Alexa হেরেমের নির্মম খোজা প্রথা (শেষ পর্ব)

হেরেমের নির্মম খোজা প্রথা (শেষ পর্ব)

তুনাজ্জিনা জাহান রেমি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:০৫ ১৫ মার্চ ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

চরম নির্মমতার মধ্য দিয়ে শিশু কিশোরদের খোজাকরণ সম্পূর্ণ হওয়ার বিষয়ে নিশ্চয় অবগত হয়েছেন! বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব শিশু কিশোরদের জোর করে খোজা বানানো হত। যেহেতু তাদেরকে কিনে নেয়া হত, তারা জানতেও পারত না যে তাদের ভাগ্যে কী ঘটতে চলেছে? বারবারা ঐতিহাসিক হেরোডেটাসকে উদ্ধৃত করে উল্লেখ করেছেন খৃষ্টপূর্ব ৪৮০ থেকে ৮১ অব্দের দিকে প্যানোনিয়াস নামক এক ব্যক্তি হার্মোডিটাস নামের একটি বালককে জোরপূর্বক খোজা বানিয়ে বিক্রি করে দেয়। নিজের পৌরষত্ব হারানোর ক্ষোভ হার্মোডিটাসকে এতটাই প্রতিশোধপরায়ন করে তুলে যে পরবর্তীকালে যখন অনুকূল সময় আসে তখন তিনি প্যানোনিয়াস ও তার পরিবারকে অবরুদ্ধ করে প্যানোনিয়াসকে দিয়ে তার চার সন্তানকে খোজা বানাতে বাধ্য করেন। কিন্তু এতেও তার পূর্ণ পরিতৃপ্তি না হওয়াতে সন্তানদের দিয়ে প্যানোন্যাসকেও নপুংশক বানিয়ে প্রতিশোধের ষোলকলা পূর্ণ করেন।

কত ধরণের খোজা ছিল?
খোজা বা ইউনাখ শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ ইউনোখোস থেকে যার অর্থ হচ্ছে শয়নকক্ষের পাহারাদার। গ্রীক শব্দ Eune অর্থ বিছানা এবং Ekhein অর্থ হচ্ছে পাহাড়া দেয়া। ঠিক একইরকমভাবে ল্যাটিন ভাষায় স্প্যাডো, ক্যাস্ট্রাটাস শব্দগুলোর মানেও খোজা। বাংলায় আমরা ইউনাখদের বলি খোজা। এ শব্দটি উর্দু, পুরো শব্দটি হল খোজা সারাহ। তবে ইউনাখ কিংবা খোজাকৃত পরুষরা কেবল মধ্যপ্রাচ্যে ছিল তা নয়। প্রাচীন চীনের অভিজাত সমাজেও এদের বিশেষ ভূমিকায় দেখা গেছে। ষোড়শ সপ্তদশ শতকে চীনে সম্রাট কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ইউনাখের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ হাজার! অটোমান হেরেমে দু’ধরণের খোজার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। কালো ও সাদা খোজা। প্রত্যেক খোজাদের এক বিশেষ প্রশিক্ষণের ভেতর দিয়ে যেতে হত খোজকরণের পর৷ তারপর যোগ্যতা অনুসারে তাদের কাজ বণ্টন করে দেয়া হত। এরা দু’ভাগে ভাগ হয়ে হেরেমের প্রশাসনিক দিক দেখভাল করত। একজন করে থাকত প্রধান খোজা। তুর্কি ভাষায় কালোদের বলা হত কিজলার আগাসি বা প্রধান কালো খোজা। এদের সাধারণত আবাসিনিয়া ও সুদান থেকে চুরি করে নিয়ে আসা হত। তারা হারেমের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতেন। হেরেমে নারীদের সংখ্যা কখনোই ৩০০ এর কম ছিল না। খোজারা এদের বার্তা বহন, গৃ্হস্থালি কাজ এবং সুলতানের আত্মীয়দের বিভিন্ন কাজে সাহায্য করত। কালো খোজাদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিল সানদালি৷ যাদের পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষ সম্পূর্ণ ছেদ করে দেয়া হত তাদেরকেই মূলত বলা হত সানদালি। যার জন্যে এই কালো খোজাদের হেরেমে অবাধ যাতায়াত স্বীকৃত ছিল। 

সাদা চামড়ার খোজাদের পুরুষাঙ্গের অংশবিশেষ রেখে দেয়া হত, ফলে এরা সরাসরি হেরেমের ভেতরে কাজ কর‍তে না পারলেও সেক্রেটারিয়েল কাজ করার সুযোগ পেত। আর প্রধান সাদা খোজাকে বলা হত কাপি আগাসি। প্রধান খোজাদের অধীনে অন্যান্য খোজারা কাজ করত। এরা খোজাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য আলাদা স্কুলও খুলেছিল। শুধু খোজাই নয়, এর পাশাপাশি নতুন কোনো সুন্দরী দাসী আসলে তাকে নাচ, গান, সাহিত্য ও অন্যান্য রাজকীয় প্রথাসমূহ শেখানোর দায়িত্বও খোজাদের উপর নিয়োজিত থাকত। এসব দাসীদের ঠিক সেভাবেই গড়ে তোলা হত যাতে তারা খুব সহজেই সুলতানের চোখে পড়তে পারে। তবে সব সমাজেই খোজাদের একই চোখে দেখা হত। সেটি হচ্ছে প্রতি ক্ষেত্রেই খোজারা সাধারণত চাকর বা দাস শ্রেণির হয়ে থেকে যেত। কালে কালে ক্ষমতাসীন লোকদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই তাদেরকে খোজা বানানো হতো। প্রভূর বিছানা তৈরি, গোসল করানো, চুল কাটা, পালকি টানা, মলমূত্রের পাত্রবহন করা ইত্যাদি কাজ করানো হতো। কোনো কোনো বিশ্বস্ত খোজাকে দিয়ে চরের কাজও করানো হতো। খোজারা কেবল শাসকের নিকটই অনুগত ছিল। সরাসরি শাসক ব্যতিত রাজ্যের অন্য কোনো উঁচু পদের কর্মচারী বা প্রশাসক হলেও খোজারা তাদের কাছে বিশেষভাবে কোনো দায়বদ্ধ থাকত না। খোজারা রাজা বা প্রভু অন্তঃপ্রাণ থাকতো। 

এমনকি কোনো কোনো খোজা রাজার জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিল। তারা তাদের বিশ্বস্ততার গুণটিকে খুবই সম্মান এবং মর্যাদার মনে করতো। যেহেতু এদের জৈবিক চাহিদা বলতে কিছুই ছিল না, সেহেতু এদর ব্যক্তিগত বংশ প্রতিষ্ঠা বা সংসার স্থাপনের ব্যাপারে কোনো ইচ্ছা ছিল না। তাদের শারীরিক অক্ষমতার কারণেই সমাজে তাদের অবস্থান ছিল খুব দুর্বল। এই দুর্বলতার কারণে তাদেরকে প্রচুর নির্যাতন সহ্য করতে হতো। কখনো কখনো খুব তুচ্ছ কারণে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হতো এমনকি হত্যাও করা হতো। তারা এতই সহনশীল ছিল যে এরপরও খোজাদের মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতো না। সুলতান আলাউদ্দীন খলজীর (১২৯৬-১৩১৬) অন্যতম বিখ্যাত সেনাপতি ও উজির মালিক কাফুর ছিলেন একজন খোজা। দিল্লির খোজাদের মতো বাংলার অভিজাতবর্গের খোজারাও প্রশাসনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। বাংলায় হাবশি শাসনামলে (১৪৮৭-১৪৯৩) বস্তুত শাসকদের ক্ষমতার উত্থান-পতনে তাদের অংশগ্রহণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শাহজাদা ওরফে বারবক নামে এক খোজা ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলার মসনদ দখল করেন। পণ্ডিতদের বিশ্বাস, হাবশী সুলতান শামসউদ্দীন মুজাফফর শাহ (১৪৯০-১৪৯৩) খোজা ছিলেন। সমসাময়িক বাংলায় পর্তুগিজ পরিব্রাজক দুয়ার্তে বারবোসার বিবরণ অনুসারে বাংলার শাসক ও অভিজাতবর্গের হারেমগুলিতে দেশীয় ও বিদেশি বংশোদ্ভূত খোজারা প্রহরায় নিয়োজিত থাকত। কথিত আছে, নওয়াব সুজাউদ্দীন খানের (১৭১৭-১৭৩৯) হারেম প্রহরায় নিয়োজিত ছিল উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে সংগৃহীত খোজারা।

খোজা বাণিজ্য
সাম্রাজ্যের প্রাদেশিক শাসনকর্তারা প্রায়শই সুলতানকে পুরস্কার হিসেবে খোজা প্রেরণ করতেন। অটোমান রাজপ্রাসাদ ও হেরেমে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ খোজা বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকত। হেরেমে এবং দরবারের ভেতরে ৩০০ থেকে ৯০০ সাদা খোজা কাজ করত। মধ্যযুগে মুসলিম এবং তুর্কি রাষ্ট্রগুলোতে উপঢৌকন হিসেবে খোজা প্রেরণ করা শুরু করেন অটোমান সুলতান প্রথম মেহমেদ। এর পরে মেহমেদের উত্তরসূরিরা এই প্রথা অক্ষুণ্ণ রাখেন। অটোমান রাজপ্রাসাদে খোজা আনা হত সাধারণত সুদান থেকে। ষোড়শ/সপ্তদশ শতকের মোঘল শাসিত সুবাহ বাংলা হয়ে উঠেছিল সমগ্র মোঘল সাম্রাজ্যের জন্য খোজাদের শীর্ষ যোগানদার। ইউরোপীয় লেখকগণ ও বিশিষ্ট মোঘল ঐতিহাসিক আবুল ফজল আইন -ই -আকবরী গ্রন্থে এ তথ্য সমর্থন করেছেন। মুসলমান শাসকগন ভারতবর্ষে আগমনের সঙ্গে এদেশে তাদের নিষ্টুর প্রথাটিরও আমদানী হয়। ভারতে মুসলমান শাসন বিস্তৃত হওয়ার পাশিাপাশি বিদেশী সাদা ও কালো খোজাদের পাশাপাশি আরো খোজার চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ধীরে ধীরে দেশীয় খোজাদের বাণিজ্য শুরু হয়। রাজ দরবার এবং আমীর ওমরাহদের ব্যাপক চাহিদা মেটাতে তৎকালীন বাংলা প্রদেশে খোজা দাস ক্রয় বিক্রয়ের একটি বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিনত হয়। 

১২৯০ সালের দিকে বিশ্ব বিখ্যাত পর্যটক মার্কোপোলো তৎকালীন বাংলা প্রদেশ সফর করেন। তার ভ্রমন কাহিনী থেকে জানা যায় বাংলা মোগল অধিকৃত হওয়ার আগেই এখানে খোজা ব্যবসায়ের রমরমা বাজার গড়ে ওঠে। প্রথম দিকে খোজাদের পুরোটাই আসতো যুদ্ধবন্দিদের শিবির থেকে। মার্কোপোলো উল্লেখ করেছেন “to purchage which the merchants from varius parts of India resort thither. They likewise make purchases of eunuchs, of whom there are numbers in the country, as slaves; for all the prisoners taken in war are presently emasculated; and as every prince and person of rank is desirous of having them for the custody of their women,the merchants obtain a large profit by carrying them to their kingdom, and there disposing of them. যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুদ্ধ শিবির থেকে মানুষের আমদানিও বন্ধ হয়ে যায়। আগে শুধু সুলতানরাই খোজা রাখলেও এ আমলে উজিরদের সাথে সাথে তৈরি হয় নতুন নতুন আমির ও ওমরাহ্‌। তারাও অনেকটা আভিজাত্যের প্রমাণ দিতে খোজা কেনা শুরু করে। এর ফলে বাংলায় খোজা বাণিজ্যের জনপ্রিয় বাজার গড়ে ওঠে। কলকাতার খোজা বাজারে আফ্রিকান হাবশি এবং দেশীয় খোজা বেচাকেনা হতো। 

দেশি এই খোজাদের প্রধান সরবরাহক ছিল সিলেট এবং ঘোড়াঘাট। প্রাচীন তথ্য উপাত্তে সিলেটের নামটিই বিশেষভাবে এসেছে। স্যার যদুনাথ সরকার সম্পাদিত The India of Aurangzib (topography, statistics and roads গ্রন্থে বলা হয়েছে “In this province (Sylhet) they make many Eunuchs” ১৩ পন্ডিত আবুল ফজলের বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরীতে বলা হয়েছে ‘In the Sarkar of Sylhet there are nine ranges of hills. It furnishes many Eunuchs. স্যার এডওয়ার্ড এলভার্ট গেইট প্রনীত ‘A History of Assam’ গ্রন্থে বলা হয়েছে “ In the early times the Sylhet district supply India with eunuchs but Jahangir issued an edict forbidding it’s inhabitants to castrate boys. খোজা সরবরাহের একচেটিয়া বাণিজ্য করত সিলেট ও ঘোড়াঘাটের সরকারেরা। প্রাচীন কাল থেকেই সিলেট একটি বাণিজ্য বন্দর হিসেবে সুপরিচিত ছিল। 

আরব দেশের সুবিখ্যাত আলিফ লায়লার কাহিনীতেও সিলেট বন্দরের উল্লেখ রয়েছে এবং সিন্দাবাদ নাবিক এখানে আগমন করেছিল। তবে মুন্সী আসরফ প্রণীত আলিফ লায়লার কেচ্ছা পুঁথিতে সিলেটের চন্দন কাঠের কথা উল্লেখ আছে খোজাদের নয়। ১৮ এ থেকে মনে হয় আলিফ লায়লা’ কাহিনীর সমসাময়িক কালে সিলেটে খোজা ব্যবসার প্রচলন হয়নি এবং আলিফ লায়লার কাহিনীও সৃষ্টি হয়েছে ভারতবর্ষে মুসলমানদের আগমনের পূর্বে। সিলেট বন্দর দিয়েই খোজা শিশুগণ কলিকাতা ভারত মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার নানা দেশে পাচার হয়ে যেত। ১৯ হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার গুজাখাইর গ্রামে অবস্থিত ‘খোজার দীঘি’ নামক বিশাল জলাশয়টি তেমনি এক জন হিতৈষী অজ্ঞাতনামা খোজার স্মৃতিকেই বহন করছে। এই এলাকার অনেক প্রবীন ব্যক্তির মতে ‘গুজাখাইড়’ নামটি ও ‘খোজা খয়ের’ নামের অপভ্রংশ। এছাড়া মৌলভীবাজার সদরের গয়গড় গ্রামে অবস্থিত এবং সুলতানী আমলে নির্মিত খোজার মসজিদটি প্রতিষ্টার সঙ্গেও কোনো এক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকারী খোজার নাম জড়িত থাকার সম্ভাবনা আছে। তুজুক ই জাহাঙ্গীরী থেকে জানা যায় মুসলমান আমলের বিস্তৃত সময়ে খোজাকরণ বা খোজা ব্যবসা বৈধ বলেই গণ্য ছিল। জাহাঙ্গীর প্রথমবারের মতো এর অমানবিক দিক বিবেচনা করে এ ঘৃণ্য প্রথা ফরমান জারি করে নিষিদ্ধ করে দেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস