Alexa হাজিরায় স্বাক্ষর করেই বেরিয়ে যান প্রধান শিক্ষক

হাজিরায় স্বাক্ষর করেই বেরিয়ে যান প্রধান শিক্ষক

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:২৪ ২০ অক্টোবর ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

চারজন শিক্ষক আর ১৬ শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে লালমনিরহাটের আদিতমারীর নামুড়ী সরকারি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে। তবে ক্লাসের সময় বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা মাঠে খেলছে। প্রধান শিক্ষক হাজিরায় স্বাক্ষর করেই বেরিয়ে গেছেন। বাকি তিন শিক্ষকের একজন অফিস কক্ষেই ঘুমাচ্ছেন অন্য দুইজন বাইরে আড্ডায় ব্যস্ত।

পলাশী ইউপির নামুড়ী গ্রামে ১৯৮৮ সালে নামুড়ী প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা। প্রতিষ্ঠার সময় পড়াশোনার মান ভাল থাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বৃদ্ধিও পায়। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্র নাথ সরকার শিয়ালুর একক আধিপত্যের কারণে ক্রমেই শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও পরিবেশ নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। আর তাই বাধ্য হয়ে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পাশের বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন।

শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা জানায়, কাগজ কলমে বিদ্যালয়ে ১৩৭ জন শিক্ষার্থীর কথা লেখা থাকলেও বাস্তবে মাত্র শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১৬ জন। বিদ্যালয়টির তৃতীয় শ্রেণিতে চারজন, চতুর্থ শ্রেণিতে চারজন ও পঞ্চম শ্রেণিতে আটজন মিলে মোট ১৬ শিক্ষার্থী।  

বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ভালো ব্যবস্থা না থাকলেও প্রধান শিক্ষক ক্ষমতা আর অবৈধ সুযোগ দিয়ে বিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রেশন করেন এবং স্ত্রী সুজাতা রানীকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন।

২০০২ সালে দ্বিতল ভবনের বরাদ্ধ নিয়ে ভবন তৈরি করেন। কিন্তু বিদ্যালয়ে নেই পাঠদানের কোনো সুষ্ঠু পরিবেশ। বাঁশ বাগানের ভেতর ও ধানক্ষেতের আইল দিয়ে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ। নেই মূল ফটক। তথ্যের ডিসপ্লেবোর্ড থাকলেও সেখানে নেই বিদ্যালয়ের কোন তথ্য। প্রবেশ পথেই বিপদজনক টয়লেটের খোলা ম্যানহোল। প্রায় প্রতিদিন সেখানে ঘটছে দুর্ঘটনা। সেদিকেও নজরদারি নেই।

২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণের পর তিন শিক্ষকের বদলি হলেও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্রনাথ সস্ত্রীক বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ফলে তাদের নিজস্ব নিয়মনীতিতেই চলে বিদ্যালয়ের পাঠদান। এমনকি বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখতে পাশের বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী এবং ভুয়া কিছু নাম দিয়ে শিক্ষার্থীর হাজিরা খাতা তৈরি করেছেন প্রধান শিক্ষক। আর সে অনুযায়ী ভোগ করেন যাবতীয় সুযোগ সুবিধা। 

তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা জানায়, রুটিন অনুযায়ী ক্লাস শুরুর দুই ঘন্টা পার হলেও ক্লাস হয় না। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও একই কথা জানান। এমনকি কিছুদিন পর বার্ষিক পরীক্ষা কিন্তু এখনো নিজের রোল বলতে পারেনি অনেক শিক্ষার্থীরা। রোল কল হয় না বলেই তারা তারা রোল জানে না।

কয়েকজন অভিভাবক জানান, প্রধান শিক্ষক ও তার স্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে চলে এ বিদ্যালয়টি। সবার বদলি হলেও তাদের বদলি হয় না। প্রভাবশালীদের সঙ্গে তার বেশ সখ্যতা থাকায় শিক্ষা অফিস ভুলেও এ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন না। ফলে নিজেদের গড়া নিয়মে চলে বিদ্যালয়। তাই উচ্চতর তদন্তের দাবি স্থানীয়দের।

প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা সহকারী শিক্ষক সুজাতা রানী ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আগের তুলনায় পাঠদান ভালো হলেও সড়কের অভাবে শিক্ষার্থীরা এই বিদ্যালয়ে আসতে চায় না। 

তিনি আরো জানান, বদলির চেষ্টা করেও তাকে বদলি করা হয়নি।

উপজেলা শিক্ষা অফিসের একজন কর্মচারী ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, এ বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলে প্রভাবশালীদের ফোন আসে। তাই কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না বা তারা নিতে পারেন না। পাশেই একাধিক বিদ্যালয় তবুও এটি অনুমোদন দেয়া ঠিক হয়নি। 

প্রধান শিক্ষক বীরেন্দ্র নাথ ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, বিদ্যালয়ে হাজিরা দিয়ে বিদ্যালয়ের কাজে শিক্ষা অফিসে ছিলেন। পাঠদানের মানের জন্য নয়, সড়কের অভাবে এখানে শিক্ষার্থী নেই বা আসতে চায় না। তবে এখানে ভুয়া শিক্ষার্থী নেই। তবে যারা অনুপস্থিত তারা সবাই পরিবারের সঙ্গে কাজের সন্ধানে এলাকার বাহিরে রয়েছে। 

তিনি বলেন, বাড়ির পাশে হলেও বদলির চেষ্টা করেছি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ বদলি না করায় একই চেয়ারে কাটছে প্রায় ৩১ বছর। এছাড়াও তিনি এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করতেও সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন।

আদিতমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এনএম শরীফুল ইসলাম খন্দকার ডেইলি বাংলাদেশকে জানান, বিদ্যালয়টির এমন করুণ পরিস্থিতি সম্পর্কে তার জানা নেই। পরিদর্শন করে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস