হজরত সাওদা বিনতে জাময়া (রা.)

হাবীবুল্লাহ সিরাজ

প্রকাশিত: ১৭:৪৭ ৯ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৭:৪৭ ৯ জানুয়ারি ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মানিতা স্ত্রীগণ এই উম্মতের মা। আমাদের সেই পূণ্যাত্মা আম্মাজানদের পরিচয় জানা প্রয়োজন। 

হজরত খাদিজাতুল কুবরাহ রাযিআল্লাহু আনহা এর পর রাসূলুল্লাহ (সা.) যাকে বিবাহ করেন তিনি হলেন হজরত সাওদা বিনতে জাময়া রাযিআল্লাহু আনহা। তাকে বিয়ে করার মর্মান্তিক একটি প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতিটা ছিলো হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের এক যাতনাধ্যায়। 

ওই সময়টা হুজুর নিজেই ‘আমুল হুজুন’ তথা ‘বেদনার বছর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। বছরটি ছিলো অবরুদ্ধ অবস্থা ছেড়ে শিয়াবে আবু তালিব থেকে মাত্র মক্কায় আসলেন। এখনো সব ঠিকঠাক হয়নি। স্বাভাবিক হয়নি পরিবেশ পরিস্থিতি। এমন মুহূর্তের দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন চাচা আবু তালেব। যিনি ছিলেন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচে’ কাছের ও বড়ো অভিভাবক। তিনি আপন ভাতিজার জন্য নিজের ঘরবাড়ি ছেড়েছেন, সংসার ছেড়েছেন, ছেড়েছেন সমাজ; তবুও ভাতিজা মুহাম্মাদকে ছাড়েননি। এমন ঘনিষ্ঠ চাচার মৃত্যুতে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একেবারে ভেঙ্গে পরেন। 

চাচার মৃত্যু শোক হালকা হতে থাকে। এমন মুহূর্তে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন হজরত খাদিজাতুল কুবরাহ রাযিআল্লাহু আনহা। এ যেন খড়ার ওপর মরার গা। চাচার বিয়োগ ব্যথা এখনো কাটেনি চলে গেলেন প্রাণাধিক প্রিয়তমা স্ত্রী! কষ্টে হুজুর (সা.) আরো ভেঙ্গে পড়েন। এক দিকে সন্তান সন্তুতির লালন পালন অন্যদিকে নবুওয়াতি দায়িত্ব! বড়ো অস্থির মুখর সময় পার করছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। চারদিকে শূন্য শূন্য। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই অস্থিরতা ও তার সন্তান সন্তুতির কথা ভেবে হজরত ওসমান ইবনে মাযউন রাযিআল্লাহু আনহা এর স্ত্রী হজরত খাওলা বিনতে হাকিম রাসূলের কাছে আসলেন। প্রস্তাব করলেন আপনার এই পেরেশানী মুহূর্তে একজন সঙ্গিনী ও সান্তান দানকারিনীর প্রয়োজন? 

উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ! আমার সন্তান সন্তুতির সকল দেখবালতো সেই করতো। এদিকে আমার কোনো পেরেশানি ছিল না। রাসূল (সা.) থেকে সবুজ সঙ্কেত পেয়ে খাওলা বিনতে হাকিম গেলেন সাওদার বাপ জাময়ার কাছে। প্রস্তাব করলেন? জময়া উত্তর করলেন- আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ তো শরিফ পুরুষ। হতে পারে। তবে সাওদারও একটি মতামত জানা উচিৎ। তার কী মতামত? সাওদা রাজি! রাজি না হয়ে কী পারে? কার পক্ষ থেকে প্রস্তাব! বুঝতে হবে। সর্বশেষে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে উপস্থিত হলেন। বিয়ে পড়ালেন সাওদার বাবা জাময়া। এই বিয়ের প্রচন্ড বিরোধী ছিলেন তার ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে জাময়া (ওই সময় কাফের ছিল এবং বাড়িতেও ছিল) তবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর এই বিষয়টির খুবই আফসোস করতেন।
 
আম্মাজান হজরত সাওদা বিনতে জাময়া সেই ভাগ্যবর্তী মহিলা যিনি খাদিজাতুল কুবরা’ এর পরেই রাসূলের স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। রাসূল (সা.) এর সঙ্গে যখন তার বিয়ে হয় তখন তার বয়স হয়েছিল ৫০, রাসুলেরও বয়স ছিল ৫০ (তারিখুল ইসলাম)। রাসূলের আগে তার আরেকটি বিয়ে হয়েছিল। সেই স্বামীর নাম সীরাতুন নবী (সা.) গ্রন্থের বর্ণনা মতে সাফওয়ান ইবনে ওমাইয়ের আর সীরাতে মুস্তফা ও আসাহহুস সিয়ার গ্রন্থের বর্ণনা মতে হজরত সাকরান বিন আমর রাযিআল্লাহু আনহু। তারা উভয়ে নবুওয়াতের প্রথম জামানায় ইসলাম গ্রহণে সৌভাগ্য অর্জন করেন, সঙ্গে সঙ্গে আবিসিনিয়া হিজরতও করেছেন। হিজরত থেকে মক্কায় ফিরে আসার কিছুদিনের মাথায় তার স্বামী মারা যান। সেই স্বামীর স্মৃতিস্বরূপ একজন ছেলে রেখে যান। তার নাম ছিল আব্দুর রহমান। তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। পরে জালোলার যুদ্ধে তিনি শাহাদত বরণ করেন। 

যে বছর হজরত উম্মাহাতুল মুমিনিন হজরত আয়েশা ছিদ্দিকা রাযিআল্লাহু আনহুর বিবাহ হয়েছে সে বছরই হজরত সাওদা বিনতে জাময়া রাযিআল্লাহু আনহুর বিবাহ হয়েছে। ইতিহাসবিদদের মাঝে এই নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে যে, কার বিবাহ আগে হয়েছে? ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাস (রহ.) এর মতে হজরত সাওদা বিনতে জাময়া’র বিবাহ আগে হয়েছে, অতপর হজরত আয়েশা ছিদ্দিকা’র বিবাহ হয়েছে। আর ইবনে আকিল বলেন আগে হজরত আয়েশার পরে সাওদার। 

গঠন প্রকৃতি : আম্মাজান হজরত সাওদা বিনতে জাময়া রাযিআল্লাহু আনহু ছিলেন দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ গঠন ও স্থুল উদর বিশিষ্টা মহিলা। এজন্যে তিনি দ্রুত চলতে পারতেন না। বিদায় হজের সময় মুজদালিফা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় হলে তিনি সে কারণেই সবার আগে রওয়ানা হওয়ার অনুমতি চেয়েচিলেন। কেননা ভিড়ের মাঝে তার চলতে কষ্ট হত। (আল্লামা শিবলী নোমানীকৃত সীরাতুন নবী সা.) 

হাদিস বর্ণনা : আম্মাজান হজরত সাওদা বিনতে জাময়া রাযিআল্লাহু আনহু থেকে সর্বমোট পাঁচটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। সাহাবিদের মধ্যে যারা তার থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন তন্মধ্যে হজরত ইবনে আব্বাস ও ইয়াহইয়া ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আসয়াদ ইবনে জারারার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার থেকে বর্ণিত পাঁচ হাদিস থেকে ইমাম বুখারি (রহ.) তার কিতাব বুখারিতে একটি এনেছেন। বাকী হাদিসগুলো আবুদাউদ ও নাসায়ী শরীফে রয়েছে (রুয়াতুত তাহযিবিয়িন) 

বদন্যতা : আম্মাজান সাওদা বিনতে জাময়া রাযিআল্লাহু আনহু বহুগুণের অধিকারিনী একজন নারী ছিলেন। তবে যে গুণটি তার মাঝে সবচে’ বেশি ছিলে তা হলো দানশীলতা ও উদারতা।

আম্মাজান হজরত আয়েশা ছিদ্দিকা রাযিআল্লাহু এর পরই দানশীলতায় শ্রেষ্ঠস্থানীয়া ছিলেন তিনি। হজরত রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে তিনিই সেই স্ত্রী যিনি নিজের ‘ভাগ’ (রাত্রিযাপন) হজরত আয়েশাকে গিফট দিয়েছিলেন। যেমন হাদিসে এসেছে-
 
عن عن هشام عن أبيه عن عائشة سودة بنت زمعة وهبت يومها لعائشة وكان النبي صلى الله  عليه وسلم يقسم لعائشة بيومها ويوم سودة

তরজমা : হজরত আশেয়া ছিদ্দিকা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, হজরত সাওদা বিনতে যাময়া তার নির্ধারিত রাতকে আয়েশা ছিদ্দিকা রাযিআল্লাহু আনহুকে হেবা করেছিলেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা ও সাওদার দিনকে আয়েশার জন্য রাখতেন (বুখারি ৪৯১৪)  

পর্দার আয়াত : পর্দার আয়াত নাজিলের সঙ্গে আম্মাজান হজরত সাওদা বিনতে যাময়ার সম্পৃক্ততা ছিল। ঘটনাটি হলো এই যে,
 
عَنِ ابْنِ شِهَابٍ عَنْ عُرْوَةَ عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ أَزْوَاجَ النَّبِىِّ - صلى الله عليه وسلم - كُنَّ يَخْرُجْنَ بِاللَّيْلِ إِذَا تَبَرَّزْنَ إِلَى الْمَنَاصِعِ - وَهُوَ صَعِيدٌ أَفْيَحُ - فَكَانَ عُمَرُ يَقُولُ لِلنَّبِىِّ - صلى الله عليه وسلم - احْجُبْ نِسَاءَكَ . فَلَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم - يَفْعَلُ ، فَخَرَجَتْ سَوْدَةُ بِنْتُ زَمْعَةَ زَوْجُ النَّبِىِّ - صلى الله عليه وسلم - لَيْلَةً مِنَ اللَّيَالِى عِشَاءً ، وَكَانَتِ امْرَأَةً طَوِيلَةً ، فَنَادَاهَا عُمَرُ أَلاَ قَدْ عَرَفْنَاكِ يَا سَوْدَةُ . حِرْصًا عَلَى أَنْ يَنْزِلَ الْحِجَابُ ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ آيَةَ الْحِجَابِ

তরজমা : (সংক্ষিপ্ত) হজরত আয়েশা ছিদ্দিকা রাযিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, পর্দার বিধান নাজিল হওয়া পূর্বে রাসূল (সা.) এর স্ত্রীগণও প্রাকৃতিক হাজত সারতে জঙ্গলে যেতেন, সচারাচর মানুষজন তা দেখতো। হজরত ওমর ফারুক রাযিআল্লাহু আনহু’ এর কাছে খারাপ লাগতো। তাই তিনি চাইতেন যেন উম্মাহাতুল মুমিনিনগণ পর্দার সঙ্গে চলাফেরা করে। এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও বলতেন। তিনি বিষয়টা প্রতি সেইভাবে খেয়াল করতেন না। একদিন সন্ধ্যারাতে হজরত সাওদা বিনতে জাময়া প্রাকৃতিক হাজতে সারতে ময়দানে গেলে হজরত ওমর ফারুক (রা.) বলেন- হে সাওদা, আল্লাহর কসম আমি তোমাকে চিনে ফেলেছি! ( কেননা, সাওদা ছিল লম্বাগড়নার) এতে সাওদা খুব লজ্জিত হয়। হজরত ওমর ফারুক (রা.) এটা করলেন যেন পর্দার আদেশ জারি হয়। অতপর এর কিছুদিন পর পর্দার আয়াত আল্লাহ নাজিল করলেন। (বুখারি ১/১৪৬) তবে পর্দার আয়াত নাজিল হবার একমাত্র কারণ এ ঘটনা তেমনটি নয়, এই জাতীয় আরো বহু ঘটনার পর পর্দার আয়াত নাজিল হয়েছে। 

মৃত্যুবরণ : আম্মাজান হজরত সাওদা বিনতে জাময়া রাযিআল্লাহু আনহা কত তারিখে মৃত্যুবরণ করেছেন তা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। সীরাতুন নবী (সা.) গ্রন্থে সবগুলো মতই উল্লেখ করা হয়েছে। ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর মতে তিনি আমিরে মুয়াবিয়া রাযিআল্লাহু আনহু’ এর খেলাফতকালে হিজরি ৫৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। 

হাফেজ ইবনে হাজার বলেন হিজরি ৫৫ সাল। ইমাম বুখারি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন- হজরত সাওদা বিনতে জাময়া রাযিআল্লাহু আনহা হজরত ওমর ফারুক (রা.) এর জামানায় মৃত্যুবরণ করেছেন। ইমাম যাহাবি বলেন- তিনি হজরত ওমরের জামানার শেষ দিকে মৃত্যুবরণ করেন। আসসাহহুস সিয়ারে এই মতটিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে