‘হাসান আল-থানি মসজিদ’ আটলান্টিকের বুক চিরে গড়ে ওঠা এক সুন্দর স্থাপনা!

মসজিদ পরিচিতি

‘হাসান আল-থানি মসজিদ’ আটলান্টিকের বুক চিরে গড়ে ওঠা এক সুন্দর স্থাপনা!

ধর্ম ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২২:৫৭ ৯ জুলাই ২০২০   আপডেট: ২২:৩১ ২১ জুলাই ২০২০

অপূর্ব কারুকার্য-শোভিত মসজিদসংলগ্ন মিনারের উচ্চতা ৬৯০ ফুট।

অপূর্ব কারুকার্য-শোভিত মসজিদসংলগ্ন মিনারের উচ্চতা ৬৯০ ফুট।

মরক্কোর কাসাব্লাংকা বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক একটি শহর। শহরটির উপকূলবর্তী প্রান্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হাসান আল-থানি মসজিদ ও তার বিশাল মিনার। আটলান্টিক মহাসাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে মিনারসংলগ্ন প্রাসাদোপম মসজিদের কিনারায়। 

কাসাব্লাংকা শহরের বেশির ভাগ স্থাপনা সাদা হলেও এই মসজিদের ইমারতগুলো লালচে। দেখতে যেন আটলান্টিক মহাসাগরের বুক চিরে গড়ে ওঠা এক সুন্দর স্থাপনা। রাতের বেলা জ্বলে ওঠা এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।

হাসান আল-থানি মসজিদটি মরক্কোর সবচেয়ে বড় মসজিদ। এর অবস্থান মুসলিম বিশ্বের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে; ঠিক আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে। মসজিদটির এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রের পানিতে ভাসমান। সমুদ্রের পানিতে ভাসমান অংশের ওপর দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া যায়। যদিও সাধারণ মুসল্লিদের জন্য কাচের তৈরি স্বচ্ছ মেঝের মধ্য দিয়ে নিচের পানির দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ নেই। সমুদ্রের তীরে অবস্থিত হওয়ায় মসজিদটিতে নামাজরত মুসল্লিরা সব ধরনের দূষণ থেকে মুক্ত থেকে সমুদ্রের মুক্ত সতেজ হাওয়া উপভোগ করতে পারেন।

কাসাব্লাংকা শহরের বেশির ভাগ স্থাপনা সাদা হলেও এই মসজিদের ইমারতগুলো লালচে

রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের বাবা দ্বিতীয় হাসান মসজিদটি তৈরি করেন। তাই একে দ্বিতীয় হাসান মসজিদ বলেও ডাকা হয়। মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৮৬ সালে। যদিও ১৯৬১ সালে মরক্কোর পঞ্চম রাজা মোহাম্মদের মৃত্যুর পরপরই এটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এরপর ১৯৮৯ সালে এটি উদ্বোধনের কথা থাকলেও নানা কারণে পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৩ সালে মসজিদটি উদ্বোধন করা হয়। মূলত মসজিদটি বাদশাহ দ্বিতীয় হাসানের ৬০তম জন্মদিনে সম্পন্ন করার কথা ছিল। অবশেষে ১১ রবিউল আউয়াল ১৪১৪ হিজরি মোতাবেক ১৯৯৩ সালের ৩০ আগস্ট মসজিদটি উদ্বোধন করা হয়।

রাজা দ্বিতীয় হাসানের উদ্যোগে নির্মিত এই মসজিদ কমপ্লেক্সটি ছিল নিম্নমধ্য আয়ের মরক্কোর ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাকাক্সক্ষী প্রকল্প। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮০০ মিলিয়ন ডলার, যার জোগান দেয়া মরক্কোর সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের একটি বিরাট অংশ সংগ্রহ করা হয় দেশের জনগণের কাছ থেকে অনুদান হিসেবে।

প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ এই মসজিদ নির্মাণের জন্য অর্থের জোগান দেন। তাদের সবাইকে সরকারের পক্ষ থেকে অনুদানের রসিদ ও একটি করে সার্টিফিকেট দেয়া হয়। সাধারণ মানুষ ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং কুয়েত ও সৌদি আরবসহ কিছু আরব দেশও নির্মাণকাজের অর্থায়নের ব্যাপারে সাহায্য করে। এ ছাড়া কিছু পশ্চিমারাষ্ট্রও এ কাজের জন্য ঋণ দেয়।

রাজা চেয়েছিলেন এমন একটি স্থাপনা তৈরি করতে; যেটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং যেটা হবে ল্যান্ডমার্ক। শহরের যেকোনো জায়গা থেকেও দেখা যাবে। সেই চিন্তা থেকেই মসজিদটির নকশা ও নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়। মসজিদের নকশা করেন বিখ্যাত ফরাসি স্থপতি মিশেল প্যাঁসো, যিনি সে সময় মরক্কোতেই থাকতেন। এটি নির্মাণে কাজ করেছেন ফরাসি কোম্পানি বয়গিসের কারিগররা।

অপূর্ব কারুকার্য-শোভিত মসজিদসংলগ্ন মিনারের উচ্চতা ৬৯০ ফুট। যেটা ৬০-তলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচু। মসজিদের মিনারটি বর্গাকৃতির। সবুজের প্রাধান্য আছে এমন ক্রোমিয়াম ব্যবহার করা হয়েছে মিনারে। ফলে মসজিদটি হয়ে উঠেছে অদ্ভুত সুন্দর। ব্যবহার করা হয়েছে ভিন্নধর্মী সবুজ টাইলস। রোদ আর সাগরের পানির মিশেলে এই সবুজ রং কখনো গাঢ় সবুজ, কখনো ফিরোজা, কখনো নীলচে রঙে বদলে যায়। বলা হয়ে থাকে এই মিনার তৈরিতে স্থপতি সমুদ্রের ফেনার জন্য সবুজ এবং আকাশের মতো বিশালতার নীল ব্যবহার করেছেন; যা কি না রাজার বিলাসবহুল জীবনের প্রতীকও বটে।

মিনারটির চূড়ায় রয়েছে একটি লেজার বিম। যার আলো বিচ্ছুরিত হয় পবিত্র কাবাঘরের দিকে। সমুদ্রে চলাচলকারী বিভিন্ন জাহাজ সেই আলোকরশ্মি ৩০ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখতে পায়। প্রায় ৯ হেক্টর জমির ওপর অবস্থিত মসজিদটির ভেতরে ২৫ হাজার এবং বাইরের চত্বরে আরও ৮০ হাজার মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারে। এতে নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য পৃথক একটি বারান্দা আছে, যার ধারণক্ষমতা পাঁচ হাজার। মসজিদটির আংশিক মাটির ওপর এবং আংশিক পানির ওপর ভাসমান। পানির ওপর ভাসমান অংশের মেঝের কিছু স্থান কাচের তৈরি, যেখান থেকে মসজিদের নিচে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ার দৃশ্য সরাসরি উপভোগ করা যায়। তবে এই সুবিধাটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়, এটি শুধু রাজপরিবারের সদস্যরা ও নির্বাচিত বিশেষ অতিথিরাই পেয়ে থাকেন।

মসজিদ ছাড়াও এই বিশাল কমপ্লেক্সের মধ্যে আছে একটি মাদরাসা, হাম্মাম বা গোসলখানা, মরক্কোর ইতিহাস-সংবলিত একটি জাদুঘর, একটি কনফারেন্স হল এবং একটি সুবিশাল লাইব্রেরি। শুধু মাদরাসাটিই ৪ হাজার ৮৪০ বর্গমিটারের বিশাল ভূমির ওপর অবস্থিত। ভূগর্ভস্থ একতলা ছাড়াও আরো দোতলা জুড়ে নির্মিত এই মাদরাসাটির আকার অর্ধ-চন্দ্রাকৃতির। মাদরাসা, কনফারেন্স হল ও লাইব্রেরির কক্ষগুলোতে অত্যাধুনিক অডিও-ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির ব্যবস্থা আছে।

রাজা চেয়েছিলেন এমন একটি স্থাপনা তৈরি করতে; যেটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে

মসজিদের কেন্দ্রীয় হলের ছাদটি দুই পাশে সরে গিয়ে উন্মুক্ত হয়ে যেতে সক্ষম। ৩ হাজার ৪০০ বর্গমিটার আকারের এই ছাদটির ১ হাজার ৭৫০ বর্গমিটারই উন্মুক্ত হতে পারে। ১ হাজার ১০০ টন ওজনের এই ছাদটি একটি মোটরের সহায়তায় খুলে যেতে সময় নেয় মাত্র পাঁচ মিনিট। ছাদটি বন্ধ থাকা অবস্থায় ৫০টি ঝাড়বাতি হলটিকে আলোকিত করে রাখে। দিনের বেলা ছাদটি খুলে দেয়া হলে মুসল্লিরা খোলা আকাশের নিচে সূর্যের আলোয় আলোকিত হলঘরে নামাজ আদায় করতে পারেন। রাতের বেলা হলে চাঁদ-তারার কোমল আলো এবং হলরুমের চারপাশের দরজাগুলো থেকে বিচ্ছুরিত আলো হলরুমটিকে আলোকিত রাখে।

উল্লেখ্য, মরক্কোর অন্যান্য মসজিদের মতো এই স্থানে কিন্তু অমুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ নয়। বছরভর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা মায়াবী সৌন্দর্যের এই ধর্মীয় কেন্দ্রে ভিড় করে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে/