Alexa সেই বাংলাদেশের অপেক্ষায়

সেই বাংলাদেশের অপেক্ষায়

প্রকাশিত: ১৫:৩২ ৫ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৫:৩৩ ৫ জানুয়ারি ২০২০

বাংলা ভাষার বর্তমান সময়ের ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম এক নাম স্বকৃত নোমান। ১৯৮০ সালের ৮ নভেম্বর ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাওলানা আবদুল জলিল ও মাতা জাহানারা বেগম। ১১ ভাইবোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। স্ত্রী নাসরিন আক্তার নাজমা ও কন্যা নিশাত আনজুম সাকিকে নিয়ে তার ব্যক্তিগত জীবন। তার উপন্যাসে উঠে আসে গ্রামবাংলার বিচিত্র মানুষ, প্রকৃতি, ইতিহাস, সমকাল, পুরাণ, বাস্তবতা ও কল্পনা। এখন পর্যন্ত তার আটটি উপন্যাস এবং দুটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া আরও এগারটি অন্যান্য গ্রন্থ আছে তার লেখা। বর্তমানে তিনি বাংলা একাডেমিতে কর্মরত রয়েছেন। ২০০২ সালে দৈনিক আজকের কাগজের পরশুরাম উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। ২০০৪ সালে ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টার (এমএমসি)-এর ফেলোশীপ লাভ করেন। ২০০৬ সালে প্রয়াত নাট্যকার আচার্য সেলিম আল দীনের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে যোগদান করেন।

আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। বড়দের কাছ থেকে শুনেছি, বই-পুস্তকে পড়ে জেনেছি। শুনতে শুনতে, পড়তে পড়তে বিস্ময়ের সঙ্গে অনুধাবন করি, ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ নামক এই রাষ্ট্রের জন্মকাল কতই না বেদনার!

কত রক্ত, কত অশ্রু, কত লাশ, কত গুম-খুন আর কত হাহাকার এই রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জড়িত। একটি ভূখণ্ডে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এমন বর্বোরচিত গণহত্যাকাণ্ড, নারীর প্রতি এমন পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা পৃথিবীতে আর কোথায় ঘটেছে? আমাদের পূর্ব-পুরুষরা এভাবেই রক্তনদী পাড়ি দিয়ে আমাদের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড উপহার দিয়েছেন, যার নাম বাংলাদেশ। আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়কালের এই মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রমাণ দেয়। প্রমাণ করে বাঙালি যে বীরের জাতি। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এই জাতি ফুঁসে উঠতে পারে, রুখে দাঁড়াতে পারে, অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিতে পারে, সেই প্রমাণ বহন করছে রক্তস্নাত মহান মুক্তিযুদ্ধ। 

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ইতিহাস থেকে জেনে আমার কাছে যতটা মনে হয়, আমাদের যা কিছু প্রাপ্তি সবই মুক্তিযুদ্ধের কারণেই। এই যে আমরা এখন একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে গর্ব করতে পারি, নির্ভয়ে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ জাতীয় সংগীত গাইতে পারি, বৈশাখের প্রথম প্রহরে রমনার বটমূলে সমবেত হয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে পারি, বাংলা ভাষায় অবাধে সাহিত্য-সংস্কৃতি করতে পারি, গল্প-উপন্যাস লিখতে পারি, স্বাধীনভাবে পত্রপত্রিকায় লিখে নিজের মত প্রকাশ করতে পারি, সম্মানের সঙ্গে একটা চাকরি করতে পারছি, এর সবই মুক্তিযুদ্ধের কারণে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করতে না পারলে আমরা থেকে যেতাম পাকিস্তান নামক একটি উদ্ভট রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে। যে রাষ্ট্র ধর্মের কারণে বিভাজিত, যে রাষ্ট্র আমার মায়ের ভাষা বাংলাকে অপমান করে রফিক-সালাম-বরকত-জব্বারের মতো দেশপ্রেমিককে হত্যা করেছে। যে রাষ্ট্রে মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণরা উপেক্ষিত। যে রাষ্ট্রের পরিচালকরা চর্যাপদ বোঝে না, রামায়ণ, মহাভারত, মঙ্গলকাব্য, গীতগোবিন্দ, রবীন্দ্রসংগীত, জারি-সারি-ভাটিয়ালি বোঝে না। তারা আমাদের আচরিত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে খাটো করে দেখেছে, আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছে। 

আমার কাছে মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধ আসলে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। আমাদের সংস্কৃতিই প্রমাণ করে আমরা বাঙালি আর ওরা অবাঙালি। ওই অবাঙালিরা যখন বাঙালির সংস্কৃতিকে অপমান করতে শুরু করল তখনই বাঙালি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করল। সিদ্ধান্ত নিল, এই আধিপত্যবাদী, প্রতিহিংসাপরায়ণ, লুটেরা, নিপীড়ক অবাঙালিদের সঙ্গে আর যৌথ বসবাস নয়। ওদের শাসন মানা বাঙালিদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। শেষ পর্যন্ত বাঙালি বিদ্রোহ করল।

অকুতোভয় বাঙালির এই গণবিদ্রোহের নেতৃত্ব দিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি তাকে দেখিনি। টেলিভিশনের পর্দায় যতবারই তাকে দেখি ততবারই এক অহঙ্কারে বুকটা ফুলে ফুলে ওঠে। রেসকোর্সের মাঠে ৭ মার্চ তারিখে তার সেই কালজয়ী ভাষণ যতবারই শুনি ততবারই বুকটা কেঁপে ওঠে। মনে হয়, কোনো মানুষ ভাষণ দিচ্ছে না, যেন এক দুরন্ত শার্দুল গর্জন করছে। ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব’, ‘বাঙালিকে তোমরা দাবায়ে রাখতে পারবা না’- কোনো বাঙালি এমন হুঙ্কার ছেড়ে শত্রুকে সাবধান করে দিতে পেরেছে বঙ্গবন্ধু ছাড়া? আমাদের ইতিহাসে তার মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আর কে আছে? শেখ মুজিবুর রহমানের সেই সাহসী কণ্ঠ আমাকে সর্বদাই অনুপ্রাণিত করে। তার ভাষণ শুনে রক্তনালীতে এক ক্ষিপ্ত ঘোড়ার ছোটাছুটি শুরু হয়। তখন ইচ্ছে করে সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। শস্য-শ্যামল ফসলভরা এই দেশটার প্রতি তখন আরো বেশি ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। মুক্তিযুদ্ধ আমার ভেতরে একটা আপসহীন চেতনা তৈরি করে দিয়েছে। আমি সেই চেতনায় উজ্জ্বীবিত। এই চেতনাকে বহন করে বেঁচে থাকি। জীবনের সব ক্ষেত্রে এই চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে গর্বিত কণ্ঠে ঘোষণা করি : আমি বাঙালি, বীর জাতির সন্তান।

যখন কাউকে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুনি তখন তার সঙ্গে আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না। মনে হয়, এই লোকটা আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশের কেউ নয়। এই দেশের প্রতি তার হৃদয়ে কোনো ভালোবাসা নেই। তাকে আমার শত্রু বলে মনে হয়। মনে হয়, যে কোনো সময় লোকটা আমার ক্ষতি করতে পারে; এমনকি আমাকে মেরেও ফেলতে পারে। অবাক লাগে, এই দেশে এখনো মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা রয়ে গেছে! এরা ঘরের শত্রু বিভীষণ। এই বিভীষণরাই একদিন এই স্বাধীন দেশের মন্ত্রী হয়েছিল! তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়েছিল। কী লজ্জা! বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোগ নিয়েছেন এই বিভীষণদের বিচারের। সেই উদ্যোগের বাস্তবায়নও করেছেন, করছেন। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের অনেকের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, অনেকের বিচার চলছে। এমন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ব্যক্তিগতভাবে আমি কৃতজ্ঞ। 

প্রশ্ন আসতে পারে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কি জরুরি ছিল? হ্যাঁ, ছিল। শুধু জরুরি নয়, খুব জরুরি ছিল। পৃথিবীর কোনো দেশে এমন নজির নেই, দেশের চিহ্নিত অপরাধীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছে। এই ঘৃণ্য নজির স্থাপিত হয়েছে একমাত্র বাংলাদেশেই। হতো না, যদি সাবেক সেনাশাসক মেজর জিয়াউর রহমান শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের নাগরিকত্ব দিয়ে এই দেশে ফিরিয়ে না আনতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের যে অঙ্গীকার, নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে সেই অঙ্গীকার তিনি ভঙ্গ করেছিলেন। বাংলাদেশের সঙ্গে, বাঙালি জাতির সঙ্গে তিনি চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। যেদিকে যাওয়ার কথা ছিল দেশটির, সেদিকে না নিয়ে সম্পূর্ণ ভুল রাস্তায় নিয়ে গেলেন তিনি দেশটিকে। কীভাবে নিয়ে গেলেন, ইতিহাস-সচেতন যে কারো তা জানা। নতুন করে আর কিছু বলার নেই। পরবর্তীতে তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠন করে, যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে, তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে, লুটপাট আর ব্যবসা-বাণিজ্যের অবাধ সুযোগ দিয়ে স্বামীর ষোলকলা পূর্ণ করে ছাড়লেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি একটি কালো অধ্যায়।

উপরের কথাগুলো রাজনৈতিক বক্তব্যের মতো মনে হতে পারে। রাজনৈতিক বক্তব্যে সত্য থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। কিন্তু জেনারেল জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে উপরের কথাগুলো আবেগের নয়, রাজনৈতিক নয়, একেবারেই বাস্তব। কথাগুলো ইতিহাসে সত্য। এই সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা চলেছে বহুদিন। আমাদের কৈশোর-তারুণ্যে জেনারেল জিয়াকে আমরা নায়ক ভেবেছি। আমাদের বলা হয়েছে তিনি নায়ক। সত্য আড়াল করে আমাদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। ভুল শিক্ষা দেয়া হয়েছে আমাদের। কিন্তু বড় হয়ে আমরা যখন ইতিহাসের বিশাল সমুদ্রে সাঁতার কাটতে শিখলাম, তখন বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম, জিয়াউর রহমান নায়ক নন, ভয়ঙ্কর খলনায়ক। মুক্তিযোদ্ধা হন্তারক। চরম বিশ্বাসঘাতক। তার মতো বিশ্বাসঘাতকতা এই দেশের সঙ্গে এভাবে আর কেউ করেনি। এই বিশ্বাসঘাতকতার ফল হলো ভয়াবহ। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের উল্টো পথে হাঁটতে লাগল বাংলাদেশ। হাঁটতে হাঁটতে একেবারে খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল। খাদে পড়ে যেত, যদি না লাগামটা টেনে ধরতেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শক্ত হাতে তিনি লাগামটা টেনে ধরলেন। তাকে সাহস জোগালেন তরুণ প্রজন্ম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ২০১৩ সালে শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে তারুণ্যের উত্থান একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। লাখ লাখ তরুণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। নিঃসন্দেহে সেটি ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। শেষ পর্যন্ত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হলো। সেই বিচার প্রক্রিয়া এখন প্রায় সম্পন্নের পথে। 

শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেই চলবে না, তাদের অনুসারীরা কিন্তু এখনো রয়ে গেছে। তাদের দিকে রাখতে হবে সতর্ক দৃষ্টি। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল, সেগুলো পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। স্বাধীনতাবিরোধী ধর্মান্ধ জঙ্গিরা প্রতিনিয়ত এই দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। 

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাতির সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে হবে। বাস্তবায়ন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে চর্চা না করে শুধুমাত্র বইপুস্তকে রেখে দিলে চলবে না। আমাদের নতুন প্রজন্মকে সবরকমের উপায়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবহিত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাদের মধ্যে জারিত করে দিতে হবে। সঠিকভাবে তা করতে পারলে এই নতুন প্রজন্মই গড়ে তুলতে পারবে উদার, অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ। আমরা সেই বাংলাদেশের অপেক্ষায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর