Alexa হাঁসে হাসে খামারি

হাঁসে হাসে খামারি

মো. মোশারফ হোসাইন, নকলা (শেরপুর) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০৯:০৭ ১১ ডিসেম্বর ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

শেরপুরের নকলার বানেশ্বরদী ইউপির বানেশ্বরদী কান্দাপাড়ার আব্দুল সবুরের ছেলে মানিক মিয়া। অভাবের তাড়নায় মানিক গাজীপুর জেলার মির্জাপুর এলাকায় এক হাঁস-মুরগীর খামারে দীর্ঘ দিন চাকরি করেছেন। সেখানের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ২০১৮ সালে নিজ এলাকায় হাঁসের খামার করার পরিকল্পনা করেন। সেই হাঁসের খামার তার মুখে হাসি ফুটিয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৯ সালের শুরুতে হাঁসের খামার করার জন্য বানেশ্বরদী কান্দাপাড়া এলাকায় ৭০ শতাংশ নিচু জমি ৫ বছরের জন্য দুই লাখ ৪০ হাজার টাকায় বন্ধক নেন। এই জমির একপাশে ১৫ শতাংশ জমিতে ৩ ফুট গভীর পুকুর করেন এবং সেখানে দেশীয় জাতের বিভিন্ন মাছ চাষ করনে তিনি। এর কাছেই রাতে হাঁস রাখার জন্য আরো ১০ শতাংশ জমিতে বছরে ৬ মণ ধান দেয়ার শর্তে বন্ধক নেন। উঁচু সেই ১০ শতাংশ জমিতে টিনশেড একটি ঘর তৈরি করেন। ওই ঘরেই হাঁস নিয়ে মানিক মিয়া নিজে রাত যাপন করেন।

নকলার একজন সফল হাঁস খামারি হিসেবে পরিচিত তিনি। সুখের আশায় বাড়ির সবাই এ খামারে পরিশ্রম করেন। সুদিনের মুখও দেখতে শুরু করেছেন। সেই খামার দিয়ে এখন ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা, সংসারের খরচ সবই চলছে। খামারটি আরো বড় করার জন্য কিছু জমি ক্রয়ের চেষ্টা করছেন মানিক। 

মানিক মিয়ার জানান, ময়মনসিংহের নান্দাইল চৌরাস্তা এলাকা থেকে একদিনের প্রতিটি বাচ্চা ৩৫ টাকা দরে কিনে আনেন। পরিবহনসহ প্রতিটি বাচ্চার পিছনে প্রথম দিনেই খরচ হয় ৩৮ টাকা করে। এতে করে ৭০০ টি একদিনের বাচ্চা বাবদ ২৬ হাজার ৬০০ টাকা, ৭০ শতাংশ জমি বন্ধক বাবদ দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা ও ৬ মণ ধান, বিদ্যুৎ লাইন, সংযোগ ও বৈদ্যুতিক মটর বাবদ ২২ হাজার টাকা, হাঁস ও নিজে থাকার জন্য ঘর নির্মাণ বাবদ ২০ হাজার টাকা; পুকুর খনন, পাড় বাধা ও ৭০ শতাংশ জমিতে জাল দিয়ে হাঁসের ভেড়া দেয়া বাবদ ৪০ হাজার টাকা ও অন্যান্য খরচসহ সর্বসাকুল্যে ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। এতে দুই লাখ টাকা নিজের আয়ের অংশ এবং বাকি টাকা ঋণের।

তিনি আরো জানান, এখন মানিকের খামারে ৪০০টি বড় হাঁস আছে। এর মধ্যে ৩৭০টি মাদী এবং ৩০টি মর্দা হাঁস। ৩৭০ টি মাদী হাঁসের মধ্যে দেড় মাস আগে থেকে ২৫ টি হাঁস ডিম দেয়া শুরু করে, তা বৃদ্ধি পেয়ে এখন প্রতিদিন ১৪০ থেকে ১৫০ টি হাঁস নিয়মিত ডিম দিচ্ছে। খুচরা হিসেবে প্রতি হালি হাঁসের ডিম ৪০ টাকা করে এবং পাইকারি শতকরা হিসেবে ১০০ ডিম বিক্রি হচ্ছে ৯০০ টাকা থেকে ৯৫০ টাকা করে। মানিক মিয়া আশা প্রকাশ করে বলেন, অল্প কিছু দিনের মধ্যে শতকরা ৮৫ ভাগ মাদী হাঁস ডিম দেয়া শুরু করবে। এতে করে প্রতিদিন ৩১০টি হাঁস ডিম দিবে। তবে প্রতিদিন অন্তত ১০০টি ডিমর দাম হাঁসের খাবার ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ চলে যাবে। ব্যয়বাদেও দৈনিক এক হাজার ৮৯০ টাকা থেকে এক হাজার ৯৯০ টাকা তার আয় থাকবে। এ হিসেব মতে প্রতি মাসে ৫৭ হাজার  টাকা থেকে ৬০ হাজার টাকা তার লাভ হবে। ফলে বছরে তার লাভ দাঁড়াবে ৬ লাখ ৮৪ হাজার থেকে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা।

মানিক মিয়া বলেন, আগামী ভাদ্র মাস পর্যন্ত  আমার খামারের মাদী হাঁসগুলো ডিম দিবে। খাকী ক্যাম্বেল জাতের হাঁস ২৪ মাস বয়স পর্যন্ত নিয়মিত ডিম দেয়। পরে আস্তে আস্তে কমতে থাকে। তাই ২৫ মাস বয়সের পরে আমার খামারের হাঁসগুলো বিক্রি করে দিব। তখন এসব হাঁস প্রতিটি কমপক্ষে ৩০০ টাকা করে বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করছেন। 

প্রাণি সম্পদ চিকিৎসকরা জানান, হাঁসের রোগ বালাই সাধারণত কমহয়। তবে কিছু মৌসুমে ডাক প্লেগ ও ডাক কলেরা রোগের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই বাচ্চার বয়স ২১ দিন থেকে ২৫ দিনের মধ্যে ডাক প্লেগের ভ্যাকসিন এবং ৭৫ দিনের মধ্যে ডাক কলেরার ভ্যাকসিন দিয়ে নিলে এসব মহামারী রোগে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে যায়।

কান্দাপাড়া এলাকার মহিউদ্দিন কমলসহ অনেক গ্রামবাসী জানান, কিছুদিন আগেও মানিক মিয়ার সংসারে অভাব-অনটন ছিল। কিন্তু হাঁসের খামার করার পর তার অভাব দূর হয়েছে। সংসারে সচ্ছলতা ও জীবনে সফলতা লাভ করেছে মানিক। 

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবুল খায়ের মুহাম্মদ আনিসুর রহমান জানান, বানেশ্বরদীর মানিক মিয়াসহ নকলার চন্দ্রকোনা, অষ্টধর, পাঠাকাটা, টালকী, উরফা ইউপিসহ বেশ কয়েকটি ইউপিতে অনেক দরিদ্র পরিবার ক্ষুদ্র আকারে হাঁসের খামার করে লাভবান হয়েছেন। এছাড়াও অনেকে বাড়িতে হাঁস পালন করে লাভের মুখ দেখছেন। 

তবে উপজেলার বানেশ্বরদী ইউপির বানেশ্বরদী কান্দাপাড়ার আব্দুল সবুরের ছেলে মানিক মিয়া অল্প শিক্ষিত হয়েও পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ও কঠোর পরিশ্রম করে উপজেলার মধ্যে সফল হাঁস খামারির পরিচিতি পেয়েছেন। হাঁস পালন একটি লাভজনক ব্যবসা। যেকোনো বেকার নারী-পুরুষ হাঁস পালনে এগিয়ে এলে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা করবে। এতে বেকারত্ব কমবে, বাড়বে কর্মসংস্থান। 

তিনি আরো বলেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে হাঁস খামারি ও বাড়িতে পালনকারীদের নিয়মিত পরামর্শ সেবা দেয়া হচ্ছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএস