হাদিসের আলোকে পবিত্র ঈদুল ফিতর

হাদিসের আলোকে পবিত্র ঈদুল ফিতর

হাবীবুল্লাহ সিরাজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:২৮ ২৪ মে ২০২০   আপডেট: ১৫:৩৫ ২৪ মে ২০২০

ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া উত্তম। এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া অন্য রাস্তা দিয়ে আসা মুস্তাহাব।

ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া উত্তম। এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া অন্য রাস্তা দিয়ে আসা মুস্তাহাব।

মুসলমানদের জন্য দু’টি ঈদ রয়েছে। একটি হলো ঈদুল ফিতর অন্যটি হলো ঈদুল আজহা। ইসলামি শরীয়তে এ দু’টি ঈদের কথাই রয়েছে। এ দু’টি ছাড়া ইসলাম ধর্মে তৃতীয় কোনো ঈদ নেই।  

ঈদ সম্পর্কিত বহু হাদিস রয়েছে। তন্মধ্যে বিষয়বস্তুসহ কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করছি।

ঈদের দিনের প্রথম কাজ:

عَنِ الْبَرَاءِ، قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ فَقَالَ ‏ "‏ إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ مِنْ يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نُصَلِّيَ، ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ، فَمَنْ فَعَلَ فَقَدْ أَصَابَ سُنَّتَنَا ‏"‏‏.‏

হজরত বারা ইবনে আযেব রাযি. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খুতবা দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, আমাদের আজকের এ দিনে আমরা যে কাজ প্রথম শুরু করব, তা হলো সালাত আদায় করা। অতঃপর ফিরে আসব এবং কোরবানি করব। তাই যে এ রকম করে সে আমাদের রীতি সঠিকভাবে মান্য করল। (সহিহ বুখারি : ৯৫১) হাদিসটিতে যদিও কোরবানির কথা আছে। তবে এই হাদিসটি উভয় ঈদের জন্য প্রযোজ্য বলেছেন ফুকাহায়ে কেরাম।
 
ঈদ উপলক্ষ্যে সুন্দর পোশাক পরিধান করা:

سَالِمُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ، قَالَ أَخَذَ عُمَرُ جُبَّةً مِنْ إِسْتَبْرَقٍ تُبَاعُ فِي السُّوقِ، فَأَخَذَهَا فَأَتَى رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ ابْتَعْ هَذِهِ تَجَمَّلْ بِهَا لِلْعِيدِ وَالْوُفُودِ‏.‏

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত, বাজারে বিক্রি হচ্ছিল এমন একটি রেশমী জুব্বা নিয়ে ‘ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এটি ক্রয় করে নিন। ‘ঈদের সময় এবং প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এটি দিয়ে নিজেকে সজ্জিত করবেন। (সহিহ বুখারি : ৯৪৮)।

তবে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, যার যার সামর্থ্যানুযায়ী ঈদের দিন নতুন ও ভালোমানের পোশাক পরিধান করবে। 

ঈদগাহে যাবার আগে খাবার গ্রহণ করা:
 
عَنْ أَنَسٍ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لاَ يَغْدُو يَوْمَ الْفِطْرِ حَتَّى يَأْكُلَ تَمَرَاتٍ‏.‏ وَقَالَ مُرَجَّى بْنُ رَجَاءٍ حَدَّثَنِي عُبَيْدُ اللَّهِ قَالَ حَدَّثَنِي أَنَسٌ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَيَأْكُلُهُنَّ وِتْرًا‏.‏

হজরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। অপর এক বর্ণনায় আনাস রাযি. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি তা বিজোড় সংখ্যায় খেতেন।

نْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَخْرُجُ يَوْمَ الْفِطْرِ وَالأَضْحَى إِلَى الْمُصَلَّى، فَأَوَّلُ شَىْءٍ يَبْدَأُ بِهِ الصَّلاَةُ ثُمَّ يَنْصَرِفُ، فَيَقُومُ مُقَابِلَ النَّاسِ، وَالنَّاسُ جُلُوسٌ عَلَى صُفُوفِهِمْ، فَيَعِظُهُمْ وَيُوصِيهِمْ وَيَأْمُرُهُمْ، فَإِنْ كَانَ يُرِيدُ أَنْ يَقْطَعَ بَعْثًا قَطَعَهُ، أَوْ يَأْمُرَ بِشَىْءٍ أَمَرَ بِهِ، ثُمَّ يَنْصَرِفُ‏.‏ قَالَ أَبُو سَعِيدٍ فَلَمْ يَزَلِ النَّاسُ عَلَى ذَلِكَ حَتَّى خَرَجْتُ مَعَ مَرْوَانَ وَهْوَ أَمِيرُ الْمَدِينَةِ فِي أَضْحًى أَوْ فِطْرٍ، فَلَمَّا أَتَيْنَا الْمُصَلَّى إِذَا مِنْبَرٌ بَنَاهُ كَثِيرُ بْنُ الصَّلْتِ، فَإِذَا مَرْوَانُ يُرِيدُ أَنْ يَرْتَقِيَهُ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ، فَجَبَذْتُ بِثَوْبِهِ فَجَبَذَنِي فَارْتَفَعَ، فَخَطَبَ قَبْلَ الصَّلاَةِ، فَقُلْتُ لَهُ غَيَّرْتُمْ وَاللَّهِ‏.‏ فَقَالَ أَبَا سَعِيدٍ، قَدْ ذَهَبَ مَا تَعْلَمُ‏.‏ فَقُلْتُ مَا أَعْلَمُ وَاللَّهِ خَيْرٌ مِمَّا لاَ أَعْلَمُ‏.‏ فَقَالَ إِنَّ النَّاسَ لَمْ يَكُونُوا يَجْلِسُونَ لَنَا بَعْدَ الصَّلاَةِ فَجَعَلْتُهَا قَبْلَ الصَّلاَةِ

হজরত আবু সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ঈদুল ফিতর ও ‘ঈদুল আজহার দিন ‘ঈদমাঠে যেতেন এবং সেখানে তিনি প্রথম যে কাজ শুরু করতেন তা হলো সালাত। আর সালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন এবং তারা তাদের কাতারে বসে থাকতেন। তিনি তাদের নসীহত করতেন, উপদেশ দিতেন এবং নির্দেশ দান করতেন। যদি তিনি কোনো সেনাদল পাঠাবার ইচ্ছা করতেন, তবে তাদের আলাদা করে নিতেন। অথবা যদি কোনো বিষয়ে নির্দেশ জারি করার ইচ্ছা করতেন তবে তা জারি করতেন। অতঃপর তিনি ফিরে যেতেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরী বলেন, লোকেরা বরাবর এ নিয়মই অনুসরণ করে আসছিল। অবশেষে যখন মারওয়ান মদিনার আমির হলেন, তখন ‘ঈদুল আজহা বা ‘ঈদুল ফিতরের উদ্দেশ্যে আমি তার সঙ্গে বের হলাম। আমরা যখন ‘ঈদমাঠে পৌঁছলাম তখন সেখানে একটি মিম্বর দেখতে পেলাম, সেটি কাসির ইবনুল সালত রাযি. তৈরি করেছিলেন। মারওয়ান সালাত আদায়ের পূর্বেই এর ওপর আরোহণ করতে উদ্যত হলেন। আমি তাঁর কাপড় টেনে ধরলাম। কিন্তু তিনি কাপড় ছাড়িয়ে খুতবা দিলেন। আমি তাকে বললাম, আল্লাহর কসম! তোমরা (রাসূলের সুন্নত) পরিবর্তন করে ফেলেছ। সে বলল, হে আবু সাঈদ খুদরী! তোমরা যা জানতে, তা গত হয়ে গেছে। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি যা জানি, তা তার চেয়ে ভারো, যা আমি জানি না। সে তখন বলল, লোকজন সালাতের পর আমাদের জন্য বসে থাকে না, তাই ওটা সালাতের আগেই করেছি। (সহিহ বুখারি : ৯৫৬)

ঈদের দিন নারীদের প্রতি রাসূলের নির্দেশনা:

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ سَمِعْتُهُ يَقُولُ قَامَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ الْفِطْرِ، فَصَلَّى فَبَدَأَ بِالصَّلاَةِ ثُمَّ خَطَبَ، فَلَمَّا فَرَغَ نَزَلَ فَأَتَى النِّسَاءَ، فَذَكَّرَهُنَّ وَهْوَ يَتَوَكَّأُ عَلَى يَدِ بِلاَلٍ وَبِلاَلٌ بَاسِطٌ ثَوْبَهُ، يُلْقِي فِيهِ النِّسَاءُ الصَّدَقَةَ‏.‏ قُلْتُ لِعَطَاءٍ زَكَاةَ يَوْمِ الْفِطْرِ قَالَ لاَ وَلَكِنْ صَدَقَةً يَتَصَدَّقْنَ حِينَئِذٍ، تُلْقِي فَتَخَهَا وَيُلْقِينَ‏.‏ قُلْتُ أَتُرَى حَقًّا عَلَى الإِمَامِ ذَلِكَ وَيُذَكِّرُهُنَّ قَالَ إِنَّهُ لَحَقٌّ عَلَيْهِمْ، وَمَا لَهُمْ لاَ يَفْعَلُونَهُ

হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ঈদুল ফিতরের দিন দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলেন, পরে খুতবা দিলেন। খুতবা শেষে নেমে নারীদের নিকট আসলেন এবং তাঁদের নসীহত করলেন। তখন তিনি বিলাল রাযি. এর হাতের ওপর ভর দিয়ে ছিলেন এবং বিলাল রাযি. তাঁর কাপড় প্রসারিত করে ধরলেন। এতে নারীরা দান সামগ্রী ফেলতে লাগলেন আমি (ইবনু জুরায়েজ) আত্বা (রহ.)- কে জিজ্ঞেস করলাম, এ কি ‘ঈদুল ফিতরের সদকা? তিনি বললেন না, বরং এ সাধারণ সদকা যা তাঁরা ওই সময় দিচ্ছিলেন। কোনো নারী তার আংটি দান করলে অন্যান্য নারীরাও তাদের আংটি দান করতে লাগলেন। আমি আতা (রহ.)-কে (আবার), জিজ্ঞেস করলাম, নারীদেরকে উপদেশ দেয়া কি ইমামের জন্য জরুরি? তিনি বললেন, অবশ্যই, তাদের ওপর তা জরুরি। তাঁদের (অর্থাৎ ইমামদের) কি হয়েছে যে, তাঁরা তা করবেন না?

এরূপভাবে ঈদের সব বিষয়গুলো হাদিসের পাতায় সুন্দর করে বর্ণিত হয়েছে। এখন আমরা ঈদের দিনের বিশেষ কতগুলো সুন্নত আছে- সেগুলো আমরা আলোচনা করবো।

ঈদের দিনের সুন্নত ও মুস্তাহাব-

১. মেসেওয়াক করা 
২. গোসল করা 
৩. সুগন্ধি ব্যবহার করা 
৪. কিছু খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া (বেজোড় সংখ্যা ও মিষ্টিদ্রব্য খাওয়া) 
৫. ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া উত্তম। এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া অন্য রাস্তা দিয়ে আসা মুস্তাহাব। 
৬. ঈদগাহে যাওয়ার পথে নিচু স্বরে তাকবির বলা।  
৭. সাধ্যমতো উত্তম পোশাক পরধিান করা মুস্তাহাব।
৮. নামাজে জন্য ঈদগাহে যাওয়ার আগে সদকায়ে ফিতর আদায় করা। এটি ঈদের দিনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। 
৯. ঈদের দিনে চেহারায় হাসি খুশি ভাব প্রকাশ করা, কারো সঙ্গে দেখা হলে আনন্দ বিনিময় করা। কোলাকুলি করা। 
১০. আনন্দ-অভিবাদন বিনিময় করা। (ফাতাওয়া শামি : ১/৫৫৬, ৫৫৭, ৫৫৮; হেদায়া : ২/৭১; বুখারি : ১/১৩০, ইবনে মাজাহ : ৯২)।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে