Alexa ৪০ সেকেন্ডেই হারিয়ে যাচ্ছে প্রিয়জন!

৪০ সেকেন্ডেই হারিয়ে যাচ্ছে প্রিয়জন!

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:০৭ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৭:১২ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সুন্দর এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে কেউই চায় না। তারপরও আবেগতাড়িত হয়ে কখনো বা ভুল সিদ্ধান্তবশত আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন অনেকেই। তরুণ প্রজন্মের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে আত্মহত্যা। সারা বিশ্ব এই সমস্যায় ভুগছে। কিছু দেশে সচেতনতামূলক নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিছু ফল মিলেছে। কিন্তু সমস্যা এখনও বেশ উদ্বেগজনক। 

চলতি বছরের ৯ এপ্রিল, হবিগঞ্জের ইনাতাবাদে মোটরসাইকেল কিনে না দেয়ায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে হাদি আলম নামের এক স্কুলছাত্র।হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিল সে। দীর্ঘদিন ধরেই মোটরসাইকেল কিনে দেয়ার জন্য পরিবারের কাছে দাবি ছিল তার। ঘটনার দিন মায়ের বকুনিতে অভিমান করে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না বেঁধে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে সে। 

আরো একটি ঘটনা, স্কুলের শ্রেণিকক্ষেই এক ছাত্রীর পিরিয়ড শুরু হয়। এক পর্যায়ে রক্তের দাগ পোশাকেও লেগে যায়। এই ঘটনায় শিক্ষকের বকুনিতে লজ্জায় মুষড়ে পড়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় সে। ৬ সেপ্টেম্বর কেনিয়ার নাইরোবির কাবিয়ানগেক এলাকার এক স্কুলে এ ঘটনাটি ঘটে। 

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশিপ্রতিদিনের খবরের পাতায় চোখ রাখলেই আত্মহত্যার খবর চোখে পড়ে। আর নিজেকে শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে অনেক সময়েই থাকে অতি তুচ্ছ কোনো কারণ। দশম শ্রেণীর ছাত্র হাদির মতো কখনো শুধু মা-বাবার বকুনি খেয়ে সন্তান চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। আবার কখনো প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয় অনেকেই। গত ৪ সেপ্টেম্বর নাটোরের এক কলেজছাত্রী প্রেমে ব্যর্থ হয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। 

মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা ফেল করে আত্মহত্যা করেছে এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। প্রতিবছরই পরীক্ষা ফেল করে অনেক তরুণ প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে। চলতি বছরের ১৯ জুলাই, অনার্স পরীক্ষায় তিন বিষয়ে ফেল করায় রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের মনিজা আক্তার মিতু নামে এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেন।  তিনি অর্থনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী ছিলেন। মিতুর বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানায়। ঘটনার রাতে নিজ বাড়িতে একটি গাছের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে সে আত্মহত্যা করে। একটি জীবনের চেয়ে পরীক্ষার ফলাফল কি বেশি দামী? 

শুধু বাংলাদেশেই নয় বরং বিশ্বজুড়েই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারন করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সমস্যার সমাধানে। গত ১০ সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। মূল্যবান জীবন রক্ষায় কী করা উচিত? কেমন করে রক্ষা পাবে মূল্যবান প্রাণ?

বেশিরভাগ আত্মহত্যা গলায় দিয়েই করা হয়প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বে একজন করে আত্মহত্যা করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক রিপোর্ট এমনই বলছে। আর বিশ্বে তরুণদের যে যে কারণে মৃত্যু হয় তার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আত্মহত্যা। ১৫ থেকে ২৯ বছরের বয়সীদের মধ্যেই আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এই বয়সীদের মৃত্যু সবচেয়ে বেশি হয় পথ দুর্ঘটনায়। আবার ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আত্মহত্যা। আর এই বয়সী ছেলেদের মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে তৃতীয় স্থানে রয়েছে আত্মহত্যা। 

ধনী দেশগুলোতে পুরুষের মৃত্যুর হার নারীদের মৃত্যুর হারের তিনগুণ। কিন্তু নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশগুলোতে পুরুষ এবং নারীদের মৃত্যুর হার প্রায় সমান। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করেন। আরেকটি হিসেব বলছে, প্রতি আত্মহত্যার তুলনায় ২০ জনের বেশি আত্মহত্যার চেষ্টা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে আত্মহত্যার কারণের সঙ্গে কোন কোন পদ্ধতিতে আত্মহত্যার বেছে নেয়া হয় তারও একটি পরিসংখ্যান মিলেছে। দেখা গিয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গলায় দড়ি দিয়েই আত্মহত্যা করা হয়। এছাড়াও কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করা হয়। আর রয়েছে আগ্নেয়াস্ত্রের সাহায্যে আত্মহত্যা। 

পাঁচ বছর আগে প্রথম আত্মহত্যার রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাতে দেশগুলোকে আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য নীতি নির্ধারণের কথা বলা হয়েছিল। গত পাঁচ বছরে বেশ কিছু দেশ আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু সেই দেশের সংখ্যা এখনো মাত্র ৩৮। এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশিষ্ট কর্মকর্তারা জানায়, আত্মহত্যা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এখনো প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন করে আত্মহত্যা করেন বিশ্বে। আত্মহত্যা শুধু একজনের প্রাণহানি নয়। তা পরিবারের সদস্যদের পক্ষে বিরাট মানসিক আঘাত। 

কীটনাশক এমনকি ঘুমের ওষুধ খেয়েও আত্মহত্যা করা হয়সেই সঙ্গে বন্ধু এবং সহকর্মীদেরও দীর্ঘ সময়ে মানসিক আঘাত সহ্য করতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে। অনুরোধ করা হয়েছে আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহায়তা করার জন্য। কীভাবে সহায়তা করা যেতে পারে তার রূপরেখাও তৈরি করে দিয়েছে সংস্থা। জানানো হয়েছে জাতীয় স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে এই বিষয়ে নীতি তৈরি করা হোক। সেই সঙ্গে শিক্ষা কর্মসূচিতেও সচেতনতামূলক পদক্ষেপ করা হোক। 

আত্মহত্যা ঠেকাতে দেশগুলোকে আরও কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। সেগুলোর একটি হল কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ। কারণ কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যার প্রবণতা প্রবল। বহু কীটনাশকই অত্যন্ত বিষাক্ত। আর যত বেশি বিষাক্ত তত বেশি প্রাণঘাতী। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দিকে। কারণ ওই সব এলাকায় অনেক সময়েই কোনোরকম প্রতিষেধক পাওয়া যায় না। কাছাকাছি কোনো স্বাস্থ্য পরিষেবাও মেলে না। ফলে মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়ে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সদ্য প্রকাশিত রিপোর্টে জানিয়েছে, কীটনাশক নিয়ন্ত্রিত করলে মৃত্যুর হার কমানো যেতে পারে। রিপোর্টে এ বিষয়ে উদাহরণও দেয়া হয়েছে। যেমন শ্রীলঙ্কা। এই দেশে বেশ কিছু উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন কীটনাশক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে আত্মহত্যা ৭০ শতাংশ কমানো গিয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। 

 রেললাইনে মাথা দিয়েও আত্মহত্যা করেন অনেকেইপরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৯৩ হাজার জনের জীবন বাঁচানো গিয়েছে কীটনাশকে নিয়ন্ত্রণ আনার ফলে। দ্বিতীয় উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। সেখানে আগাছা দমনের জন্য ব্যবহার করা প্যারাকুয়াত নামে একটি ওষুধ খেয়ে প্রাণহানি হত সবথেকে বেশি। ২০১১-১২ সালে এই আগাছানাশক ব্যবহার বন্ধ করা হয়। হাতেনাতে ফল মেলে। দেখা যায়, ২০১১-১৩ সালের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা কমেছে।

তথ্য সবসময়েই কাজে লাগে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে কার্যকরী নীতি এবং কৌশল গ্রহণ করতে হলে এই তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে তা করা হয় না। ২০১৬ সালের রিপোর্ট প্রকাশের সময়ে সংস্থার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মাত্র ৮০টি দেশ তথ্য দিয়েছিল। কিন্তু সদস্য দেশ রয়েছে ১৮৩টি। নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশগুলোতে এই ধরনের কোনও তথ্য সংগ্রহ করাই হয়নি। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্ট জানিয়েছে, আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা যায়। এর জন্য ব্যক্তিগত স্তর থেকে শুরু করে জাতীয় স্তর পর্যন্ত উদ্যোগী হতে হবে। পাশে দাঁড়াতে হবে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়া মানুষগুলোর। হঠাৎ কোনও বিপর্যয়ে আঘাত পাওয়া মানুষগুলোকে জোগাতে হবে মানসিক শক্তি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস