হারানো সুর

হারানো সুর

অনুবাদ গল্প ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৩২ ১১ এপ্রিল ২০২০  

ছবি: অন্তর্জাল

ছবি: অন্তর্জাল

প্রচন্ড গরমের রাত। এমনই গরম যে, ডিমকে হাফ-বয়েল করে ফেলা সম্ভব।

জে’র বারের ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এসি’র শীতলতা আমাকে স্পর্শ করলো। সিগারেট, হুইস্কি, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, মানুষের বগলের দুর্গন্ধ এবং অপরিচ্ছন্নতার কারণে বিদঘুটে গন্ধ ছড়িয়ে আছে কক্ষটিতে। কিছুটা বাসী কেকের গন্ধের মত।

প্রতিদিন যেখানে বসি, আজও সেখানেই বসলাম। কক্ষটির শেষপ্রান্তে। অতঃপর দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চারপাশের সবকিছু করতে লাগলাম। অদ্ভূত পোশাক কয়েকজন ফরাসী জাহাজী ও দুটো মেয়ে ছিল সেখানে। আর ছিল এক তরুণ দম্পত্তি। বিশের ঘরে তাদের বয়স। আর কেউ না।

র‍্যাট (Rat) এর টিকিটিও দেখা যাচ্ছিল না। আমি একটা কর্ন বিফ স্যান্ডউইচ ও বিয়ারের অর্ডার দিলাম। হাতের বইটাকে চোখের সামনে মেলে ধরলাম। এবং চেয়ারে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম।

দশ মিনিট পর, বছর তিরিশের একজন মহিলা জমকালো পোশাক পরিহিত অবস্থায় বারে প্রবেশ করল। তার স্তন দ্রাক্ষা ফলের মতো ঝুলছিল। আমার থেকে দুই আসন দূরে অবস্থান নিয়ে সে পুরো কক্ষকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। ঠিক যেমনটা আমি করেছিলাম। একটা গিমলেটের (Gimlet) অর্ডার দিল এবং বিয়ারার ড্রিঙ্ক সার্ভ করার পর তাতে একটা চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর পার্শ্ববর্তী পে-ফোনের দিকে হেঁটে গেল এবং কাউকে কল করল। আমার কাছে মনে হচ্ছিল সে অনন্তকাল ধরে কথা বলছে। কথা শেষ হবার পর পার্সটা হাতে নিয়ে টয়লেটের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।

পুরো ব্যাপারটাকে মহিলা পরবর্তী ৪০ মিনিটের ভেতরে তিন বার পুনরাবৃত্তি করল। Gimlet, ফোন কল করা, পার্স, টয়লেট।
বার্টেন্ডার জে আমার কাছে আসল।

“এভাবেই মহিলা তার পুরো সময় পার করবে,” সে বিড়বিড় করে বললো।

তার চোখে-মুখে বিরক্তি। জে চাইনিজ হলেও আমার চেয়ে অনেক সুন্দর জাপানিজ কথোপকথন পারে।

মহিলা টয়লেট থেকে তৃতীয় বার প্রত্যাবর্তন করল এবং কক্ষের চারদিকে তাকাতে লাগল। তারপর আমার পাশের সীটে এসে বসল।

“আমার লজ্জা করছে,” সে নীচুস্বরে আমাকে বলল, “কিন্তু তারপরেও বলতে বাধ্য হচ্ছি। তুমি কি আমাকে এই নোটটা পরিবর্তন করে কিছু ইয়েন দিতে পার?”

আমি পকেটে হাত ঢুকিয়ে সবগুলো ইয়েন বের করলাম। সর্বসাকুল্যে ১৩টা ১০ ইয়েনের মুদ্রা ছিলো।

“তুমি খুবই ভাল ছেলে। এই ভাংতির জন্যে বার্টেন্ডারকে আরেকটা বিল করে দিতে বললে সে ক্ষেপে যেত এবং আমার দিকে কটমট করে তাকাত।”

“সমস্যা নেই। খুচরা ইয়েনগুলো তোমাকে দিতে পেরে আমি হাল্কা বোধ করছি। ধন্যবাদ।”

মৃদু হেসে সে বার থেকে বেরিয়ে গেল। পুনরায় ফোনের দিকে।

আমার বই পড়তে ভালো লাগছিল না। জে’কে দিয়ে পোর্টেবল টিভি সেটটা কাউন্টারের ওপরে স্থাপন করে নিলাম এবং একটা বিয়ার পান করতে করতে বেইসবল খেলা দেখতে বসে গেলাম। চতুর্থ ইনিংসের চূড়ান্ত পর্যায় চলছিল। কিন্ত এই সময়েই দুইজন পিচার (Pitcher) হোম রান সহ ছয়টি হিট ছেড়ে দিল এবং একজন আউটফিল্ডার পড়ে গেল। অতিরিক্ত চাপের কারণে।

নতুন পিচার আগমনের পূর্বে মোট ছয়টা বিজ্ঞাপন দেখানো হলো। বিয়ার, লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ভিটামিন, একটা উড়োজাহাজ, পটেটো চিপস এবং স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর।

যে জাহাজীর সঙ্গে কোন মেয়ে ছিল না, সে আমার পেছনে এসে দাঁড়ালো। তার হাতে বিয়ারের গ্লাস।

“কি দেখছো তুমি?” সে ফ্রেঞ্চ ভাষায় আমাকে জিজ্ঞেস করলো।

“বেইস বল,” আমি ইংরেজীতে উত্তর দিলাম।

“বেইস বল?”

আমি ভদ্রভাবে খেলার নিয়মকানুনগুলো তাকে বললাম। একজন বল ছুঁড়ে মারে। অন্যজন তার হাতের স্টিক দিয়ে বলটিকে আঘাত করার চেষ্টা করে। সফল হলে আঘাতকারী এক পয়েন্ট বা এক রান পায়।

জাহাজী লোকটা পাঁচ মিনিট ধরে খেলাটা দেখল। পুনরায় কমার্শিয়াল শুরু হতেই আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “এখানকার কেউই Johnny Hallyday-র গানগুলো শুনছে না কেন?”

“কারণ তারা কেউই তাকে পছন্দ করে না,” আমার সহজ উত্তর।

“তাহলে কোন ফ্রেঞ্চ গায়কের গান এখানকার লোকেরা পছন্দ করে?”

“Adamo.”

“সেতো বেলজিয়ান।”

“ঠিক আছে, সেক্ষেত্রে এই গায়কের নাম Michel Polanareff।”

“Merde”, (অর্থাৎ Shit) উচ্চারণ করে সে তার নিজের টেবিলে ফিরে গেল।

পঞ্চম ইনিংসের চুড়ান্ত পর্বের সময়ে সেই মহিলা ফিরে আসল।

“ধন্যবাদ,” সে বলল, “তোমার উপকারের প্রতিদান হিসেবে আমি তোমাকে একটা ড্রিঙ্ক কিনে দিতে চাই।”

“প্রয়োজন নেই।”

“অবশ্যই আছে। আমি হলাম সেই মেয়ে, যে কিছু পেলে তার প্রতিদান দিতে জানে। ভালো বা মন্দ, যাই হোক না কেন।”

আমি মৃদু হাসি দিয়ে তাকে থামানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু তা কাজে না দেয়াতে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম। মহিলা আঙুল তুলে জে’কে ডাকলেন। আমার জন্যে একটা বিয়ার এবং নিজের জন্যে আরেকটা Gimlet অর্ডার দিল। অর্ডার নিয়ে জে তিনবার মাথা নেড়ে কাউন্টারের পেছনে উধাও হয়ে গেল।

“মনে হচ্ছে আমার বন্ধু আজ আমাকে ফাঁকি দিয়েছে। তোমারও কি একই অবস্থা?”

“মনে হচ্ছে।”

“সে কি কোন মেয়ে?”

“না, সে একটা ছেলে।”

“তাহলে আমরা দুজনেই একই তরীর যাত্রী। আস, কিছুক্ষণ আমরা গল্প করি।”

আমি মাথা নাড়ালাম।

“বল তো, আমাকে দেখতে কত বছর বয়সী বলে মনে হয়?”

“আটাশ বছর।”

“কৌতুক নয়, সিরিয়াসলি বল।”

“সেই ক্ষেত্রে ছাব্বিশ।”

“কি যা তা বলছো? তবে তুমি মানুষ হিসেবে ভালো,” সে হাসতে হাসতে বলল। “আমাকে কি অবিবাহিতা মনে হয়? নাকি আমার স্বামী আছে?”

“সঠিক বলতে পারলে কি আমি পুরস্কার পাব?”

“অবশ্যই?”

“ঠিক আছে। আমার ধারণা তুমি বিবাহিতা।”

“তুমি অর্ধেক সঠিক। গতমাসে আমি ডিভোর্স দিয়েছি। তুমি কি কখনও কোন ডিভোর্সীর সাথে কথা বলেছো?”

“না, তবে কম বুদ্ধির এক গাভীর সাথে আমার একবার সাক্ষাৎ হয়েছিল।”

“সত্যিই তাই? কোথায়?”

“আমাদের স্কুলের ল্যাবে। আমরা পাঁচজন ছাত্র মিলে ওটাকে ক্লাসের ভেতরে ঢুকিয়েছিলাম।”

মহিলা প্রাণ খুলে হাসল।

“তার মানে তুমি কলেজে পড়?”

“হ্যা।”

“আমিও একসময়ে কলেজে পড়তাম। ১৯৬০ সালের দিকে। সেগুলো আসলেই আনন্দের দিন ছিল।”

“কেমন?”

Gimlet-এ এক চুমুক দিয়ে সে হেসে উঠল। উচ্চকিতভাবে। তারপর হঠাৎ কিছুর কথা মনে আসায় তার হাতঘড়ির দিকে তাকাল।

“আরেকটা কল করতে হবে আমাকে,” সে বলল, দাঁড়িয়ে যেতে যেতে। হাতে পার্স।

আমার উত্তর না পাওয়া প্রশ্নটা বাতাসের ভেতরে ঘুরতে থাকল। সে চলে যাবার পর।

আমি বিয়ারের অর্ধেক পান করলাম এবং জে’কে বিল দিতে বললাম।

“এতো তাড়তাড়ি চলে যাচ্ছ?” জে বললো।

“ঠিক।”

“নিশ্চয়ই সেই বয়স্ক মহিলার কাছে নয়।”

“বয়সের সাথে যাওয়া, না যাওয়ার সম্পর্ক নেই। Rat আসলে ওকে আমার কথা জানিও।”

আমি যখন বার হতে বের হচ্ছিলাম, মহিলা চতুর্থ বারের জন্যে টয়লেটে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

ঘরে ফেরার পথে আমি চমৎকৃত হলাম আবিষ্কার করে যে, আমি কারের ভেতরে শিস বাজাচ্ছি। আপন মনে।

সুরটা আমি ইতিপূর্বে কোথাও শুনেছিলাম। কিন্তু কোথায় তা মনে করতে পারলাম না। খুবই পুরানো গানের সুর।

গাড়িটাকে থামালাম এবং রাস্তার রাস্তার ধারে বসে পড়লাম। রাতের আকাশের নীচে বসে সমুদ্রের দিকে তাকালাম। এবং সর্বাত্নকভাবে চেষ্টা করলাম গানটি মনে করার।

শেষ পর্যন্ত আমি মনে করতে সক্ষম হলাম। সেটা হল “The Micky Mouse Club Song।”

“Come along and sing a song and join the jamboree,
M-I-C, K-E-Y, M-O-U-S-E”

মনে হয়, আসলেই সেগুলো খুব আনন্দের দিনকাল ছিল।

(১৯৫৫ সনে এবিসি টেলিভিশনে প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হবার পর ওয়াল্ট ডিজনি’র ‘মিকি মাউস ক্লাব’ টেলিভিশন সিরিজটি শিশুদের ভেতরে প্রবল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এর কয়েকমাস পর ‘ডিজনিল্যান্ড পার্ক’ সকলের জন্যে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। উপরের গানটি ছিল সিরিজটির থিম সং।)

মূল: Hear The Wind Sing উপন্যাস (হারুকি মুরাকামি)

ভাবানুবাদ: মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই