Alexa হুমায়ূন আহমেদ: মধ্যবিত্তের স্বপ্ন নির্মাতা

হুমায়ূন আহমেদ: মধ্যবিত্তের স্বপ্ন নির্মাতা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৪৮ ২০ জুলাই ২০১৯  

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের এক অপার বিস্ময়- একথা স্বীকার করতেই হয়। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে অলাভজনক একটি পেশাকে অবলম্বন করে বিস্ময়কর সফলতা অর্জন করেছেন।

শুধু সাহিত্যচর্চা করে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন; অপরকেও স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এমনকি তার লেখনির মাধ্যমে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। ফলে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ এমন একটি নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সর্বস্তরের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে। তবে তা কেবল কথাসাহিত্যিক হিসেবে নয়; নাটক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও এর পেছনে ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। 

হুমায়ূন আহমেদ একাধারে ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, ছোটগল্পকার, চলচ্চিত্রকার ছাড়াও বাংলা কথাসাহিত্যের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন। এতদসত্ত্বেও হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য পড়েননি এমন লোক হয়তো কম নয়; তবে তার চলচ্চিত্র, টিভি নাটক বা গানের সঙ্গে পরিচিত অনেকেই। এ যাবতকালে ‘পাঠকনন্দিত বা পাঠকপ্রিয় লেখক’ বলতে আমরা তাঁকেই চিনি। সারা বছরের বই বিক্রির কথা বাদ দিয়ে শুধু একুশে বইমেলার কথা যদি বলি, তাহলে বলতে হবে- তাকে ঘিরে একটি আলাদা উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা যেত। যা তার মৃত্যুর পর আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি। 

লেখক হিসেবে তিনি সফল; নির্মাতা হিসেবেও সফল। সফলতার চূড়ান্ত পর্বে তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। পুকুরের জলে টোপ ফেললেই যেমন বোঝা যায়, মাছ আসবে কিনা। তিনিও প্রথম টোপ ফেলার পরই বুঝে গেছেন। প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’র মাধ্যমেই তিনি পাঠক চিনে গেছেন। বাংলা সাহিত্যে লেখক হিসেবেও তার আসনটি পাঁকা করে নিয়েছেন। ফলে তার লেখার ধারাবাহিকা সৃষ্টি হয়ে গেছে। যদিও গতানুগতিক হয়ে উঠেছিল তার গল্প, উপন্যাস, সিনেমা এবং নাটক। তবু এক ধরনের অদ্ভুত কাহিনি, অদ্ভুত চরিত্র, সমাধানহীন পরিণতি দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। হিমু, মিসির আলী, শুভ্র, বাকের ভাই, রূপা ইত্যাদি চরিত্র তাকে জনপ্রিয়তার শিখরে টেনে নিয়ে গেছে। এমনকি মৃত্যুর পরও সে আসন তিনি ধরে রেখেছেন।

সাহিত্যে তিনি মধ্যবিত্তকে যেভাবে স্বপ্ন দেখিয়েছেন- তার প্রধান উদাহরণ হিমু। লেখক গল্পটি বলেছেন এভাবে- ‘প্রচণ্ড রোদ। নিউ মার্কেট এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে যুবক। হাতে একটি সিগারেট। আজ হরতাল। কখন একটি বাস পুড়বে সেই আগুনে সে সিগারেট ধরাবে!’ (হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম)। অদ্ভুত এবং অস্বাভাবিক চরিত্র সৃষ্টিতে তার তুলনা নেই। এমন অদ্ভুত হিমুর প্রথম দেখা পাই তার ‘ময়ূরাক্ষী’ উপন্যাসে। এ উপন্যাসের মাধ্যমেই তিনি আমাদের হিমু চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর আরা পাই ‘মিসির আলী’কে। মোটা ফ্রেমের ভারি চশমা পরিহিত লোকটি কিছুতেই বিশ্বাস করেন না অতিপ্রাকৃত ঘটনা। সব রহস্যময় ঘটনাই তিনি যুক্তি দিয়ে বিচার করেন। এই যুক্তিবাদী মানুষটি হিমুর ঠিক বিপরীত। হিমু যেমন যুক্তি মানে না, মিসির আলী আবার যুক্তির বাইরে কথা বলেন না।

হুমায়ূন আহমেদের মধ্যবিত্ত চরিত্রগুলোর মধ্যে ‘শুভ্র’ অন্যতম। নিজেকে পৃথিবীর যাবতীয় জটিলতা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে ভাবতে চান না। সবসময় মোটা ফ্রেমের চশমা পরে বইয়ের মাঝে ডুবে থাকেন। বাবার বিপুল সম্পত্তি শুভ্রকে কখনো টানে না। শুভ্র সুন্দরের শুদ্ধতা নিয়েই বেঁচে থাকতে চান। এরপর যদি একটি চরিত্রের কথা বলি, সবাই হয়তো নড়েচড়ে বসবেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয় টেলিভিশন নাটক। এ নাটকের ‘বাকের ভাই’র কথা কমবেশি সবারই মনে থাকার কথা। পাড়ার এক মাস্তানকে একটি মিথ্যা মামলায় ফাঁসি দেওয়া হয়। নাটক দেখার পর এ ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে শত শত মানুষ! ফাঁসি বন্ধের দাবিতে মিছিল, সমাবেশ, বিক্ষোভ হয়। নাটকের কাহিনি ঘুরানোর কথা বলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফাঁসিই বহাল রেখেছেন। এতে তাঁর ওপর তীব্র অভিমানে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে!

হুমায়ূন আহমেদের আরেকটি সৃষ্টি ‘রূপা’। হিমুর মতো এক বাউণ্ডুলেকে ভালোবাসে অসম্ভব রূপবতী মেয়েটি। সবসময় হিমুর পথের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে। হিমু মুঠোফোনে বলে, ‘রূপা আমি আসছি’। হিমুর পছন্দের আকাশি রঙের শাড়ি, চোখে কাজল দিয়ে ছাদে কিংবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে রূপা। কিন্তু হিমু আসে না। রূপাও জানে হিমু আসবে না। কিন্তু তারপরও অসম্ভব মায়া আর ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষা করে। পরিণতিহীন এক প্রেম নিয়ে রূপা দাঁড়িয়ে থাকে সবসময় হিমুর পথের দিকে তাকিয়ে।

তার লেখার মূল উপকরণের সঙ্গে সহজ-সরল ও সাবলীল ভাষায় হিউমার ঢুকিয়ে দিয়ে মধ্যবিত্ত জীবনের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা ও আবেগ, ভালোবাসা, আনন্দ-বেদনাকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপায়ন করেছেন অনুভূতির চিত্রাবলীতে। বিশিষ্টজনরা হয়তো তার সম্ভাবনাকে আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই পাঠকের হাতে পৌঁছানোর আগেই তারা অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন গ্রন্থের ভূমিকায়। তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’র ভূমিকা লিখতে গিয়ে ভাষাবিদ ড. আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘বইটি পড়ে অভিভূত হয়েছি। গল্পে অবিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছি একজন সুদর্শী শিল্পীর, একজন কুশলী স্রষ্টার পাকা হাত। বাংলা সাহিত্যে এ এক সুনিপুণ শিল্পীর, এক দক্ষ রূপকারের, এক প্রজ্ঞাবান স্রষ্টার জন্মলগ্ন যেন অনুভব করলাম। বিচিত্র বৈষয়িক ও বহুমুখী মানবিক সম্পর্কের মধ্যেই যে জীবনের সামগ্রিক বঞ্ছনা নিহীত, সে উপলব্ধি লেখকের রয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ বয়সে তরুণ, মনে নবীন দ্রষ্টা, মেজাজে জীবনরসিক, স্বভাবে রূপদর্শী, যোগ্যতায় দক্ষ রূপকার। ভবিষ্যতে বিশিষ্ট জীবনশিল্পী হবেন- এই বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করবো।’ আমরাও দেখেছি- তার বিশ্বাস এবং প্রত্যাশা বিফলে যায়নি। 

ড. আহমদ শরীফের কথার সূত্র ধরেই বলতে পারি তিনি ‘নন্দিত নরকে’ এবং ‘শঙ্খনীল কারাগার’ উপন্যাসে মধ্যবিত্ত জীবনের গভীরতর বেদনাকে গল্পের বুননে এমন চিরচেনা চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়ে সৃষ্টি করেছেন; তাতে পাঠককে সম্মোহনী শক্তিতে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে। জীবনের জাদু বাস্তবতা, সামাজিক জীবনের ভেতরের জটিলতাকে নিজস্ব জগতের রহস্যময়তার উপস্থাপনায় সাহিত্যকে বাক্সময় করে তুলেছেন। এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য আরেকটি উপন্যাস ‘মধ্যাহ্ন’। ‘মধ্যাহ্ন’ উপন্যাসের কাহিনি শুরু হয়েছে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাাপট নিয়ে। হুমায়ূন আহমেদের চমকপ্রদ ঐতিহাসিক শেষ উপন্যাস ‘দেয়াল ’। এটি মূলত রাজনৈতিক উপন্যাস। সেখানেও মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান। তবে একাত্তরের পটভূমিতে মন ছুঁয়ে যাওয়া উপন্যাস ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ যেমন লিখেছেন; তেমনিভাবে ইতিহাসের উপাদান নিয়ে উপন্যাসে ইতিহাসকে ফুটিয়ে তুলতে বিশ্বস্ত থেকেছেন ‘দেয়াল’ উপন্যাসে। তবুও বাংলাদেশের কোনো কোনো সাহিত্য বিশারদের মতে, হুমায়ূন আহমেদের লেখা জীবনমুখী নয়। এ নিয়ে বিতর্ক চলছে এবং চলবে। হয়তো এ দ্বন্দ্ব অমিমাংসিতই থেকে যাবে।

তবে নিজের সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, ‘আমি চেষ্টা করি সবার ভালো দিকটি তুলে ধরতে, সমাজের খারাপ মানুষটিরও কিছু ভালো এবং মজার দিক থাকে, পাঠক এগুলোর মাধ্যমেই সমাজকে জানুক’। (এলেবেলে ২য় পর্ব) সে হিসেবে বলা যায়, অনেকেরই অসম্ভব প্রিয় একটি উপন্যাস ‘লীলাবতী’। এ উপন্যাসে একটি বিশাল সম্ভ্রান্ত পরিবার হঠাৎ করেই ধ্বংস হয়ে যায়। বাড়ির কর্তা ‘গইড়ার ভিটা’ নামক একটি অলক্ষণে ভিটা কেনার পর। হয়তো বাংলার একটি গ্রামেই কোন সম্ভ্রান্ত পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পেছনে ঠিক এমন একটি কাহিনি থাকতে পারে। তাই তো সেই সুক্ষ্ম দিকগুলো তিনি তার সাহিত্যকর্মে প্রকাশ করেছেন। 

অথচ দেখবেন- আমরা সবাই হিমু হতে চাই, কিন্তু তার সাহিত্যের গভীরে যাই না। গেলে হয়তো কোথাও না কোথাও অবশ্যই প্রকৃত নিজেকেই খুঁজে পেতে পারি। বেকারত্বের হতাশায় তাই তো আমাদের মধ্যবিত্ত জীবন একটি ঘামেভেজা পাঞ্জাবি থেকে জীবনের গন্ধ নেয় আর না বলা গোপন প্রিয়াকে উদ্দেশ্য করে একের পর এক কবিতা লিখে যায়। আর যারা কি না প্রবাসে রয়েছেন; তারা যদি ‘আজ আমি কোথাও যাব না’ উপন্যাসটি পড়েন, হয়তো নিজের অজান্তেই পুরনো দিনের স্মৃতিগুলো ভিড় করে চোখের কোণ সিক্ত করে দেবে। কেননা হুমায়ূন আহমেদই আমাদের ‘চান্নি পসর রাত’ চিনিয়েছেন, কখনো রবিঠাকুরের নীপবনে নিয়ে নবধারায় ভিজিয়ে এনেছেন আমাদের মনকে। আবার কখনো ভিক্ষুক মন্তাজকে দিয়ে চিনিয়েছেন বেহেস্তের লিলুয়া বাতাস। 

হয়তো এতো জনপ্রিয় একজন লেখক আমাদের অনেকের কাছে জনপ্রিয় হতে পারেননি। এমনটি হতেও পারে- কারণ, একজনকে সবার কাছে সমান জনপ্রিয় লেখক হতে হবে এমনটিও হয়তো কোথাও লেখা নেই। তিনি ‘নন্দিত কথাসাহিত্যিক’ উপাধির সঙ্গেসঙ্গে ‘বাজারি লেখক’র তকমাও পেয়েছেন কারো কারো কাছে। সত্যি বলতে তিনিই তো সাহিত্যের বাজারটা ধরতে পেরেছিলেন। সেই অর্থে কথাটি অপ্রাসঙ্গিক নয়। তবে তিনি বাজারের সস্তা লেখক ছিলেন না। ছিলেন জুয়েলারি দোকানের সবচেয়ে দামি অলংকার।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

Best Electronics
Best Electronics