Alexa হ্যালোইন: নকল ভূতের উৎপাত বাড়ে এদিনে

হ্যালোইন: নকল ভূতের উৎপাত বাড়ে এদিনে

নুরুল করিম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:১১ ৩১ অক্টোবর ২০১৯  

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

অক্টোবরের শেষ দিন মানেই যেন সর্বত্র ভূত-পেতনির বাড়াবাড়ি। আসল নয়! এদিন পশ্চিমা দেশগুলোর নগর জনপদের সর্বত্র নকল সব ভূত-পেতনি দিয়ে সাজানো থাকে বাড়িঘর। দোকানগুলোয় সাজানো হয় এমন সব ভয় লাগানো সাজসরঞ্জামে। দিনটির একটি নামও রয়েছে, যা অনেকের জানা। সেটা হলো ‘হ্যালোইন উৎসব’। আজ বৃহস্পতিবার বিশ্বজুড়ে ভূত নিয়ে যখন এত মাতামাতি, এত আয়োজন তখন আমাদের ভূতদের সম্পর্ক না জানলে কী হয়!

ভূত দেখেছেন কি?

‘আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন?’ বা ‘ভূত দেখেছেন নিজের চোখে?’ এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হননি এমন মানুষ খুবই কম। জবাবে আপনার উত্তর হ্যাঁ বা না যেকোনটাই হতে পারে। কারণ ভূত দেখাটা অনেকটা হ্যালুসিনেশনের মতো। ভূত দেখি বা না দেখি, ভূতের কাহিনী লোকমুখে সবাই শুনেছে। কিছু কাহিনী বিশ্বাসযোগ্য হয়তো আপনার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে, আবার কোনোটা হয়নি। বিষয়টি মূলত মন মানসিকতা ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। আমাদের জানার আগ্রহ হয় এই ভূততত্ত্বটা কি আসলে, ভূত এলো কোত্থেকে। এজন্য আমরা দ্বারস্থ হই বিজ্ঞান কি বলে সেইদিকে।

ভূত কোত্থেকে এসেছে, মানে ভূতের ধারণাটি কোথা থেকে এসেছে সেটা নিয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য জানা যায়নি। স্বয়ং বিজ্ঞান ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে কম গবেষণা করেনি। কিন্তু বিজ্ঞানের কাছে এখন পর্যন্ত ভূতের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে ভূত বলতে আমরা সহজ কথায় বুঝি কোনো মৃত আত্মা বা অপচ্ছায়া। অনেকে অন্ধকারকে ভূতের অস্তিত্ব আর আশ্রয়স্থল বলতে চান। অন্ধকার ছাড়া ভূতের টিকে থাকা অসম্ভব। এই ভূতের বিশ্বাস সেই প্রাচীনকাল থেকেই। অসংখ্য প্রাচীন লোককাহিনীতে ভূত বা আদিভৌতিক ঘটনার উল্লেখ আছে। পৃথিবীর অনেক জাতিই ভূতে বিশ্বাস করে। এই আধুনিক যুগে এসেও। তাদের মতে প্রাণীর শরীর থেকে আত্মা চলে গেলেই সে প্রাণহীন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো আত্মা প্রাণীর শরীর থেকে বের হওয়ার পরও ফিরে আসে। আর এই ফিরে আসা আত্মাই হচ্ছে ভূত। ভূতের শরীরী রূপ তার থাকে না। সে থাকে অস্পষ্ট। কিন্তু তার চালচলন স্বাভাবিক জীবিত শরীরের মতো। তাকে স্পষ্ট দেখা যায়না। কিন্তু উপলব্ধি করা যায় ঠিকই।

ভূত দেখাটা অনেকটা হ্যালুসিনেশনের মতো

কোথা থেকে এলো

গোস্ট শব্দটি প্রাচীন ইংরেজির গাস্ট থেকে উদ্ধৃত। ল্যাটিনে ‘স্পিরিটাস’ শব্দটির অর্থ হলো শ্বাস বা জোরে বাতাস ত্যাগ করা। এমন নানান ব্যাখ্যা রয়েছে। সেই আদিকাল থেকেই ব্যাখ্যাগুলো রয়েছে বিভিন্ন ভাষায়। প্রাচ্যের অনেক ধর্মে পর্যন্ত ভূতের উল্লেখ আছে। যেমন হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ বেদ-এ ভূতের কথা বলা আছে। হিব্রু তাওরাত ও বাইবেলেও ভূতের উল্লেখ আছে। সেই উনিশ শতকে ‘ক্রিসমাস ক্যারল’ বইতে লেখক চার্লস ডিকেন্স ভূতের কথা তুলে ধরেছিলেন। ভূতের কাহিনী আরও অসংখ্য স্থানেই লিপিবদ্ধ আছে। সংস্কৃতিতে ‘ভূত’ শব্দের অর্থ অতীত। এই বিশাল অতীতকালের ব্যাপ্তির মাঝে কখন কীভাবে ভূতের উদ্ভব হয়েছে সেটা জানা মুশকিল। তবে ভূতের ধারণাটি তো একদিনে হয়নি, যুগে যুগে এটা প্রতিষ্ঠিত। 

তবে আধুনিক বিজ্ঞান ভূত বিষয়টিকে স্বীকার করে না। আবার এমন হাজারো ঘটনা আছে যেগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিতে পারেনি। আর তখনই দ্বিধা বাড়ে তাহলে কী সত্যি ভূত বলে কিছু আছে কি না। পৃথিবীর নানা প্রান্তের উপকথা, গল্প এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ভূতের উল্লেখ। বলা হয়েছে ভূত হলো আত্মা বা স্পিরিট। একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার অদৃশ্য উপস্থিতি। যদিও তার বিবরণ সর্বত্র এক নয়। কোথাও বায়বীয়, কোথাও পানির মতো, কোথাও ছায়া আবার কোথাও তারা পশুপাখির অবয়বে বিরাজমান। ভূত নামের এই অদৃশ্য অলৌকিক এবং কাল্পনিক অবয়বটির প্রতি কমবেশি সবারই অনেক জিজ্ঞাসা রয়েছে।

ভৌতিক উৎসবের উৎপত্তি

পশ্চিমা বিশ্বের অনেকগুলো দেশে হ্যালোইন পালিত হয়, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, আয়ারল্যান্ড, পুয়ের্তো রিকো, এবং যুক্তরাজ্য। এছাড়া এশিয়ার জাপানে এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডেও হ্যালোইন পালিত হয়। কিন্তু এই উৎসবের উৎপত্তি কীভাবে জানেন? জানতে হলে ফিরে যেতে হবে প্রায় দুই হাজার বছরের পেছনে ফিরতে হবে। সেখানে দেখি এক ইন্দো-ইউরোপিয়ান জনগোষ্ঠী কেল্টিকদের হাত ধরে আসে বিশ্বের ভূতেদের এই দিন।

হ্যালোইন উৎসবের বয়স প্রায় দু’শত বছর

আইরিশ, যুক্তরাজ্য, ওয়েলশ সম্প্রদায়ের লোকেরা বিশ্বাস করতো যে প্রত্যেক নতুন বছরের আগের রাতে (৩১শে অক্টোবর) সাহেইন, মৃত্যুর দেবতা, আঁধারের রাজ পুত্র, সব মৃত আত্মা ডাক দেয়। এই দিন মহাশূন্য এবং সময়ের সমস্ত আইনকানুন মনে হয় স্থগিত করা হয় এবং জীবিতদের বিশ্ব যোগদান করতে মৃত আত্মাদের অনুমোদন করে। তারা আরও বিশ্বাস করতো যে মৃত্যুর কারণে তারা অমর যুবক হয়ে একটি জমিতে বসবাস করতো। মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতো যে স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড অঞ্চলের ছোট পাহাড়ে কখনো কখনো মৃতরা পরীদের সঙ্গে থাকে।

বিভিন্ন লোককাহিনীতে বলা হয়েছে, এদিন সব মৃত ব্যক্তিরা ৩১শে অক্টোবর রাত্রিতে জীবিতদের বিশ্বে আসে আগামী বছরের নতুন দেহ নেয়ার জন্য। এজন্য গ্রামবাসীরা এই খারাপ আত্মাদের থেকে বাঁচার জন্য ব্যবস্থা নেয়। এই প্রথাটি ছিল পবিত্র বেদি আগুন বন্ধ করা এবং নতুন আগুন জ্বালানো হতো পরবর্তী প্রভাতে। আইরিশ, যুক্তরাজ্যবাসী কেল্টদিগের পুরোহিতরা তারা মিলিত হতো একটি অন্ধকার ওক বনের ছোট পাহাড়ে নতুন আগুন জ্বালানোর জন্য এবং বীজ ও প্রাণী উৎসর্গ করতো। আগু্নের চারিদিকে নাচতো এবং গাইতো প্রভাত পর্যন্ত, পথ অনুমোদন করতো সৌর বছর এবং আঁধার ঋতুর মধ্যে। যখন প্রভাত হয়, আইরিশ, যুক্তরাজ্যবাসী কেল্টদিগের পুরোহিতরা প্রতি পরিবার থেকে জ্বালানো অগ্নির কয়লা পরিধান করতো।

যেভাবে পালিত হয়

শীতের হিমেল হাওয়ায় রাতের অন্ধকারে কম বয়সী ছেলে-মেয়েরা টর্চ হাতে বেরিয়ে পরে ‘ট্রিক অর ট্রিট’ করার জন্য। আর রেওয়াজ মত অনেকেই মুখে মুখোশ এঁটে গায়ে অদ্ভুত পোষাক পরে বেরিয়ে পড়ে। দোকানীরাও পিছিয়ে নেই এই সময়টাতে, বাজারে দেখা যায় হ্যালোইন কষ্টিউম এর দোকান। এবারে সবচাইতে বেশি যে পাঁচটি পোশাক বিক্রি হয়েছে তা হচ্ছে ডাইনী, জলদস্যু, ভ্যাম্পায়ার, ষ্পাইডারম্যান, জম্বি এবং ব্যাটম্যান। অন্যদিকে গায়িকা কেটি প্যারির আদলের পোশাক-আষাক অনেক তরুণীই কিনে থাকে। যেমন খুশি তেমন খুশি সাজোতে কেউবা রাজকুমারী, প্রজাপতি বা উইনি দ্যা পু-এর টিগার সাজতে-সাজাতে ভালোবাসে।

এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে পোষাক

পশ্চিমা দেশগুলোতে বেশিরভাগ বাড়ি সাজানো হয় ভৌতিক আবহে। মাকড়শার জাল বিছিয়ে কঙ্কাল টাঙ্গিয়ে ভুতুড়ে একটা পরিবেশ তৈরি করে রাখেন। বড় বড় মিষ্টি কুমড়ো হ্যালোইনের সময় প্রায় প্রত্যেকটি বাড়ীর সামনে রাখা হয়। কুমড়োর ভেতরটা ভাল করে পরিষ্কার করে এর আবার মুখ-চোখ বানানো হয়। তারপর ভেতরে ভরে দেয়া হ্য় বাতি। টিমটিম করে বাতি জ্বলতে থাকে আর বাড়ির ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার করে চকলেট নিয়ে অপেক্ষা করা হ্য় ছেলে-মেয়েদের জন্য। তারপর শুরু হয় চমকে দেওয়ার পালা! এই ভাবে রাতভর ছেলেমেয়েরা বাড়ি বাড়ি যায়, সংগ্রহ করে আনে ব্যাগ ভর্তি চকলেট। এই একটি দিন আমেরিকায় যেদিন বিনাদ্বিধায় যে কারও বাড়ির আঙ্গিনায় যাওয়া যায় আর অনায়াসে দরজায় কড়া খটখটালেও কেউ আপত্তি জানায় না।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে