সেই বীরসেনা লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদের কথা মনে আছে?

সেই বীরসেনা লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদের কথা মনে আছে?

মো. ইদ্রিস আলম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:২৬ ৩১ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৭:১০ ৩১ মার্চ ২০২০

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদ

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদ

সহকর্মীর জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া এমন বীরসেনার মহতী ঘটনা হয়ত আগে কখনো ঘটেছে কি না জানা নেই। বলছি লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদের কথা। তার চলে যাওয়ার তিনটি বছর কেটে গেল। 

২০১৭ সালের ২৫ মার্চ সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানা এলাকার পাঠানপাড়া আতিয়া মহলের কথা হয়ত কেউ ভুলে যায়নি। সারাদেশের নজর ছিল তখন সিলেটের আতিয়া মহলের দিকে। সাবাই তাকিয়ে ছিল টেলিভিশনের পর্দার দিকে। জঙ্গি নামোক এক আতঙ্ক তখন তাড়া করছিল সারাদেশকে।

আজও মনে হলে আতকে উঠে বুকের ভেতরটা! সবার জীবনে এমন না হলেও প্রতি নিয়ত কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে সেই বীরসেনার পরিবারকে। সহধর্মিণীকে উপহার দিয়েছে একটি সাদামাটা পোশাক। এতিম করেছে সন্তানদের। দেশের বাহিনীতে এমন বিচক্ষণ বীরসেনার হয়ত অভাব। এমন জেনেও হয়ত অনেকেই ভুলে গেছে তাকে!

দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন চাকরি জীবনে। কুড়িয়েছিলেন অনেক সম্মান। একনজরে দেখা যাক সেই বীরসেনার ইতিহাস-

কর্নেল আজাদ এর জন্ম ১৯৭৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়ন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজিতে এমএ করেন। ১৯৯৬ সালে ৩৪তম ব্যাচ এবিএমএ লং কোর্স সম্পন্ন করেন। ২০১১ সালে এলিট ফোর্স খ্যাত র‍্যাব-১২ এর কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পান। ওই বছরই তাকে পদোন্নতি দিয়ে গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পরিচালক করা হয়। ২০১৩ সালে তিনি র‍্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হন। 

অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বিপিএম মরণোত্তর পেয়েছেন তিনি।

কর্নেল আজাদ ২০০০ সালের ৩০ ডিসেম্বর  উত্তরবঙ্গের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব, স্বাধীনতার অন্যতম সংগঠক মইনুদ্দিন আহমেদ মন্টু ডাক্তারের সুযোগ্য কন্যা সুরাইয়া সুলতানা শর্মির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। 

কী ঘটেছিল সেদিন বিদায় নিতে হলো আজাদকে?

জানাযায়, ২০১৭ সালের ২৫ মার্চ সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানা এলাকার পাঠানপাড়া আতিয়া মহল নামে একটি বাড়িতে জঙ্গিদের অবস্থানের খবর পেয়ে বাড়িটি ঘিরে রাখে পুলিশ। পরদিন সকালে ওই বাড়ি থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়ে জঙ্গিরা। সেদিন ঢাকা থেকে বিশেষ টিম সোয়াতকে জঙ্গি দমন করার জন্য পাঠানো হয়।

কিন্তু কোনোভাবেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। উপায় না পেয়ে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দল ঘটনাস্থলে গিয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে আনে।

এ সময় আতিয়া মহলের পাশে দফায় দফায় বিস্ফোরণ ঘটে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদ ঘটনাস্থলে হঠাৎ লক্ষ্য করেন পুলিশের একজন সদস্য বোমাসদৃশ্য পলিথিন মোড়ানো একটি বস্তু লাঠি দিয়ে দেখছেন। এ অবস্থায় কর্নেল আজাদ ‘ডোন্ট টাচ ডোন্ট টাচ’ বলতে-বলতে এগিয়ে যান তার টিমমেটদের জীবন রক্ষার্থে। কাছে যেতেই বোমাটি ফেটে যায়। চরমভাবে আঘাত পান আজদসহ কয়েকজন।

আজাদের মস্তিষ্কে বোমার স্প্লিন্টার ঢুকে যায়। আজাদকে সিলেট থেকে ঢাকা এবং ঢাকা থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তার শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় ২৯ মার্চ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ৩১ মার্চ রাতে আবুল কালাম আজাদ শহীদ হন। ওই দিন বিকেলে বনানী সামরিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

জঙ্গি নামক একটি আতঙ্ক আজও তাড়া করে যাচ্ছে সেই আজাদের পরিবারকে। নিরবে কেঁদে যাচ্ছেন স্ত্রী শর্মী।

শহীদ আজাদের স্ত্রী সুরাইয়া সুলতানা শর্মী ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, সারাদেশ এমনকি পৃথিবীব্যাপী যেন জঙ্গিদের রাজত্ব। তাদের দৌরাত্ম দিন দিন বেড়েই চলেছে। জঙ্গি নামক শব্দটাকে শুধু আমিই নই, সারাবিশ্ব প্রচণ্ডভাবে ঘৃণা করে। এই জঙ্গি নামক শব্দটা আমার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছে। এক মুহূর্তেই কেড়ে নিয়েছে আমার স্বামীকে। আমাকে উপহার দিয়েছে একটি যুদ্ধের জীবন। যেটা আমি কোনোদিন দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করিনি।

তিনি বলেন, আমার সুখি ও সুন্দর দাম্পত্য জীবনটা ভেঙে গুড়িয়ে গেল। আমি হয়ে গেলাম বিধবা এবং সন্তানেরা হয়ে গেলো এতিম। কি অপরাধ ছিল আমাদের? আমার সন্তানেরা কি ক্ষতি করেছিল বলতে পারেন? জানি এর জবাব কারোর জানা নেই। তবে যে বা যারা আমাদের এমন অবস্থা করেছে মহান আল্লাহর কাছে আমার চাওয়া, আল্লাহ যেন তাদেরকে ধ্বংস করে দেয় এবং আখিরাতে দেয় চরম শাস্তি।

তিনি আরো বলেন, আমার প্রতিটি ফোঁটা চোখের পানির দাম তাদেরকে দিতে হবে ইহকালে এবং পরকালে। জঙ্গিরা জাতির শত্রু, দেশের শত্রু, ইসলামের শত্রু। তাদের মহান আল্লাহই ধ্বংস করবেন। সাধারণ মানুষের প্রতি আমার আবেদন আপনারা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।

ডেইলি বাংলাদেশ/ইএ/টিআরএইচ/এসএএম/এসআই