Alexa স্পা আর রান্না দিয়ে ব্রিটেন জয় করেছিলেন এই ক্ষৌরকার

স্পা আর রান্না দিয়ে ব্রিটেন জয় করেছিলেন এই ক্ষৌরকার

সাত রঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৪৯ ১৮ জানুয়ারি ২০২০  

ম্যাসাজ আর মালিশ দিয়েই ২৬০ বছর আগে ব্রিটেন জয় করেছিলেন এই ভারতীয় খাবার পরিবেশক   -ফাইল ফটো

ম্যাসাজ আর মালিশ দিয়েই ২৬০ বছর আগে ব্রিটেন জয় করেছিলেন এই ভারতীয় খাবার পরিবেশক -ফাইল ফটো

অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের পোর্টম্যান স্কোয়্যারে নিজের বাড়িতে একটি স্নানঘর তৈরি করিয়েছিলেন নাবোব বেসিল। যেখানে অর্থের বিনিময়ে উষ্ণ বাষ্পীয় ভাপে নিজের পরিচর্যা করা যেত। অর্থাৎ আজকের স্পা-এর আগের সংস্করণ। সে সময়টাতে ‘নবাব’উঠে গিয়ে ‘নাবোব’ শব্দ প্রচলিত হয়েছিল। এই শব্দ বোঝাত ধনী ও সম্ভ্রান্ত ইউরোপীয়দের।

সে সময় নাবোব বেসিলের কাছে কাজ নিলেন দীন মহম্মদ নামের একজন। বুদ্ধিমান দীন মহম্মদ স্নানঘরকে করে দিলেন ‘ওষধিঘর’। শুরু করলেন শ্যাম্পুয়িং।

ইউরোপে তখন ‘শ্যাম্পুই’ বা ‘শ্যাম্পুয়িং’ বলতে বোঝানো হত ভারতীয় ম্যাসাজ বা মালিশকে। রাজা ষষ্ঠ জর্জ ও ষষ্ঠ উইলিয়ামেরও ব্যক্তিগত ম্যাসিয়োর ছিলেন দীন মহম্মদ। অবশ্য তার পোশাকি নাম ছিল ‘শ্যাম্পুয়িং সার্জেন’।

এ শ্যাম্পুয়িং সার্জেন কে ছিলেন জানেন কি?

আধুনিক যেসব রান্না এবং তার পরিবেশনের আগে নানাভাবে সাজানো এই জিনিসটির উম্মোচন করেছিলেন তিনি। এমনকি রূপচর্চা ও ফ্যাশনের সব কৃতিত্ব আজ ফরাসিদের দখলে থাকলেও তার পথও দেখিয়েছিলেন এই ভারতীয়। তিনি একজন ভারতীয়, এটা জেনে নিশ্চয় অবাক হচ্ছেন!  

হ্যাঁ, আজকের পাটনা শহর ব্রিটিশ ভারতে ছিল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অংশ। সেখানেই ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে জন্ম শেখ দীন মহম্মদের। বক্সারের এক ছোট্ট গ্রাম থেকে এসে পাটনায় থাকতে শুরু করেছিলেন দীন মহম্মদের বাবা। তাদের পারিবারিক পেশা ছিল ক্ষৌরকর্ম অর্থাৎ যারা খাবার পরিবেশন করতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে নিযুক্ত ছিলেন দীনের বাবা। মাত্র দশ বছর বয়সেই তিনি পিতৃহীন হন। এরপর কোম্পানিই পিতৃহীন বালক দীনের দায়িত্ব নেয়।    

শিক্ষানবীশ হিসেবে কোম্পানিতে ছিলেন দীন। সেখানকার এক অ্যাংলো আইরিশ সেনা আধিকারিক গডফ্রে ইভান বেকারের কাছেই প্রশিক্ষণ নেন তিনি। মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনী থেকে যুদ্ধ করেছেন দীন মহম্মদ। দীনের বংশগত পেশা আর তার ওপর যুদ্ধের ময়দানের অভিজ্ঞতা তাকে নানা বিষয়ে কৌতূহলী করে তোলে। 

তখন পেশার তাগিদেই দীন মহম্মদ ঘাঁটাঘাঁটি করতে শুরু করেছিলেন ক্ষার ও ক্ষারীয় পদার্থ নিয়ে। এই চর্চা পরবর্তী জীবনে তার চলার পথ ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ব্রিটিশদের প্রতি দায়বদ্ধ দীন মহম্মদের চোখে পড়েছিল বাংলার তৎকালীন অভিজাত মুসলিমদের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা। পলাশির যুদ্ধের পরে বাংলার মসনদে তখন মীর জাফরের জামাই মীর কাশেম। তিনি ব্রিটিশদের হাতের পুতুল। বয়সে ছোট হলেও বুদ্ধিমান দীন মহম্মদ আঁচ করতে পারলেন ভবিষ্যৎ।  

১৭৭২ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিলেন গডফ্রে। কয়েক বছর পরে তার সঙ্গে বিদেশে পাড়ি দিলেন দীন মহম্মদও। দেশের প্রতি অনুরাগে আর কোনোদিন ফিরেও আসেননি তিনি। সাগর পাড়ি দেয়ার পথে লিখে ফেললেন বই। তার নাম ‘দ্য ট্র্যাভেলস অফ দীন মহম্মদ।’ চেঙ্গিজ খান, তৈমুর লং আর বাবরের প্রশংসা সে বইয়ের প্রতিটি পাতায় পাতায়।

খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ডেলরিম্পেল ১৯৯৮ সালে এই বইটির রিভিউ দিয়েছিলেন। রিভিউয়ের শুরুতেই তিনি বইয়ের লেখকের নাম দিয়েছিলেন ‘ট্রিপল ফার্স্ট’। অর্থাৎ, তিনটি প্রথমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওই বইয়ের লেখক। প্রথমত, তার লেখা বইটিই ছিল কোনো ভারতীয়’র ইংরেজিতে লেখা প্রথম বই। দ্বিতীয়ত, তিনি প্রথম ভারতীয় ব্যক্তি হিসেবে লন্ডনে রেস্তোরাঁ ব্যবসা শুরু করেছিলেন। আর হ্যাটট্রিক করেছিলেন তার নাম দিয়ে। তিনিই প্রথম ভারতীয়, যার সম্মানে প্রথমবারের মতো কোনো ব্রিটিশ হোটেল/রিসোর্টের নামকরণ করা হয়েছিল ‘মাহোমেদ’ (তার নামের বিলাতি সংস্করণ)! 

এরপর ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে নিজের মালিশখানা খুললেন দীন মহম্মদ। প্রচার করলেন, কবোষ্ণ জলে ভারতীয় ওষধি মিশিয়ে এই ম্যাসাজে গেঁটের বাতসহ অনেক রোগব্যাধি পালায়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফুলেফেঁপে উঠল তার কারবার। হাসপাতাল থেকেও তার কাছে রোগী রেফার করত! আজ যেখানে বিখ্যাত কুইন্স হোটেল, সেখানেই ছিল দীন মহম্মদের অভিজাত স্পা। 

এরপর বিভিন্ন যন্ত্রের সমন্বয়ে একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন তিনি। যা দিয়ে বাইরে থেকে বসে রোগীর দেহ মর্দন করে দিতে পারতেন। আর এ মর্দনের নাম দেন তিনি ‘শাম্পনা’। শীঘ্রই এটি ব্রাইটনবাসীর কাছে ‘শ্যাম্পু’ হয়ে গেল! এভাবেই উৎপত্তি হলো শ্যাম্পু শব্দটির, যদিও এর বর্তমান ব্যবহার চুল ধোয়া বা ধোয়ার দ্রব্যকে বোঝায়। ১৮২২ সালে তিনি ‘শ্যাম্পুইং অর বেনিফিটস রেসুলটিং ফরম দ্য ইউজ অব ইন্ডিয়ান মেডিকেল ভ্যাপুর বাথ’ নামে আরেকটি বই লেখেন। যেখানে তিনি শ্যাম্পু আর স্পা এর ব্যাপারে লিখেন। বিদেশের মাটিতে তার এই কর্মকাণ্ডের অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন তার স্ত্রী।    

দীন মহম্মদের বিয়েও এক দুঃসাহসিক অভিযান : 

ভারতবর্ষ থেকে যাওয়ার সময় ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে গডফ্রে গিয়েছিলেন নিজের জন্মভূমি আয়ারল্যান্ড। তখনো দীন মহম্মদ তার সঙ্গেই ছিলেন। নতুন দেশে পা রাখলেন দীন মহম্মদ। যদিও সে সময় দীন মহম্মদ ইংরেজিতে তেমন কেতাদুরস্ত হননি। তাই তার ইংরেজির জ্ঞান ঘষামাজার জন্য এক বুদ্ধি বের করলেন। সেখানকার অভিজাত আইরিশ পরিবারের সঙ্গে মিশতে শুরু করলেন দীন। সেখানেই দীনের সঙ্গে পরিচয় হয়  সম্ভ্রান্ত জেন ড্যালির।পরিচয় ক্রমশই প্রণয়ে পরিণত হতে থাকল। কিন্তু দীনের মতো সাধারণ ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুতেই মেনে নিল না জেনের পরিবার।

কিন্তু জেন ড্যালি তার সম্পর্কের ব্যাপারে ছিলেন সৎ। দীনও কম যান না। তিনিও জেনকে বিয়ে করতে নিজের ধর্ম পাল্টে প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান হয়ে গেলেন। ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে বিয়ের পরে উনিশ শতকের গোড়ায় দু’জনে এলেন ইংল্যান্ডে। এরপর পুরোজীবনই দীন মহম্মদের পাশে থেকেছেন জেন।  

দীন ও জেনের ছয় সন্তান ছিল। রোজান্না, হেনরি, হোরেশিয়ো, ফ্রেডেরিক, আর্থার এবং দীন মহম্মদ জুনিয়র। এদের মধ্যে আর্থার লন্ডনে টার্কিশ বাথ এর ব্যবসা চালাতেন। এ ছাড়াও ছিলেন একজন দক্ষ জিমন্যাস্ট।  

দীন মহম্মদের এক নাতি ফ্রেডেরিক হেবরি হোরেশিয়ো আকবর মহম্মদ ছিলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক। রক্তচাপ নিয়ে তিনি বিস্তারিত গবেষণা করেছিলেন। আর এক নাতি জেমস কোরিয়ান মহম্মদ উনিশ শতকের শেষ দিকে সাসেক্সের হোভ এর ভিকার পদের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কোনো কোনো গবেষকের দাবি, খ্রিস্টান সমাজের রীতি ভেঙে দীন মহম্মদ দ্বিতীয় বিয়ে করেন জেন জেফ্রিজকে। তাদের একমাত্র মেয়ের নাম অ্যামেলিয়া।  

দীন মহম্মদের কাজের ব্যাপ্তি ছিল অনেকদূর। তিনি সবসময়ই তার সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে নানা কর্ম করতেন। আর তা থেকেই মধ্য লন্ডনের জর্জ স্ট্রিটে রোস্তোরাঁ খুলেছিলেন তিনি। রোস্তোরাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘হিন্দুস্তান কফি হাউজ’। ভারতীয় খাবারের সঙ্গে ছিল হুকাহ। খাঁটি ভারতীয় তামাকের স্বাদে মজতেন ব্রিটিশরা। কিন্তু ২ বছর পরে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারণে এই কফি হাউজ বন্ধ হয়ে যায়। 

কিছুটা হলেও পরবর্তী প্রজন্মের কৃতিত্বের সাক্ষী হতে পেরেছিলেন দীন মহম্মদ। তিনি প্রয়াত হন ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে, ৯২ বছর বয়সে। লন্ডনের সেন্ট নিকোলাস গির্জায় আছে তার সমাধি। সিপাহি বিদ্রোহেরও আশি বছর আগে তিনি ব্রিটেন জয় করেছিলেন। আজ কোথায় হারিয়ে গিয়েছে ঝুঁকি নিতে ভালবাসা এই ভারতীয়ের নাম।

২৬০ বছর আগে জন্মানো এই ভারতীয়র হাত ধরে রূপচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শিখেছিল ইউরোপ। যা এখনো সারাবিশ্বে প্রচলিত রয়েছে। লন্ডনের ব্রাইটন শহরে দীন মুহাম্মদের কখনোই মৃত্যু হয়নি। আর এ কথা উপলব্ধি হবে সে শহরে গেলেই। ব্রাইটনের রাস্তায় দেখা যাবে ‘শেক দীন মোহামেদ’লেখা গণপরিবহণ। ব্রাইটনের সমুদ্র তীরে পাওয়া যাবে তার নামে নামকরণ করা রিসোর্ট। এছাড়াও জাদুঘরে আছে তার ছবি ও কিছু ব্যবহার্য দ্রব্য-সামগ্রী। বিখ্যাত কুইন’স হোটেলে তার স্মারক চিহ্ন আর সংরক্ষিত সে বাড়িটি, যেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এতেই বোঝা যায় এ শহর তার স্মৃতি লালন করছে তাদের অন্তরে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে