Alexa হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের পুরো টাকাই গায়েব, দুদকের মামলা

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের পুরো টাকাই গায়েব, দুদকের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৫০ ৯ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৫:৫৪ ৯ জুলাই ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যন্ত্রপাতি সরবরাহের নামে সাজানো টেন্ডারে শতভাগ সরকারি অর্থ লোপাটের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় মঙ্গলবার সকালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক জালাল উদ্দিন বাদী হয়ে খুলনা জেলা সমন্বিত কার্যালয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় সাতক্ষীরার তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুর রহমানসহ ৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এর আগে দুদকের অনুসন্ধানে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যন্ত্রপাতি সরবরাহের নামে সাজানো টেন্ডারে শতভাগ সরকারি অর্থ লোপাটের প্রমাণ মিলে। ১৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকার কার্যাদেশের মধ্যে ১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকাই লোপাট করা হয়েছে। বাকি প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স বাবদ কেটে রাখা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে হাসপাতালের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থও হাতিয়ে নেয় একটি চক্র।

এ বিষয়ে গত ২৫ মে ডেইলি বাংলাদেশে ‘১৭ কোটি টাকার ১২ কোটিই গায়েব’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতালে যন্ত্রপাতি কেনার নামে এই দুর্নীতি করা হয়।  

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে জানা গেছে, যন্ত্রপাতি কেনাকাটার নামে ভুয়া রেজিস্টার দেখিয়ে আত্মসাতের রাস্তা তৈরি করেন সাতক্ষীরার তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুর রহমান। তার তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারসহ ৮ সদস্যের একটি সিন্ডিকেট নানা কৌশলে ওই হাসপাতালের কেনাকাটাসহ অন্যান্য খাতে এক বছরের জন্য সরকারি বরাদ্দের পুরোটাই গিলে ফেলে। দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তারা বলেন, সাতক্ষীরায় সরকারি হাসপাতালে কেনাকাটার নামে প্রায় শতভাগ অর্থ জালিয়াতির মাধ্যমে লোপাট করা হয়েছে।

অনুসন্ধান দলের প্রধান দুদকের উপপরিচালক মো. সামসুল আলম বলেন, আমাদের টিমের অনুসন্ধানে দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। কমিশনের সিদ্ধান্তে জড়িতদের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

জানা গেছে, সরকারি তদন্তে ওই হাসপাতালে ১৭ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সরবরাহের নামে ১২ কোটি টাকা দুর্নীতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদকের অনুসন্ধানে দুর্নীতির পুরো চিত্র বেরিয়ে আসে। এতে দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে সাড়ে ১৬ কোটি টাকার বেশি লোপাট হয়েছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুর রহমানসহ ৯ জন জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। এর সঙ্গে জড়িত সিভিল সার্জন ছাড়া বাকি ৮ জনের মধ্যে একই পরিবারের চারজনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে।

তারা হলেন- রাজধানীর ২৫/১, তোপখানা রোডের বেঙ্গল সায়েন্টেফিক অ্যান্ড সার্জিকেল কোম্পানির কর্ণধার মো. জাহের উদ্দিন সরকার। তার ছেলে মো. আহসান হাবিব। জাহের উদ্দিনের বাবা মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার হাজী আবদুস সাত্তার সরকার এবং তার ভগ্নিপতি ইউনিভার্সেল ট্রেড কর্পোরেশনের কর্ণধার মো. আসাদুর রহমান।

এই চারজনের নামে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ২৫/১ নং তোপখানা রোড। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত চক্রের অপর সদস্যরা হলেন- সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন দফতরের স্টোরকিপার একেএম ফজলুল হক, হিসাবরক্ষক আনোয়ার হোসেন, জাহের উদ্দিন সরকারের নিয়োগকৃত প্রতিনিধি কাজী আবু বকর সিদ্দিক ও মহাখালী নিমিউ অ্যান্ড টিসির সহকারী প্রকৌশলী এএইচএম আবদুল কুদ্দুস। দুদকের অনুসন্ধানে সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুর রহমানসহ এই ৯ জনের বিরুদ্ধে ১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ডা. তওহীদুর রহমান ২০১৭ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও এর আওতাধীন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনার একটি তালিকা তৈরি করেন।

তালিকা অনুযায়ী এর স্পেসিফিকেশন ও বর্তমান বাজারদর প্রেরণের জন্য মহাখালীর নিমিউ অ্যান্ড টিসির চিফ টেকনিক্যাল ম্যানেজারকে অনুরোধ করেন। তা পাওয়ার পর ওই প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রকৌশলী এএইচএম আবদুল কুদ্দুস নিজেই টেন্ডার সংক্রান্ত কার্যক্রম শুরু করেন। তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ক্ষমতাবহির্ভূতভাবে নিজে তৎপর হয়ে ওঠেন। কোনো ধরনের বাজারদর সংগ্রহ বা যাচাই না করে ১৫৯ ধরনের মেডিকেল যন্ত্রপাতির স্পেসিফিকেশনসহ নিজের মনগড়া দর তৈরি করে সাতক্ষীরায় সিভিল সার্জনের কাছে পাঠান।

ওই স্পেসিফিকেশনসহ দরপত্র পেয়ে তৎপর হয়ে ওঠেন সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুর রহমান। তিনি সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা হাসপাতালের চাহিদাপত্র বা প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৫৯ ধরনের যন্ত্রপাতি কিনতে ২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর টেন্ডার বা দরপত্র আহবান করেন।

টেন্ডার আহবানের পর আগে থেকে ঠিক করে রাখা একই পরিবারের মালিকানাধীন তিনটি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানি, ইউনিভার্সেল ট্রেড কর্পোরেশন ও মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের তিন প্রতিষ্ঠান সাজানো টেন্ডারে অংশ নিয়ে পরিকল্পনামতো দর দিয়ে আলাদাভাবে দরপত্র জমা দেয়।

অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভায় ওই তিনটি দরপত্র গ্রহণযোগ্য হয়। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে সদস্য হিসেবে মহাখালীর নিমিউ অ্যান্ড টিসির সহকারী প্রকৌশলী এএইচএম আবদুল কুদ্দুস অন্তর্ভুক্ত হন। অথচ তার কর্তৃপক্ষ তাকে এ কাজে মনোনয়ন করেনি।

তিনি অবৈধভাবে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে উপস্থিত হয়ে মনগড়া দর গ্রহণে সহায়তা করেন। পরিকল্পিতভাবে দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হন মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। এভাবে সাজানো দরপত্রে সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুর রহমান ২০১৮ সালের ১৩ মে ১০৬টি আইটেমের যন্ত্রপাতির জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (কার্যাদেশ) প্রদান করেন।

ওইদিনই তিনি জাহের উদ্দিন সরকারের মনোনীত প্রতিনিধি কাজী আবু বক্কর সিদ্দিকের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেন। চুক্তি অনুযায়ী ১০৬ আইটেমের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেই ভুয়া চালান ওই বছর ৩১ মে সিভিল সার্জন বরাবর দাখিল করে।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের স্টোরকিপার একেএম ফজলুল হক তাতে স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে যন্ত্রপাতিবিহীন চালান গ্রহণ করেন। পরে তিনি (একেএম ফজলুল হক) সার্ভে কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর স্ক্যান করে চালানের অপর পৃষ্ঠায় বসিয়ে ৭ জুন যন্ত্রপাতি সার্ভে হয়েছে মর্মে জানান। তাতে তিনি নিজে স্বাক্ষর করে সিল প্রদান করেন।

এছাড়া স্টক রেজিস্টারে মেডিকেল অফিসারের প্রত্যয়ন করার নিয়ম থাকলেও তা না করে সিভিল সার্জন ডা. তওহীদুর রহমানের প্রত্যয়নে নতুন স্টক রেজিস্টার খুলে ১৩ মে স্টক রেজিস্টারে মিথ্যাভাবে যন্ত্রপাতি সরবরাহ দেখানো হয়। স্টক রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ যন্ত্রপাতি সরবরাহ বুঝে নেয়ার সত্যতা প্রমাণে রেজিস্টারের রিমার্কস কলামে ডা. তওহীদুর রহমান স্বাক্ষর করেন। যা ছিল অবৈধ।

দুদকের অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, এরপরও দরপত্র আহবান না করে ডা. তওহীদুর রহমান দ্বিতীয় দফায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে আরও ১৬টি আইটেমের যন্ত্রপাতি সরবরাহের কার্যাদেশ দেন।

ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও স্বাক্ষর করেন সিভিল সার্জন। দ্বিতীয় দফায়ও জালিয়াতির আশ্রয় নেয় চক্রটি। চুক্তি অনুযায়ী যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করে আমমোক্তার গ্রহীতা কাজী আবু বক্কার সিদ্দিক মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের লিখিত প্যাডে ১৬টি আইটেমের যন্ত্রপাতি সরবরাহের মিথ্যা চালান সিভিল সার্জনের বরাবর দাখিল করেন।

এছাড়া অবৈধভাবে আগের দরপত্রে দেয়া দামে তৃতীয় দফায় আরো তিনটি আইটেমের ৯টি যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য একই প্রতিষ্ঠানকে ২০১৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। এই চুক্তি অনুযায়ীও যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করে আমমোক্তার গ্রহীতা কাজী আবু বক্কর সিদ্দিক মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের লিখিত প্যাডে তিনটি আইটেমের যন্ত্রপাতি সরবরাহের মিথ্যা চালান সিভিল সার্জন বরাবর দাখিল করেন।

এসব বিলেও স্টোরকিপার ফজলুল হক সার্ভে কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর ও সিল অন্য জায়গা থেকে স্ক্যান করে এনে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার করেন। যাতে প্রতিস্বাক্ষর করেন সিভিল সার্জন। এভাবে ধাপে ধাপে এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ১৮ কোটি ৮৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেয়া হয়। টেন্ডার পেয়ে মালামাল সরবরাহ না করেই ভ্যাট-ট্যাক্স বাদে ১৬ কোটি ৬১ লাখ টাকার বিল তুলে নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

বিষয়টি ফাঁস হলে তড়িঘড়ি ওই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার জাহের উদ্দিন সরকার বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করে তার প্রতিনিধির মাধ্যমে স্টোরকিপার একেএম ফজলুল হক ও আনোয়ার হোসেনের সহায়তায় সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন অফিসের ইপিআই স্টোরে এবং অফিসের বারান্দায় বেশ কিছু বাক্স বন্ধ অবস্থায় রাখার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু দুদকের তদন্তে সবই ধরা পড়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস