Alexa সূরা বাকারা: ১০৩-১১৫ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট ও ঘটনা 

সূরা বাকারা: ১০৩-১১৫ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট ও ঘটনা 

পর্ব- ৪

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৮:৪৯ ৭ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৮:৫১ ৭ ডিসেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

আমরা এখানে সূরা বাকারার ১০৩-১১৫ নাম্বার আয়াতসমূহের উল্লেখযোগ্য শানে নুযুল (আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট) তুলে ধরছি-

আরো পড়ুন>>> সূরা বাকারা: ৮৪-১০২ নম্বর আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট

وَلَوْ أَنَّهُمْ آمَنُواْ واتَّقَوْا لَمَثُوبَةٌ مِّنْ عِندِ اللَّه خَيْرٌ لَّوْ كَانُواْ يَعْلَمُونَ.
অর্থ : আর (এর বিপরীত) যদি তারা ঈমান ও তাকওয়া অবলম্বন করতো তবে আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত সওয়াব অবশ্যই অনেক উত্তম বিবেচিত হত। আহ্! (এর তাৎপর্য যদি তারা উপলব্ধি) করত। (আয়াত-১০৩)।

শানে নুযূল : আলোচ্য আয়াতে হজরত সুলায়মান (আ.) এর প্রতি ইহুদিদের আরোপিত কফুরির অভিযোগ থেকে তাকে নিস্কুলুষ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা এ আয়াতাংশ নাজিল করেন । বর্ণিত আছে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন যে, সুলায়মান (আ.)-কে যখন নবীগণের অন্তর্ভূক্ত বলে উল্লেখ করা হলো, তখন এক শ্রেণির ইহুদিরা বলতে থাকে, তোমরা মুহাম্মাদের প্রতি লক্ষ্য কর! তিনি সুলায়মানকে নবীগণের মধ্যে গণ্য করেছেন। অথচ তিনি ছিলেন কেবল মাত্র একজন জাদুকর। ইহুদিদের এহেন মিথ্যা অভিযোগ থেকে সুলায়মান (আ) এর নিস্কলুষতায় বর্ণনা করার জন্য আল্লাহ তায়ালা আলোচ্যে আয়াতাংশে অবতীর্ণ করেন।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَقُولُواْ رَاعِنَا وَقُولُواْ انظُرْنَا وَاسْمَعُوا ْوَلِلكَافِرِينَ عَذَابٌ أَلِيمٌ.
অর্থ: হে মুমিনগণ! তোমরা ‘রায়িনা’ বলো না ‘উনযুরনা’ বলো এবং শুনতে থাক। আর কাফেরদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (আয়াত-১০৪)।

শানে নুযুল-১ : সাহাবায়ে কেরাম যখন রাসূল (সা.) এর মজলিসে থাকতেন তখন রাসূলের কোনো কথা বুঝে না আসলে তারা বলতেন, আমাদের প্রতি লক্ষ করুন। কিন্তু এই শব্দটি ইহুদীদের ভাষায় একটি গালি। তাই সাহাবায়ে কেরাম এরুপ বললে তারা হাসাহাসি করত। তাই আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত নাজিল করেন।

২. নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সালাম বিনিময় ও কথাবার্তা ইত্যাদিতে ইহুদিরা সম্ভাব্য সকল উপায়ে দুর্ব্যবহারের চেষ্টা চালাত। তাই তারা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কখনো ‘একটু থামুন, কথাগুলো আমাদেরকে ভালো করে বুঝতে দিন’। বলার প্রয়োজন হলে তারা বলত ‘রায়িনা’। এ কথাটির স্বাভাবিক অর্থ হচ্ছে আমাদের প্রতি লক্ষ্য রাখুন বা আমাদের কথা শুনুন। কিন্তু এর আরো কয়েকটি অর্থ হতে পারে। যেমন- হিব্রু ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে, ‘শোন তুই বধির হয়ে যা’ হিব্রু ভাষায় এর অপর অর্থ হতে পারে নির্বোধ ও মূর্খ। এ শব্দটি কথাবার্তার মাঝে বলা হলে তার অর্থ হয়, ‘তুমি যদি আমাদের কথা শোনো তবে আমরাও তোমাদের কথা শুনব। তা ছাড়া এই শব্দ উচ্চারণের অর্থ হয়, ‘হে আমাদের রাখাল’। ইহুদিদের মুখে শব্দটি শুনে মুসলমানরা এর স্বাভাবিক অর্থ লক্ষ্য করে শব্দটি প্রয়োজন মতো ব্যবহার করতেন। এ সম্পর্কে ইহুদিদের দুষ্টু মনোভাব সম্পর্কে মুসলমানরা বেখবর ছিলেন। ইহুদিদের দুষ্টু ভাবধারা থাকার কারণে মুসলমানদেরকে এ শব্দটি ব্যবহার করতে একেবারেই নিষেধ করে দেয়া হয়েছে এবং এর পরিবর্তে ‘উনজুরনা’ বলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর অর্থ- ‘আমাদের দেখুন। আমাদের প্রতি লক্ষ্য রাখুন বা আমাদের কথা বলার সুযোগ দিন।’ এ শব্দটিতে অন্য কোনো অর্থের অবকাশ নেই। এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাজিল হয়। ফলে ইহুদিদের ‘রায়িনা’ বলার আর কোনো সুযোগ রইল না।

مَا نَنسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِّنْهَا أَوْ مِثْلِهَا
অর্থ: আমি কোনো আয়াত রহিত করলে অথবা বিস্মৃত করে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জান না যে, আল্লাহ সব কিছুর ওপর শক্তিমান। (আয়াত : ১০৬)।

শানে নুযুল: যখন কেবলা পরিবর্তন হলো তখন ইহুদিরা তিরস্কার করে বলতে লাগল যে, মুহাম্মাদ (সা.) অস্থিরমনা মানুষ আজ তার সাথীদেরকে এক নির্দেশ দেয় আবার আগামীকাল তা থেকে নিষেধ করে। তখন এই আয়াত নাজিল হয়।

أَمْ تُرِيدُونَ أَن تَسْأَلُواْ رَسُولَكُمْ كَمَا سُئِلَ مُوسَى مِن قَبْلُ
অর্থ : ইতোপূর্বে মুসা (আ.) যেমন জিজ্ঞাসিত হয়েছিলেন (মুসলমানগণ) তোমরাও কি তোমাদের রাসূলকে তেমনি প্রশ্ন করতে চাও? যে কেউ ঈমানের পরিবর্তে কুফুর গ্রহণ করে, সে সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। (আয়াত-১০৮)।
 
শানে নুযুল: একবার মক্কার কাফেররা রাসূলে করিম (সা.)-কে বললেন, আমাদের জন্য উহুদ পাহাড়কে স্বর্ণ বানিয়ে দিন। রাসূল (সা.) প্রতি উত্তরে বললেন, আমি স্বর্ণ বানাতে পারি, তবে শর্ত হলো এরপর যদি তোমরা নাফরমানি কর তাহলে তোমাদের ওপর আজাব আসবে। ওই আজাব আসবে যা বনী ইসরাঈল এর ওপর এসেছিল। একথা বলার পর তারা হুজুর (সা.) এর কাছে থেকে চলে গেল। তখন উল্লিখিত আয়াতটি নাজিল হলো।

وَدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ
অর্থ: আহলে কিতাবদের অনেকেই প্রতি হিংসাবশত: চায় যে, মুসলমান হওয়ার পর তোমাদেরকে কোন রকমে কাফির বানিয়ে দেয়। তাদের কাছে সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর (তারা এটা চায়)। যাক তোমরা আল্লাহর নির্দেশ আসা পর্যন্ত তাদের ক্ষমা কর এবং উপেক্ষা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাবান। (আয়াত-১০৯)।

শানে নুযুল: ইসলামের চির শত্রু আখতারের দুই ছেলে ইহুদি নেতা হুআই এবং আরেক ভাই সব সময় প্রাণপণে চেষ্টা করত মুসলমানদেরকে কুফুরীর দিকে ফিরিয়ে আনার জন্যে। তাদের এই নোংরা চেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাজিল করেন।
 
وَقَالُواْ لَن يَدْخُلَ الْجَنَّةَ إِلاَّ مَن كَانَ هُوداً أَوْ نَصَارَى تِلْكَ أَمَانِيُّهُمْ قُلْ هَاتُواْ بُرْهَانَكُمْ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ
অর্থ: ওরা বলে ইহুদী অথবা খৃষ্টান ব্যতিত কেউ জান্নাতে যাবে না। এটা ওদের মনের বাসনা। বলে দিন, তোমরা সত্যবাদী হলে প্রমাণ উপস্থিত কর। (আয়াত-১১১)।

শানে নুযুল: একবার হুজুর (সা.) এর দরবারে নাজরানের কিছু খৃষ্টান এবং মদিনার কিছু ইহুদী উপস্থিত হলো। এক পর্যায়ে উভয় গ্রুপ তর্কে লিপ্ত হলো। ইহুদীরা দাবী করতে লাগল যে, জান্নাতে একমাত্র ইহুদীরাই প্রবেশ করবে। আর নাসারাও দাবী করল যে, জান্নাতে একমাত্র নাসারাই প্রবেশ করবে। তাদের এই হাস্যকর দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাজিল হয়।

وَقَالَتِ الْيَهُودُ لَيْسَتِ النَّصَارَى عَلَىَ شَيْءٍ وَقَالَتِ النَّصَارَى لَيْسَتِ الْيَهُودُ عَلَى شَيْءٍ وَهُمْ يَتْلُونَ الْكِتَابَ كَذَلِكَ قَالَ الَّذِينَ لاَ يَعْلَمُونَ مِثْلَ قَوْلِهِمْ فَاللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيمَا كَانُواْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ.
অর্থ: ইহুদিরা বলে খ্রিস্টানদের (ধর্মের) কোনো ভিত্তি নেই। আর খ্রিস্টানরা বলে ইহুদিদের (ধর্মের) কোনো ভিত্তি নেই। অথচ এরা সবাই (আসমানী কিতাব) পাঠ করে থাকে। এভাবে তারা (মুশরিকরা) যাদের কাছে কোনো (আসমানী জ্ঞান নেই) তারাও এই (আহলে কিতাবদের মতো) কথা বলা শুরু করেছে। আল্লাহ নিজেই কেয়ামতের দিন তাদের এসব কথার ফায়সালা করে দেবেন। যেসব বিষয়ে তারা মতবিরোধ করছে। (সূরা বাকারা-১১৩)।

শানে নুযূল : ইহুদি সম্প্রদায় তাওরাত এবং খ্রিস্টানরা ইঞ্জিল পাঠ ও আলোচনা করে। উভয় কিতাবের মধ্যেই উভয় কিতাবের এবং উভয় রাসূলের সত্যতামূলক বর্ণনা রয়েছে। অথচ ইহুদি সম্প্রদায় বলে, নাসারাদের ধর্ম কোনো ভিত্তির ওপর স্থাপিত নয়, অনুরূপভাবে নাসারাও বলে ইহুদিদের ধর্ম কোনো ভিত্তির ওপর স্থাপিত নয়। কিতাবীদের পরস্পরের এরূপ উক্তি শ্রবণ করে আরবদের কাফিররাও নিজেদের বড়ত্ব প্রকাশ করে বলত, ইহুদি ও নাসারাদের উভয় ধর্মই ভিত্তিহীন, বরং আমরা সত্যের ওপর রয়েছি। তাদের এহেন উক্তির প্রতিবাদে আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাজিল করেন।

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن مَّنَعَ مَسَاجِدَ اللهِ أَن يُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ وَسَعَى فِي خَرَابِهَا
অর্থ : যে ব্যক্তি আল্লাহর মসজিদসমূহে তার নাম উচ্চারণ করতে বাধা দেয় এবং সেগুলোকে উজাড় করতে চেষ্টা করে, তার চাইতে বড় জালেম আর কে? এদের পক্ষে মসজিদসমূহে প্রবেশ করা বিধেয় নয়, অবশ্য ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায়। ওদের জন্য ইহকালে এবং পরকালে কঠিন শাস্তি রয়েছে।
(আয়াত- ১১৪)

শানে নুযুল: এই আয়াতের শানে নুযুল সম্পর্কে দু’ধরণের বর্ণনা রয়েছে-

১। ইহুদীরা যখন ইয়াহইয়া (আ.)-কে হত্যা করল তখন খৃষ্টানরা তার বদলা নেয়ার জন্য  উঠে পড়ে লাগল। এক পর্যায়ে তারা ইরাকের অগ্নিপূজক বাদশাহর নেতৃত্বে সিরিয়ার বাদশাহর তাইতাশের নেতৃত্বাধীনদের ওপরে আক্রমন করল। তারা বহুত ইহুদীদেরকে হত্যা করল এমন কী মসজিদে আকসার ওপরও আক্রমন করল। মসজিদে আকসার ভেতরে শুকর ও আবর্জনা ফেলে মসজিদকে নাপাক করে দিল। তাদের ব্যাপারেই এই আয়াত নাজিল হয়।

২। কেউ কেউ বলেন, এই আয়াতটির সম্পর্ক হুদায়বিয়ার সঙ্গে। অর্থাৎ রাসূল (সা.) যখন ওমরার উদ্দেশ্যে সাহাবায়ে কেরামের কাফেলা নিয়ে মক্কার দিকে রওয়ানা হোন তখন কাফেররা হুদায়বিয়া নামক স্থানে রাসূল (সা.)-কে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দেন। যার বিস্তারিত ঘটনা হাদিস ও ইতিহাসের কিতাবে বর্ণিত আছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াতটি নাজিল হয়।

وَلِلّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ فَأَيْنَمَا تُوَلُّواْ فَثَمَّ وَجْهُ اللهِ إِنَّ اللهَ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
অর্থ : পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। অতএব, তোমরা যে দিকে মুখ ফেরাও সেদিকেই আল্লাহ বিরাজমান। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞ। (আয়াত-১১৫)।

শানে নুযুল : এ আয়াতটি সম্পর্কে মুফাসসিরগণ লেখেন যে, যখন রাসূল (সা.) মক্কাতে ছিলেন তখন বাইতুল্লাহ শরিফের দিকে ফিরে নামাজ পড়তেন। ইহুদীরা মনে প্রাণে চাইত রাসূল (সা.) যেন মসজিদে আকসার দিকে ফিরে নামাজ পড়েন। কেননা আকসা ইহুদীদের কেবলা। কিছুদিন পর রাসূল (সা.) হিজরত করে মদিনায় ফিরে যান তখন আল্লাহর নির্দেশে ষোল কিংবা সতের মাস মসজিদে আকসার দিকে ফিরে নামাজ পড়েন। তাতে ইহুদীরা খুব আনন্দিত হলো আর পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, মুহাম্মাদ (সা.) যখন আমাদের কেবলা অনুসরণ করেছেন। নিশ্চয়ই কিছুদিন পর আমাদের ধর্মও অনুসরণ করবেন। কিন্তু রাসূল (সা.) মনে প্রাণে চাইতেন যাতে রাসূল (সা.) এর কেবলা বাইতুল্লাহর দিকে করে দেয়া হয়। পরে ষোল কিংবা সতের মাস পর আল্লাহ তায়ালা তাকে বাইতুল্লাহর দিকে ফিরে নামাজ পড়ার নির্দেশ দিলেন। যখন কেবলা পরিবর্তন হয়ে গেল তখন ইহুদিরা তিরস্কার করে বলতে লাগল মুহাম্মাদ (সা.) কেবলারই ঠিক নাই। তাদের এই তিরস্কারের জওয়াবে এই আয়াত নাজিল হয়। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে