Alexa হুমায়ূন আহমেদ, কবি ও বাংলা কবিতা

হুমায়ূন আহমেদ, কবি ও বাংলা কবিতা

অমিত গোস্বামী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:২২ ১৩ নভেম্বর ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

(আজ ১৩ নভেম্বর। বাংলা ভাষাসাহিত্যের বরপুত্র হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। তার জীবন কাহিনী অবলম্বনে রচিত ও প্রকাশিত উপন্যাস ‘হুমায়ূন’-এর লেখক অমিত গোস্বামীর কলমে হুমায়ূন আহমেদের কিছু স্মৃতিচারণ ডেইলি বাংলাদেশ’র পাঠকদের জন্য প্রকাশ হলো)

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের প্রতি আমার ভাল লাগা বহুদিনের। কিন্তু মানুষ হুমায়ূনের প্রতি  আকৃষ্ট হলাম তার মৃত্যুর পরে। কারন ব্যক্তি হুমায়ূন সম্পর্কে তার মৃত্যুর পরে উঠে আসা  বিভিন্ন বিতর্ক আমাকে অবাক করেছিল। কারন বিতর্কের হেতু আমি আমার দৃষ্টিকোন থেকে খুঁজে পাইনি। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার অনেকেরই ব্যক্তিজীবন সাধারনের সাথে মেলে না। কারন তারা অসাধারণ। কিন্তু হুমায়ূনের মৃত্যুর পরে তাকে ও তার পরিবারকে মুড়মুড়ে মোড়কে আবদ্ধ করে বাজারে যেভাবে আনা হয়েছিল ব্যক্তিগতভাবে আমার বারবার তা বাজারি বলে মনে হয়েছিল। আড়ালে পড়ে গেল তার সাহিত্য সৃষ্টি। তাতে আমার মনের মধ্যে একটা কৌতুহল জন্ম নিল। মনে হল এই মানুষটি অনেকটাই আলাদা। তার সম্পর্কে পড়তে শুরু করলাম। পড়তে পড়তে বুঝলাম হুমায়ূনের জীবনের ঘটনাগুলি ও তা থেকে সৃষ্ট অভিঘাতগুলি অনান্য সাহিত্যিকদের জীবন থেকে একেবারে আলাদা। এই ঘটনাক্রমগুলি সাজালে অনায়াসে জন্ম নিতে পারে আলাদা একটি উপন্যাস। সেইখান থেকে লিখতে শুরু করলাম – হুমায়ূন। সেই ‘হুমায়ূন’ উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদের সাথে বাংলা কবিতা ও কবিদের সংযোগ নিয়ে লেখা অংশ তুলে ধরলাম।    

...হুমায়ূনের সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক ছোটবেলা থেকে। একদিন হোস্টেলে বসে বসে সে দু’তিনটে কবিতা লিখে ফেলল। ভারী মজার তো এমন শব্দের খেলা। ছোট ছোট বাক্যে ভাবপ্রকাশ। সবগুলোর মানে হয় না। হুমায়ূন আবার স্পষ্ট অর্থ না থাকলে তাকে কবিতা ভাবতে নারাজ। যাই হোক কবিতা এমন একটা জিনিষ বলে তার মনে হয় যার জন্যে গুরু না হলেও চলে, রেওয়াজ বা প্র্যাক্টিশ না করলেও চলে, খরচ নেই আলাদা করে শুধু কলম আর কাগজ, সময় বেশি লাগে না... কিন্তু মেয়েদের কাছে কবিদের মূল্যই আলাদা। তাই হঠাৎ আজ মনে হল লিখে দেখা যাক। কিন্তু লেখার পরে মনে হল কবিতাগুলি মন্দ হয়নি। কিন্তু পুরুষোচিত নয়। কেমন যেন লবঙ্গলতিকা মার্কা। দেখা যাক একটা পরীক্ষা করে। সে দুটি কবিতা সুন্দর করে কপি করল। করে ডাকযোগে পাঠিয়ে দিল দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায়। তবে লেখক হিসেবে নিজের নাম দেয়নি। নাম দিল ছোটবোন মমতাজ আহমেদ শিখু’র। প্রকাশের প্রত্যাশা সে করেনি। কিন্তু কী আশ্চর্য, পরের সপ্তাহেই দুটি কবিতাই ছাপা হল দৈনিক পাকিস্তানে। সম্পাদকের চিঠি এল, প্রিয় আপা, কবিতা ছাপা হল, আরো কবিতা পাঠাবেন, আপনার কবিতার দুটি লাইন আমার খুব পছন্দ হয়েছে...দিতে পার একশ ফানুস এনে, আজম্ম সলজ্জ সাধ একদিন আকাশে কিছু ফানুস ওড়াই। কী সব্বোনাশ! সম্পাদকের চিঠি পেয়ে হুমায়ূন ভাবল এর নাম কবিতা? এরই নাম যে কবিতা সে’কথা সেই বিকেলে হুমায়ূনকে জোর দিয়ে বলল তার সহপাঠি বন্ধু মুহাম্মদ নুরুল হুদা। এই হুদা এক আজব চরিত্র। কবিতা অন্ত প্রাণ। কবিতার ওপর জ্ঞান প্রচুর। তার সবসময় মতলব থাকে সবাই কবিতা লিখবে। পৃথিবীকে কবিতাময় করে তুলতে তার জুড়ি নেই। এর মধ্যে সে একটা কবিতা সংকলন নিজের খরচায় বার করবে। হুমায়ূনকে দিয়ে জোর করে কবিতা লেখাল। কবিতাটা মাঝে মাঝে হুদা আবৃত্তি করে সকলকে শোনাত।

রঙিন সূতার ছিপ ফেলে/ এক প্রজাপতি ধরতে গিয়ে উলটে পড়ে/ এই উঠোনেই, মাগো, তোমার খুন হয়েছে/ বিশ বছরের যুবক ছেলে...।

কবিরা সত্যি পাগল হয়। হুদাকে দেখে বেশ টের পেত হুমায়ূন। হুদার গুঁতোনির চোটে সে তিনটে টাটকা কবিতা নিয়ে গেল অধ্যাপক হুমায়ূন কবির সাহেবের কাছে। কবির সাহেবের তখন কুসুমিত ইস্পাত নামের কবিতার বইটি খুব জনপ্রিয়। যেতেই কবির সাহেব বললেন, কি চাই?
তিনটে কবিতা নিয়ে এসেছি।

কেন?

না, শুনলাম বাংলা অ্যাকাডেমি নাকি ঠিক করেছে যে গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতার আলাদা নির্বাচিত সংকলন করবে। তাই যদি সুযোগ পাওয়া যায়?
আপনার কবিতা কি আগে কোথাও ছাপা হয়েছে?

জি-না।

ছন্দ সম্পর্কে কোন জ্ঞান আছে?

জি-না।

অন্যের কবিতা পড়েন?

জি-না।

আচ্ছা আপনাকে এখানে আসতে কে বলেছে?

আমার বন্ধু মুহাম্মদ নুরুল হুদা

হুমম। হুদা ভাল লেখে। একদিন ও অনেক বড় কবি হবে। ওকেও এমন সংকলন করতে হবে। তখন ও কিন্তু আপনার মত আনকোরা কবিকে স্থান দেবে না। আপনি মনে দুঃখ পাবেন না। আপনি হুদার বন্ধু বলেই বলছি, কবিতা কোন সস্তা বাজারি বিষয় নয়। কবিতা লিখতে যে মেধা ও মনন লাগে তার জন্ম এই ভুবনে না। কবিতার ছন্দ শিখতেই লাগে দশ বছর। আপনি এখনো কবি নন।

বাংলা একাডেমি থেকে সোজা মহসীন হল। ফিরে দেখে হুদা অপেক্ষা করছে। কি হল? হুমায়ূন বহুখন্ডে তিনটে কবিতাই ছিঁড়ে তাকে আজকের ইতিবৃত্ত বলল। তারপরে বলল, হুদা, সবার জন্যে যে কবিতা নয়, এটা আজ কবির সাহেব স্পষ্ট করে দিলেন।... 

...হুমায়ূন নিয়মিত ডাকবাক্সে তার আগত পত্র দেখে। মাঝে মধ্যেই ভাবে কি করা যায়? হুদা ঢাকায় নেই। কিন্তু হুমায়ূনের বাংলা অ্যাকাডেমিতে দরকার ছিল। একা একাই হেঁটে গেল সে। গিয়ে দেখল মহাপরিচালকের ঘরের বাইরে অনেকে অপেক্ষা করছেন। সেখানে দেখল সৈয়দ শামসুল হক বসে আছেন। মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। পরিচিত একজনের সাথে বইয়ের ভাষায় কঠিন কঠিন শব্দে জটিল সব বাক্য তৈরি করে কথা বলছেন। কথা বলছেন মানে রাগ ঝাড়ছেন। সেই ভদ্রলোক হুমায়ূনের পরিচিত। হুমায়ূনকে ডেকে আলাপ করিয়ে দিলেন হক ভাইয়ের সাথে। হুমায়ূন এমনি একটু দূরত্ব রেখে চলে। তবু লেখক তো। খুশি হয়ে হক ভাইকে বলল, আমি আপনার রচনার একজন ভক্ত পাঠক। আপনার প্রায় সব লেখাই পড়েছি। হক ভাই পাত্তা দিলেন না। নিস্পৃহ গলায় বললেন, ও আচ্ছা। মেজাজটা আরো খিঁচড়ে গেল। সে অন্তত সামান্য উত্তাপ প্রত্যাশা করেছিল হক ভাইয়ের থেকে।...

...এরমধ্যে একদিন হুমায়ূনের সাথে হঠাৎ নিউমার্কেটে সৈয়দ শামসুল হকের সাথে দেখা। হক সাহেবকে হুমায়ূন যথেষ্ঠ শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু হক সাহেব তাকে যে বাজারি লেখকের তকমাদানে নিরলস তা হুমায়ূন ভালই জানেন। একবার বিচিত্রার অফিসে হক সাহেব সবার সামনে বললেন, হুমায়ূন, বলুন তো আপনার লেখা সব সময় ফর্মা হিসেবে বেরোয় কেন? হুমায়ূন উত্তর দিলেন, হক ভাই, আপনি তো সনেট লেখেন। আপনি যদি আপনার ভাবনা নির্দিষ্ট ১৪ লাইনে শেষ করতে পারেন আমি কেন আমার ভাবনা ফর্মা হিসেবে শেষ করতে পারব না। আজ সাথে আবার গুলতেকিনও আছে। তিনি হাসিমুখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, কি  লিখছেন এখন ? হুমায়ূন বিনীত ভাবে উত্তর দিলেন, বহুব্রীহি তো শেষ হল, এখন লিখছি ‘অয়োময়’। তিনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, সাহিত্য কিছু লিখছেন না? হুমায়ূন ক্ষুন্ন হলেন। বললেন, হক ভাই, টিভি নাটক সাহিত্য নয়, কিন্তু মঞ্চ নাটক সাহিত্য, তাই তো?

তা তো বটেই।

কী করে হয়? আমার একটা নাটক তিন কোটি মানুষ দেখে। তারা কাঁদে, হাসে, দুঃখ পায়, আনন্দ পায়। সেখানে একটা মঞ্চ নাটক দর্শক পায় ধরে নেই তিন’শ। কিন্তু তাকে আপনারা সাহিত্য বলবেন আমারটা নয়?

তা নয় হুমায়ূন, বাংলা সাহিত্য আমজনতার জন্যে তো পুরোপুরি নয়।

হক ভাই, আমার টিভিতে নাটক প্রচারের পরে আমার উপন্যাসের বিক্রি কোথায় পৌঁছেছে জানেন? আপনি আমার ‘আমার আছে জল’ বা ‘ফেরা’ উপন্যাস পড়েছেন?

না, এখনও পড়িনি।

অথচ দেখুন দুটি উপন্যাসই তিরিশ হাজারের ওপরে বিক্রি অর্থাৎ ধরে নিচ্ছি ষাট হাজারের বেশি মানুষ পড়েছেন। কিন্তু আপনি পড়েন নি। তাহলে আমি কার জন্যে লিখব? আপনি কবে আমায় বইয়ের সাহিত্যগুন বিচার করে কোন কাগজে এক কলম লিখবেন সেটা প্রত্যাশা করে আপনার জন্যে লিখব? না আমজনতা যারা পয়সা দিয়ে পড়ে আমায় দিস্তা দিস্তা চিঠি পাঠাবেন, তাদের জন্যে লিখব? 
তাহলে তুমি তো বাজারি লেখক হয়ে যাবে! 

হলে তো আমি গর্বিত হব। কোন লেখক বিক্রির নিরিখে বিবেচিত হন না বলতে পারেন?
তোমার আমার চিন্তা ভিন্ন।

অবশ্যই। কিন্তু আমি আপনার প্রতি আপনার সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

হুমম, বলে হক ভাই চলে গেলেন। গুলতেকিন পাশ থেকে বলে উঠল, তুমি এত বড় কবিকে এমনভাবে বলতে পারলে? হুমায়ূন বললেন, আমি হক ভাইয়ের লেখাকে শ্রদ্ধা করি, পড়ি, বলিও সবাইকে, কিন্তু কবি ও লেখকদের মধ্যে কয়েকজন আছেন যারা অন্যের কাজের পদ্ধতির সমালোচক। অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা মেনে নিতে আপত্তি নেই। হক ভাই সেই দলে পড়বেন কেন? তাই আজ একা পেয়ে এভাবে বললাম। সবার সামনে কখনই আমি হক ভাইকে কিছু বলি না।...

...শিল্পী সাহিত্যিক গায়ক সুরকার এরা সুক্ষ কলার চর্চা করে। এদের জীবনে নারীদের আগমন নতুন নয়। তার প্রিয় কবি জীবনানন্দ লিখেছেন –
কান্তারের পথ ছেড়ে সন্ধ্যার আঁধারে/ সে কে এক নারী এসে ডাকিল আমারে,/ বলিল , তোমারে চাই/ বেতের ফলের মতো নীলাভ ব্যথিত তোমার দুই চোখ / খুঁজেছি নক্ষত্রে আমি- কুয়াশার পাখনায়-/ সন্ধ্যার নদীর জলে নামে যে আলোক/ জোনাকির দেহ হতে-খুজেছি তোমারে সেইখানে-।
এই খোঁজ চলতে থাকে অবিরাম। স্বপ্নের নারীর খোঁজ, সৃষ্টির খোঁজ, সৃষ্টিকর্তার খোঁজ সব মিলে মিশে নিজেকে চেনার খোঁজ। কে পায়? ক’জন পায়? কেউ পায় না হয়ত। হয়ত বা পায়।...

...আগুপিছু কিছু না ভেবেই ইলেকট্রিক তানপুরাটা চালিয়ে দিল শাওন। গাইল, তবু মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে, যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে, যদি থাকি কাছাকাছি, দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি। হুমায়ূন চোখ বন্ধ করে শুনলেন। গান শেষ হতেই চোখ না খুলে আবৃত্তি করলেন, কোথায় গিয়েছ তুমি আজ এই বেলা/ মাছরাঙা ভোলেনি তো দুপুরের খেলা/ শালিখ করে না তার নীড় অবহেলা/ উচ্ছ্বাসে নদীর ঢেউ হয়েছে সফেন,/ তুমি নাই বনলতা সেন।/ তোমার মতন কেউ ছিল কি কোথাও?/ কেন যে সবের আগে তুমি চলে যাও।/ কেন যে সবের আগে তুমি/ পৃথিবীকে করে গেলে শূন্য মরুভূমি/ ছিঁড়ে গেলে কুহকের ঝিলমিল টানা ও পোড়েন, /কবেকার বনলতা সেন।...

...তাহলে শোন অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদের বাসায় আমি, কবি শামসুর রাহমান, সালেহ চৌধুরী ও হুমায়ূন আজাদ আড্ডা দিচ্ছি। আমি একটা সময়ে কবি শামসুর রাহমানকে জিজ্ঞাসা করলাম, নির্মলেন্দু গুণকে আপনার কবি হিসেবে কেমন মনে হয়? ও কি আদৌ কবি? তিনি আমার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, বাইরে একেবারেই বলবেন না আমি বলেছি তাহলে অনর্থ হবে, নির্মলেন্দু গুণকে আমার খুব বড় মাপের কবি বলেই মনে হয়। আমি বললাম, আপনি এত চুপিচুপি বলছেন কেন? বাকিরা .ক্ষেপে যাবে সেই ভয়ে? তিনি বললেন,আরে তুমি কবিদের জানো না। এরা এদিকে বলবে কবিরা দেশের আত্মা ওদিকে একজনকে ভাল বললে অন্যেরা একজোট হয়ে রেগে আপনার মুণ্ডপাত করবে।...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর