সিলেটের যত ঐতিহাসিক স্থাপনা

ঈদ ভ্রমণ (সিলেট পর্ব- ১)

সিলেটের যত ঐতিহাসিক স্থাপনা

সজল জাহিদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১০:৫৬ ১৯ মে ২০১৯  

ক্বীন ব্রিজ

ক্বীন ব্রিজ

কারো কাছে ৩৬০ আউলিয়ার দেশ, কারো কাছে আধ্যাত্মিক রাজধানী, আবার কারো কাছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও লীলাভূমি। ঠিক তাই! প্রকৃতি যেন আপন হস্তে সাজিয়েছে সিলেটকে। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও সিলেটের রয়েছে প্রসিদ্ধ ইতিহাস। সিলেটে বসবাসকারী বিভিন্ন আদিবাসীদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি। যা যেকোনো ভ্রমণপিপাসুকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও রয়েছে দেখার মতো অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা। ঈদ ভ্রমণে সিলেটে গিয়ে এই স্থাপনাগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন!

হযরত শাহজালাল (র.) মাজার

সিলেটে প্রবেশ করে প্রথমেই চলে যেতে পারেন শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হযরত শাহজালাল (রা)-এর মাজারে। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকে মুখরিত থাকে মাজার প্রাঙ্গণ। অনেকেই মনোবাসনা পূরণ করতে জিয়ারত করে যান এই মাজার। ৩৬০ আউলিয়ার দেশ বলার কারণের সঙ্গে এই বিখ্যাত দরবেশ ও পীরের রয়েছে নিবির যোগসূত্র। হযরত শাহজালাল (র:) ছিলেন উপমহাদেশের একজন বিখ্যাত দরবেশ ও পীর। তিনি ছিলেন ওলিকুল শিরোমণি। সিলেট অঞ্চলে তার মাধ্যমেই ইসলামের প্রসার ঘটে। সিলেটের প্রথম মুসলমান শেখ বুরহান উদ্দিনের ওপর রাজা গৌর গোবিন্দের অত্যাচার এবং এর প্রেক্ষিতে হযরত শাহজালাল(র:) ও তার সফরসঙ্গী ৩৬০ আউলিয়ার সিলেট আগমন ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আর এই কারণে সিলেটকে ৩৬০ আউলিয়ার দেশ বলা হয়।

মাজার কমপ্লেক্সে প্রবেশ করলে প্রথমেই দেখা যাবে দরগাহ মসজিদ। যদিও ১৪০০ শতকে নির্মিত এই মসজিদটি বর্তমানে আধুনিক রূপ নিয়েছে। মসজিদের পাশেই রয়েছে মাজারে ওঠার সিঁড়ি। ওপরে উঠে মাজারে প্রবেশ করতে হবে গম্বুজবিশিষ্ট একটি হল ঘরের মধ্য দিয়ে। এই হল ঘরের ঠিক পশ্চিমের ভবনটি ঘড়িঘর। ঘড়িঘরের আঙিনার পূর্বদিকে ৩টি কবর রয়েছে। এই কবরগুলো হযরত শাহজালাল (রা.)-এর ঘনিষ্ঠ তিন সঙ্গীর। এর দক্ষিণ পাশে গ্রিলঘেরা ছোট্ট ঘরটি হযরত শাহজালাল (রা.)এর চিল্লাখানা। জনশ্রুত আছে, ২ ফুট চওড়া এই চিল্লাখানায় তিনি জীবনের ২৩টি বছর ধ্যানমগ্ন কাটিয়েছেন। এর উত্তরের প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়বে হযরত শাহজালাল (রা) এর সমাধি। ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও এখানে আরো রয়েছে ইয়েমেনের রাজা শাহজাদ আলী ও সিলেটের শাসনকর্তা মুক্তালিব খান উজিরের কবর। মাজারের পূর্ব পাশে একটু এগুলেই গজার মাছে ভরপুর একটি পুকুরের দেখা মিলবে। এছাড়া শতশত জালালী কবুতরের কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়াও মাজার কমপ্লেক্সের পশ্চিম পাশের একটি ঘরে দেখা মিলবে হযরত শাহজালাল (রা.)-এর ব্যবহৃত তলোয়ার, প্লেট, বাটিসহ নানা ব্যবহার্য জিনিসপত্র।

হযরত শাহজালাল (র.) মাজার

ক্বীন ব্রিজ

সিলেটের প্রবেশদ্বার বলা হয় ক্বীন ব্রিজকে। সুরমা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে এই স্থাপনাটি জানান দেয় যুগ-যুগান্তরের ইতিহাসের। এই ব্রিজটির রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব। ইতিহাস থেকে জানা যায়, গত শতকের তিরিশের দশকের দিকে আসাম প্রদেশের গভর্ণর মাইকেল ক্বীন সিলেট সফরে আসেন। তার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতেই এ ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়। ব্রিজটির নামকরণ করা হয় ক্বীনের নামে। লোহার তৈরি এই ব্রিজটিধনুকের ছিলার মতো বাঁকানো। ব্রিজটির দৈর্ঘ্য ১১৫০ ফুট এবং প্রস্থ ১৮ ফুট। ব্রিজটি এক নজর দেখার জন্য প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটক ভিড় জমান।

হযরত শাহ পরান (রা.)-এর মাজার

সিলেট শহর থেকে ১০ কিলোমিটার পূর্বে দক্ষিণগাছের খাদিম পাড়ায় রয়েছে অ্যাধ্যাত্মিক সাধনার আরেক মহান ব্যক্তি হযরত শাহ পরান (রা)-এর মাজার। শাহ পরাণ (রা.) ছিলেন হযরত শাহজালাল (রা) এর ভাগ্নে। মামার নির্দেশে শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে একটি বট গাছের নিয়ে আখড়া স্থাপন করে ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন শাহ পরাণ (র.)। আর সেই বিশাল বট গাছের ছায়াতলেই এখন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই মহান ধর্ম প্রচারক। মাজারে ওঠানামার জন্য উত্তর ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে সুদৃশ্য দুটি সিঁড়ি। ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু এই সিঁড়ি মোগল আমলে নির্মিত হয়েছে। এছাড়া মাজারের পশ্চিম দিকে রয়েছে মোগল আমলে নির্মিত একটি কারুকার্যময় মসজিদ। যেখানে একসঙ্গে ৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

গাজী বুরহান উদ্দীনের মাজার

সিলেট শহরের দক্ষিণ পূর্ব সীমান্তে সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত গাজী বুরহান উদ্দীনের মাজার। বুরহান উদ্দীন ছিলেন সিলেট বিভাগের প্রথম মুসলমান। প্রতিদিন শতশত দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীর আগমন ঘটে গাজী বুরহান উদ্দীনের ঐতিহাসিক বাড়িতে তার সমাধীতে। এটি সিলেটের অন্যতম পূণ্য তীর্থ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া এখানে আরো রয়েছে প্রাচীন শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্যের রাজা গৌড়-গোবিন্দের অত্যাচারে নিহত গাজী বুরহান উদ্দীনের ছোট শিশু গুলজারে আলমের মাজার।

জৈন্তাপুর রাজবাড়ি

জৈন্তাপুর রাজবাড়ি

সিলেট শহর থেকে মাত্র ১ ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত ইতিহাসের এক অনন্য স্বাক্ষী জৈন্তপুর রাজবাড়ি। ঐতিহাসিক রাজবাড়িটির বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে জৈন্তাপুর বাজার গড়ে উঠলেও এখনো পুরো এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে সেকালের অনেক গৌরবময় ঐতিহ্য। এছাড়া যে কারণে রাজ্যটির কুখ্যাতি ছিল, সেই নরবলির বেদি ও লাশ ফেলার কূপ এখনো রয়েছে বাড়িটির ভেতরে। অনন্য সৃষ্টি এই রাজবাড়ির বাইরের উঁচু দেয়ালটি সেকালে ভারতের রাজস্থান থেকে আমদানি করা ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। দেয়ালের গায়ে আঁকা তেজোদীপ্ত এক তরুণের অসাধারণ চিত্রকর্ম এখনও রাজাদের স্বাধীনচেতা মনোভাবের ঐতিহ্য বহন করছে। এছাড়া এখানে আরো রয়েছে দুর্লভ মেগালিথ পাথর, যা মৃত রাজ-রানিদের স্মৃতি হিসেবে বসানো হয়েছিল। এই বাজারের একটু ডান দিকের গলি দিয়ে অগ্রসর হলেই একটি বিশাল পুকুর ও এর উত্তর পাড়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি মন্দিরের অংশবিশেষ এবং তোরণের দেখা মিলবে। এছাড়াও এখানে বসে উপভোগ করতে পারবেন ওপারে ভারতীয় অংশের বিশাল খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের সৌন্দর্য। 

মণিপুরি রাজবাড়ি

সিলেটের মির্জাজাঙ্গালে অবস্থিত মনিপুরী রাজবাড়ি প্রাচীন স্থাপতকীর্তির অন্যতম নির্দশন। নগর এ ভবনের নির্মাণশৈলী সিলেট অঞ্চলের কৃষ্টি-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদিও বাড়িটির প্রধান ফটক, সীমানা দেয়াল, মনোহর কারুকাজের সিঁড়ি ও বালাখানার ধ্বংসাবশেষই বর্তমান মনীপুরী রাজবাড়ির স্মৃতি সম্বল। তবুও স্থাপনাটি সিলেটে বসবাসরত মনিপুরী সম্প্রদায়ের গভীর শ্রদ্ধা-ভক্তির স্থান। ঊনবিংশ শতাব্দিতে তৎকালীন মনিপুরী রাজ্যের তিন সহোদর রাজা চৌর্জিৎ সিং, মার্জিত সিং ও গম্ভীর সিং রাজবাড়িটি তৈরি করে এখানে বসবাস করেন। এখানে আরো দেখা যাবে একমণ ওজনের মন্দিরের একটি ঘণ্টা। যার গায়ে মনিপুরী ভাষায় লেখা আছে, ‘শ্রীহট্ট কুনোঙ্গী শ্রী মহাপ্রভুদা শ্রীলশ্রী পঞ্চযুক্ত মনিপুরে স্বরচন্দ কীর্ত্তি সিংহ মহারাজন্য কৎখিবী সরিকনি ইতিশকাব্দা ১৮০০ তারিখ ১৮ জ্যৈষ্ঠ’।

শ্রী চৈতন্য দেবের বাড়ি

সিলেট শহর থেকে জকি গঞ্জ বা বিয়ানীবাজারগামী যেকোনো বাস সার্ভিসে আপনি ঢাকা দক্ষিণ, তারপর ভ্যান বা রিকশা করে ঘুরে আসতে পারেন শ্রী চৈতন্য দেবের বাড়ি থেকে। কথিত আছে, চৈতন্য (বিশ্বম্ভর মিশ্র) বাঙালির আধ্যাত্বিক জীবনে এক বৈপ্লবিক যুগের সূচনা করেন। তার ডাকে সাড়া দেয় দেশের আপামর জনগণ। এছাড়া চৈতন্য দেবের পুত্র বৈষ্ণব পদাবলীর অন্যতম লেখন ছিলেন। এই বাড়িটি আজো তাদের স্মৃতি বহন করে চলছে।

এছাড়াও সিলেট শহরে রয়েছে আমজাদ আলীর ঘড়ি, নাজিমগড় গার্ডেন রিসোর্ট,শুকতারা প্রকৃতি নিবাস, ড্রিমল্যান্ড পার্কসহ বেশকিছু রিসোর্ট ও পার্ক। যেখানে আপনি অবকাশযাপনের সাথে উপভোগ করতে পারবেন প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্য।

নির্দেশনা

রাজধানী ঢাকা থেকে বেশকিছু বিলাসবহুল বাস প্রতিদিন যাতায়াত করে সিলেটে। এছাড়া কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে ট্রেনে করেও যেতে পারেন। একইসঙ্গে বিমান ভ্রমণের স্বাদ নিতে চাইলে ঢাকা থেকে বিমানেও যেতে পারেন সিলেটের সৌন্দর্য অবলোকন করতে। থাকা খাওয়ারও তেমন কোনো চিন্তা নেই সিলেট শহরে। শহরটিতে বেশকিছু উন্নতমানের হোটেল রয়েছে। যেখানে আপনি নিজের সাধ্যের ভেতরেই রুম বুকিং ও খাবার খেতে পারবেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে