Alexa হাজার বছরের সাক্ষী চীনের মহাপ্রাচীর

হাজার বছরের সাক্ষী চীনের মহাপ্রাচীর

রুখসানা আক্তার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৩৪ ২ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১০:২৭ ৩ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

চীনের মহাপ্রাচীর বা দ্য গ্রেট ওয়াল অব চায়না!! বিস্ময়কর এই স্থাপত্যের কথা শুনেনি এমন মানুষ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। চীনে একে ডাকা হয় ‘ছাং ছং’ বা দীর্ঘ প্রাচীর নামে। দীর্ঘ এ প্রাচীরের সারির প্রায় পুরোটাই মাটি ও পাথর দিয়ে তৈরি। আক্রমণকারীদের দূরে রাখা এবং সামরিক অনুপ্রবেশ ঠেকানোই ছিল এ বিশাল প্রাচীর নির্মাণের উদ্দেশ্য। 

পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি হল চীনের এই মহাপ্রাচীর। এটি মানুষের হাতে তৈরি সবচেয়ে বড় স্থাপত্য। আজ আমরা পৃথিবীর এই সবচেয়ে দীর্ঘতম প্রাচীরটির ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা, অবকাঠামো ইত্যাদি সম্বন্ধে কিছুটা জানার চেষ্টা করব।

কেন এই প্রাচীর নির্মাণ করা হলো?

চীনের লোকেরা কেন এটি নির্মিত হয়েছিল তা জানার জন্য স্বাভাবিকভাবেই সবাই কৌতূহলী। তবে তার আগে বলুন তো আমরা কেন আমাদের বাড়ির পাশে দেয়াল দেই? এর সহজ উত্তর হলো আমাদের বাড়িতে না জানিয়ে কেউ প্রবেশ করতে পারে। নিজের সুরক্ষার স্বার্থে, আমরা যেমন বাড়ির চারপাশের দেয়াল দেই, ঠিক তেমনি চীনের লোকেরা প্রতিবেশী মঙ্গোল দস্যুদের হাত থেকে বাঁচার জন্য এই প্রাচীর নির্মাণ করেছিল।

নির্মাণের ইতিহাস

এই প্রাচীরটিকে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি প্রায় পাঁচ থেকে আট মিটার উঁচু এবং আট হাজার আটশ’ ৫২ কিলোমিটার লম্বা। প্রাচীরটির নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৭শ’ বছর আগে চিহলি-পুরোনো নাম পোহাই উপসাগরের কূলে শানসীকুয়ান থেকে। শেষ হয়েছিল কানসু প্রদেশের চিয়াকুমান নামক স্থানে। চীনের অনেক রাজবংশ এ প্রাচীর নির্মাণে অপূরণীয় ভূমিকা রেখেছেন।

প্রাচীর নির্মাণের উদ্দেশ্য কি সফল হয়েছিল?

প্রাচীরটি চীনের উত্তর সীমান্তের রাজ্য এবং রাজ্য সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ইউরোশিয়ান সীমান্ত থেকে যাযাবরদের আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য পূর্ব থেকে পশ্চিম সীমান্তে এটি নির্মাণ করা হয়। 

চীনের ইতিহাসে প্রায়শই দেখা যায় যে, ঐতিহাসিকরা প্রাচীরটিকে "১০ হাজার মাইল দীর্ঘ প্রাচীর" নামে অভিহিত করতেন। একই বক্তব্যটি ইতিহাসবিদ 'সিমা কিয়ান' এর বর্ণনায়ও দেখা যায়। যদিও ১০ হাজার সংখ্যাটি এর প্রকৃত দৈর্ঘ্যকে না বুঝিয়ে কতটা দূরত্বে তা বোঝার জন্য ব্যবহার করা হতো।

খ্রীষ্টের জন্মের পাচঁশত থেকে আটশত বছর আগেই চীনারা প্রাচীর নির্মাণের কলা কৌশল ভালোভাবেই রপ্ত করে নিয়েছিল। এই সময়ের মাঝে চীনের কিন, ঝাও, কিউ, ইয়ান এবং ঝংশান রাজ্য তাদের নিজস্ব সীমানা রক্ষার জন্য বিশাল দুর্গ তৈরি করেছিল। এই দুর্গগুলো রাজ্যের ছোট আক্রমণগুলো রোধ করার জন্য ব্যবহার করা হতো। সেই দিক থেকে চিন্তা করে বলা যায়, চীনের র্দীঘ এ প্রাচীরটি আসলে বেশ কিছু দুর্গের যোগফল।

কোন কোন রাজবংশ এ প্রাচীর নির্মাণ করেছিল?

কিন রাজ্যের রাজা ঝেং ২২১ খ্রীষ্ট পূর্বে তার শেষ শত্রুদেরও পরাজিত করে পুরো চীন জুড়ে প্রথম ‘কিন’ বংশের রাজত্ব স্থাপন করেন। তিনি কেন্দ্রীয় শাসন জোড়দার করতে বিভিন্ন রাজ্যের আগের নির্মিত দেয়ালগুলো, যেগুলো সেই রাজ্যকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছিল সেই দেয়ালগুলো ভাঙ্গার নির্দেশনা দেন। 

তবে উত্তর দিক থেকে জিয়াংনু গোষ্ঠির মানুষদের আক্রমণ থামানো যাচ্ছিল না। তাই তিনি এ আক্রমণের হাত থেকে রাজ্যকে রক্ষার জন্য অবশিষ্ট দুর্গগুলোকে সংযুক্ত করে নতুন দেয়াল নির্মাণের নির্দেশ দেন। এ দেয়াল নির্মাণের কাঁচামাল জোগাড় করা তখন বেশ কষ্টসাধ্য এক কাজ ছিল। তাই স্থানীয় যেসব কাঁচামাল পাওয়া যেত তাই দিয়েই কাজ চালানো হত। 

পরবর্তিতে হান, সুই সহ আরো অনেক রাজবংশ এই দেয়ালের সংস্কার, পুনর্নির্মাণ এবং বিস্তার ঘটায়। এ সবই করা হয়েছিল উত্তর দিক থেকে আসা যাযাবর বা, শত্রুদের আক্রমণ ঠেকাতে। পরে হান, সুই, উত্তরের ওয়েই, জিন, মিং সহ আরো অনেক রাজবংশ দুর্গগুলোর প্রাচীর পুননির্মাণ ও প্রসারিত করে।

১৪ শতকে মিং রাজবংশ তুমুর যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর প্রাচীরটি নিয়ে বেশ সচেতন হয়েছিল। মিং রাজবংশ উত্তর সীমান্তে প্রাচীরটি আরো উন্নত করার পুননির্মাণ শুরু করেছিল। শত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রাচীরগুলো স্থায়ী মাটি দিয়ে তৈরি না করে পাথর ও ইট দিয়ে তৈরি করেছিল। দেওয়ালটিতে প্রায় ২৫ হাজার ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছিল।

তবে এত কিছুর পরেও চীনের ওপর মঙ্গোলদের আক্রমণ থামেনি। তারা নিয়মিত আক্রমণ চালিয়ে যেত। পরবর্তীতে তারা নির্মিত দেয়ালগুলোর অনেক ক্ষতি করেছিল। মিংগানদের এ দেয়াল সংস্কারের জন্য প্রচুর অর্থ এবং শ্রম ব্যয় করতে হয়।

১৮৬০ সালে শেষ হওয়া দ্বিতীয় অপিয়াম যুদ্ধের পর চীনের সীমান্তে বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এর ফলেই ব্যবসায়ী এবং দর্শনার্থীরা এই মহা প্রাচীর সম্বন্ধে ভালভাবে প্রথম জানতে পারে। এর আগে পর্যন্ত সারা বিশ্বে এর তেমন কোনো পরিচিতি ছিল না।

ধীরে ধীরে চীনের এই মহা প্রাচীর দর্শনার্থীদের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে যায়। বিশেষ করে উনবিংশ শতাব্দিতে এসে এই প্রাচীর খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং একে ঘিরে নানা রকম মিথ বা, জনশ্রুতি তৈরি হতে থাকে। চীনের এই প্রাচীরকে চাঁদ এমনকি মঙ্গল গ্রহ থেকেও দেখা যায় বলে জনশ্রুতি এখনো বেশ প্রচলিত রয়েছে।

দেয়ালের মধ্যে লুকানো অংশ

২০০৯ সালে এই প্রাচীরের লুকিয়ে থাকা ১৮ কিলোমিটার অংশ নতুন করে আবিষ্কার করা হয়। এই অংশটি পাহাড় এবং খানা খন্দের আড়ালে চাপা পরে গিয়েছিল। এই অংশ খুঁজে বের করতে ‘ইনফ্রারেড রেঞ্জ ফাইন্ডার’ এবং জিপিএস সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছিল। গত বছরের মার্চ এবং এপ্রিলে আরো ১০ কি.মি. এরও বেশি দীর্ঘ দেয়ালের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে বলে জানা যায়। এগুলোকেও চীনের মহা প্রাচীরের অংশ হিসেবেই ধারণা করা হচ্ছে।

প্রাচীরটি নির্মাণের প্রধান উপাদানগুলো কি?

চীনের প্রাচীরটি পাথর, ইট, কাঠ, খড়ি, চুন, মাটি এবং কঙ্করের মতো উপকরণগুলোর সংমিশ্রণে তৈরি। প্রাচীরটি বিভিন্ন যুদ্ধের সময় দেশটিকে রক্ষা করার পাশাপাশি অভিবাসন সমস্যা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। পরিবর্তীত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীরটি বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক নামে পরিচিত পায়। বহু কবিতা এবং সাহিত্যকর্মে চীনের মহা প্রাচীরটিকে 'দ্য আর্থ ড্রাগন' বলা হয়েছে।

কোন প্রদেশগুলো চীনের প্রাচীর দ্বারা আবৃত?

প্রাচীরটি দিয়ে চীনের পূর্ব অংশ ও পশ্চীম অংশকে আবৃত করা হয়েছে। এছাড়াও চীনের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর দীর্ঘ অংশ জুড়েও এটি আবৃত রয়েছে। এই প্রদেশগুলো হলো বেইজিং, তিয়ানজিন, হেব্বি, শানজি, ইনার মঙ্গোলিয়া, লিয়াওনিং, জিলিন, হিলংজিয়াং, শানডং, হেনান, শানসী, গানসু এবং কিংহাই।

প্রাচীরের দৈর্ঘ্য

আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের মহাপ্রাচীরের দৈর্ঘ্য ১৩ হাজার ১৭০ মাইল, গড় উচ্চতা প্রায় ২০ থেকে ২৩ ফুট। ২০১২ সালে জুন মাসের আগে এ প্রাচীরের সঠিক দৈর্ঘ্য সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য ছিল না। জেনে অবাক হবেন যে, রাজ্যের প্রশাসনিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমীক্ষা চালাতে এবং প্রাচীরটির সঠিক দূরত্ব নির্ণয় করতে প্রায় পাঁচ বছর সময় লেগেছিল।

প্রাচীরের বৈশিষ্ট্য

প্রথম দিকে দেয়ালটি মাটি, কাঠ এবং পাথরের ব্যবহারেই তৈরি করা হত। মিং সাম্রাজ্যের সময়ে চুন, ইট আর পাথরের ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এই প্রাচীর থেকে সীমান্ত রক্ষীরা সীমান্ত পাহাড়া দিত। সীমান্ত রক্ষীরা ভিন্ন ভিন্ন দলে ভাগ হয়ে এই সীমান্ত পাহাড়া দিত। ফলে এক দলের সাথে অন্য দলের যোগাযোগ রক্ষার বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এছাড়াও ভয়ঙ্কর আক্রমণের ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী বাহিনীকে ডাকা বা, সতর্ক করারও সুব্যবস্থা ছিল এতে। পাহাড়ের চূড়ায় বা, অনেক উঁচুতে ওয়াচ টাওয়ারগুলো অবস্থিত ছিল। ফলে এসব টাওয়ার থেকে কোন সতর্কতা বা, বিপদ সংকেত দেয়া হলে তা খুব সহজেই বোঝা যেত।

প্রাচীরের বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে প্রাচীরটির অনেক অংশই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছে। যদিও বেইজিঙ্গের উত্তর দিকে এবং পর্যটন কেন্দ্রের আশেপাশে সংরক্ষিত রয়েছে। এসবের কিছু অংশ আবার অনেক বেশি রকমের সংস্কারও করা হয়েছে। ২০১৪ সালে লাইয়াওনিং এবং হেবেই প্রদেশের বর্ডারের কাছের দেয়ালগুলো কনক্রিট দিয়ে নতুন করে সংস্কার করা হয়। চীন সরকারের এই সংস্কার উদ্যোগ তখন বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছিল। 

২০১২ সালের ‘স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশান অভ কালচারাল হেরিটেজ’ কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যমতে মিং সাম্রাজ্যের সময় তৈরি হওয়া ২২% প্রাচীরই বা, প্রায় ২,০০০ কি.মি. প্রাচীরই সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস হয়ে গেছে। 

পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি এই চীনের মহা প্রাচীরের যে অংশ গানসু প্রদেশে অবস্থিত তার ৬০ কিলোমিটারেরও দীর্ঘ অংশ আগামী ২০ বছরের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চীনের মহান প্রাচীর সম্পর্কে শীর্ষ পাঁচটি আকর্ষণীয় তথ্য
১) প্রাচীরের প্রায় ১০ হাজার ওয়াচ-টাওয়ার রয়েছে।
২) পৃথিবীর একমাত্র স্থাপত্য যা চাঁদ থেকেও দেখা যায়।
৩) প্রাচীরটির প্রায় ১/৩ অংশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে গেছে।
৪) এর বয়স আনুমানিক প্রায় ২ হাজার৭০০ বছর।
৫) প্রাচীরটি নির্মাণে এক হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেছিলো।

বর্তমানের আবর্তে শুধু চীনের নয় গোটা বিশ্বের গৌরব চীনের এই প্রাচীর অনেকটাই ধ্বংসের মুখোমুখি। পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর এর প্রতি চীন সরকার যেমন যত্নবান হয়েছেন তেমনি উল্টোদিকে এই ব্যাপক পরিচিতির ফলে একে প্রতি নিয়ত সামলাতে হচ্ছে লাখ লাখ পর্যটকদের চাপ।

তবে চীন সরকার যদি এর সংস্কারের প্রতি আরো মনোযোগী হয়ে ওঠে তাহলে হয়ত আরো বহুদিন এই মনুষ্য সৃষ্ট বিশ্ব ঐতিহ্যকে এই পৃথিবীর বুকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

ডেইল বাংলাদেশ/মাহাদী