Alexa সড়ক দুর্ঘটনা কী অপ্রতিরোধ্য?

সড়ক দুর্ঘটনা কী অপ্রতিরোধ্য?

প্রকাশিত: ১৫:৩৮ ২০ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৫:৩৯ ২০ আগস্ট ২০১৯

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

সম্প্রতি যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- এবারের ঈদুল আজহায় যাতায়াতে সারাদেশে ২০৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২২৪ জন এবং আহতের সংখ্যা ৮৬৬ জন। 

অপরদিকে রেল ও নৌ-পথ মিলিয়ে মোট ২৪৪ দুর্ঘটনায় ২৫৩ জন নিহত ও ৯০৮ জন আহত হয়েছেন। ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার এ তথ্য উদ্বেগজনক বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতাল এলাকার সড়কে দুজন কলেজ শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। সরকারি সংস্থাগুলো সে সময় বলেছিল, শিশুদের এ আন্দোলন তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। এরপর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নেয়া হয় নানান উদ্যোগ। সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয় প্রতিশ্রুতিও। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, চোখ খুলে দেয়ার পরও সড়ক পথে থামছে না মৃত্যুর মিছিল। প্রশ্ন হলো, সড়কে-মহাসড়কে মৃত্যুর এই বিভীষিকা কি চলতেই থাকবে?

আমাদের জাতীয় জীবনে একটি বড় সমস্যার নাম সড়ক দুর্ঘটনা। তাই এ সমস্যাকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই; বরং সড়ক দুর্ঘটনা রোধ জাতীয় দাবি হওয়া উচিত। কারণ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়ত যেভাবে মানুষের প্রাণ ঝরে যাচ্ছে তাতে যেন জীবনের কোনো মূল্য নেই! পত্রিকার পাতা খুললেই দুর্ঘটনার খবর আমাদের চোখে পড়ে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ঘর থেকে বাইরে গিয়ে সুস্থ অবস্থায় ঘরে ফেরা যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। জন্ম-মৃত্যু মানুষের নিয়তি নির্ধারিত। সময় ও জলস্রোতকে মানুষ যেমন কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারে না, তেমনি মৃত্যুও। প্রতিটি মৃত্যুই বেদনাদায়ক। তবে এমন কিছু মৃত্যু আছে যা মানুষ সহজেই মেনে নিতে পারে না। রোগে-শোকে, বার্ধক্যে মানুষের মৃত্যু হলে স্বজনরা যতটুকু আহত হন তার চেয়ে অনেক বেশি হন অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে কেউ মারা গেলে। যাকে বলা হয় অধিক শোকে পাথর। এ কারণে প্রতিটি মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যু কামনা করেন। 

সড়ক দুর্ঘটনায় শুধু যে প্রাণহানি ঘটছে তা নয়। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, আহতদের অঙ্গহানি ও যানবাহনের ক্ষতি হলো সরাসরি প্রভাব। এছাড়া দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত একেকটি মানুষের সঙ্গে জড়িত একেকটি পরিবারও এ ক্ষতির সরাসরি শিকার। পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দুর্ঘটনায় মারা গেলে তাহলে সে পরিবারে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে। তবে মারা যাওয়া বা আহত, পঙ্গুত্ববরণ; যাই হোক না কেন এটি একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। অথচ আমরা প্রতি মুহূর্তেই এই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। কিছুতেই যেন দুর্ঘটনায় মৃত্যু রোধ করা যাচ্ছে না। এর বড় প্রমাণ প্রতিদিন দুর্ঘটনায় প্রাণহানি। সুতরাং বিপুল ও বহুমুখী এই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরা যে যৌক্তিক, তা নানানভাবেই আলোচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত তিন কারণে সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে। ওভারস্পিড, ওভারটেকিং, যান্ত্রিক ও রাস্তার ত্রুটি। এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস না পাওয়ার পেছনে রয়েছে অন্যান্য কারণ। চালকের লাইসেন্স প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে যানবাহনের ফিটনেস সনদ, গাড়ির অনুমোদন, সড়কের ত্রুটি, সঠিক তদারকির অভাবসহ সব ক্ষেত্রেই রয়েছে গলদ। 

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। আমাদের দেশের সড়ক-মহাসড়কগুরো পর্যায়ক্রমে উন্নত হচ্ছে কিন্তু সড়ক পথে মৃত্যু থামানো যাচ্ছে না। দুর্ঘটনা যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। তাহলে মানুষের নিরাপত্তা কোথায়! স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি কোথায়! আমাদের দেশের চালকরা যদি একটু সতর্ক হয়ে গাড়ি চালান তাহলে দুর্ঘটনা কমবে। পরিতাপের হলো, অধিকাংশ চালকরা এ সতর্কতা বা সাবধানতা অবলম্বন করেন না। ওভারটেক বা দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হন এবং বহু হাতহতের ঘটনা ঘটে। বাস্তবতা হচ্ছে কেউ আইন মানতে চায় না। আইন না মানার প্রবণতা সড়ক পথে ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। লক্ষ্যণীয় যে, সড়ক দুর্ঘটনার দায়ভার কেউ নিতে চায় না। না সরকার, না চালক, না মালিকপক্ষ। সামাজিক বিভিন্ন সংগঠনগুলো জোরালো কোনো প্রতিবাদও করে না। সবারই যেন গা সওয়া ব্যাপার। প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা একেবারে কম নয়, বরং রাজনৈতিক সহিংসতার চেয়েও বেশি। এ অবস্থার পরিবর্তনই এখন সময়ের দাবি। 

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৯৯৩ জন লোকের বসবাস। জনসংখ্যাও ১৬ কোটির অধিক। দেশের প্রচুর যানবাহনের মধ্যে সব যানবাহন যে, চলাচলেও উপযোগী তাও নয়। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন যেমন আছে তেমন আছে অদক্ষ চালক। এসব কারণেই সড়ক পথে নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। চালকদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৫ হাজার ছোট বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আবার সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ এর হিসেব মতে প্রতিদিন সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রায় ৩০ জন। সে হিসাবেও বছরে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮শ’ জন। আবার বিশ্বব্যাংকের হিসেবে বছরে ১২ হাজার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রেকর্ড অনুযায়ী ২০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। অন্যদিকে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্স ইন্সটিটিউট (এআরআই) এবং নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ১২ হাজার মানুষ নিহত হন। বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা কিছু তারতম্য থাকলেও বছরে ১০-১২ হাজার মানুষ শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার খতিয়ান আমাদের পিলে চমকে দেয়ার মতো। সড়ক দুর্ঘটনায় এত মানুষের মৃত্যু হলেও, আমরা এমন একটি বাস করি যেখানে প্রশাসন বা চালকদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এটা ঠিক যে, পৃথিবীর সবদেশেই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের দুর্ঘটনা বিশ্বের সব দেশকে ছাপিয়ে শীর্ষে। পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রে আইন মেনে চলা ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগ রয়েছে। বাংলাদেশে তাও নেই। এসব কারণেই বছরে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নেয়া যায় না। আর বিদ্যমান এ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার যে পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, তার বাস্তবায়নও শঙ্কার মধ্যে পড়া অমূলক নয়। সরকারের পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও দুর্ঘটনা রোধ না হওয়া অত্যন্ত পরিতাপের। 

সড়ক র্দুঘটনা একটি জাতীয় সমস্যা। সরকারের পদক্ষেপ সত্ত্বেও দুর্ঘটনা কেন রোধ হচ্ছে না তার সুস্পষ্ট কারণ নির্ণয় এবং সে অনুযায়ী বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেয়া যৌক্তিক। মালিক, চালক শ্রমিকদের মধ্যে একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলমান। আবার এ খাতে রাজনীতি, স্বার্থের দ্বন্দ্ব জড়িত বলেও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ওঠে। তাই নির্মোহভাবে ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে কাজ করতে হবে সরকারকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। দেশবাসী এসব পদক্ষেপের বাস্তবায়ন আশা করে। সড়ক-মহাসড়কের এই মৃত্যুর মিছিল যেভাবেই হোক থামাতে হবে। সড়ক হোক নিরাপদ, মানুষ স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি পাক- এটাই দেশবাসীর চাওয়া।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর