‘সেলিব্রেটি’ বাঘিনীর নামে ফেসবুক পেজ, প্রোটোকল মেনে তার সৎকার

‘সেলিব্রেটি’ বাঘিনীর নামে ফেসবুক পেজ, প্রোটোকল মেনে তার সৎকার

ফিচার ডেস্ক  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৩২ ৩০ মে ২০২০   আপডেট: ১৩:২৫ ৩১ মে ২০২০

মছলীর তীক্ষ্ণ ‍দৃষ্টি

মছলীর তীক্ষ্ণ ‍দৃষ্টি

বর্ষা মৌসুমের স্যাঁতস্যাতে পরিবেশে বংশ বা আকৃতি বাড়ায় গাছ-গাছালি। তেমনি ১৯৯৭ সালের বর্ষা মৌসুমে ভারতে বাঘের সংখ্যা বাড়াতেই জন্ম হয়েছিল দেশটির ‘মোস্ট ফেমাস বা সেলিব্রেটি’ বাঘিনী মছলীর। তার জন্মই রাজস্থানের রণথম্বোর জাতীয় উদ্যানে বাঘের সংকটের ঘাটতি পূরণ হয়। বাঘিনীকে নিয়ে করা ডকুমেন্টারি জিতেছে জাতীয় পুরস্কার। বাঘিনীটিও পেয়েছে জাতীয় স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি। মৃত্যুর পর কপালে জুটেছে সম্মাননার সৎকারও। বর্ণাঢ্য বাঘিনী মছলীর জীবনের গল্প ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো-

জন্মের পর মছলীর মুখ ও কানের কাছে ছিল মাছের আকৃতির দাগ। দাগের সৌন্দর্যই মছলীর জনপ্রিয়তায় হাওয়া লাগায়। দাগ থেকেই তার নামকরণ করা হয়েছিল মছলী। দুই বছর বয়সেই একাই শিকারে বেরিয়ে পড়ত সে। ধীরে ধীরে মা থেকে আলাদা হয়। ১৯৯৯ সালে রণথম্বোরের জঙ্গলের প্রায় ৩৫০ বর্গমাইল এলাকায় মছলী শুরু করে রাজত্ব। এতে মায়ের এলাকার অনেক অংশ দখল করেছিল সে। এক পর্যায়ে নানা সাহসিকতার কারণে মছলীর নামের পাশে বসে পড়ে ‘লেডি অব দ্য লেকস’, ‘ক্রোকোডাইল কিলার’, ‘টাইগার কুইন অব রণথম্বোর’ উপাধি।

মছলীর দাম্পত্য জীবন-সংসার 

রাজত্বের শুরুতে ‘বাম্বু রাম’ নামের এক শক্তিশালী বাঘের সঙ্গে মিলন হয় মছলীর। এতে একটি স্ত্রী ও দুটি পুরুষ শাবকের জন্ম দেয় সে। স্ত্রী লিঙ্গের শাবকের নাম রাখা হয়েছিল ‘সুন্দরী’(টি-১৭)। আর পুরুষ লিঙ্গের শাবকের নাম রাখা হয়েছিল ‘ব্রোকেন টেল’ ও ‘স্লান্ট ইয়ার’। এরইমধ্যে বয়সের কারণে মারা যায় ‘বাম্বু রাম’ নামের বাঘটি। 

শাবকদের নিয়ে মছলী

দ্বিতীয় বার সঙ্গীর সন্ধান পায় মছলী। ‘নিক ইয়ার’ নামের একটি বাঘের সঙ্গে মিলন হয় তার। ২০০২ সালের এপ্রিলে আবারো দুটি শাবকের জন্ম দেয় সে। তাদের নাম রাখা হয় ‘ঝুমরু’ (পুরুষ) ও ‘ঝুমরি’ (স্ত্রী)।

এরপর ‘এক্স-মেল’ নামের আরেকটি বাঘের সঙ্গে আবারো মিলন করে সে। এতে ২০০৫-এর মার্চে শর্মিলী (স্ত্রী) ও বাহাদুর (পুরুষ) নামের দুটি শাবকের জন্ম হয়। এভাবেই তার গর্ভে সাতটি মেয়ে ও চারটে ছেলে শাবকের জন্মে উদ্যানটিতে বাঘের বংশ বৃদ্ধি গতি পায়। তার দুটি মেয়েকে বাঘ সংকটে থাকা সারিসকা ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কেন্দ্রে স্থানান্তরিত করা হয়। ২০০৪ সালে রণথম্বোরে ছিল ১৫টি বাঘ। মছলীর অবদানে ২০১৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০টিতে।

যেভাবে মোস্ট ফেমাস বা সেলেব্রেটি হয় মছলী

মছলীর জনপ্রিয়তা শুধু বংশ বৃদ্ধির জন্য নয়, পর্যটক ও পশুপ্রেমীদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল সে। সুন্দরের পাশাপাশি ক্যামেরার সামনেও ছিল তার সমান স্বাচ্ছন্দ্য। সেই একমাত্র বাঘিনী, যার ছবি সব থেকে বেশি বার তোলা হয়েছে। 

ডকুমেন্টারি তৈরি করার সময় মছলী

সরকারি হিসাব মতে, মছলীর জনপ্রিয়তার কারণে ১৯৯৮ থেকে ২০০৯ সালের ভেতরে ১০ কোটি মার্কিন ডলার আয় করে ভারত সরকার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮০ কোটি টাকার বেশি। 

আরো যেসব কারণে জনপ্রিয় মছলী

কুমিরকে শিকার করে মছলীরণথম্বোর জাতীয় উদ্যানে মছলীর দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। তার ক্ষিপ্রতা, শক্তি নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে নেটদুনিয়াতেও। ২০০৩-এ একাই ১৪ ফুট লম্বা একটি কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে মেরে ফেলে মছলী। ওই লড়াইয়ে তার দাঁতের বেশ ক্ষতি হয়। তবে অন্য প্রাণীর হাত থেকে শাবকদের রক্ষা করতে তার হিংস্র হয়ে ওঠার গল্প বিশ্বজুড়ে নন্দিত।

যেসব সম্মাননা অর্জন মছলীর ঝুলিতে 

বাস্তুতন্ত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য ২০১৩ সালে মছলীর প্রতি সম্মান জানিয়ে তার ছবি সম্বলিত পোস্টাল কভার ও স্ট্যাম্প ছাপে ভারত সরকার। এছাড়া বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে অবদান ও পর্যটক আকর্ষণের জন্য লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কারও পায় সে।

জীবনের ক্রান্তিকাল ও মৃত্যু 

মৃত্যুর পর মছলী

বাঘ বা বাঘিনীদের জীবনকাল সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর হয়ে থাকে। তবে মছলী ১৯ বছর বেঁচেছিল। ২০১৪-র পর থেকে রণথম্বোরের রানি শক্তি হারাতে থাকে। শেষ বয়সে একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানোয় এলাকা বেদখল হতে থাকে। অবশেষে ২০১৬-র ১৮ অগস্ট মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মছলী। মৃত্যুর পর জাতীয় ব্যাঘ্র সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের প্রোটোকল অনুসারে দেহ সৎকার করা হয় তার।

সম্মাননার সঙ্গে মছলীকে সৎকার করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

ফেসবুকে মছলী

মছলীর নামের একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। সেখানেও রয়েছে অসংখ্য ভক্ত। তাকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে বেশ কয়েকটি ডকুমেন্টারি। যার মধ্যে ‘দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট ফেমাস টাইগার’ ছবিটি ৬৬তম জাতীয় ফিল্ম পুরস্কার জিতে নেয়।

বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে অবদান, সাহসিকতা ও জনপ্রিয়তায় রণথম্বোররে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে প্রয়াত বাঘিনী মছলী।

সূত্র-আনন্দবাজার পত্রিকা অনলাইন

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ