশ্বের সর্বত্র শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে শহীদ বরকত, সালাম, জব্বার, রফিকের নাম। উচ্চারিত হবে বাংলাদেশের নাম।

একুশে ফেব্রুয়ারির গৌরবময় কাহিনি জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করেছে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে উঠেছে দেশ ও বিদেশের অসংখ্য মানুষের তীর্থক্ষেত্র। তবে একথা উল্লেখ্য, একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হলেও এটি বাংলাদেশের একান্ত আপন অর্জন। বাংলাদেশের বাইরেও বাংলা ভাষা প্রচলিত রয়েছে। আসাম ও ত্রিপুরার বিরাট জনসমষ্টির, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের জনগণের মাতৃভাষা বাংলা। একুশে ফেব্রুয়ারির মতো মহান অধ্যায় কিন্তু  রচিত হয় পূর্ব বাংলায়। শহীদ মিনার নির্মাণ হয়,  ঢাকায়। কলকাতায় নয়। বাংলাদেশের ভাষা বাংলা  সৃষ্টি করেছে স্বতন্ত্র এক আবহ। সৃষ্টি করেছে স্বতন্ত্র এক জীবনবোধ। স্বতন্ত্র এক সংস্কৃতি। এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশি সংস্কৃতি। বাংলাদেশের জনগণ এ জন্য গর্বিত। জাতি হিসেবে গর্বিত মহান একুশের উত্তরাধিকার মাথায় নিয়ে। তাই একুশে ফেব্রæয়ারির  আন্দোলনের বীরনায়কদের সীমাহীন ত্যাগের কাহিনি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। স্মরণ করে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারিকে।  শ্রদ্ধাবনত হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পূর্ণস্মৃতি স্মরণে রেখে।

স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। সর্বস্তরে বাংলাভাষা বাস্তবায়নের ব্যাপারে কিছু কিছু আইনও জারি করা হয়েছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ তেমনভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ৬৭ বছর সময় একটা জাতির জীবনে মোটেই কম সময় নয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, যে আদর্শ,  চেতনা ও প্রত্যাশা নিয়ে এত আত্মদানের বিনিময়ে আমরা মায়ের ভাষাকে  প্রতিষ্ঠিত করেছি, সে অনুপাতে দেশে সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রয়োগ ও প্রচলন করতে সক্ষম হইনি আমরা। ভাষা আন্দোলনের ছয় দশক পেরিয়ে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাবনিকাশ করতে গেলে তাই  প্রত্যাশার তুলনায় প্রাপ্তি বড়ই কম।

স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া সত্তে¡ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে তথা উচ্চশিক্ষাসহ প্রশাসনে, আদালতে মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার অতি সীমিত। দেশে অসংখ্য ইংরেজি-মাধ্যম শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে দেশে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের  শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভক্তি  তৈরি হয়েছে। ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা ব্যয়বহুল, যা গ্রহণ করা সমাজের  ধনী শ্রেণির সন্তানদের পক্ষে সম্ভব। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পক্ষে সে শিক্ষা গ্রহণ সম্ভব নয়। তাই পিছিয়ে পড়েছে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল তরুণ সমাজ।

বাংলাদেশের বিভিন্ন  প্রশাসনিক  প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের মধ্যে অনেকেরই ইংরেজির মোহ আজও কাটেনি।  তারা বাংলা মাধ্যমের নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনে আগ্রহী নন। বিষয়টি সর্বস্তরে বাংলাভাষার ব্যবহার ও প্রচলনের অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। সরকারি নির্দেশে অফিস-আদালতে নথি ও নোট  তৈরি, অভ্যন্তরীণ চিঠিপত্র আদান-প্রদানে বাংলা ভাষার ব্যবহার মোটামুটিভাবে চালু হলেও দলিলপত্র, দস্তাবেজ, চুক্তিনামা ইত্যাদি এখনও অনেকাংশে ইংরেজিতে লেখা হচ্ছে। এসব দলিলপত্রে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে এক অদ্ভুত ধরনের বিজাতীয় ভাষায় কথা বলছে বিভিন্ন প্রাইভেট রেডিওর পারফরমারা। এদিকে নজর দিতে হতে তথ্য মন্ত্রণালয়কে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও কৃষি-প্রযুক্তির বই-পুস্তক বাংলায় প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তা জনপ্রিয় করে তুলতে হবে।

ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। ইংরেজি ভাষার সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। আমরা ইংরেজি পড়ব, দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে। বর্তমানে সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহার দারুণভাবে উপেক্ষিত। মাতৃভাষার মাধ্যমে জ্ঞানচর্চাই জাতীয় অগ্রগতির চাবিকাঠি। চীন, জাপান, কোরিয়া, রাশিয়া, জার্মানি মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় এবং বিজ্ঞানে চরম উৎকর্ষ লাভ করে  আত্মনির্ভরশীল হয়েছে। আমরাও পারবো।  এ ব্যাপারে মূল বাধা চিহ্নিত করে তা অতিক্রম করে সামনের দিকে এগুতে হবে আমাদের। এ পরিপ্রেক্ষিতে জনমত সৃষ্টিতে  এবং আইনের প্রয়োগে শিক্ষিত শ্রেণি ও সরকারের দায়িত্ব অপরিসীম।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর