হতে চেয়েছিলেন নায়িকা, বিয়ের পর হয়ে ওঠেন বেপরোয়া

হতে চেয়েছিলেন নায়িকা, বিয়ের পর হয়ে ওঠেন বেপরোয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৪৭ ১৩ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৯:৩৩ ১৩ জুলাই ২০২০

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

করোনা পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে তিনদিনের রিমান্ডে রয়েছেন জেকেজি হেলথ কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা এ চৌধুরী ওরফে ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী।

এদিকে জালিয়াতির ঘটনায় ডা. সাবরিনার নাম আসার পর থেকেই সাবরিনার আবেদনময়ী ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে অনলাইনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ছবি প্রকাশ করে অনেকেই তার শাস্তি চেয়েছেন।

জেকেজি হেলথকেয়ারকাণ্ড সারাদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। কীভাবে ডা. সাবরিনার উত্থান, অপকর্ম এখন অনেকেরই জানা। তবে এখনো আড়ালেই রয়ে গেছে ব্যক্তিজীবন। 

তার প্রকৃত নাম ডা. সাবরিনা শারমিন হুসাইন। বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলে চিকিৎসক হিসেবে তার নিবন্ধন আইডি ১১১৬৭৯। তিনি কখনো ব্যবহার করতেন ডা. সাবরিনা এ চৌধুরী, কখনো আবার সাবরিনা আরিফ চৌধুরী বা সাবরিনা মিষ্টি চৌধুরী নাম। 

রাজধানীর শেরে বাংলানগরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার ও কার্ডিয়াক সার্জন তিনি। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেকেজি (জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা) হেলথ কেয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফুল হক চৌধুরীর চতুর্থ স্ত্রী তিনি।

সাবরিনা সরকারি কর্মচারী হয়েও জেকেজি হেলথ কেয়ার ও ওভাল গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতেন। 

সাবরিনা যেমন আরিফের চতুর্থ স্ত্রী তেমনি আরিফও সাবরিনার দ্বিতীয় স্বামী। সাবরিনার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরে। তার বাবা সাবেক সচিব সৈয়দ মোশাররফ হোসেন। তিনি ঢাকার শ্যামলীর পিসি কালচার রোডের নিজ বাড়িতে বসবাস করেন। তার দুই মেয়ের মধ্যে ডা. সাবরিনা বড়। 

সাবরিনা ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১৯৯৩ সালে এসএসসি ও পরে এইচএসসি পাস করেন। এরপর এমবিবিএস পাস করেন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে। সাবরিনার প্রথম স্বামীর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। 

জানা গেছে, সাবরিনার প্রথম স্বামী টেলিফোন সেবা সংক্রান্ত একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। 

সাবরিনা ২৭তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারের চাকরি পাওয়ার পর তার প্রথম পোস্টিং হয় দিনাজপুরে। পরে বদলি হয়ে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখান থেকে যোগ দেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে।

ডা. সাবরিনা বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনার পরিচিত মুখ। বিভিন্ন টকশোতেও স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনায় নিয়মিত অংশ নিতেন তিনি। দিতেন সুস্থ থাকা ও করোনামুক্ত থাকা এবং প্রতিরোধের নানা টিপস। তার প্রতিষ্ঠানে করোনা সনদ জালিয়াতির তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে এখন আলোচনায় তিনি। গতকাল রোববার পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে তাকে তিনদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়।

ডা. সাবরিনার তদবিরেই করোনা শুরুর প্রথম দিকে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে নমুনা সংগ্রহের কাজ পায় জেকেজি। তাদের প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও ঠিকাদারির কাজও করত। সারা দেশে ৪৪টি বুথ বসিয়ে ও বাসাবাড়িতে গিয়ে তারা কমপক্ষে ২৭ হাজার নমুনা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে প্রায় ১৬ হাজার ভুয়া সনদ বিতরণের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি সনদের জন্য বাংলাদেশিদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ও বিদেশিদের কাছ থেকে ১০০ ডলার করে নিত জেকেজি।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, আরিফের সঙ্গে বিয়ের পর বেপরোয়া হয়ে ওঠেন সাবরিনা। দুজনে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও ঠিকাদারি কাজ পেতে নানামুখী তদবির করেন সাবরিনা। এক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)-এর কয়েকজন নেতাকে কাজে লাগান বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন ছিল সাবরিনার
সিনেমার নায়িকা হওয়ার তীব্র বাসনা ছিল ডা. সাবরিনার। ২০১৬ সালে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনলাইন পোর্টালকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। সাবরিনা বলেন, নায়িকা হতে চেয়েছিলাম একসময়। কিন্তু বাবার কড়া শাসনের কারণে আর সেটি হয়ে ওঠেনি। নায়িকা হওয়ার জন্য প্রস্তাবও পেয়েছিলাম। লুকিয়ে অভিনয়ের রিহার্সেলে যেতাম। তবে যেদিন ফাইনাল শ্যুটিং হবে সেদিন বাবা বুঝে গেছেন সবকিছু। আমার আর অভিনয় করা হলো না!

ওভাল গ্রুপেরও চেয়ারম্যান ছিলেন সাবরিনা 
শুধু জেকেজি-ই নয়, দ্বিতীয় স্বামীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ওভাল গ্রুপেরও চেয়ারম্যান ছিলেন ডা. সাবরিনা। আরিফ গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে ওভাল গ্রুপের ওয়েবসাইট ডাউন পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ওভাল গ্রুপের ঢাকা এক্সপো-২০১৯ নামে একটি ওয়েবসাইটে ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে ওভাল গ্রুপের চেয়ারম্যান পরিচয় দেয়া হয়েছে। সেখানে ১১ বার চেয়ারম্যান হিসেবে তার নাম লেখা হয়েছে। ওভাল গ্রুপের প্রোফাইলেও চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছে সাবরিনার নাম।

গ্রেফতার এড়াতে নানামুখী তৎপরতা 
স্বামী আরিফুল গ্রেফতার হওয়ার পর করোনা সনদ জালিয়াতির সঙ্গে ডা. সাবরিনার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসে। এরপর নানা মাধ্যমে গ্রেফতার এড়ানোর চেষ্টা শুরু করেন। বিষয়টি পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ ও তেজগাঁও থানার একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর তড়িঘড়ি তালাক নোটিস পাঠান তিনি। এরপর গতকাল পর্যন্ত নিয়মিত অফিসে যান তিনি। 

জানা গেছে, বিভিন্ন কর্মকর্তার দফতরে গিয়ে গ্রেফতার এড়ানোর বিষয়ে সহযোগিতা চান তিনি। এজন্য বিএমএ ও স্বাচিপের একাধিক নেতাও তার পক্ষে তবদির করেন।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, আরিফুলকে গ্রেফতারের পর জেকেজির দফতর থেকে উদ্ধার হওয়া ল্যাপটপে করোনা পরীক্ষার ১৬ হাজার ভুয়া সনদ দেয়ার প্রমাণ মিলেছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আরিফুলের স্ত্রী ডা. সাবরিনার নাম আসে। তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই তাকে গ্রেফতার করা হয়।

তিনি বলেন, জেকেজির যেসব সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন জিজ্ঞাসাবাদে তাদের সবাই বলেছেন, সাবরিনা জেকেজির চেয়ারম্যান। তাছাড়া তেজগাঁও কলেজে জেকেজির বুথে হামলার অভিযোগ উঠলে সাবরিনাই প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র হিসেবে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেন। তিনি তেজগাঁও কলেজে মাঠকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেন। তাছাড়া সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি কখনোই কোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই