স্বপ্ন দহন

স্বপ্ন দহন

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০০:১৬ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ০৮:৩০ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সারা জীবন আমি উদ্ভট স্বপ্নের মধ্যেই পাশ ফিরে শুয়েছি- আল মাহমুদ

শৈশবে আমার ডান বাজুতে একটা রুপোর মাদুলি বাঁধা ছিলো। প্যাঁচানো সুতোয় গিঁট দিয়ে। সেই সময়কালে আধুনিক চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে জন্মের পর থেকেই যেসব শিশু-কিশোরদের অসুখ-বিসুখ ছাড়তো না, এগুলো তাবিজ হিসেবে পরিয়ে রাখতেন তাদের অভিভাবকরা। জিন-পরি, ভূত, দেও বা অন্য কোনো অশুভ শক্তি যাতে কোনো ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম না হয়।

কিন্তু আমাকে মাদুলিটা পরানো হয়েছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। আমাকে বেঁধে দেয়া হয়েছিল যাতে আমি দুঃস্বপ্ন না দেখি। শুধু দুঃস্বপ্ন দেখলেও ক্ষতি ছিলো না। আমার দুঃস্বপ্নের সমাপ্তি হতো বোবায় ধরার মধ্য দিয়ে। বেবুনের মতো দেখতে একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রাণী স্বপ্নের শেষ অংশে এসে আমার বুকের ওপরে চেপে বসতো। আমি প্রাণপণে চিৎকার করে উঠতাম। আমার চিৎকারে জেগে উঠতো সারা বাড়ি। এই বাড়িতেই আমরা পুরো বংশ বসবাস করতাম। অন্তত ছয়টা শরিক। সব মিলে অর্ধশত মানুষ। সবাই ছুটে আসতো আমাকে সাহায্য করার জন্য। আমার অবস্থা তখন হতো ইশপের গল্পের মিথ্যেবাদী দুষ্ট রাখাল বালকের মতো।

তবে বাস্তবিকই আমি ছেলেবেলায় একজন স্বপ্ন কাতর মানুষ ছিলাম। প্রতিনিয়ত ঘুমের ভেতরে আমি স্বপ্ন দেখতাম। একই স্বপ্ন বারংবার দেখতাম। এমনকি স্বপ্নের ভেতরেও পুনরায় স্বপ্ন দেখতাম!

মাদুলিটাকে আমি ভাবতাম রুপার অলংকার। শ্রীকৃষ্ণের বাজুবন্ধের মতো। সকালের সূর্যকিরণ কৌণিকভাবে এর ওপরে পতিত হয়ে আমার ডান বাহুর ওপরে একটা গোলাকার আলোর বৃত্ত তৈরি করতো আলোর প্রতিফলন বা প্রতিসরণের কারণে। অলৌকিক সেই আলোয় উজ্জ্বল হয়ে যেতো আমার হৃদয়টাও। সব শিশুদের ভিড়ে আমি তখন হয়ে যেতাম ভিন্ন এক শিশু। অনার্যদের ভিড়ে আর্য রাজপুত্রের মতো। অথবা বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণের মতো, যে ময়ূরের পেখম দিয়ে তৈরি পোশাক আর রাজমুকুট পরে থাকে।

আমার স্বপ্নগুলোর সবই অবাস্তব ছিলো না। কিছু কিছু স্বপ্ন ফলে যেতো আমার চোখের সামনেই। দুঃখজনক ছিল যে, আমার স্বপ্নগুলোর বেশিরভাগই দুঃস্বপ্ন ছিলো। প্রিয়-পরিচিতজনদের মৃত্যুকেন্দ্রিক। এগুলোর মাধ্যমে আমি কোনো মৃত্যু বা দুঃসময়ের অশনিসংকেত পেতাম।

১৯৭৮ কিংবা ১৯৭৯ সাল। সময়টা বর্ষাকাল। প্রতি বছরের মতো বন্যার ঘোলাজলে প্লাবিত আমাদের বাড়ির চারপাশ। যত দূর দৃষ্টি যায় শুধুই জল। আমি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ক্লাস এইটে পড়ি। ছুটিতে বাড়িতে আসছি। লোকাল ট্রেনে করে ঝিনাই নদীর ওপরের ব্রিজ অতিক্রম করে প্রথমে মেলান্দহ বাজার রেলস্টেশন। তারপর মেলান্দহ বাজার জামে মসজিদের পাশ থেকে নৌকায় করে যাত্রা। ছইবিহীন ডিঙি নৌকা। বছরের অন্য সময়ে ধূলিধূসরিত নয় মাইল পথ পায়ে হেঁটে আমাদের বাড়ি থেকে মেলান্দহ বাজারে আসতে হয়। আঁকাবাঁকা পথে। বর্ষাকালে মেলান্দহ বাজার থেকে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত জলের ওপরে বিস্তৃত পথটি মোটামুটিভাবে একটা সরল রৈখিক পথ। উড়োজাহাজের ঢাকা–সিংগাপুর ফ্লাইট পথের মতো। নৌকার আরোহী সর্বমোট তিনজন। আমি, আমার ফুফাতো ভাই আবু এবং সামাদ ভাই। লগি আর বৈঠা দিয়ে নৌকা চালাচ্ছেন সামাদ ভাই। আমাদের বাড়ির সামনে একটা দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তর। এই প্রান্তরের ভেতরে হাজারো নলকূপ। এর মধ্যে একটা নলকূপ আমাদের। সামাদ ভাই এই নলকূপ চেপে আমাদের ক্ষেতে ইরি ধানের চাষ করেন। অন্য সময়েও তিনি বাঁধা কাজের মানুষ হিসেবে আমাদের সঙ্গেই থাকেন।

হাজরাবাড়ী -মাহমুদপুর-ঝাড় কাটা। অতঃপর কুমার পাড়া। আমার গ্রাম। মাহমুদপুর পেরোতেই ঝাড় কাটা নদী। মাঝ নদীতে নৌকা আসতেই ঈশান কোণে ঘন কালো মেঘের প্রবল আনাগোনা। তারপর মুষলধারে বর্ষণ শুরু। প্রবল বর্ষণের ভেতর দিয়ে দূরে অস্পষ্টভাবে আমাদের গ্রাম দৃশ্যমান হলেও প্রান্তর পেরিয়ে গ্রামে পৌঁছুতে আরো প্রায় এক মাইল দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু কয়েক মিনিটের বৃষ্টিতেই ডিঙি নৌকার তলদেশ প্লাবিত হয়ে গেলো। আমার আর আবুর পায়ের কব্জির ওপরে জল উঠে এসেছে। বৃষ্টি চলতে থাকলে ডিঙি নৌকা জলে ভর্তি হয়ে ডুবে যাবে। সামাদ ভাই বললেন, ‘তোরা দুইজন ওই থালা আর মগ দিয়ে পানি নৌকার বাইরে ফেলতে থাক’। থালা আর টিনের মগ নৌকার ইন্টেগ্রাল অংশ। আমরা দুজনেই প্রবল আনন্দিত। বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নৌকার বাইরে জল ফেলছি।

নিশ্চিত ফল পাওয়া গেল। বাড়িতে ফেরার পর রাত থেকেই আমার প্রবল জ্বর। আবুর কিছুই হয়নি। জ্বরের ভেতরে আমি আবার ছোটবেলার মতো স্বপ্ন দেখছি। আমার বাজুতে কোনো মাদুলি বা তাবিজ বাঁধা নেই। গভীর অন্ধকার রাত। গ্রামের সামনের প্রান্তরের ভেতরে শুয়ে আছি। ঘাসের বিছানার ওপরে। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকারা ছাড়া আর কেউ জেগে নেই। আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি কয়েক শত আলোকবর্ষ পর্যন্ত দূরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে সক্ষম। দূরের একটা নীল নক্ষত্র থেকে উজ্জ্বল রশ্মি এসে পড়েছে প্লাবিত প্রান্তরের ভেতরে। অন্ধকারাচ্ছন্ন নিবিড় এক বাড়িতে। এই বাড়িটা আমি চিনি। আমার নানা বাড়ি। খরকা বিলের পাশে। বন্যার এই সময়ে খরকা বিলের পৃথক অস্তিত্ব বোঝার উপায় নেই।

খুবই সংক্ষিপ্ত স্বপ্ন। ঘুম থেকে জেগে আম্মাকে বলতেই তিনি অস্থির। বিগত কয়েকদিন যাবত তার পিতা অর্থাৎ আমাদের নানা অসুস্থ। বন্যার কারণে কয়েকদিন খোঁজ নেয়া যায়নি। সকাল দশটার দিকে নৌকায় করে আমার মামাতো ভাই এলো। আমার নানা ইন্তেকাল করেছেন।

১৯৮৫ সাল। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে আমাদের পাসিং আউট প্যারেড অনুষ্ঠিত হবে ১৯ মে তারিখে। পুর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী জুন মাসের ১৯ তারিখে হওয়ার কথা ছিলো। বিশেষ কারণে অনুষ্ঠানটা এক মাস পূর্বে হচ্ছে। ক্যাডেটদের সবার মাথায় হাত। বিশেষ করে সাইন্সের ক্যাডেটদের। কারণ পাসিং আউট প্যারেডের পূর্বের এক মাস দিন-রাত অধ্যয়ন করেই তারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। পাগলের মতো সারারাত জেগে পড়াশুনা করছে সবাই। আর আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় স্বপ্ন দেখছি। দুঃস্বপ্ন! স্বপ্নের ভেতরেই দেখলাম বা অনুভব করলাম আমার মৃত্যু হয়েছে। দেহের বাইরে থেকে ভিন্ন সত্ত্বা হিসেবে আমি আমার মৃত্যুকে অবলোকন করছি!

আমাদের বাড়ির উত্তর প্রান্ত। তালগাছের নিচে পগারের পাড়ে এসে বাড়িটা শেষ হয়ে গেছে। বাড়ির সবাই সমবেত হয়েছে এই জায়গায়। আমাকে বিদায় জ্ঞাপন করার জন্যে। কারণ, মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই মৃতরা জীবিতদের ভেতরে বসবাস করার সব অধিকার হারিয়ে ফেলে। সুতরাং সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমার একাকী যাত্রা। সামনের প্রান্তরের ভেতর দিয়ে। হেমন্তকাল। ধূ ধূ প্রান্তর। কেটে নেয়া ধান গাছের বিচালিতে ছেয়ে আছে। কিছু দূর যাওয়ার পর আমি পেছন ফিরে তাকাই। প্রিয়জনেরা এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রমশ তাদের চেহারা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে তাদের মুখ। তারপর তাদের শরীর। সবশেষে অবয়ব।

প্রান্তর পেরিয়ে ঝাড় কাটা গ্রামের কাছে আসতেই দেখলাম সবাই বিন্দু হয়ে গেছে। শুধু তালগাছের মাথাটা স্কাই লাইনের ওপর দিয়ে বেলুনের মতো ঝুলছে। শূন্যের ভেতরে। জীবিতদের কাছে মৃতরা যেমন, মৃতদের কাছে জীবিতরাও তেমনি। তারাও আমার নিকটে স্মৃতি মাত্র। তবুও পৃথিবী ছেড়ে যেতে আমার কষ্ট হচ্ছে। যেমনটা হয়তোবা সব মানুষের হয়।

আমি ভাবতে চেষ্টা করলাম শারীরিক অস্তিত্বের কথা। মৃত মানুষদের তো শরীরী অস্তিত্ব বলে কিছুই থাকার কথা নয়। সুতরাং নিজেকে বুঝালাম যেহেতু আমি মৃত, সেহেতু আমারও শারীরিক অস্তিত্ব বলে কিছু নেই। আমি চাইলেই এখন উড়তে পারি। আকাশের ভেতরে। শঙ্খচিলের মতো। ঝাড়কাটা নদী পেরিয়ে, মাহমুদপুর, মেলান্দহ বাজার, জামালপুর, শেরপুর হয়ে গারো পাহাড় অতিক্রম করে মানুষের তৈরি সীমান্ত অতিক্রম করে আসামের মেঘালয় দিয়ে আরো উত্তরে তিব্বতের মানস সরোবরের ওপর দিয়ে আমি চলে যেতে পারি কোনো অজানা গন্তব্যে। এমনকি পৃথিবী ছেড়েও।

ভাবতেই হালকা মনে হলো নিজেকে। আমি উড়তে শুরু করলাম। হাত নাড়তেই পাখির পালক হয়ে গেলো আমার ডানাদ্বয়। নিজের পা দুটোকে মনে হচ্ছিল পাখির লেজ। চলার দিক নির্ধারণ করা যাচ্ছিলো এটা দিয়ে। নৌকার হালের মতো আমার পাশ দিয়েই এক ঝাঁক জালালি কবুতর আমাদের বাড়ির দিকে উড়ে যাচ্ছিল। প্রতিদিনই সকালে দল বেঁধে এরা উত্তরের দিকে চলে যায়। ফিরে আসে সন্ধ্যার দিকে। আমার হঠাৎ খুব ইচ্ছে হলো এদের সঙ্গে ফিরে যাই। কিন্তু এরা কেউই আমাকে দেখতে না পেয়ে দ্রুত চলে গেল। স্বপ্নের ভেতরেই অনুভব করলাম আমার জীবনের চেয়েও এদের জীবনের মূল্য অনেক বেশি।

মাত্র দুইদিন পরের কথা। ১৯ মে ১৯৮৫। পাসিং আউট প্যারেডের দিনে আমার বাবাকে আমন্ত্রণ করেছে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি কর্তৃপক্ষ। প্যারেড শেষ হওয়ার পর অভিভাবকদের সঙ্গে আমাদের দেখা হবে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, আমার বাবা আসেননি। আমার ছোট চাচা এসেছেন। কিন্তু তার মুখ বিষণ্ন। জানালেন স্কুলের একটা জরুরি মিটিংয়ের কারণে আমার বাবা আসতে পারেননি। আমার স্বপ্নের কথা মনে পড়ে গেল।

বি এম এ থেকে আমাদের সবাইকে ছুটি দেয়া হয়েছে। ছুটি শেষে সবাই নিজ নিজ বদলি হওয়া ইউনিটে যোগ দেবো। বাবার না আসার বিষয়টাকে আমি সহজভাবে নিতে পারিনি। চট্টগ্রাম থেকে জামালপুরগামী ট্রেনে ওঠার পর আমি পুনরায় তাকে আব্বা কেনো আসেননি, তা জিজ্ঞেস করলাম। চাচা হু হু করে কেঁদে ফেললেন। দুইদিন পূর্বে সকালে আমার দাদি মারা গেছেন। আমার ডিগ্রি পরীক্ষা ও পাসিং আউটের কথা ভেবে বিষয়টা আমাকে জানানো হয়নি।

বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বপ্ন দেখার আতিশয্য কমে যায়। জীবনের বাস্তবতা বা রূঢ়তা মানুষের ভেতরে সূক্ষ্মভাবে ক্রমান্বয়ে এই পরিবর্তন আনে। ছেলেবেলার বল্গাহারা কল্পনাও তার সীমারেখা পুনঃনির্ধারণ করে নেয়। সুতরাং সময়ের সঙ্গে আমার ঘুম বা জাগরণে স্বপ্ন দেখাও কমে গিয়েছিল এবং ক্রমশ আমি একজন স্বপ্নহীন মানবে রূপান্তরিত হচ্ছিলাম।

২০০৯ সাল। সেনা সদরে আমার চাকুরির মেয়াদ শেষ। চাকরির দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আমার বদলি হবে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আমি দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছিলাম টেকনাফ বি ডি আর ব্যাটালিয়নে আমার বদলি হয়েছে। সমুদ্র তীরের বিস্তৃত বেলাভূমিতে অজস্র লাল কাঁকড়া। প্রান্তরকে লাল রঙে রাঙিয়ে রেখেছে। আমি কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলেই চকিতের ভেতরে বালির ভেতরে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমার অবস্থা অনেকটা আলেকজান্ডার সেলকার্কের মতন। দক্ষিণে বিশাল সাগর। আমার চারপাশে রাশি রাশি জল। যত দূর দৃষ্টি যায় আমিই প্রভু। কিন্তু অজানা কারণে আমার বদলি হয়েছে আবার রাজধানীর সামরিক প্রতিষ্ঠানে। তবে আমার টেকনাফ বা কক্সবাজারে যাওয়ার সম্ভাবনা উবে যায়নি। এই প্রতিষ্ঠানের শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে আছে দেশের সর্বত্র।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ২৫ তারিখ সকাল। আমার বদলির প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। বসে আছি ইউনিট সদর দফতরের পার্সোনাল স্টাফ অফিসারের অফিসে। সকাল সাড়ে আটটার দিকে টেলিফোনের অন্যপ্রান্তে কথা বললেন তিনি। চোখে মুখে অস্থিরতা। বললো, ‘স্যার, পিলখানা বি ডি আর সদর দফতরে গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।’

আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধু লুতফর। পিলখানায় একটা রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক। দুইদিন পূর্বে আমাকে তার রানার দিয়ে একটা উপন্যাস পাঠিয়েছে পড়ার জন্যে।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আফতাব। আমাদের কোর্সের সবচেয়ে মেধাবীদের অন্যতম। সারাক্ষণ মৃদু হাসি লেগে থাকে তার ওষ্ঠে। আমার অন্য দুই কোর্সমেট মেজর আজিজ ও মেজর সালেহ। দুজনেরই রুমমেট ছিলাম আমি।

কর্নেল গুলজার। কম্বোডিয়াতে আমরা একসঙ্গে ১৯৯২-৯৩ সালে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। সবাই মিলে ভিয়েতনামে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সাইগনে। বিকেলের দিকে নগরের পথ ধরে হাঁটছিলাম। গুলজার স্যার, বায়েজিদ, আমিন, আমি এবং আরো কয়েকজন। একটা স্যুভেনিরের দোকানে কাঠ অথবা পাথরের ওপরে খোদিত ভিয়েতনামের প্রাকৃতিক দৃশ্যের একটা স্যুভেনির আমার পছন্দ হয়ে গেল। কিন্তু দাম খুবই বেশি। সুতরাং না কিনে সবার সঙ্গে সামনের দিকে এগোতে থাকলাম। পথে ওটা ছাড়া আর কিছুই আমার পছন্দ হচ্ছিল না। ঘণ্টা দুয়েক পর জানাতেই সবাই একবাক্যে আমাকে জানিয়ে দিলো, ওটা কিনতে তাদের ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। গুলজার স্যার বললেন, ‘আসাদের যখন পছন্দ হয়েছে, তখন ওটা আনতে আমাদেরকে ফিরে যেতেই হবে। লেট আস গো ব্যাক। ডাজ নট ম্যাটার হাউ ফার এ-ওয়ে ইট ইজ’। সবাই সুড়সুড় করে গুলজার স্যারের পেছন পেছন রওনা দিলো। আনুমানিক দেড় ঘণ্টা পর কেনা হলো আমার পছন্দের জিনিস।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাস্টার মশিউর রহমান। আমার প্রথম ইউনিটের অফিসার। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ইবিআরসি মেসে আমার রুমমেট ছিলেন। ছিলেন সিগন্যালস স্কুলে আমার প্রশিক্ষকও।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম কিবরিয়া। ক্যাডেট কলেজে নজরুল হাউজে আমাদের জুনিয়র হাউজ লিডার এবং পরবর্তীতে হাউজ লিডার ছিলেন। আমি ক্যাডেট কলেজে প্রবেশের পর থেকে একাধারে পাঁচ বছর ধরে তাকে দেখেছি প্রতি সোমবারের প্রিন্সিপালস প্যারেডে শ্রেষ্ঠ টার্ন আউটের ক্যাডেট হতে। হাউজের নোটিশ বোর্ডে প্রতিবার তার নাম দেখে প্রবল ঈর্ষান্বিত বোধ করতাম আমি।

কর্নেল এমদাদ। আমাদের বেসিক কমান্ডো কোর্সের প্রশিক্ষক ছিলেন।

কর্নেল জাহিদ। তার সঙ্গে আমি একবার দুর্ঘটনায় আহত হয়ে একই কক্ষে একমাস সিএমএইচে ভর্তি ছিলাম। অসম্ভব স্নেহ করতেন তিনি আমাকে।

১৯৮৩ সনে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে রউফ কোম্পানিতে আমরা একটা প্লাটুন হিসেবে এক কক্ষে বসবাস করেছিলাম পুরো এক টার্ম। সেখানে আমাদের প্লাটুন সার্জেন্ট ছিলেন মোয়াজ্জেম স্যার। আমাদের কক্ষের এক কোনায় পার্টেক্স বোর্ড দিয়ে পৃথক করা ছিলো তার বসবাসের কক্ষ। অসম্ভব স্নেহ দিয়ে আমাদের লালন করেছিলেন মিলিটারি একাডেমিতে।

মেজর মকবুল। আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটে চাকুরি করার সময়ে আমার পাশের টেবিলে বসতেন। চুপচাপ স্বভাবের সহৃদয়ের মানুষ। একবার পরিচিত হলে যাকে ভোলা সম্ভব নয় কারোরই।

মেজর হায়দার। আমার ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক সুজা হায়দার স্যারের সন্তান। মিরপুর স্টাফ কলেজে স্টাফ কোর্স করার সময়ে আমার সতীর্থ। তার অসাধারণ নান্দনিকতা দিয়ে আমরা দুজনে মিলে স্টাফ কলেজ থেকে আমাদের বিদায়ী অনুষ্ঠানের ব্যাক-স্টেজ তৈরি করেছিলাম।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাজ্জাদ। সেনা সদরে দীর্ঘ দুই বছর আমরা দুজনে একই কক্ষে বসতাম। আমি মুগ্ধ ছিলাম তার মানবিক গুণাবলিতে।

কর্নেল এলাহী স্যার। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অফ সাইন্স এন্ড টেকনোলজি (এম আই এস টি)-তে ছিলেন আমার সহকর্মী। বাংলাদেশ আর্মির একজন প্রবল মেধাবী অফিসার। আরো অনেক অফিসার যাদের সঙ্গে আমি নিবিড়ভাবে চাকরি করেছি।

আমি প্রাণপনে বৃথাই আমার মোবাইলে তাদেরকে অনুসন্ধান করতে থাকি। দুপুরের সূর্য আমাদেরকে ছায়াহীন করে দেয়ার আগেই কিংশুকের রঙে ভরে গেল পিলখানা বি ডি আর সদর দফতরের প্রান্তর। টেকনাফের লাল কাঁকড়ার প্রান্তরের মতো। ৫৭ জন সূর্য সন্তানের রঙে রঙিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর/আরএ