১০০ বছরে কেউ সাঁতারু আবার দৌড়বিদ, জাপানিদের দীর্ঘজীবনের রহস্য

১০০ বছরে কেউ সাঁতারু আবার দৌড়বিদ, জাপানিদের দীর্ঘজীবনের রহস্য

মো. হাসানুজ্জামান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৩৩ ২ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৭:০৩ ২ এপ্রিল ২০২০

ছবি: জাপানের প্রবীণ ব্যক্তিরা

ছবি: জাপানের প্রবীণ ব্যক্তিরা

জাপান পৃথিবীর গড় আয়ুর শীর্ষ দেশ। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রবীণ জনসংখ্যার হার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি।

তবে জাপানের প্রবীণরা মোটেও জরাজীর্ণতার প্রতীক নয় বরং তাদের কর্ম উদ্যম সবার অনুপ্রেরণার উৎস। দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী এমনই কয়েকজন জাপানি প্রবীণ নাগরিকের জীবনের বাস্তবতা এই লেখায় স্থান পেয়েছে। যা সবার জন্যই অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।

মিয়েকো নাগাওকা

একজন মানুষের বয়স যখন ৮০’র কোঠায় চলে যায় তখন সে স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে যায়। নিজেকে সব জায়গা থেকে গুটিয়ে নেয় এবং মৃত্যুর প্রহর গুণতে থাকে। তবে জানেন কি? এমনো অনেক জাপানিজ বয়স্করা আছেন যারা এই বয়সেও সাঁতার কাটেন তাও আবার পূর্ণ উদ্যমে। মিয়েকো নাগাওকা ঠিক বিপরীত কিছু করেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার বয়স যখন আশির কোঠায় পৌঁছায় তখন তিনি সাঁতার কাটতে শেখেন। সাঁতার কাটার মাধ্যমেই তিনি দীর্ঘদিনের হাঁটুর ব্যথা থেকে মুক্তি পান। নাগাওকা ১০০ বছর বয়সে নিজের লেখা বই প্রকাশ করেন যার নাম ‘১০০ বছরেও আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো সাঁতারু’। 

মিয়েকো নাগাওকাতিনি ১০১ বছর বয়সে ১৫০০ মিটার সাঁতার কেটে বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। তার নামের পাশে ১৮টি বিশ্ব রেকর্ড জ্বলজ্বল করছে। ১০৫ বছর বয়সেও তিনি মাস্টার কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নাগাওকা গণমাধ্যমে নিজের শেষ প্রতিযোগিতার পূর্বে অবসরের ঘোষণা দেন। ১০৫ থেকে ১০৯ বছর বয়সী গ্রুপে তিনি ৫০ মিটার ব্যাকস্টোকে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার প্রচেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তার আগেই নাগাওকাকে অবসর নিতে হয়েছে। ২৫ বছরের সাঁতারের ক্যারিয়ার শেষ করে তিনি অবসর নেন। তার ছেলে ৭৯ বছর বয়সী হিরোযুকি তাকে সাঁতার প্রশিক্ষণ নিতে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। নাগাওকা মনে করেন স্বাস্থ্যসম্মত খাবর গ্রহণ এবং যথাযথ ব্যায়াম করে প্রবীণ বয়সেও সুস্থ থাকা সম্ভব। 

হিদেচিছি মিয়াজাকি

হিদেচিছি মিয়াজাকি২০১৯ সালে ১০৮ বছর বয়সে হিদেচিছি মিয়াজাকি মৃত্যুবরণ করেন। অলিম্পিক স্বর্ণ জয়ী উসাইন বোল্টের নাম অনুযায়ী তাকে গোল্ডেন বোল্ট হিসেবে ডাকা হয়। মিয়াজাকি ১০৫ বছর বয়সে ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতায় সর্বপ্রথম বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। তারপরও মিয়াজাকির মধ্যে সফলতার জন্য ক্ষুধা ছিল। তিনি নিজের দৌড়ের গতি বৃদ্ধিতে সর্বদা উদগ্রীব ছিলেন। 

ইউইচিরো মিউরা

ইউইচিরো মিউরা ৮৬ বছর বয়সী একজন প্রফেশনাল পর্বতারোহী এবং স্কিয়ার ছিলেন তিনি। তার বয়স যখন ৪০ এর কোঠায় ছিল তখন মাউন্ট এভারেস্ট থেকে পিছনে প্যারাস্যুট নিয়ে তিনি স্কি-ডাউন করেন। তার এই কৃতকর্মের উপর ‘দ্য ম্যান হু স্কাইড ডাউন এভারেস্ট’ নামে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি হয়েছিল। যা বেস্ট ডকুমেন্টারি হিসেবে ১৯৭৫ সালে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড পায়। 

মিউরা ৭০ বছর বয়সে এভারেস্ট চূড়ায় উঠে বিশ্বের প্রবীণতম এভারেস্ট জয়ী হন। এরপর ৭৫ ও ৮০ বছর বয়সে আবারো নতুন রেকর্ড গড়েন তিনি। ২০১৯ সালে তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ছয় হাজার ফুট উঁচু দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠার সিদ্ধান্ত নেন। তবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় ডাক্তার তা নিষেধ করেছিলেন। এদিকে মিউরিও হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়, তারপরও তিনি ৯০ বছর বয়সে এভারেস্ট জয় করার সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি একজন বডিবিল্ডারমিছিহারু শিমোজো ৮৩ বছর বয়সেও ম্যারাথন রানার, সেইছি সানো ৮০ বছর বয়সেও সার্ফিং করেন। তাদের এই প্রবীণ বয়সের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা নিয়ে কৌতূহল সৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। এ বিষয়ে কিছু দিক আলোচনা করা হলো-

জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৮০ কিংবা তার অধিক বয়সী মানুষের সংখ্যা ২০৫০ সালে বর্তমানের ১৪৩ মিলিয়নের প্রায় তিনগুন বৃদ্ধি পেয়ে ৪২৬ মিনিয়নে দাঁড়াবে। জাপানের জনগণের বয়সের চালচিত্র গত কয়েক দশক ধরেই পরিবর্তন হচ্ছে। তারা এখন ‘সুপার এজড’ সোসাইটিতে প্রবেশ করেছে। জাপানের ৬৫ বছর এর অধিক বয়সী নাগরিক মোট জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ থেকেও বেশি। যে বিষয়টি তাদের অর্থনীতির সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট। ইউরোপের অনেক দেশেই প্রবীণ নাগরিকদের আধিক্য রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, চীন এবং সিঙ্গাপুরেরও একই অভিজ্ঞাতার নজির আছে। জাপানেও বর্তমানে মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রবীণ নাগরিক। 

সুস্থ থাকতে তারা সবাই শরীরচর্চা করেপ্রবীণ শ্রম শক্তির জন্য উৎপাদন হ্রাস, স্বাস্থ্য সেবা এবং পেনশনের খরচ সব মিলিয়ে তাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে। তাছাড়া প্রবীণদের মানসিক প্রশান্তির নিশ্চয়তা দেয়াও সবার দায়িত্ব। জাপান এরই মধ্যে এমন কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে যা তাদের প্রবীণদের মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক দিক থেকে উপযোগী এবং সমগ্র সমাজের জন্যও যথাযোগ্য। তাদের ক্যাবিনেট দফতরের এজিং সোসাইটির বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক কার্যক্রমে জড়িত। সেখানকার প্রবীণরা পরিবারের তরুণ সদস্যদের উপর নির্ভরশীল নয়। তারা নিজেদের উদ্যোগে খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হয়। 

কিমিকো নিশিমাতোএকই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের প্রবীণ নাগরিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বিশ্বের অন্য সব দেশের প্রবীণদের থেকে বেশি। কিও স্পোর্ট মেডিসিন রিসার্স সেন্টারের হেলথ ম্যানেজমেন্ট রিসার্সের এসোসিয়েট প্রোফেসর উকো ওগোমার মতে, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার সঙ্গে এ্যাথলেটিক সক্ষমতার সরাসরি সংযোগ আছে। প্রবীণ এবং তরুণদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে ক্রস-জেনারেশন এবং ক্রস-কালচারাল বিভিন্ন কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়া প্রবীণদের প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেট সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রয়োজন আছে। ইন্টারনেটের জগতে প্রবীণরাও যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে তার বড় উদাহরণ কিমিকো নিশিমাতো। ৯০ বছর বয়সী নিশিমাতোর দুই লাখ ২০ হাজার ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার রয়েছে। তিনি অনলাইনে শরীরচর্চা এবং মানসিক সুস্থতা ও উন্নতির বিভিন্ন পদ্ধতি প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস