Alexa হায়াৎ সাইফের সাক্ষাৎকার (শেষ কিস্তি)

হায়াৎ সাইফের সাক্ষাৎকার (শেষ কিস্তি)

সাক্ষাৎকার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৩৮ ১৫ মে ২০১৯   আপডেট: ১৬:৪১ ১৫ মে ২০১৯

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

ষাটের দশকে কাব্যচর্চা শুরু করেছিলেন হায়াৎ সাইফ। ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ সম্পন্ন করেন। তার লেখা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। ১৯৮৩ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সন্ত্রাসের সহবাস’ প্রথম প্রকাশিত হয়। হায়াৎ সাইফের লেখা ১৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষায় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। ১৯৬৫ সালে রাজশাহী কলেজের  শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। হায়াৎ সাইফ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্কাউট মুভমেন্টের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন ১৯৯০ সাল থেকে। তিনি বাংলাদেশ স্কাউটের ন্যাশনাল কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। ২০০৩ সালে বিশ্ব স্কাউট কমিটির একমাত্র এবং বিশ্ব স্কাউট পরিমণ্ডলের সবচেয়ে সম্মানজনক পদক ‘ব্রোঞ্জ উলফ’ পদক অর্জন করেন। ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৮ সালে ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হন হায়াৎ সাইফ।   তার সাক্ষাৎকারের শেষ পর্ব প্রকাশ হলো আজ

 

প্রশ্ন: এই যে শব্দের পরিপ্রেক্ষিতে শব্দ এবং কখনো কখনো নতুন শব্দ, এটা কি আসলে কবিতার ভাবার্থের জন্যই আনা?

হায়াৎ সাইফ: আমি নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে করি। এমন একটি ভাষা আমার মাতৃভাষা যারা সম্ভাবনা প্রায় অসীম। বিশেষ করে কাব্যিক ক্ষেত্রে। তার প্রকাশ করবার যে ক্ষমতা, বাংলা ভাষার নিজেস্ব প্রতিভা আছে। যেটাকে ইংরেজিতে বলে ‘জিনিয়াস অব দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ’ সেই জিনিসটা বাংলা ভাষার মধ্যে অসীম পর্যায়ে আছে। আমি মনে করি, একজন কবির কাজ হলো সেই শব্দের যে সম্ভাবনা সেই সম্ভাবনার নতুন নতুন দিগন্তকে উন্মোচন করা। কেননা, কবিতার একটি সজ্ঞায় হচ্ছে, শ্রেষ্ঠ শব্দের শ্রেষ্ঠ বিন্যাস। এটিই হচ্ছে কবিতা, এবং তাই যদি হয় তাহলে শব্দ নিয়ে যে একটা খেলা যেটা হলো অন্তরের ভেতর থেকে উঠে আসা কতকগুলো ধারণা। সেই ধারণার সঙ্গে কিন্ত যোগ আবহমান বাংলার। একজন কবি যখন লেখেন, তখন কিন্তু তিনি এককভাবে লেখেন না। তার পেছনে কাজ করে একটি জাতি, একটি দেশের-একটি মৃত্তিকার লগ্নতা এবং তার আবহমানকালের যে সংস্কৃতি ও সাহিত্য সেটা পুরোটাই কাজ করে। একটা প্রবদ্ধে আমি খুব স্পষ্ট করে বলেওছি, আধুনিক পাশ্চাত্য কবিতা বাংলা কবিতাকে যতোখানি প্রভাবিত করেছে তার যে অনেক বেশি ঋণী আমরা বাঙালির প্রাথমিক যে সাহিত্য চর্যাপদের কাছে। চর্যাপদের দেখবেন হেয়ালি, তার মধ্যে যে সমাজ চেতনা, তার মধ্যে যে মৃত্তিকা লগ্নতা সাধারণ মানুষের কথা। সেখানে আধ্যাত্মিক যে গানগুলো সেগুলোর ভেতর দিয়েই যে সমাজচিত্রটা নিয়ে আসা হয়েছে। সেটা সাধারণ মানুষের কথা, সেটা সাধারণ মানুষের দুঃখ, কষ্ট, দারিদ্র-যন্ত্রণা এইটার কথা বলা হয়েছে। এবং আধুনিক বাংলা কবিতায় সেই জিনিসটি কিন্তু আমরা পুরোপুরি ধারণ করি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা সেটা থেকে আমাদের মৃত্তিকা লগ্নতা অনেক বেশি গভীর। আমার শেকড় কিন্তু এই মৃত্তিকায় প্রোথিত। এই দিক থেকে বাংলা কবিতায় যে ঐতিহ্যের বিষয় এটি কিন্তু সব জায়গায়-সমানভাবে পাবেন না-অন্য কোন ভাষায়। আধুনিকতার যে হেয়ালি, যে তীর্যকতা সেটা সেই চার্যাপদ থেকেই চলে আসছে। 

প্রশ্ন: কিন্তু শব্দতো এমনো হতে হবে যাতে পাঠকের বোধগম্য হয়।

হায়াৎ সাইফ:  সেটি একটি ব্যপার আছে, সেটাও বটে। আমি যেটা বলি তা হলো, বাংলাদেশে এখন প্রায় সাড়ে ষোল কটি কবিতা আছে ( হা হা হা)। অনেকে খুব সহজপ্রবণ মনে করে এটি ধরে। কিন্তু এটা করতে গেলে যে মধ্য রাত্রিতে তেল খরচ করতে হয়। দীর্ঘ, দীর্ঘ এবং দীর্ঘ অনুধ্যাণের প্রয়োজন হয়, চর্চার প্রয়োজন হয়। জানারও বিষয় আছে, কেননা আপনি ঐতিহ্যকে ধারণ করেন। এটা খুব স্পষ্ট করে বলেছেন  টি এস এলিয়ট- একজন কবি যখন লেখেন তার যে হৃদয়টি, তার যে মননটি সেটি একটি ক্যাটালিস্ট-এর মতো কাজ করে। এটি ঘটকের মতো কাজ করে। সেখানে এসে তার ইতিহাস, তার ভাষা, তার সংস্কৃতি সমস্তই কাজ করতে করতে একটা সময় তার ধারণাটা কয়েকটি শব্দে প্রোথিত হয়ে যায়। এবং সেটাই কবিতা।

প্রশ্ন: বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষাতেও আপনার কবিতা প্রকাশ হয়েছে। আমরা সমসাময়িক যে কবিতা দেখতে পাচ্ছি সেটার বৈশ্বিক মান নিয়ে যদি আপনি কিছু বলতেন।

হায়াৎ সাইফ: আমার নিজের ধারণা হচ্ছে, বাংলায় বর্তমান কালে বিশেষ করে ষাটের দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত- এখন নতুন অনেকেই লিখছেন অপূর্ব। কিন্তু আমাদের যে একটা সমস্যা যেটা আমি বেশ আগেই বলেছিলাম, আশির দশকেই এশিয়াটিক সোসাইটি একটি সার্ভে করেছিল  যার ‘কি নোট পেপার’টা আমি দিয়েছিলাম। এটা করিয়েছিলেন ড. খান সারওয়ার মোর্শেদ। সেখানে আমি বলেওছিলাম এই কথাটি , এখন সময় এসেছে সীমান্তের বাইরে আমাদের কবিতাকে নিয়ে যাওয়া। এবং সেটা  নেয়ার একটা উপায় হচ্ছে ভালো অনুবাদ। বিভিন্ন ভাষায় আমাদের কবিতার কিন্তু ভালো অনুবাদ এখনও হয়নি। যোগ্য অনুবাদ দরকার, সেটার কিছু কিছু চর্চা এখন শুরু হয়েছে। আমাদের বেশ কিছু কবিতা আছে যেগুলো রীতিমত বিশ্বমানের। সেই জায়গায় আমাদের যাওয়া উচিত। সেটার জন্য ইন্সটিটিউশনাল কিছু হেল্প হয়তো দরকার আছে। অনেক ইনিডিভিজ্যুয়ালও অনেক চেষ্টা হচ্ছে। অনেকে আছেন যারা বাইরে আমাদের কবিতাকে পরিচিত করিয়েছেন, বিভিন্ন জায়গায়। আমার কিছু কবিতা অনুবাদ হয়েছে, বেশিরভাগ কবিতা অনুবাদ হয়েছে স্প্যানিশ ভাষায়। স্প্যানিশরা মোটামুটিভাবে বাংলাদেশকে চেনে। এটা অনেক আশার কথা। এখনো আরো ভালো অনুবাদ হওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি।

প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষা পদ্ধতি সেখানে কর্মমুখী শিক্ষা বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। সেখানে ফিলোসফি বলেন, সাহিত্য বলেন, সংস্কৃতি বলেন আমাদের প্রজন্ম কতটুকু আগ্রহী হচ্ছে। আমরা একটা খরা অনুভব করবো কিনা অচিরেই?

হায়াৎ সাইফ: একটা ব্যপার হয়েছে কি জানেন, প্রযুক্তির ফলে আমি সহজেই অনেক তথ্য পেতে পারি। কিন্তু কোন তথ্যটির ওপর আমি নির্ভর করবো, সেই জিনিসটা খুব স্পষ্ট নয়। ফলে আমাদের তরুণেরা তথ্য নিচ্ছে কিন্তু এটাকে শোষণ করা আত্মস্থ করা এই জিনিসটা কিন্তু আমরা হারিয়ে ফেলছি। হিউম্যানিটিজে ভালো পড়াশোনা থাকা দরকার, দর্শন সম্পর্কে আমাদের একেবারেই উৎসাহ নেই। এখন পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা একটা জায়গায় এসে দাঁড়ালো না। ইংরেজি শিক্ষা-বাংলা শিক্ষা এই রকম নানান সমস্যা আছে। আমি আশা করি এটা গিয়ে একসময় একটি জায়গায় দাঁড়াবে। এটা নির্ভর করবে সমাজের বিবর্তনের উপরে। বিবর্তীত হতে হতে একটা ভারসাম্য তৈরি হবে। 
প্রশ্ন: সম্প্রতি আপনি একুশে পদক পেলেন, যারা ভাষা-সাহিত্য রচনা করেন এটা তাদের জন্য অত্যন্ত সম্মানের। আপনার অনুভূতি কী?
হায়াৎ সাইফ: কেউ তো আর পুরস্কার পাওয়ার জন্য লেখেন না। আমাকে সবাই নিভৃতচারী বলে, তার কারণ আছে আমি সবসময় বিব্রতবোধ করি। আমি যে পঙতিটি রচনা করতে চাই, সেটি আমি এখনো রচনা করতে পারিনি। সেটার জন্য আমি দীর্ঘ অনুধ্যান করি, দীর্ঘ সময় বসে থাকি কিন্তু পাইনি। এ আমার সব সময় একটি আক্ষেপ। এই রকম একটি পর্যায়ে নিজের সম্পর্কে কি বলবো, কিছুইতো জানি না এখনো। এখনো যা কিছু পড়তে যাই, মনে হয় আমি এগুলো কিছুই জানি না! এতো কম জেনে দম্ভ করার মতো মানুষের কিছুই নাই। এখনো অনেক জানতে হবে। মানুষকে জানতে হবে, মৃত্তিকাকে বুঝতে হবে, মাটি ও মানুষের কাছাকাছি যেতে হবে-সেটা খুব দরকার। মানুষের তৃষ্ণার তো শেষ নেই, সেটা যতো থাকে ততোই ভালো আর নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই তৃষ্ণা আরো বেশি থাকার কথা। আমরা যখন তরুণ ছিলাম তখন এই স্পৃহাটা অনেক বেশি ছিল। আমার মনে আছে জন স্টাইনবেক তখন নোবেল প্রাইজ পেলেন, এবং আমি তার বেশ কয়েকটি কাজ অনুবাদ করে ফেললাম। এই সমস্ত কাজ আমরা তখন করেছি। এখনো তরুণ প্রজন্ম একটা অংশ আছে যারা এটা করে, সেখানেই আশা এবং ভরসা। আমি জানি তারাই এগিয়ে নিয়ে যাবে। এ সম্পর্কে আমার কোন সন্দেহ নেই।

তথ্যসূত্র: মাছরাঙ্গা টেলিভিশন (রাঙা সকাল, অনুষ্ঠান, ১৮ এপ্রিল ২০১৮)    

গ্রন্থণা ও শ্রুতিলিখন: স্বরলিপি