Alexa ‘হজে মাবরুর’ বা পূর্ণাঙ্গ হজের প্রতিবন্ধক বিষয়সমূহ

‘হজে মাবরুর’ বা পূর্ণাঙ্গ হজের প্রতিবন্ধক বিষয়সমূহ

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:০৯ ১৬ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ২১:১৪ ১৬ জুলাই ২০১৯

পবিত্র মক্কা শরিফ

পবিত্র মক্কা শরিফ

জীবের প্রাণ আছে বলে আমরা জানি। কিন্তু জীব ছাড়া অন্যান্য বিষয়-বস্তুরও প্রাণ থাকতে পারে আমরা অনেকে তা খেয়াল করি না। বুযুর্গণের মতে ইবাদতের প্রাণ আছে।

ইচ্ছে করলে ইবাদতকে জানদার, সজীব ও তরুতাজা করা যায়। আবার অবহেলা বা ইবাদতের মূল বিষয়কে অগ্রাহ্য করার দ্বারা তাকে মেরেও ফেলা যায়। এর জন্য আমাদের বুযুর্গ আকাবিরদের জীবন চরিত অধ্যয়ন করা দরকার। তাহলে জানতে পারবো, ইবাদতে কীভাবে প্রাণ আসে। ইবাদত জানদার হলে তার শক্তি দুনিয়ার যেকোনো বস্তুর শক্তিকে পরাভূত করতে সক্ষম।

আরো পড়ুন>>> হজে বিশ্বনবী (সা.) এর পঠিত তালবিয়া ও দোয়া

প্রসিদ্ধ ঘটনা। একবার মোঘল সাম্রাজ্যের প্রসিদ্ধ আলেম মোল্লা জিউন (রহ.) এর ওপর তৎকালীন বাদশা ক্ষিপ্ত হলেন। পুলিশকে নির্দেশ দিলেন তাকে গ্রেফতার করে বাদশার দরবারে হাজির করতে। শাহজাদা ওই আলেমকে মহব্বত করতো। তাই চাইলো গ্রেফতারের সংবাদ ওই আলেমের কাছে পৌঁছে দিতে। সংবাদ শুনে সেই বুযূর্গ আলেম ওজু করতে বসে গেলেন। শাহজাদার ধারণা ছিলো সংবাদ শুনে হয়তো তিনি আত্মগোপন করবেন। কিন্তু এই কাণ্ড দেখে সে হতবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, হজরত! আপনি ওজুতে বসলেন কেন? ওই বুযূর্গ উত্তর দিলেন, তোমার পিতা আমাকে গ্রেফতারের জন্য সৈন্য পাঠিয়েছে। তাই আমিও তাদের মোকাবেলা করার জন্য অস্ত্রে ধার দিচ্ছি। আমার অস্ত্র হচ্ছে ওজু। রাসূল (সা.) বলেছেন ‘ওজু মুমিনের হাতিয়ার।’ এর পর শাহজাদা বাদশাকে গিয়ে বুঝালে সে উক্ত কাজ থেকে নিবিত্ত হয়। এই ঘটনা থেকে শিক্ষার বিষয় এটাই যে, ইবাদত প্রাণদার হলে তার শক্তি যেকোনো বস্তুর শক্তির চেয়ে অনেক বেশি হয়।

আরো পড়ুন>>> কবুল হজের আলামত ও রাসূল (সা.) এর সতর্কবার্তা

ইসলামের চতুর্থ রুকন হচ্ছে হজ। হজ হচ্ছে এমন ইবাদত যেখানে বান্দার জান মাল উভয়টা ব্যয় হয়। শাআয়েরে দ্বীন বা ইসলামের বিভিন্ন নিদর্শন দেখে ঈমান বৃদ্ধির সুযোগ হয়। রাসূল (সা.) যাদের ওপর হজ ফরজ তাদেরকে হজ আদায়ের জন্য অনেক তাগিদ দিয়েছেন। যেমন এক হাদিসে এসেছে, যার ওপর হজ ফরজ আর সে হজ না করে মারা গেল তাহলে সে ইহুদী, নাসারা বা যে অবস্থাই মারা যাক সে ব্যাপারে রাসূল (সা.) এর কোনো আফসোস থাকবে না। আমরা জানি, নবী করিম (সা.) মানুষের ঈমানের ব্যাপারে কত আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু তিনিই হজ না আদায়কারীর ব্যাপারে এমন মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তাহলে আমাদের বুঝা উচিত ইসলামে হজের গুরুত্ব কতটুকু।

আরো পড়ুন>>> ইসলামে মদ, জুয়া, বেদী, ভাগ্য নির্ধারক শর নিষিদ্ধ (পর্ব-১)

হজে মুমিন বান্দা ঈমানি জযবায় পরিপূর্ণ থাকার কারণে, আল্লাহ তায়ালার বিভিন্ন নিদর্শন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ লাভ করে। আর তখন আল্লাহ তায়ালার মহব্বতের সমুদ্রে তারা হাবুডুবু খেতে থাকে। যেমন ‘তাবাকাতে ইবনে সাদ’ ও ‘হিলয়াতুল আওলিয়া’ হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের ঘটনা উল্লেখ আছে। হজরত উরওয়া ইবনে যোবায়ের তাওয়াফরত অবস্থায় ইবনে ওমর (রা.)-কে একটি কথা জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু ইবনে ওমর (রা.) কোনো উত্তর দিলেন না। পরে দেখা হলে ইবনে ওমর (রা.) বলেন, তুমি আমাকে কথাটি তওয়াফের হালতে জিজ্ঞেস করেছিলে। আর আমি ওই অবস্থায় আল্লাহকে কল্পনা করে থাকি। তাই তোমার কথার কোনো উত্তর দেইনি। কোনো কোনো বান্দা নবী করীম (সা.) এর স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন বিষয় দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ইবনে ওমর (রা.) হজের সফরে বাহন এদিক ওদিক ঘুরিয়ে সামনে অগ্রসর হতেন। তিনি বলতেন হতে পারে আমার বাহনের পাঁ ওই স্থানে পড়বে যেখানে রাসূল (সা.) এর বাহনের পাঁ পড়েছিলো। পাকিস্তানের মুফতীয়ে আজম, মারেফুল কোরআনের লেখক মুফতী শফী (রহ.) মদীনায় রাসূল (সা.) এর রওজা জিয়ারতে গিয়ে লজ্জায় দূরে দূরে ছিলেন। অনুভূতি ছিলো, আমার মতো অযোগ্য বান্দা তাঁর সামনে কোন সাহসে মুখ দেখাবো। এই ছিলো হজের সফরে আমাদের পূর্ববর্তী বুযূর্গগণের অবস্থা।

হজের প্রতিশ্রুত বিষয় পূর্ণাঙ্গ হজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হজ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত। হাদিসের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ইবনে মাজার এক হাদিসে বিবৃত হয়েছে, রাসূল (সা.) বলেন, ‘ হজ ও ওমরা আদায়কারীগণ আল্লাহর মেহমান। তারা দোয়া করলে আল্লাহ তায়ালা কবুল করেন। গোনাহ মাফ করাতে চাইলে আল্লাহ তায়ালা মাফ করেন।’ মুসনাদে আহমদের এক হাদিসে বিবৃত হয়েছে, ‘রাসূল (সা.) বলেন, যখন কোনো হাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে তো তাকে সালাম দিবে, মোসাফাহা করবে এবং তার কাছে তোমার গোনাহ মাফের জন্য দোয়ার দরখাস্ত করবে। কেননা, সে ক্ষমা প্রাপ্ত।’ তবে এসকল ফজিলত তাদের জন্য যাদের হজ ‘মাবরুর’ হিসেবে আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। মাবরুর হজ বলতে বুঝানো হয়েছে, যে হজ ইখলাসের সঙ্গে, সমস্ত রকমের অপবিত্রতা থেকে মুক্ত থেকে আদায় করা হয়। এক হাদিসে এসেছে নবী করিম (সা.) বলেন, ‘একবার ওমরা আদায় করার পর পুনরায় ওমরা আদায় করার দ্বারা দুই ওমরার মাঝের সমস্ত গোনাহ মাফ হয়ে যায়। আর মাবরুর হজের প্রতিদান হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার জান্নাত।’ (সহীহ বোখারী, মুসলিম)।

হজে মাবরুর বা পূর্ণাঙ্গ হজের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়াবলী-

(এক) ইখলাস বা আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্যই হজ করা: রাসূল (সা.) বলেন, সমস্ত কাজের নির্ভরশীলতা নিয়তের ওপর। কোনো কোনো ব্যক্তি অনেক বড় নেক কাজ করে, কিন্তু তার আমলের খাতা শূন্য থেকে যায়। আবার কেউ সামান্য সামান্য নেক কাজ করেও অনেক বড় প্রতিদান পেয়ে যায়। এর মূলে রয়েছে নিয়ত। রাসূল (সা.) এ-ও বলেছেন, তোমরা ইখলাসপূর্ণ আমল কর তাহলে অল্প আমলই নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে। দেশ ছেড়ে চিরদিনের জন্য অজানা পথে পাড়ি জমানো কত কঠিন তা সকলেই জানি। ইসলামের জন্য দেশ ছেড়ে যাওয়াকে হিজরত বলা হয়। বোখারী শরীফসহ বহু হাদিসের কিতাবে এসেছে এক সাহাবির নিয়তে সমস্যা থাকার কারণে তাকে নারীর জন্য হিজরতকারী বলা হয়েছে। অর্থাৎ এত বড় আমলের কোনো মর্যাদাই আল্লাহর দরবারে রইলো না শুধু নিয়তে সমস্যা থাকার কারণে। তাহলে আমরা লোক দেখানো, হাজি লকব ব্যবহার বা অন্যকোনো উদ্দেশ্যে হজ করলে আল্লাহ তায়ালার কাছে তার কতটুকু সওয়াব পাবো?

বর্তমানে নিজেকে তুলে ধরার অনেক মাধ্যম চলে এসেছে। সেলফি তুলে ইন্টারনেটে ছেড়ে দিলে মুহূর্তেই সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা অনেকে হজে গিয়ে সেলফি তুলে নেটে ছাড়ি আবার কেউ কেউ লাইভ ভিডিও দেখিয়ে থাকি। এগুলোতে সমস্যা দু জায়গায়। প্রথমত ছবি তোলার মতো গোনাহের কাজে লিপ্ত হচ্ছি। যদিও অনেকে মনে করেন মোবাইল স্কিনে, মনিটরে দেখার জন্য যা তোলা হয় তা ছবির অন্তর্ভূক্ত নয়, কিন্তু তাদের মতেও অপ্রয়োজনে এগুলো তোলা মাকরূহ। দ্বিতীয়ত ইখলাস নষ্ট হচ্ছে। আমি সারা দুনিয়াকে আমার হাজি বনার ফিরিস্তি দেখাচ্ছি। তাই হজে ইখলাসকে ধরে রাখা ও ভাবগাম্ভির্যপূর্ণ করার জন্য সেলফি বা লাইভ ভিডিও পরিহার করতে হবে। তাছাড়া আল কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হজের সময় হচ্ছে নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস। যে ব্যক্তি এতে নিজের ওপর হজ ফরজ করে নিলো সে কামভাবের কথা বলতে পারে না (কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করতে পারবে না)।’ লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আজকে এই ইন্টারনেটের কারণে আমরা গোনাহতেও লিপ্ত হয়ে যাই। তাই হজে যাওয়ার আগে আমাদেরকে এ সকল অপবিত্র বস্তু থেকে পবিত্র হতে হবে। তাহলে ‘হজে মাররুর’ নসিব হবে, যার প্রতিদান হিসেবে রয়েছে জান্নাত।

(দুই) হালাল মাল দ্বারা হজ করা: হালাল খাওয়া-পরা ইবাদত কবুলের পূর্ব শর্ত। আল কোরআনের বহু জায়গায় বলা হয়েছে, ‘তোমরা হালাল ভক্ষণ কর এবং নেক কাজ কর।’ মুফাসসিরগণ বলেছেন, নেক আমলের আগে হালাল ভক্ষণের কথা বলার কারণ হচ্ছে, হালাল ছাড়া নেক আমল কখনো কবুল হবে না। তাই জীবনের কষ্টার্জিত হালাল টাকা দ্বারা হজ করলে হজ পালনের অবস্থা হবে ভিন্ন রকম। আর কলমের খোঁচায় পকেট পুরে সে টাকা দিয়ে হজ করলে বিনোদন ভ্রমণ হবে, কিন্তু হজের বরকত নসিব হবে না।

(তিন) ঝগড়া ফাসাদ থেকে দূরে থাকা: আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে হজ আদায়ের নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘হজ কিছু নর্দিষ্ট মাস। যে হজ ফরজ করে নিবে সে হজে.... আল্লাহর নাফরমানি ও ঝগড়া ফাসাদে জড়াবে না।’ (সূরা: বাকারা, আয়াত: ১৯৭)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) এর সূত্রে সহিহ বোখারী ও মুসলিমে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি হজ করলো এবং সেখানে কোনো যৌনতার কথা বলেনি, আল্লাহর কোনো বিধান লংঘন করেনি তাহলে সে গোনাহ থেকে এমন পবিত্র হয়ে ফিরে আসে কেমন যেন সে আজকে মায়ের পেট থেকে জন্মগ্রহণ করেছে।’ তো হজের মাঝে ঝগড়া করা বা আল্লাহর বিধান লংঘন করা হজের ফজিলত লাভের পথে অন্তরায়। যে আল্লাহ তায়ালার এত কাছে গিয়েও তাকে অমান্য করার ধৃষ্টতা দেখাবে তার চেয়ে হতভাগা কী আর কেউ হতে পারে? 

বর্তমানে হজ ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে। যারা বিনিময়ের ভিত্তিতে হাজিদেরকে বিভিন্ন রকম সেবা দিয়ে থাকে। তাদের কর্তব্য হচ্ছে আল্লাহর ঘরের মেহমানদের সেবায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। আর হাজি সাহেবদের মনে থাকা দরকার, আমরা যাচ্ছি দ্বীনের কাজে। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই সামান্য খানাপিনার জন্য ঝগড়া-ফাসাদ সৃষ্টি করে হজের ভাবগাম্ভির্যকে নষ্ট করতে পারি না। অনেকে মানুষের গীবত, শেকায়াতেও লিপ্ত হয়। যা দ্বারা বরকত নষ্ট হয়।

হজের পরবর্তী জীবনে পরিবর্তন হজ কবুল হওয়ার আলামত: বুযূর্গদের অভিমত হচ্ছে, যার জীবনে হজের পর পরিবর্তন এসেছে তার হজ কবুল হওয়ার আশা করা যায়। তাই হাজিদের মনে রাখা দরকার, আমার পূর্বের জীবনের চেয়ে পরবর্তী জীবনটা যেন ভিন্ন হয়। আল্লাহর পথে চলার গতি যেন বৃদ্ধি পায় তাহলে আমার হজ স্বার্থক হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে 

Best Electronics
Best Electronics