Alexa ১২ মাসে ১১২ জনের প্রাণহানি

১২ মাসে ১১২ জনের প্রাণহানি

এবিএম আতিকুর রহমান, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) থেকে ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৫৩ ১৭ জানুয়ারি ২০২০  

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

টাঙ্গাইল জেলার সড়কপথগুলোতে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে ঘটছে ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা। 

থানায় নথিভুক্ত মামলা থেকে জানা যায়, গত ১২ মাসে জেলায় ৬৩টি দুর্ঘটনায় ১১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। তবে সব দুর্ঘটনায় যে থানায় মামলা হয়েছে, তা বলা যায় না। এসব দুর্ঘটনার পেছনে মহাসড়কে অনিয়ম বাড়তে থাকাকেই দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। 

মহাসড়কগুলোতে যত্রতত্র বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, উল্টোপথে যান চলাচল, নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর অবাধ চলাচল, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল, রাস্তা পারাপারে পথচারী-সেতু না থাকা, ট্রাকে ও বাসের ছাদে যাত্রী পরিবহন, পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো, অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণহীন মোটরবাইক চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে ওভারটেকিং, রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে রাখাসহ বিভিন্ন কারণে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) টাঙ্গাইল কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ জানুয়ারি মাস থেকে বছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন স্থানে ৬৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১’শ ১২ জনের প্রাণহানি হয় এবং আহত হন ৪০ জন। 

আর ২০১৮ এর জানুয়ারি মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৪টি। এতে নিহত হয়েছেন ৪৪ জন এবং আহত ১২৭ জন। 

২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে প্রায় ৩ গুণ। তবে এই সংখ্যা শুধু থানায় মামলা করার সূত্রে লিপিবদ্ধ করা। প্রকৃত দুর্ঘটনার হিসাব বের করা সম্ভব হলে এই সংখ্যা আরো বাড়বে বলে জানিয়েছেন বিআরটিএ টাঙ্গাইল সার্কেলের মোটরযান সহকারী পরিদর্শক মো. আবু নাইম। 

জেলায় দুর্ঘটনা যেভাবে বাড়ছে তা সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ সেভাবে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। বিআরটিএ ও পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছেন ট্রাফিক আইন না মেনে চলার কারণে এসব দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। 

সম্প্রতি সরেজমিনে ঢাকা-টাঙ্গাইল, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল-জামালপুর, এলেঙ্গা-ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল-সখিপুর-বাসাইল, টাঙ্গাইল-গোপালপুর, আঞ্চলিক সড়কগুলোতে বেশ কিছু অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা-ভূঞাপুর-জামালপুর-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কে। 

এই আঞ্চলিক মহাসড়কটিতে বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর নিয়ম ভাঙার প্রতিযোগিতা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে। এ আঞ্চলিক মহাসড়কটি দিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন রুটে প্রায় ১০ হাজার গাড়ি চলাচল করে প্রতিদিন। 

বেশ কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আঞ্চলিক মহাসড়কে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে চললেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। 

এনজিও কর্মী আদিল বলেন, গাড়িচালকেরা কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান। এর ফলেই দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে। 

এ প্রসঙ্গে কথা হয় কয়েকজন চালকের সঙ্গে। বিনিময় পরিবহনের চালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, সড়কে নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলার যান চলাচলেই সড়কের দুর্ঘটনাগুলোর জন্য দায়ী। 

অ্যাডিশনাল এসপি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সড়ক বাড়ছে, গাড়ি বাড়ছে, মানুষও বাড়ছে। কিন্তু ট্রাফিক আইনের প্রতি না আছে মানুষের না আছে গাড়ি চালকের শ্রদ্ধা ও সচেতনতা। যার কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনাগুলো বেড়েই চলেছে। এছাড়াও গাড়ির ফিটনেস, চালকদের অদক্ষতা এবং পথচারীদের অসচেতনতাকে দায়ী করছেন তিনি।  মহাসড়কের দুর্ঘটনা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য সড়কগুলোতে টহল দিচ্ছে পুলিশের পেট্রোল দল। পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশও নিয়োজিত আছে। একথায় চালকের দক্ষতা এবং পথচারীদের সচেতনতাই সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে মনে করেন তিনি। 

জেলায় গত বছরের সর্বশেষ বড় সড়ক দুর্ঘনাটি ঘটে ৬ ডিসেম্বর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বঙ্গবন্ধু সেতু এলাকায়। এই দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো পাঁচজন। নিহতরা মাইক্রোবাসের যাত্রী ছিলেন। 

আর সর্বশেষ দুর্ঘটনাটি ঘটে কালিহাতী উপজেলার হাতিয়া এলাকায়। বাসচাপায় রওশন জামান বাবু (২৫) নামে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়। গত ১৯ ডিসেম্বর বিকেলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্তের সংযোগ সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ১৪ ডিসেম্বর মধুপুর উপজেলার বনাঞ্চলের বড়বাইদ এলাকায় ট্রলির (ভটভটি) সঙ্গে সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশার সংঘর্ষে মমতাজ বেগম (৩৫) নামে এক নারী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন নিহতের পরিবারের তিন জনসহ ছয়জন। 

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সংগঠনের টাঙ্গাইল জেলা শাখার সভাপতি মো. গোলাম কিবরিয়া বড়মনি বলেন, আমরা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করে সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমানে সরকারের নিরাপদ সড়ক আইন ২০১৯ আইনটি কার্যকর করা হলে সড়কদুর্ঘটনা অনেকটাই কমে যাবে বলে আশা করেন তিনি। 

তবে বিআরটিএ টাঙ্গাইল কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আবু নাইম দাবি করেন, তারা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। সড়কে আইন রোধে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। লাইসেন্স ও ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হচ্ছে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ