90843 হাত-পা বেঁধে হার্ডিঞ্জ ব্রিজে শুইয়ে দেয়
Best Electronics

হাত-পা বেঁধে হার্ডিঞ্জ ব্রিজে শুইয়ে দেয়

আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পাবনা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:০২ ১৪ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ১৭:০৮ ১৫ মার্চ ২০১৯

১৯৭১ সালের ৯ অক্টোবর রাতে নতুন আদেশে তাকে আবার গ্রেফতার করে পাকিস্তানি মিলিটারি। নিয়ে যাওয়া হয় পাবনার পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজে। চোখ-হাত বাঁধা ছিল। পিপাসা ছিল বেশ।পানি চেয়েছিলেন তিনি। খানসেনারা তাকে হা করতে বলে। আর হা করতে গেলেই জিহবায় ঘুরিকাঘাত করে। গাল বেয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। এভাবেই তাকে নিয়া আসা হয় ব্রিজে। ব্রিজের ঠিক মাঝখানেই চিত করে শুইয়ে রাখা হয়। কয়েকজন খানসেনা তাকে ঘিরে রাখে। একজন খানসেনা তার বুকের উপর উঠে পড়ে। তবুও মনোবল হারাননি।

তিনি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পাবনা জেলার ডেপুটি কমান্ডার। পৈলানপুর মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেছেন। বাবা এস্কেন্দার আলী সেখ। মা ওলিমা খাতুন। একাত্তরে ১০ম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ১৬-১৭ বছর বয়সেই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন।এখন সত্তর বয়স। তিন ছেলে, তিন মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে সংসার। দেশ স্বাধীনের পর এখনো পৈলানপুরেই আছেন। এখানেই তার বাসভবন। 

আব্দুল লতিফ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, বিশ্বাস ছিল, বেঁচে যাব। তাই মরে গেছি এমন ভাব দেখালাম। চোখ বন্ধ করে পড়ে ছিলাম। একজন খানসেনা আরেকজনকে বলল- ছোড় দো ইয়ার, মর গিয়া। আমাকে নদীতে ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটা বোঝার সঙ্গে সঙ্গেই দুই পায়ের বুড়ো আঙুল এক করে গোড়ালি দুটো একটু ফাঁক করে রাখি। এই অবস্থা দেখে তারা হয়তো ভেবেছিল মরে যাওয়াতেই এমন বাঁকা অবস্থায় শক্ত হয়ে আছে। আমাকে ফেলে দেয় পদ্মার ১০০ ফুট নিচে। প্রথমে আমি পানির গভীরে চলে যাই। পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাকা দুই পা সোজা করে নেয়ায় একটু ঢিলা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চোখ আর হাতের বাঁধন খুলতে পারিনি।দুই পায়ের বাঁধন খুলে সাঁতরে নদীতে ভাসতে থাকি। বাঁচাও-বাঁচাও বলে চিৎকার করতে থাকি। এভাবে দাদাপুর ঘাটে চলে গিয়েছিলাম। চিৎকার শুনে একজন জেলেরা নৌকা নিয়ে টেনে তুলে। চোখের বাঁধন খুলে দেয়। রাত প্রায় শেষ। জিহবার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছিল। আমার অনুরোধে তারা দাদাপুরের মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার ওয়াসেক আলীর বাড়িতে পৌছে দেয়। ওখানে একদিন থাকি। একজন গ্রাম ডাক্তার দিয়ে আমাকে দেখানো হয়। ডাক্তার কি ওষুধ দিলেন, কিন্তু তখন আমি কিছুই খেতে পারছিলাম না। সারা শরীরও ফুলে ব্যাথা। আশ্রয়দাতাদের সেবায় সামান্য সুস্থ হওয়ার পর আমার বাড়ি আসি। 

সেময় পাবনায় থাকা নিরাপদ ছিল না। বাবা-মার সঙ্গে দেখা করে পরদিন রাতেই ভারতের উদ্দেশে চুয়াডাঙ্গার পথে রওনা দেই। চুয়াডাঙ্গা হয়ে কলকাতায় একটি হাসপাতালে ভর্তি হই। একটু সুস্থ হওয়ার পর যুদ্ধের প্রস্তুতি নেই। মনের মধ্যে একটাই চিন্তা- আমি তো মারাই গেছিলাম। এখন দেশের জন্য যা করব সেটাই প্রাপ্তি। ১৫ দিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে আবার চলে আসি পাবনায়। শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর ক্যাম্পে উঠলাম। এরপর মুক্তি বাহিনীর মেজর ইকবাল এর সঙ্গে চলে আসি রাণীনগরে। ২৫ জন মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হয়ে একের পর এক অপারেশনে পরিচালনা করি। মনে পড়ে, ভারতের আমার ভাই শহীদ আব্দুস সাত্তার লালু হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। ওখানে এক ডাক্তারের প্রশ্ন ছিল- আমি কিভাবে বেঁচে ছিলাম? বলেছিলাম- মাতৃভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি তাই বেঁচে আছি। 

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পুনরায় পাবনা শহর দখল করে। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারত চলে যান। প্রথমে কেচুয়াডাঙ্গা থেকে বালুরঘাট পরে বিহার প্রদেশের পানিহাটায় সামরিক ট্রেনিং নেন। আগস্টের ৮ তারিখ পাবনায় চলে আসেন। তখন পাকিস্তানের পক্ষে সক্রিয় জামায়াত ইসলামী, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ, পিডিপির নেতাকর্মীরা। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের দেখলেই ধরিয়ে দিচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পের খোঁজ নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে জানিয়ে দিচ্ছে।

তাদের হাতেই ধরা পড়েন আব্দুল লতিফ। পরে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় মিলিটারি ক্যাম্পে। অত্যাচারেও কোনো তথ্য বের করতে পারেনি তারা। 

১৯৭১ সালের ২১ আগস্ট আব্দুল লতিফের বাড়ি যান পাক মিলিটারিরা। তাকে সঙ্গেই রেখেছিলন। এসময় একজন খান সেনা জিজ্ঞেস করে- তুম এই আচ্ছা হায় না?
এই প্রশ্নের উত্তর কি হবে তিনি তখন বুঝতে পারেননি।
তখন আবার তাকে বলা হয় মুক্তিফৌজের কথা বলো, না হলে তোমার বাড়ি-ঘর সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিব।
তখন তিনি বলেন- আমি জানি না। ১২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মেজর মীর নেওয়াজ খোকন তার সামনেই বাড়িতে আগুন দেয়। পুড়ে যায় ঘর। এরপর পাকবাহিনীর ক্যাম্পে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
সনদপত্র দেখে প্রশ্ন করে- তুমি বক্সিং আচ্ছা।
আমি বলি- ছোটদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে প্রথম হয়েছিলাম।
১২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একজন বলে- হাম ভি এ রেজিমেন্টমে ফাস্ট হায়, তুম হামারা সাথ লড়ে গা?
তখন আমি একটু চিন্তা করলাম যে, আজ পাঁচদিন ধরে ওরা আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে মারধর করছে। ওর সঙ্গে বক্সিং খেলে ওকে যদি একটা মারি তাও আমার জীবন সার্থক। তাই বললাম-মওকা দেগা তো জরুর লড়ে গা।

এই কথা বলার পর তাহের সাহেব আমাকে ‘জরুর মওকা দেগা তুমকো’ বলে একজন খানসেনাকে ডেকে আমার হাত দুটো শক্ত করে বাঁধল। তারপর ঝড়ের মতো আমার বুকের উপর বক্সিং মেরে যেতে লাগলো। তখন আমি তাকে বললাম- মরদহ তো মরদ কা তরফ লড়িয়ে।

এ কথা শুনে মারা বন্ধ করে আবার প্রশ্ন শুরু করলো- মুক্তিফৌজ কোথায় এবং নাম দাও। আমি তখনও একই কথা বললাম কিন্তু ওই বর্বর দস্যুরা তবু আমাকে ছাড়লো না। মারতে শুরু করল। একটানা ঘন্টাখানেক আমার শরীরে এলোপাতাড়ি আঘাত করে যেতে থাকলো। অত্যাচার সহ্য সহ্য করতে না পেরে আমি যখন চলে মাটিতে পড়ে গেলাম।

তখন আমাকে দুজন খানসেনা ধরে একটি ঘরের মধ্যে নিয়ে রাখলো। এইভাবে আরো দুদিন আমার ওপর নির্যাতন চালালো। ২৩ সেপ্টেম্বর আমাকে ছেড়ে দেয়ার হুকুম দেয়। কিন্তু আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আরেকটি চালাকি করেছিলাম ওই পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে। আমি তখন মুক্তি নিতে অস্বীকার করি এবং অনুরোধ জানাই- বাইরে গেলে নকশাল ও বদর বাহিনীর লোকেরা ব্যক্তিগত আক্রোশে আমাকে মেরে ফেলবে। তাই রাতে থাকার আশ্রয় চাই। মনে হয় আমার এই চালাকিটুকু তারা বুঝতে পারেনি। তাই সেদিন আমাকে তারা থাকার অনুমতি দিয়েছিল। পাকবাহিনীর সঙ্গে থেকে যা দু-একটা খবর সংগ্রহ করতাম তা আমাদের মুক্তি ফৌজের কাছে পাঠাতে থাকি। এইভাবে আমি কৌশল করে চলতে লাগলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই চালাকি বেশিদিন করতে পারলাম না। কারণ পাকবাহিনীর আইবি আমার পেছনে লাগানো ছিল তা আমি বুঝতে পারিনি। 

জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় ১৯৬৭, ১৯৬৮, ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে পর পর এই চার বছর পাবনার যে কিশোর ছেলেটি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। কুশলী সাঁতারু হওয়ায় নিশ্চিত মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে আবার নেমেছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম

Best Electronics