হাশরের ময়দানে বান্দার ওপর আল্লাহর অভিযোগ

হাশরের ময়দানে বান্দার ওপর আল্লাহর অভিযোগ

শহীদুল ইসলাম  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:০৮ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৫:১২ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

নানা ব্যস্ততার কারণে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সময় খুব একটা হয় না। তবে কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া অলিখিত একটি বিধান হিসেবে গণ্য হয়। 

রোগী দেখাকে কেন্দ্র করে কিছুটা বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি দেখা যায়। প্রথমত আমাদের সমাজে অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে না এলে খুব খারাপ হিসেবে বিষয়টিকে নেয়া হয়। রোগী নিজে এবং তার পরিবার এটাকে তাদের প্রতি অবহেলার শামিল মনে করে। ফলাফল হিসেবে অপর পক্ষের রোগীকেও কেউ দেখতে যেতে চায় না। অনেক ক্ষেত্রে একে কেন্দ্র করে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। অথচ এটাকে স্বাভাবিক ভাবেও নেয়া যেত।

এক সাহাবির গায়ে হলুদ রঙ্গের চিহ্ন দেখে রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করেন, তুমি বিবাহ করেছ? সাহাবি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ! রাসূল (সা.) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, বিবাহিতা নারী নাকি অবিবাহিতা? এভাবে একের পর এক রাসূল (সা.) এর পক্ষ থেকে প্রশ্ন ও সাহাবির উত্তর জারি থাকে। কথার ফাঁকে ফাঁকে রাসূল (সা.) সাহাবিকে বৈবাহিক জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের পরামর্শ দেন। রাসূল (সা.) ছিলেন সাহাবাদের সবচেয়ে কাছের আত্মীয়। সে আত্মীয়তার বন্ধন ছিল রক্তের আত্মীয়তার বন্ধনের চেয়ে মজবুত। রাসূলের (সা.) চেয়ে কাছের আত্মীয় সাহাবাদের অন্য কেউ ছিলেন না। সাহাবি বিবাহ করছেন আর সেই আত্মীয়কে দাওয়াত দিচ্ছেন না! কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়নি, দাওয়াত না পাওয়ায় ওই সাহাবির ওপর রাসূল (সা.) বেজায় চটেছেন। রাগে তার সঙ্গে কথাবার্তা ছেড়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ এর দ্বারা সবকিছুকে স্বাভাবিকভাবে নেয়ার শিক্ষা আমাদেরকে তিনি দিয়ে গেছেন। তাই আমাদের এ সব বিষয়কে স্বাভাবিক ভাবে নেয়া দরকার।

রোগীর সাক্ষাতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু করণীয় আছে। এ ক্ষেত্রে কিছু বাড়াবাড়ি আছে। অসুস্থতার কথা শুনেই রোগী দেখতে অনেকে রওয়ানা হয়ে যান। পরিবেশ, পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নেয়ার ফুরসত তাদের হয় না। এর দ্বারা রোগী সান্তনা না পেয়ে, তার পেরেশানি বাড়তে পারে কখনো কখনো। তাই উচিত হচ্ছে, দেখতে যাওয়ার আগে বিবেচনা করা, এর দ্বারা রোগী ও তার পরিবার কোনো চাপে পড়বে কিনা। যদি সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে দেখা-সাক্ষাতের জন্য উপযুক্ত কোনো সময় নির্বাচন করা। যেন রোগীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। আবার তার পরিবারের ওপর কোনো চাপও না পড়ে। ইসলামের এ সব বিষয় ‘আদাবুল মুআশারাত’ শিরোনামে আলোচনা করা হয়। এ বিষয়ের সারমর্ম হচ্ছে, কোনো ক্ষেত্রেই মানুষকে কষ্ট নয় বরং আরাম পৌঁছানোর চেষ্টা করা। রাসূল (সা.) এর হাদিসে যার উল্লেখ আছে এভাবে ‘খাঁটি মুসলমান ওই লোক যার জবান ও হাত দ্বারা অন্য কেউ কষ্ট পাায় না বরং সবাই তার থেকে নিরাপদ থাকে।’

আবার কেউ কেউ রোগী দেখার ক্ষেত্রে ছাড়াছাড়ির শিকার। তাদের কাছে অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়ার অর্থ হলো তার পরিবারকে ঝামেলায় ফেলা। সমবেদনা জ্ঞাপন, সাক্ষাতে তার খুঁজ-খবর নেয়া, সম্ভব হলে খেদমতের বিষয়ের গুরুত্ব একেবারেই গৌণ। ইসলামের নির্দেশনা এগুলোর মাঝামাঝি। ইসলামে রোগীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া খুবই ফজিলতের বিষয়। সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক থাকা যে, যাওয়া-আসা দ্বারা যেন রোগী ও তার পরিবারের ওপর চাপ না হয়। নিম্নে রাসূল (সা.) এর সুন্নার আলোকে এ বিষয়ে আলোচনা তোলে ধরছি।
   
আমাদের সমাজে রোগী ও তার আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়। তবে একবার দেখে আসলেই সব দায়িত্ব আদায় হয়ে যায় না। বরং এখানে মূল বিষয়ই হচ্ছে রোগীর সেবা করা। এটা সুস্থদের ওপর রোগীর হক। রাসূল (সা.) এর জবান থেকে এ বিষয়ে শব্দ ব্যবহার হয়েছে ‘ইয়াদাতুল মারিজ’। ‘ইয়াদাতুল মারিজ’ শুধু দেখা করার নাম নয়। দেখা করে সেবা করার নাম হলো ‘ইয়াদাতুল মারিজ’।

ইসলামে রোগীর সেবা করার গুরুত্ব: হাদিসে মুসলমান হিসেবে এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের কিছু হকের কথা আলোচনা হয়েছে। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের পাঁচটি হক। সালামের উত্তর দেয়া, অসুস্থ হলে সেবার জন্য যাওয়া, দাওয়াত দিলে কবুল করা, মৃত্যুর পর লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় পেছনে পেছনে যাওয়া ও হাছির জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহু’ বলা। কোনো কোনো বর্ণনায় নির্দেশ হিসেবে এসেছে। অর্থাৎ রাসূল (সা.) এগুলো করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

হাশরের ময়দানে বান্দার ওপর আল্লাহ তায়ালার অভিযোগ থাকবে যে বিষয়ে: হাদিসের বিশুদ্ধতম কিতাব সহিহ মুসলিম শরিফে হজরত আবু হুরাইরা (রা.) এর সূত্রে এ প্রসঙ্গে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। উক্ত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, হাশরের ময়দানে বান্দার ওপর অভিযোগ করে আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম কিন্তু তুমি আমার কোনো সেবা করোনি। বান্দা বলবে, আমি আপনার সেবা কীভাবে করবো? আপনি হলেন রাব্বুল আলামিল; সবকিছুর পালনকর্তা। আল্লাহ তায়ালা তখন বলবেন, তুমি জানতে না, আমার ওমুক বান্দা অসুস্থ ছিল? জেনেও তুমি তার সেবা করোনি। যদি তার সেবা করতে তাহলে আমাকে সেখানে পেতে। 

তারপর তিনি বলবেন, আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম, তোমরা আমাকে খাবার দাওনি।’ এভাবে একের পর এক অভিযোগ উত্থাপন করবেন। বান্দা সেগুলোর জবাব দেয়ার চেষ্টা করবেন। কিন্তু জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় শাস্তি ভোগ করতে হবে। রোগীর সেবা করাকে আল্লাহ তায়ালা নিজের সেবা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর দ্বারা আন্দাজ করা যায় যে, ইসলামে উক্ত বিষয়ের গুরুত্ব কত উপরে। হজরত আলী (রা.), রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, কেউ যদি সকালে রোগীর সেবা করে তাহলে সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেস্তা তার মাগফেরাতের জন্য দোয়া করতে থাকেন, সন্ধ্যায় এ কাজ করলে সকাল পর্যন্ত সমসংখ্যক ফেরেস্তা তার জন্য দোয়া করতে থাকেন। এই সেবার বদলায় আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি বাগান তৈরি করে দেন। (তিরমিজি এবং আবু দাউদ)। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, জাহান্নামকে তার থেকে সত্তর বছর দূরে সরিয়ে দেয়া হয়। (আবু দাউদ)। এ সংক্রান্ত আরো বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে, শিক্ষা গ্রহণ ও আমলের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।

সেবার সঙ্গে সঙ্গে সহযোগিতাও কাম্য: আমরা রোগী দেখতে গিয়ে বহু অর্থ খরচ করি। নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ কাজও ফেলে রেখে চলে যাই। তবে রোগীর চাহিদা বুঝে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারাই বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো লৌকিকতা না রেখে এক্ষেত্রে সরাসরি জিজ্ঞেস করা যায়, আপনার জরুরত পূরণ ও অর্থের ব্যবস্থা কীভাবে হচ্ছে? সামর্থ্যরে আলোকে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। রোগীর সেবা যে রকম গুরুত্বপূর্ণ, তাকে সহযোগিতা করা আরো গুরুত্বপূর্ণ। সহযোগিতা শুধু অর্থ দিয়ে নয় বরং অন্যান্য বিষয়েও সম্ভব হলে সহযোগিতা করা। ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ, ভালো মানের হাসপাতাল নির্বাচন, চিকিৎসার প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ইত্যাদিতেও সহযোগিতা হতে পারে।
 
সহিহ বোখারী ও মুসলিম শরিফে এ ব্যাপারে এক হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান, মুসলমানের ভাই। অতএব, কোনো মুসলমান, নিজের ভায়ের ওপর জুলুম ও জবরদস্তি করবে না। অন্যকে জুলুম করার সুযোগ করেও দেবে না। যে মুসলমান, তার ভায়ের প্রয়োজন পূরণ করবে আল্লাহ তায়ালা তার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন। আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন ওই বান্দার ওপর থেকে মুসিবতকে দূর করে দেবেন, যে দুনিয়াতে মানুষের বিপদ-আপদ দূর করার জন্য চেষ্টা করে।’

এ সব আলোচনা দ্বারাই প্রমাণিত হয়, ইসলাম কতটুকু মানবতাবাদী ধর্ম। ইসলামের এই শিক্ষা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিতে পারলে সমাজের চিত্রই পাল্টে যাবে। ডাক্তারা বর্তমানে এ সব কর্ম করে অনেক সওয়াবের ভাগীদার হতে পারেন। কিন্তু (আল্লাহ না করুন) অর্থের কারণে যদি ডাক্তারা চিকিৎসা থেকে বিরত থাকেন। আর এই অবহেলার কারণে একজন রোগী মারা যান। তাহলে অবশ্যই হাশরের ময়দানে আল্লাহ তায়ালা বলবেন ‘আমি অসুস্থ ছিলাম, কিন্তু তোমরা অর্থের লোভে আমার চিকিৎসা করোনি।’ তখন আমাদের জবাব দেয়ার মতো কোনো বিষয় থাকবে না।

রোগী দেখতে যাওয়ার সময় করণীয় কিছু বিষয়: রোগী দেখতে যাওয়া, তার সেবা করা অবশ্যই অনেক সওয়াবের কাজ। তবে ফিকহের একটি মূলনীতি হচ্ছে ‘ক্ষতিকে দফা করা অগ্রগণ্য লাভ কামানোর চেয়ে।’ অর্থাৎ তার উপকার করতে গিয়ে যেন আমার দ্বারা কোনো ক্ষতি না হয়। চিকিৎসা শাস্ত্রের আলোকে যদি রোগীর সঙ্গে সাক্ষাতের দ্বারা তা ক্ষতি হয় তাহলে অবশ্যই তা থেকে বিরত থাকবো। নিজের ময়লা হাত বা শরীর দ্বারা যদি রোগীর ক্ষতি হয় তাহলে তাকে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকবো। এই সবকিছুর দলিল হচ্ছে পূর্বোক্ত মূলনীতি। তাছাড়া রোগীর সঙ্গে সাক্ষাতে সময় বেশি নিবো না।

ইমাম বাইহাকী (রা.) রাসূল (সা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, রোগীর সঙ্গে সাক্ষাতের উত্তম পদ্ধতি হলো সময় কম ব্যয় করা। রোগীর কষ্ট হওয়ায় তার কাছে উচ্চ আওয়াজে কথা না বলা। রাসূল (সা.) শেষবার যখন অসুস্থ হলেন, সাহাবায়ে কেরামের মাঝে একটা বিরোধ নিয়ে উচ্চ আওয়াজে কথা হচ্ছিল। রাসূল (সা.) তখন বলেন, ‘তোমরা আমার কাছ থেকে চলে যাও।’ (সহহি মুসলিম)।

সহযোগিতা ও দেখা সাক্ষাতের পাশাপাশি দোয়া করা। সাধারণ দোয়া তো আছেই। বিভিন্ন রোগ থেকে হেফাজত, মুক্তির জন্য হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলোও পাঠ করা। রোগীর সামনে দুশ্চিন্তা উদ্রেগকারী কোনো কথা না বলা। বরং উৎসাহ ও সবরের বিষয় আলোচনা করা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে