সোনালী রাজপ্রাসাদ

সোনালী রাজপ্রাসাদ

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৩১ ৭ জুলাই ২০২০   আপডেট: ২২:১৮ ২১ জুলাই ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ফুসি পর্বত থেকে নীচে নামতেই একটা বিশাল সড়ক। নাম King Sisavang Vong সড়ক। এই সড়কের ওপারেই লুয়াং প্রেবাং এর রাজপ্রাসাদ। যে রাজা এবং তার পরিবারের সদস্যদের কথা ইতিমধ্যেই আমি আপনাদেরকে বলেছি। স্থানীয় ভাষায় রাজপ্রাসাদটি Haw Kham বা Ho Kham নামে পরিচিত। এই নামের অর্থ গোল্ডেন প্যালেস বা সোনালী প্রাসাদ।

মূল রাজপ্রাসাদের স্থানে নির্মিত হলেও বর্তমান রাজপ্রাসাদটি খুব নতুন নয়। পূর্বের রাজপ্রাসাদটি তৈরী করা হয়েছিল সেগুন কাঠ ও লাওসের দেশীয় সরঞ্জামাদি দিয়ে। কিন্তু ১৮৮৭ সালে ব্ল্যাক-ফ্ল্যাগ আর্মি নামের একটি চায়নিজ মিলিশিয়া বাহিনী লুয়াং প্রেবাং আক্রমণ করে শহরটিকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলে এবং রাজপ্রাসাদটিকে সম্পূর্ণরূপে গুঁড়িয়ে দেয়। অতঃপর ফরাসি উপনিবেশকালে ১৯০৪ সাল হতে ১৯০৯ সালের মধ্যে রাজপ্রাসাদটি একই স্থানে পুনঃনির্মাণ করা হয়। সেগুন কাঠের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় ইট এবং আধুনিক সরঞ্জামাদি। রাজা Sisavang Vong এবং তার পরিবারের সদস্যদের বসবাসের জন্যে এই প্রাসাদটি নির্মিত হয়েছিল।

জানা গেল, প্রাসাদটি তৈরিতে লাও ট্র্যাডিশনাল স্থাপত্য এবং ফরাসী Beaux Arts এর মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়েছে। ইতালিয়ান মার্বেল পাথরের তৈরী অনেকগুলো সিঁড়ি দিয়ে প্রবেশদ্বারটি নির্মিত হয়েছে। সিঁড়ির দুইপাশে দুইটি কামান স্থাপন করা আছে। প্রবেশদ্বারের ঠিক উপরে স্থাপন করা হয়েছে সোনালী রঙের তিন মস্তক বিশিষ্ট একটি হাতির রিলিফ-ওয়ার্ক। এই হাতি হিন্দু দেবতা ইন্দ্রের বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হত। হাতির উপরে আছে একটি ছাতা (যা রাজকীয়তাকে প্রকাশ করে)। পুরো দৃশ্যপটাকে ঘিরে আছে পৌরাণিক নাগ সর্পেরা (mythological Naga serpents)। লাও সাম্রাজ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে এই প্রতীক।

ছবি: সংগৃহীত

রাজা Sisavang Vong এর মৃত্যুর পর ক্রাউন প্রিন্স Savang Vatthana ও তার পরিবার সর্বশেষ এই রাজপ্রাসাদটিতে বাস করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সনে প্যাথেট লাও কর্তৃক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর কমিউনিস্টরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে এবং রাজ পরিবারকে জোর করে রাজপ্রাসাদ থেকে বের করে দিয়ে সেটিকে যাদুঘরে রূপান্তরিত করে। আমি জেনেছি যে, ১৯৯৫ সালে এই রাজপ্রাসাদ যাদুঘরকে সাধারণ মানুষের জন্যে খুলে দেয়া হয়। আমি যখন ১৯৯২ সনে গিয়েছিলাম, তখন সেটিতে সাধারণ মানুষেরা প্রবেশ করতে পারত না। আমি প্রবেশ করেছিলাম জাতিসংঘের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে।

লুয়াং প্রেবাং এর সবচেয়ে দর্শনীয় স্থান এই রাজপ্রাসাদ। প্রাসাদের লৌহ কপাট অতিক্রম করে তালগাছে ছাওয়া একটি পথ দিয়ে প্রাসাদের মূল ভবনে প্রবেশ করতে হয়। সিঁড়ি দিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করার পর প্রথমে ডানদিকে ‘কিংস রিসেপশন রুম’। এতে লাওসের শেষ তিনজন রাজার আবক্ষ মূর্তি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়াও এই কক্ষের কক্ষের চারদেয়ালে লাও গ্রাম, নিসর্গ এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে লাওসের সংস্কৃতি বা জীবনাচরণ ম্যুরাল হিসেবে আঁকা আছে। ফ্রেস্কো রূপে। গার্ড আমাকে জানাল, দেয়ালের ছবিগুলোকে দিনের বিভিন্ন সময়ে দেখতে হয়। কারণ, কক্ষের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন আতিশয্য নিয়ে দেয়ালগুলোর উপরে পতিত হয়। তখন ছবিগুলোকে দেখলে মনে হয় যে, সেগুলো দিনের নির্দিষ্ট সময়কে প্রতিবিম্বিত করছে। এই যেমন, আমি সকালের সময়টাতে এসেছি। সুতরাং প্রত্যূষের আলোতে দৃশ্যগুলো উদ্ভাসিত হয়ে আছে এবং আমার কাছে দৃশ্যগুলো সকালের সময়কার বলেই মনে হচ্ছে। আমি যদি বিকেলে বা গোধূলির সময়ে আসতাম, তাহলে হয়ত দৃশ্যপটগুলোকে মনে হত বিকেলের বা গোধূলির আলোতে দেখার জন্যেই আঁকা হয়েছে। এই অসাধারণ তৈলচিত্রগুলো এঁকেছিলেন ফরাসী শিল্পী Alix de Fauntereau। ১৯৩০ সালে। গাইড আমাকে জানালো যে, ম্যুরালগুলোর ছবি তোলা নিষেধ। কারণ এগুলোকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

‘কিংস রিসেপশন রুম’ এর পাশেই ‘কুইনস রিসেপশন রূম’। এই কক্ষে দেয়ালের পাশে দাঁড় করানো অনেকগুলো শোকেসের ভেতরে সাজানো আছে নানা রাষ্ট্র থেকে আগত পরিদর্শকদের কর্তৃক রাজপরিবারকে দেয়া রকমারি সব উপহার। এমনকি একটি শোকেসে দেখতে পেলাম প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পাঠানো এক টুকরো চন্দ্রশীলা। রাণীর রিসেপশন রূমের দেয়ালে রাজার একটি লাইফ সাইজ পোট্রেটও রাখা আছে। আমি রীতিমত চমৎকৃত।

সবশেষে সিংহাসন কক্ষ (Throne Room)। এই কক্ষের দেয়াল লাল রঙের। এখানে কাঁচের মোজাইক দিয়ে তৈরি একটা সিংহাসন রয়েছে। যেটা দেখতে অনেকটা রাজকীয় হাতির হাওদা বলে মনে হয়। প্রচলিত গল্প অনুসারে রাজা এই সিংহাসনে চড়ে বিগত শতাব্দীতে লাওস পরিভ্রমণ করতেন। কামরাটির সম্পূর্ণ ছাদ ও দেয়ালের কিয়দংশে উজ্জ্বল রঙিন কাঁচ বসিয়ে বাইচের নৌকা, মহিষ ও রাখাল, নৃত্যরতা নারী, বৌদ্ধ শ্রমণ ও হাতির পিঠে শিকার ইত্যাদি প্রতীকী ছবি আঁকা হয়েছে। ছাঁদ থেকে ঝুলন্ত ঝাড়বাতির বিচ্ছুরিত আলো কাঁচের রকমারী ছবিগুলোতে প্রতিফলিত হয়ে সিংহাসন কক্ষে আশ্চর্য সুন্দর বর্ণালি সৃষ্টি করে। এই কক্ষের একটা কাঁচের কেইসের ভেতরে বেশ কয়েকটি স্বর্ণের ও স্ফটিকের তৈরি বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে যেগুলো ষোড়শ শতাব্দীতে বিভিন্ন মন্দির ও স্তূপে পাওয়া গিয়েছিল।

সিংহাসন কক্ষের পেছনে রাজ পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত কক্ষ। এগুলো সিংহাসন কক্ষের দুইদিকেই বিস্তৃত। গাইড আমাকে জানাল যে, রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাজপরিবারের সদস্যদের রাজপ্রাসাদের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার পরও এই কক্ষগুলোর আসবাবপত্র কোথাও সরিয়ে নেয়া হয়নি। বরং পূর্বের মতই সংরক্ষণ করে রেখে দেয়া হয়েছে। এই অংশে অবস্থিত রাজকীয় শয়নকক্ষ, ডাইনিং কক্ষ এবং লাইব্রেরি। লাইব্রেরি কক্ষে বিভিন্ন বইপুস্তকের সাথে মস্ত মস্ত কাঠের সিন্দুকে রাখা তালপত্রের পুঁথি দেখে আমি খুবই অবাক হলাম।

ছবি: সংগৃহীত

রিসেপশন রুমের পাশের রুমে রাজ দেবতা ‘প্রেবাং’ এর মূর্তি। শোনা গেল, “ফা-নুম নামের এক লাও কুমার কম্বোডিয়ার রাজ দরবারে লালিত হন এবং পরবর্তীতে কম্বোডিয়ান এক রাজকুমারীকে বিয়ে করেন। এ রাজকুমারই লাওসে প্রথম রাজ্য স্থাপন করেন। পঞ্চদশ শতকে। কম্বোডিয়া থেকে আসার সময়ে রাজপরিবার হতে উপহার হিসেবে তাকে দেয়া হয় ‘প্রেবাং’ বৌদ্ধ মূর্তিটি। সম্পূর্ণ স্বর্ণ দিয়ে এই মূর্তিটি তৈরি করা হয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। প্রায় হাজার বছর আগে। এটি কম্বোডিয়ার খেমার রাজা শ্রীলঙ্কার রাজদরবার হতে উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন। ফা-নুম তার রাজধানী গড়ে তুললে শহরটির নাম প্রাসাদ বিগ্রহের মহিমায় হয় লুয়াং প্রেবাং।

আমি অবাক বিস্ময়ে ভাবতে থাকি ভারতবর্ষ, শ্রীলঙ্কা আর ইন্দোচীনের সকল অঞ্চলের ইতিহাস কেমন এক সূত্রে গাথা। কম্বোডিয়ায় ‘এঙ্কর ওয়াট’ নামের পৃথিবী বিখ্যাত মন্দিরটিও তৈরি করেছিলেন জয় বর্ধন নামের এক ভারতীয় যুবরাজ। সৃষ্টি করেছিলেন খেমার নামের এক বিশাল সাম্রাজ্যের।

মূল প্রাসাদের বাইরে সামনের খালি জায়গায় রাজা Sisavang Vong এর মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। তার ভঙ্গি দেখে মনে হয় এখনও শাসন করছেন সগর্বে। প্রাসাদের ঠিক পেছনেই মেকং নদী বয়ে গেছে। গাইড আমাকে জানালো যে, রাজ পরিবারের অতিথিরা নৌকাযোগে এসে রাজবাড়ির ঘাটে নামতেন, যেখানে রাজা ও রানী তাদেরকে স্বাগত জানাতেন।

রাজবাড়ির প্রোটকল কক্ষে একটা ভিজিটর’স বুক। আমার গাইড আমাকে বলল, ‘আপনি কি ভিজিটর’স বুকে কিছু লিখতে চান?’ বইটির পাতা উল্টিয়ে দেখলাম বিভিন্ন পরিদর্শকদের কমেন্ট শেখানে। তবে বাংলায় কোন ভিজিটরস কমেন্ট পেলাম না। অজ্ঞাত কোন কারণে কবি আল মাহমুদের দুটো কবিতার লাইন আমার কলম থেকে আপনা আপনিই নিঃসৃত হয়ে গেলঃ

‘এখানে বসে তুমি যত খুশি ভেবে নিতে পারো, মৃত্তিকার সাথে তোমার নাড়ীর সম্পর্ক কতোটা নিবিড়!’

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই/