Alexa ২০ লাখ কর্মের সম্ভাবনা পাদুকা শিল্পে!

২০ লাখ কর্মের সম্ভাবনা পাদুকা শিল্পে!

এম এস রুকন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:১৪ ২ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৯:৪৪ ২ অক্টোবর ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

দেশে রফতানি আয়ের প্রধান এবং কর্মস্থানের বৃহত্তম বাজার তৈরি পোশাক শিল্পের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি শিল্প চামড়া-চামড়াজাত পণ্য পাদুকা শিল্প। এবার পোশাক শিল্পকে পেছনে ফেলে আগামী দিনে দেশের শীর্ষ স্থানীয় রফতানি পণ্য এবং ২০ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারও হতে যাচ্ছে পাদুকা শিল্প। এমনই অনুসন্ধানী তথ্য দিলেন এ কাজে সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পোশাক শিল্পের মতো চতুরদিক প্রতিবন্ধকতামূলক নয় পাদুকা শিল্প। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক রফতানির চেয়েও পাদুকা বা চামড়া শিল্প অনেক দূর এগিয়ে গেছে। গেল কয়েক বছরে এর রফতানি দ্বিগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের চামড়া পণ্য রফতানি হয় যা ৫০০ কোটি ডলারের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এখাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশ। বাংলাদেশ বিশ্ব বাজারে ৮ম চামড়াজাত দ্রব্য রফতানির দেশ।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে বাংলাদেশের চামড়া পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা জাপান। মোট রফতানি আয়ের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশই আসে জাপান থেকে। জাপান এ পণ্যে কোটা ফ্রি দিয়ে থাকে। ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে চামড়া পণ্য রফতানি লক্ষ্যমাত্রা ১৩৭ কোটি ডলারের বিপরীতে আয় ১০৮ কোটি; যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২২ শতাংশ কম। দেশের ভেতরেও পাদুকার চাহিদা অনেক বেশি। এদিকে দেশে প্রতি বছর ২০/২৫ কোটি পাদুকা উৎপাদন হয় যেখানে চাহিদা রয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন। জাপান ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও পাদুকার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ১১০টি রফতানিমুখী চামড়াজাত পণ্যের কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে এপেক্স, এফবি, পিকার্ড, জেনিস, আকিজ, আরএমএস, বেঙ্গল অন্যতম। এছাড়া ২০৭টি কারখানা রফতানিমুখী হওয়ার পথে রয়েছে। পোশাক শিল্পের মতো বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পাদুকা শিল্পে ঝুকলে এবং দেশীয় মালিকরা আন্তরিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করলে অপার সম্ভাবনাময় এ শিল্প আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিশ্ববাজারে শীর্ষ স্থানীয় রফতানিকারক শিল্পে পরিণত হবে এবং লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। 

বর্তমানে পোশাক শিল্পে ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করছে তার মধ্যে ৩০ লাখ নারী। পাদুকা শিল্পে নারী-পুরুষ সমান সংখ্যক শ্রমিকের কাজের সুযোগ রয়েছে। ২০ বছরের মধ্যে এ শিল্পে ৫০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সারা বছর ৬১ থেকে ৭০ লাখ গরু-মহিষ জবাই হয়। ছাগল ও ভেড়া জবাই হয় দেড় থেকে ২ কোটি। শুধু ঈদুল আজহায় গরু-মহিষ জবাই হয় প্রায় ৩০ লাখ, ছাগল ও ভেড়া ৭০ থেকে ৮০  লাখ। কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় এসব পশুর চামড়া সংগ্রহ করে রাখেন ব্যবসায়ীরা। দেশে প্রতি বছরই কোরবানী করা পশুর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। চামড়া সংগ্রহের সংখ্যাও তুলনামূলক বাড়ে ৫ থেকে ৭ শতাংশ হারে। বছরে দেশে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়; যার অধিকাংশ কোরবানীর ঈদ থেকে আসে।

সম্প্রতি এডিপি অগ্রগতির পর্যালোচনা সভায় শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ন জানান, দ্রুত বিকাশমান চামড়া শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা এবং সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন জেলায় চামড়া গোডাউন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। কোনোভাবেই যেন চামড়া শিল্প হোঁচট না খায় বা ক্ষতির কারণ না হয় তার জন্য সব রকম ব্যবস্থা করবে সরকার।

এডিপি আলোচনায় জনানো হয়, সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পের উন্নয়নে ৫০ বছরের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। সাভারে অবস্থিত চামড়া শিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার প্লান্ট বা সিইটিপির কাজ এ বছরের অক্টোবরের মধ্যে শেষ হবে। কঠিন বর্জ্যের জন্য ডাম্পিং নির্মাণে ডিজাইনের কাজ চলছে। চামড়া শিল্প নগরীর পাশে এক্সেসরিজ শিল্প নগরী স্থাপনের জন্য ২০০ একর জমি নিয়ে একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যার আওতায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চামড়া খাতের দক্ষ কারিগর তৈরি করতে চামড়া শিল্প ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে।

গবেষণা সংস্থা পিআরআই এর সূত্রে জানা যায়, চামড়াজাত দ্রব্য এবং পাদুকা শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা বিদ্যমান আছে। এগুলো নিরসন করা গেলে এ খাতে নিঃসন্দেহে সোনালি সম্ভাবনা আছে। বিশেষ কয়েকটি সমস্যা যেমন- দক্ষ জনবল গড়ে তোলা, ডিজাইন, শেইপ, কমফোর্ট, কাঁচামাল, বিনিয়োগের পারদর্শিতা, নকশার আভাব, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, সংরক্ষণ প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন এ সমস্ত সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে এ খাতে অনেক দ্রুত অগ্রগতি আসবে এবং রফতানি বাজার ও রফতানি আয় বিপুল পরিমাণে বাড়বে।

গবেষণা সংস্থা পিআরআই এর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর জানান, চামড়া এবং পাদুকা শিল্প কোনো মতেই যেন কোনো প্রকার ষড়যন্ত্রের শিকার না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সব মহলের দায়িত্বশীল হতে হবে। তা না হলে এ শিল্প হুমকির মুখে পড়ে যাবে। 

তিনি বলেন, এ শিল্পের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের জন্য সরকার এবং উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী মহল মিলে এক যোগে কাজ করতে হবে। 

দেশের শীর্ষস্থানীয় চামড়াজাত পণ্য এবং পাদুকা রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর জানান, দেশে এবং বিদেশে পাদুকা এবং চামড়া পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো গেলে দেশে বৈদেশি মুদ্রার অন্যতম শীর্ষ খাত হবে এ শিল্প। তিনি বলেন, পোশাক শিল্পের মতো এ শিল্পে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার-লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এবং এক্স স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহম্মেদ জানান, সোনালি আঁশ পাট শিল্পকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। চামড়া শিল্পকে হারাতে চাই না। তিনি বলেন, চামড়া শিল্পের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। এগুলো হলো- ব্যবসায়ী মালিক, উদ্যোক্তা এবং সরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুদ্দিন বলেন, চামড়াজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বিশ্বে। এটাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের অভাবনীয় রফতানি আয় আসবে। এছাড়া এ শিল্পে বিপুল পরিমাণে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ রয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই