Alexa সূর্যোদয়ের সময়ের দোয়া ও মর্মার্থ (শেষ পর্ব)

সূর্যোদয়ের সময়ের দোয়া ও মর্মার্থ (শেষ পর্ব)

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:২৩ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৯:২৯ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

উল্লেখিত দোয়ার দ্বিতীয় বাক্যে বলা হয়েছে,

وَلَمْ يُهْلِكْنَا بِذُنُوبِنَا

‘আল্লাহ তায়ালার শোকর তিনি আমাদরেকে আমাদর গুনাহর কারণে ধ্বংস করেননি’।

আরো দেখুন>>> সূর্যোদয়ের সময়ের দোয়া ও মর্মার্থ (পর্ব-১)

এই বাক্যটি ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সারগর্ভ। এই বাক্যের মাধ্যমে একথা স্বীকার করা যে, পার্থিব জীবনে আমরা বহু গুনাহ করে ফেলেছি। গুনাহর কারণে আমরা আজাবের যোগ্য হয়ে বসে আছি। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার ফজল ও করমে দয়া ও অনুগ্রহে তিনি আমাদেরকে আজাব থেকে নিরাপদ রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালার শোকর তিনি আমাদেরকে ধ্বংস করেননি।

আদ জাতির শাস্তি: আমরা যদি আমাদের সমাজ জীবনের প্রতি দৃষ্টি দিই তাহলে দেখব বড় বড় সব গুনাহই আমাদের সমাজে সংঘটিত হচ্ছে। অথচ, এসব গুনাহর কারণে দূর অতীতে বহু জাতিকে আল্লাহ সমূলে ধ্বংস করে ফেলেছেন। আদ জাতির ওপর আল্লাহ তুফানের শাস্তি নাজিল করে ছিলেন। তিন দিন পর্যন্ত তাদের ওপর বিরতিহীনভাবে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হয়েছিল। বাতাসের প্রচণ্ডতা তাদের নারী শিশু ও জীব-জন্তুগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মেঘের সঙ্গে তাদের করুন আহাজারি আর আর্তনাদ ভেসে এসেছিল।

সামুদ ও হজরত শোয়াইব (আ.) এর সম্প্রদায়ের ওপর শাস্তি: সামুদ জাতিকে আল্লাহ তায়ালা এমন চিৎকার দ্বারা ধ্বংস করেছিলেন, যার ফলে তাদের কলিজা পর্যন্ত ফেটে গিয়েছিল। হজরত শোয়াইব (আ.) এর সম্প্রদায়ের ব্যাপারে কোরআনুল কারিমে এসেছে, তারা মাপে কম দিত। দাড়ি পাল্লার হাতল চেপে ধরার অভ্যাস ছিল তাদের। এর ফলে তাদের ওপর ইয়াওমুয় যিল্লাহর আজাব এসেছিল। তিন দিন পর্যন্ত তাদের ওপর প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। আসমান থেকে আগুন ঝরে পড়েছিল। জমিন থেকেও আগুন উথলে উঠেছিল। তিন দিনের আগুন উত্তাপে তাদের প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত হয়ে পড়েছিল ঠিক তখন হঠাৎ তীব্র শীতল বাতাস বইতে শুরু করেছিল। জনপদের অদূরে একটি খোলা ময়দানের কাছাকাছি একটি মেঘ খণ্ড নেমে এসেছিল। সেখান থেকে শুরু হয়েছিল শৈত্যপ্রবাহ। প্রচণ্ড তাপদাহে অতিষ্ঠ লোকজন ছুটে গিয়েছিল সেই মেঘ খণ্ডের নিচে। যখন সবাই একত্র হয়েগিয়েছিল তখন সেই মেঘ খণ্ড থেকে অঙ্গার বর্ষণের কারণে সমগ্র জাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাদের ওপর এই আজাব আসার কারণ ছিল তারা কুফুর শিরিকের পাশাপাশি মাপে ওজনে কম দিত।

হজরত লুত (আ.) এর সম্প্রদায়ের ওপর আজাব: হজরত লুত (আ.) এর সম্প্রদায়ের ওপর তাদের সমকামিতা ও রাহাজানির কারণে আজাব এসেছিল। একদিকে তাদের ছিল স্বভাব বিরুদ্ধ অপকর্মের বদভ্যাস। অন্যদিকে তারা ধন-সম্পদ লুট পাটের মাধ্যমে মানুষের হক নষ্ট করত। এই দুই অপকর্মের কারণে তাদের ওপর পাথরের বৃষ্টির আজাব এসেছিল। তাদের ওপর আসা আরেক আজাব হলো, তাদের সমগ্র জনপদ উল্টিয়ে দেয়া হয়েছিল। আজো তাদের সেই জনপদের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এই ধ্বংসাত্মক আজাবের ফলে সেখানে একটি সমুদ্রের সৃষ্টি হয়। সেই সমুদ্রে কোনো প্রাণীই জীবন্ত থাকতে পারে না। এ কারণেই একে মৃত সাগর বলা হয়। সেখানে কোনো মাছ ছাড়া হলে সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়।

পৃথিবীর গভীরতম এলাকা: ভূগোলবিদরা বলেছেন, যেখানে হজরত লুত (আ.) এর জনপদ ছিল, সেই জায়গাটি বর্তমান পৃথিবীর গভীরতম নিচু এলাকা। সমুদ্র পৃষ্ঠে থেকে এ গভীরতা পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্নতম। সেখানকার বিভিন্ন স্থানে সাইন বোর্ডের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, সমুদুপৃষ্ঠ থেকে এখন এর গভীরতা এতটুকু। এই জায়গার গভীরতা এতটুকু। কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে,

فجعلنا عاليها سافله

‘আমি তার উচ্চ স্থানকে নিচু করে দিলাম। (সূরা: হিজর, আয়াত: ৭৪)। অর্থাৎ ওলট পালট করে দিলাম। আজো মানুষ তা প্রত্যক্ষ করতে পারে।

উম্মতে মোহাম্মাদিয়া সাধারণ আজাব থেকে নিরাপদ: মোটকথা, অতীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পাপাচারের কারণে আল্লাহ তায়ালা বহু জাতি গোষ্ঠীর ওপর আজাব নাজিল করে ছিলেন। কিন্তু হজরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের উম্মতকে তার অসিলায় এই বিশেষ প্রদান করেছেন যে, এই উম্মতকে একই সঙ্গে সমূলে ধ্বংস করে ফেলার মতো কোনো ব্যাপক আজাব আপতিত করবেন না। তাই কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

وماكان الله ليعزبهم وانت فيهم وما كان الله معزبهم وهم يستغفرون

‘আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতের ওপর ততক্ষণ আজাব নাজিল করবেন না, যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তা ছাড়া তারা যতক্ষণ ইসতিগফার করতে থাকবে, আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর আজাব দেবেন না। (সূরা: আনফাল, আয়াত ৩৩)। এই ঘোষণার ফলে বর্তমানে কঠিন কঠিন পাপাচারে লিপ্ত হওয়া সত্তেও আল্লাহ তায়ালা এই উম্মত ব্যাপকভাবে ধ্বংস করছেন না।

কিছু কিছু আজাব উম্মতে মোহম্মদিয়ার ওপরও আসবে: তবে ভালো করে মনে রাখবে, এই ঘোষণার অর্থ এই নয় যে, এই উম্মতের ওপর ছোট খাট কোনো আজাবই আসবে না। বরং হাদিস শরিফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মতের ওপরও কিছু কিছু আজাব আসবে। কখনো ভূমিকম্প আসবে। কখনো পাথর বর্ষণ করা হবে। কখনো আসবে প্রবল ঝড় তুফান। বিভিন্ন সময় এসব আজাব প্রকাশ পেতে থাকবে। এই দোয়ায় কেবল দু’টি অংশ। কিন্তু এতে লুকিয়ে আছে বিস্তৃত মর্ম ও ভাব। একদিকে আল্লাহ তায়ালার নেয়ামতের শোকর আদায় করা হয়েছে। অন্যদিকে আল্লাহ তায়ালার আজাবের প্রতি নিজের ভয় ও সন্ত্রস্ততা প্রকাশ করা। পাশাপাশি গুনাহ স্বীকার করে তাওবা করার সুযোগ এবং এই দিকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা যেহেতু একটি নতুন দিন দিয়েছেন, তাই সেই দিনটি আল্লাহ তায়ালার বিধান ও মর্জি মোতাবেক ব্যয় করা হোক। আল্লাহ তায়ালা এই দোয়া বিশেষত্ব বোঝার এবং সেই মোতাবেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন। واخردعوا نا ان الحمد لله رب العلمين

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে