Alexa স্বর্গীয় নৈসর্গিক নাকাচকোলো উপদ্বীপ

স্বর্গীয় নৈসর্গিক নাকাচকোলো উপদ্বীপ

নাজমুন নাহার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:২৪ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

প্যাসিফিক সমুদ্র তীরে

প্যাসিফিক সমুদ্র তীরে

কোস্টারিকার অনেক জায়গায় ঘুরেছি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে দেশটির সবচেয়ে সুন্দর জায়গা নাকাচকোলো উপদ্বীপ। যার সৈকত কোস্টারিকার অন্যান্য সমুদ্র সৈকতের থেকে একটু ভিন্ন। এই উপদ্বীপ পাপায়া পেনিনসুলার মধ্যে পড়েছে। দেশটির কুলেব্রা থেকে এই দ্বীপটি মূল ভূখন্ড থেকে বেরিয়ে ঠিক প্যাসিফিক সমুদ্রের কিছুটা অংশজুড়ে রয়েছে। দেখে মনে হবে আলাদা একটি কোনো ভূখণ্ড। যেন একটি বিশাল বড় ভূখণ্ডের ভেতর থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের মধ্যে হাত ছড়িয়ে সাঁতার কাটছে।

কোস্টারিকার লাইবেরিয়া শহরের ডডেরো হোস্টেল থেকে আমরা ছয় জন বের হলাম এই উপদ্বীপের উদ্দেশ্যে। আমি, সান, যীশু, ম্যানদিলিনা, আলবার্ট ও এওয়েন। পাহাড়ি এলাকা ও জঙ্গল পেরিয়ে যখন আমাদের গাড়ি চলতে থাকলো তখন দেখা যাচ্ছিল অপূর্ব নীলাভ্র পানির, কোরাল আর অদূরেই পাহাড়ের ভ্যালি। সৈকতের কাছাকাছি যখন পৌঁছালাম তখন অনেক ম্যানগ্রোভ জঙ্গল দেখতে পেলাম। ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের মধ্যে প্রতিদিনই বিকেলে পানি এসে ডুবে যায়, কয়েক ঘণ্টা পর পানি নিচে নেমে যায় আবারো।

আমরা ম্যানগ্রোভ জঙ্গল পার হয়ে সৈকতে গেলাম। আমি হাত দিয়ে প্যাসিফিক সমুদ্রের পানি স্পর্শ করলাম। আহ... কি অপূর্ব! পানিগুলো যেন হালকা কুসুম গরম; নিচে সামুদ্রিক মাছের দৌঁড়াদৌঁড়ি, কোরাল আর ছোট ছোট পাথর, নানা রঙের শামুক-ঝিনুক সবই দেখা যাচ্ছে। পৃথিবীর অনেক সমুদ্রের পানিতে আমি গোসল করেছি, সাঁতার কেটেছি। কিন্তু নাকাচকোলোর পানি এবং প্যাসিফিকের এই অংশটুকু আমার কাছে একটু ভিন্ন রকম মনে হলো। উত্তাল ঢেউ নেই, সৈকতের পুরোটাই সমতল মনে হলো। সমুদ্র থেকে যে পানিগুলো পাড়ে এসে ভিড় করছে সেগুলো খুবই ধীরে ধীরে আসছিল। সব মিলিয়ে আমার কাছে এই উপদ্বীপের সৈকত নিরাপদ মনে হলো।

এমন সৈকতের পানিতে আমি না নেমে থাকতে পারলাম না। সবাই মিলে নেমে পড়লাম প্যাসিফিক সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে। সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউয়ের সঙ্গে আমরা সবাই কিছুদূর এগিয়ে গেলাম যেখানে আমাদের কোমর পর্যন্ত পানি ছিল। সমুদ্রের নিচে লুকিয়ে থাকা প্রবাল পাথর ঝিনুক, শামুক সবকিছু এত স্বচ্ছ মুক্তোর দানার মত লাগছিল দেখতে। যেন আমি ওই সমুদ্র থেকে আর ফিরে না আসি। কোস্টারিকা তাজা ফলের জন্য খুব বিখ্যাত। আমরা সবাই আগেই ফ্রেশ ফলের জুস নিয়ে এসেছিলাম। পানির মধ্যে বসে আমরা সবাই জুস পান করছি আর গল্প করছি; ঠিক যেন গোলটেবিল বৈঠক!

প্যাসিফিক সমুদ্র তীরে লেখক

প্রথমে আমি ম্যানগ্রোভ বনের ভেতরে ঢুকলাম। জঙ্গলের গাছগুলোকে দেখলাম ডালপালাগুলো যেন উপুড় হয়ে মাটি ছুঁয়ে আছে। ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের কাছাকাছি আবার সামুদ্রিক বালি দেখা যাচ্ছে। পেছনে উঁচু উঁচু পাহাড়, কোথাও খণ্ড-খণ্ড পাথর; এমন অপূর্ব সব দৃশ্যের মধ্যে যেন আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম নিমিষেই। এরপর শুরু হলো পৃথিবী নিয়ে গল্প। প্রায় ২ ঘন্টা আমরা এই গল্প চালিয়ে গেলাম। মাঝখানে শান বারবার জিজ্ঞেস করছিল বাংলাদেশের কথা। আমি প্যাসিফিক সমুদ্রের পানির মধ্যে ভেসে ভেসে বাংলাদেশের গল্প করতে থাকলাম তাদের সঙ্গে।

বাংলাদেশ এবং কোস্টারিকার মধ্যে সময়ের দূরত্ব ১২ ঘন্টা। কোস্টারিকায় তখন দুপুর ১২টা আর বাংলাদেশে তখন রাত ১২ টা। সমুদ্রের ওই গোল টেবিলের অনেকেই বাংলাদেশকে ভালোমতো চেনেন না। তাদেরকে আকার-ইঙ্গিতে ম্যাপ দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে অবগত করলাম, বললাম আমাদের স্বাধীনতার কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা, আমাদের সংস্কৃতির ইতিহাস আর কৃষ্টির কথা।

এরমধ্যে আকাশের রং পরিবর্তন হলো। দূর পাহাড়ের মধ্যে জমে উঠল মেঘের মেলা। বৃষ্টি আসার আগের মুহূর্তে আমার কাছে কেমন যেন অপূর্ব একটা ভালোলাগার অনুভূতি সৃষ্টি হলো। সবকিছু কেমন যেন ফেরিটেলের মত লাগছিল চারিদিকে। তারপরই শুরু হলো বৃষ্টি আর আকাশের গর্জন। আমরা ছয় জন সমুদ্রের মধ্যে বৃষ্টিতে ভিজছি আর কথা বলছি তখনো। আমরা তখন যেন ভিন্ন রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছি। কেউই ভয় পাচ্ছিলাম না!

নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল বলে এখানে বৃষ্টি বেশিক্ষণ থাকে না। এই বৃষ্টি আসে, এই আবার রোদ ওঠে। এমনই চলতে থাকে কোস্টারিকার আবহাওয়ার পরিবর্তন। কিছুক্ষণের মধ্যে আবার রোদ উঠে গেল। প্যাসিফিক সমুদ্রের গোলটেবিল বৈঠক থেকে আমি তখন বের হয়ে আসলাম। প্যাসিফিকের সমুদ্রের কিনারায় তলা থেকে পানিতে ডুব দিয়ে কিছু অপূর্ব রঙের শামুক-ঝিনুক আর পাথর কুড়িয়ে নিলাম আমি আর আলবার্ট।

মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে আসার আগে একদিন আমি আমার ঘুমন্ত স্বপ্নে দেখেছিলাম। স্বপ্নে দেখা সেই সৈকত আমি ঘুরে বেড়িয়েছি পৃথিবীর অচেনা অজানা প্রান্তে আবিষ্কারের নেশায়। আর সেই সৈকতে আমি উড়িয়েছি লাল-সবুজের পতাকা। অনেক মানুষ সমুদ্রের কিনারা থেকে দৌঁড়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘এটি কোন দেশের পতাকা?’ আমি সগৌরবে বলেছি এটি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা; এই পতাকা নিয়েই আমি পাড়ি দিয়েছি পৃথিবীর ১৩৫ টি দেশের সীমান্ত। আরো পাড়ি দেবো পৃথিবীর বাকি সব দেশ।

লেখক: পরিব্রাজক

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে