হালদা রক্ষা ও রেকর্ড ডিম সংগ্রহের পেছনের গল্প

হালদা রক্ষা ও রেকর্ড ডিম সংগ্রহের পেছনের গল্প

হাসিবুল ইসলাম, চট্টগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:১২ ২৪ মে ২০২০   আপডেট: ২২:০৯ ২৪ মে ২০২০

হালদা নদীতে মাছের ডিম সংগ্রহ

হালদা নদীতে মাছের ডিম সংগ্রহ

এক সময়ের অবহেলিত ও পরিত্যক্ত নদী চট্টগ্রামের হালদা। অসাধুরা লুটেপুটে খেত এ নদীকে। ময়লা-আবর্জনায় পূর্ণ থাকতো হালদা। কিন্তু নদীর প্রতি ভালবাসা থেকে হালদাকে রক্ষার শপথ নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া।

হালদা নদী রক্ষায় ২০ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এ গবেষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শেষে প্রতিদিনই কাজ করেছেন হালদা নিয়ে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে করেছেন গবেষণা। হাতে নিয়েছেন নানান কার্যক্রম। এ নদী রক্ষায় সব শ্রেণীপেশার মানুষকে নিয়ে ২০০৭ সালে গঠন করেছেন ‘হালদা নদী রক্ষা কমিটি’। এ নদী নিয়ে তৈরি করেছেন ভিডিও ডকুমেন্টারি।

পরিবেশ রক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন হালদা পাড়ের ছেলে অধ্যাপক কিবরিয়া। এ কারণে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। হালদা পাড়ের জেলেদের নিয়েও তৈরি করেছেন ডকুমেন্টারি। যাতে তারা সহজে হালদা নদীর গুরুত্ব বুঝতে পারেন। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস প্রজজন কেন্দ্র হালদা নদী রক্ষায় ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন 'হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি'।

অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, কারখানা বন্ধ করে দূষণ ঠেকানো, বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা, মানিকছড়ি পাহাড়ে তামাক চাষ বন্ধ করা, বছরব্যাপী চোরাশিকারি ও বালু খেকোদের তৎপরতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া, বর্তমান লকডাউনের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক থাকায় এ সুফল এসেছে।

খাগড়াছড়ির রামগড় পাহাড় থেকে উৎপত্তি হওয়া হালদা নদীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৭ মার্চ ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ ঘোষণা করেছে সরকার।

হালদা নদী থেকে এবার রেকর্ড পরিমাণ ডিম সংগ্রহের পেছনে চট্টগ্রামের ডিসি ইলিয়াস হোসাইনের ভুমিকাও অনন্য। তার নির্দেশে  ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই হাটহাজারীর ইউএনও রুহুল আমিনের তত্ত্বাবধানে হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নানাবিধ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাঠ প্রশাসন, গবেষক, স্থানীয়দের সমন্বিত উদ্যোগেই হালদা নদী থেকে ডিম আহরণে এ বছর রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।

হালদা নদীতে মাছের ডিম সংগ্রহ

জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের গৃহিত পদক্ষেপ
হালদার দূষণ রোধ এবং মাছ ও জীব বৈচিত্র রক্ষায় তড়িৎ পদক্ষেপের মাধ্যমে ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল ফার্নেস তেলের ছড়িয়ে পড়া রোধে ডিসি ইলিয়াস হোসেনের পরামর্শে আড়াই কিলোমিটার খালের মধ্যে ১২টি বাঁধ নির্মাণ করেন হাটহাজারীর ইউএনও। কাজ করেছেন টানা পাঁচ দিন। প্রায় শতভাগ তেল অপসারণ করা হয়। ফলে হালদা নদী ভয়াবহ দূষণ থেকে রক্ষা পায়।

হালদা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হাটহাজারী পৌর এলাকার ‘কামাল পাড়া খালের’ মুখে লোহার গ্রীল বসানো হয়। সেখানকার ময়লা-আবর্জনা প্রতি সপ্তাহে পরিষ্কার করা হয়। এখন আর পৌর এলাকার বিভিন্ন নালা-নর্দমা থেকে আসা ময়লা-আবর্জনা পড়ছে না হালদা নদীতে। হালদার জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে প্রশাসন কঠোর মনিটরিং করেছে।

নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহার ও বিষ দিয়ে মা মাছ শিকার ও বালু তোলা নিয়ে ইউএনও রুহুল আমিনের দেয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এশিয়ান পেপার মিল ও ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ করে দেয় পরিবেশ অধিদফতর। ২০১৯ সালে ১০৯ বার হালদা নদীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হয়েছে। এক বছরে হালদা থেকে দুই লাখ ২১ হাজার মিটার মা মাছ শিকারের ঘেরা জাল উদ্ধার করা হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে ৯টি ড্রেজার, ১৫টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা, সাড়ে তিন কিলোমিটার বালু তোলার পাইপ। উদ্ধার করা হয়েছে এক লাখ ১৫ হাজার ঘনফুট বালু।

হাটহাজারীর ইউএনও মো. রুহুল আমিন ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, দেড় বছর ধরে হালদায় টানা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় গতবারের চেয়ে বেশি ডিম পাওয়া গেছে। আমাদের এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। আশা করি আগামাী বছর আরো ভালো সুফল আসবে।

হালদা নদীতে পাওয়া মাছের ডিম

পিকেএসএফ-আইডিএফ’র আন্তরিক প্রচেষ্টা
আশপাশের কলকারখানার বর্জ্যের দূষণ, মা মাছ শিকার, বালু তোলা, উজানে তামাক চাষ, নদীতে রাবার ডেম ও শাখা নদীতে স্লুইসগেট নির্মাণের কারণে ২০১৬ সালে হালদা নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। ওই অবস্থা থেকে হালদাকে উদ্ধারের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক মুখ্য সচিব ও পিকেএসএফ’র তৎকালীন এমডি আবদুল করিম পিকেএসএফ ও আইডিএফ’র মাধ্যমে ওই বছর হালদা পাড়ের বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে মা মাছ রক্ষা ও হালদাকে দূষণমুক্ত করার প্রকল্প হাতে নেন। সে প্রকল্পের সুফলই এখন ভোগ করছে মানুষ।

জেলা মৎস্য বিভাগ, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে হালদার মা মাছ সংরক্ষণ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে প্রকল্প থেকে হালদার দুই পাড়ে ৪০ জন (এক পাড়ে ২০ জন করে) স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, একটি করে স্পিডবোট, ট্রলার ও সোলার বোট সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে রেণু উৎপাদনের জন্য ১৫৭টি মাটির কূপ খনন করা হয়েছে। এছাড়া সেমিনার, তামাক চাষিদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, বিষমুক্ত চাষের উপকরণের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, হালদা নদী থেকে এ বছর রেকর্ড ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। গত ১২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ও গত বছরের প্রায় চারগুণ বেশি। ২৮০টি নৌকায় ৬১৫ জন মানুষ সাড়ে সাত ঘণ্টায় এসব ডিম সংগ্রহ করেছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর/আরএম