৪শ’ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ১১ কোম্পানি

৪শ’ কোটি টাকা নিয়ে উধাও ১১ কোম্পানি

মীর সাখাওয়াত সোহেল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:৩১ ২৪ মে ২০১৯   আপডেট: ১৪:১৩ ২৪ মে ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১১টি কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে থাকা এসব কোম্পানির অস্তিত্বই এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। 

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওটিসি মার্কেটে ৬৫টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানি পুঁজিবাজারের বিদ্যমান আইন কিছুটা অনুসরণ করলেও, বাকিরা আইনের তোয়াক্কা করছে না। এর মধ্যে ২২টি কোম্পানি কোনো রকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু অন্য ১১টি কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব নেই। 

ওটিসি মার্কেটের অস্তিত্বহীন ওই ১১টি কোম্পানি হল- বাংলাদেশ ইলেকট্রিসিটি মিটার কোম্পানি (বেমকো), চিক টেক্সটাইল, রাসপিট ডাটা, রাসপিট ইনকরপোরেশন, এম হোসেন গার্মেন্টস, ফার্মাকো, আমান সি ফুড, জার্মান বাংলা ফুড, মেটালিক্স, রাঙামাটি ফুড ও সালেহ কার্পেট। এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের প্রায় চার কোটি ৮৭ লাখ শেয়ার রয়েছে। যার বাজারমূল্য ৪০০ কোটি টাকারও বেশি। নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে এসব কোম্পানির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ওইসব ঠিকানায় কোথাও আবাসিক বাসা, কোথাও মুদি দোকান, আবার কোথাও বেসরকারি ক্লিনিক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেছে। 

জানা গেছে, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ওভার দ্য কাউন্টার) বিধিমালা, ২০০১ অনুযায়ী ২০০৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এসইসি’র আদেশ নম্বর এসইসি/সিএমআরআরসিডি/২০১১-১৬ অনুসারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডকে কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের জন্য ওভার দ্য কাউন্টার সুযোগ দেয়া হয়। ২০০৯ সালের ১ অক্টোবরে প্রাথমিকভাবে ৫১টি কোম্পানি নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ওটিসি মার্কেট যাত্রা শুরু করে। ৫১টি কোম্পানির মধ্যে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড ২০১০ সালের ১৩ জুন ‘জেড’ক্যাটাগরির অধীনে মূল বাজারে ফিরে আসে। 

এরপর আরো ২৯টি কোম্পানিকে বিদ্যমান ওটিসি মার্কেটে পাঠানো হয়। কিন্তু  কিছুদিনের মধ্যেই শর্ত পূরণ করায় ১০টি কোম্পানিকে আবার মূল মার্কেটে ফেরার অনুমোদন দেয় বিএসইসি। জিএমজি ইন্ড্রাষ্ট্রিয়াল কর্পোরেশন লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওটিসি মার্কেট থেকে ২০১১ সালের ২০ জুন তালিকাচ্যুত করা হয়। এরপর ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা পর্ষদ পদ্মা সিমেন্ট লিমিটেডকে তালিকাচ্যুত করে। একই বছরের ১৪ মে ওয়াটা ক্যামিক্যালস লিমিটেডের শেয়ার ওটিসি মার্কেট থেকে মূল মার্কেটে যাওয়ার আবেদন অনুমোদন করে ডিএসই। সবশেষ ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ওটিসি মার্কেট থেকে মূল মার্কেটে যাওয়ার আবেদন অনুমোদন করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালনা পর্ষদ। এ অবস্থায় বর্তমানে ওটিসি মার্কেটে সর্বমোট ৬৫টি কোম্পানি রয়েছে।  

মূলত উৎপাদন বন্ধ থাকা, অব্যাহতভাবে লোকসানে থাকা, লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়া, বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) না করার কারণে বিভিন্ন সময় এসব কোম্পানিকে ওটিসি মার্কেটে পাঠানো হয়েছিল। এদের মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি তাদের ব্যর্থতা কাটিয়ে মূল মার্কেটে ফিরে গেলেও, অন্যদের এ নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই। এদের মধ্যে ওটিসি মার্কেটে স্থানান্তরিত হওয়ার পর ২৫টি কোম্পানির কোনো লেনদেনই হয়নি। আর বর্তমানে ১১টি কোম্পানি অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে ওটিসি মার্কেটের কয়েকটি কোম্পানির ঠিকানায় গিয়ে তাদের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ডিএসইর ওয়েবসাইটে কোম্পানি প্রোফাইলে ‘ফার্মাকো’র ঠিকানা দেয়া আছে ৫০/১ পুরানা পল্টন লেন, ঢাকা। সেখানে গিয়ে ফার্মাকোর অফিসের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। 

সেখানে কর্মরত নিরাপত্তাকর্মী জানান, ওই ভবনে কোনো অফিস নেই। একইভাবে ওটিসি মার্কেটের রাসপিট ডাটা ও রাসপিট ইনকর্পোরেশনের ঠিকানা অনুযায়ী রাজধানীর গ্রিন রোডে এ কে কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বার। গত ১০ বছর ধরে এখানে এ নামে কোনো কোম্পানি দেখেননি বলে জানান ভবনের তত্ত্বাবধায়ক। ওটিসি বাজারের আরেক কোম্পানি এম হোসেন গার্মেন্টসের ঠিকানা দেয়া আছে বনানীর কে-ব্লকের ২৭ নম্বর রোডের ২ নম্বর বাসার তৃতীয় তলা। 

ওই ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অন্য একটি কোম্পানির অফিস। তাদের এক কর্মকর্তা জানান, তারা ২০০৭ সাল থেকে এখানে অফিস নিয়েছেন। এর আগে এম হোসেন গার্মেন্টস নামে কোনো কোম্পানি ছিল কি না, তা জানেন না। 

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, কোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেয় বিএসইসি। তারা কোম্পানির সবকিছু দেখে বিবেচনা করেই অনুমোদন দেয়। তাই কোনো কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মাসাৎ করতে চাইলে সেটা বিএসইসিকেই ঠেকাতে হবে। এর দায়ভার বিএসইসি কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। 

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের পুঁজিবাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। আস্থার সংকটে বাজার একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এ অবস্থায় যদি কোনো কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়, তাহলে বাজারে আরো বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তারা বলছেন, এমনিতেই ওটিসি মার্কেটের শেয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এখানে তাদের কোটি কোটি টাকা আটকে রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরতের জন্য কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসইর একজন পরিচালক বলেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ওটিসি মার্কেটের ধারণাটাই সঠিক হয়নি। কোনো কোম্পানি খারাপ করলেই তাকে শাস্তি হিসেবে ওটিসি মার্কেটে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এতে তারা আরো বেশি হাল ছেড়ে দেয়। ফলে কোম্পানির উদ্যোক্তা/পরিচালকরা আর্থিকভাবে সেই অর্থে ক্ষতির মুখে তেমন পড়ে না। আর্থিক ক্ষতির পুরো দায় এসে পড়ে বিনিয়োগকারীদের ওপর। এ অবস্থার পরিবর্তনে বিএসইসিকে নতুন করে ভাবতে হবে। 

তবে এ বিষয়ে জানতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির একজন নির্বাহী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিনিয়োগকারীদের দেখে শুনে বুঝে বিনিয়োগ করতে হবে। যদি কোনো কোম্পানি মুনাফা না করতে পারে তবে কোম্পানি আইন অনুযায়ী শেয়ারহোল্ডারাই কোম্পানি অবলুপ্ত করতে পারে। এখানে বিএসইসির কিছু করার নেই। 

এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ওটিসি মার্কেটে যাওয়া কোম্পানি থেকে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আদায়ে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া দরকার। অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করতে না পারলে কমপক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। যদি এটা করা না হয়, তাহলে কেবল বিনিয়োগকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, সার্বিকভাবে শেয়ারবাজারেরও বড় ধরনের ধ্স নামবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এস/এমআরকে/এলকে