Alexa সিরাতুল মুস্তাকিমের এতো এতো দাবিদার কেন?

সিরাতুল মুস্তাকিমের এতো এতো দাবিদার কেন?

আল্লামা মাহমুদুল হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:৪০ ২৬ জানুয়ারি ২০২০  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

মুমিনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহ তায়ালার দেয়া আমানত। এ আমানতের খেয়ানত করার অধিকার কারো নেই।

যে সময়কে যে কাজের জন্য আল্লাহ তায়ালা নির্ধারিত করে দিয়েছেন সে সময়কে সে কাজেই ব্যবহার করতে হবে। নামাজের সময় নামাজ, রোজার সময় রোজা, হজের সময় হজ, নফল এবাদতের সময় নফল এবাদত, ব্যক্তিগত কাজের সময় ব্যক্তিগত কাজ, পারিবারিক কাজের সময় পারিবারিক কাজ, সামাজিক কাজের সময় সামাজিক কাজ।

আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গেই আল্লাহ তায়ালার হুকুম জুড়ে আছে। আমাদের সুচিন্তিত বিবেকই আমাদের নির্দেশনা দিতে পারে, এ মুহূর্তে আমার ওপর কোন কাজের হুকুম আছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে। প্রিয় নবী (সা.), সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন ও আকাবির-আসলাফের জীবন-চরিত অনুসরণ করলেই আমরা সহজে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারব।

সময়মতো প্রতিটি আমল না করলে বা কোনো গুনাহ করলে আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হন। আর আল্লাহ তায়ালা আমার মনের মধ্যে এ বিষয়টি ঢেলে দেন যে, এখন আমার কী করা উচিত ছিল অথচ আমি কী করে বসেছি? কিন্তু এভাবে সবার মনে আল্লাহ তায়ালা এ সতর্কবার্তা পাঠান না। যার প্রতি ভালোবাসার সম্পর্ক তার মনেই এ সতর্কবার্তা পাঠান।

হজরত সুফিয়ান সাওরি (রহ.) অনেক বড় ফকিহ, মুহাদ্দিস ও আরিফ বিল্লাহ ছিলেন। মৃত্যুর পর তার জান্নাত পাওয়ার স্বপ্ন অনেক মানুষ দেখেছে। তার জন্মস্থান কুফায় হওয়া সত্তেও তাকে সাওরি বলা হয়। তিনি একবার মসজিদের ঢোকার সময় অথবা মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় সুন্নতের খেলাফ করেছিলেন। তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে ডেকে বলেছিলেন, হে সাওর! অর্থাৎ হে বলদ! তুমি সুন্নতের খেলাফ করেছ কেন? আল্লাহ তায়ালার এ সতর্কবার্তা পেয়ে তিনি আবার বের হয়ে সুন্নত মতো মসজিদে প্রবেশ করেছেন।

আলেমদের উচিত মানুষের সামনে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা। কারণ, তাদেরকে সবাই লক্ষ করে। কী করেন? কীভাবে করেন? এসব মানুষ লক্ষ করে। আমার জীবনেও এমন একটি দুর্ঘটনা আছে। কোনো এক সফরে এক মাদরাসায় গিয়ে উপস্থিত হওয়ার পর আমি আমার পায়ের মোজা খুললাম। অসর্কতায় প্রথমে ডান পায়েরটা খুলে ফেলেছি। ততক্ষণাৎ আমার মনে প্রচণ্ড বাড়ি খেল। আরে! আমি তো সুন্নতের খেলাফ করে ফেলেছি। আমি তখন আবার মোজা পরলাম। একটু ঘুরে এসে আবার মোজা খুলে  রাখলাম।

আমার এ ঘটনাটা ওই মাদরাসার একটা ছোট ছেলে দেখেছে। সে দেখে এতোই প্রভাবিত হলো যে, অবুঝ শিশু হওয়া সত্তেও আমার সুন্নতের পাবন্দি দেখে আমার কাছে বাইআত হওয়ার জন্য উতলা হয়ে উঠেছে। আমার তখন একটা বিষয় মাথায় এলো, এ ছেলেটি তো জীবনে কখনো আমার এ আমলটির কথা ভুলতে পারবে না। তাই আলেমদের উচিত সবসময় সুন্নতের ব্যাপারে সতর্ক থাকা। যেন এর ইতিবাচক প্রভাব সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।

হজরত সুফিয়ান সাওরি (রহ.) এতো বড় আল্লাহ ওয়ালা হওয়া সত্তেও সামান্য সুন্নতের খেলাফ করার কারণে আল্লাহ তায়লা তাকে বলদ বলে সম্বোধন করেছেন। আমাদের প্রতিদিন কতো কতো সুন্নত ছুটে যাচ্ছে! আমরা কি কখনো একটু ভাবি, আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রতি কতটুকু অসন্তুষ্ট হন? আল্লাহ তায়ালা আমাদের বোঝার তওফিক দান করুন।

আমি একবার বিদেশ সফরে যাই। যে দেশে গেছি সেখানে এখনো একটা নিয়ম চালু আছে, কোনো বিদেশি আলেম বা বড় কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব সেখানে গেলে সব ধর্মের ব্যক্তিরা সেখানে উপস্থিত হয়। পরস্পর মতবিনিময় করে। যার যার ধর্ম নিয়ে আলোচনা করে। আমাকে পেয়ে তারা সবাই মিলে এমন এক প্রশ্ন করে বসল যে প্রশ্নের সম্মুখীন আমি জীবনে আর কখনো হইনি। প্রশ্নটা যখন তারা করছিল তখন আমি কাঁপছিলাম, এ প্রশ্নের উত্তর আমি কোথায় পাব? আল্লাহ তায়ালার এটা একটা বড় কারিশমা। তার কোনো বান্দা এমন পরিস্থিতির সামনে পড়লে তিনিই এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর তার মনে ঢেলে দেন। তিনি নিজ দায়িত্বে তার দ্বীনকে সমুন্নত রাখেন কঠিন থেকে কঠিন সব মুহূর্তে।

তারা প্রশ্ন করল, আপনি আপনার ধর্ম ইসলামকে সিরাতুল মুস্তাকিম বলে দাবি করেন, ইহুদিরা তাদের ধর্মকে সিরাতুল মুস্তাকিম দাবি করে, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্মকে সিরাতুল মুস্তাকিম দাবি, হিন্দুরা তাদের ধর্মকে সিরাতুল মুস্তাকিম দাবি করে। এক সিরাতুল মুস্তাকিমের এতো এতো দাবিদার কেন?

প্রশ্নটা করার সময় আমার ভেতরে কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু প্রশ্ন শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আমার মাথায় মানতেকের একটা কায়দা ঢুকে গেল। অথচ আমার এ চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের তালিমি জীবনে কখনো আমি মানতেকের ওই কায়দাটাকে গুরুত্ব দিইনি। ছাত্রবেলায় পড়ার খাতিরে পড়েছি। উস্তাদরা পড়িয়েছেন ঠিক, বুঝিনি কিছুই। কখনো এমন কায়দা এতো মারাত্মকভাবে প্রয়োজন পড়ে যাবে কখনো কল্পনাও করতে পারিনি। কায়দাটা হলো, কয়েকটি জানা বিষয়কে মিলিয়ে অপর একটি অজানা বিষয়ের সন্ধান পাওয়া যায়।

আমি এ কায়দার ওপর ভিত্তি করে বললাম, অজানাকে জানার তিনটা পদ্ধতি সর্বস্বীকৃত। মুসলমান, ইহুদি, খ্রিস্টান সবার ধর্মমত অনুযায়ী এ পদ্ধতিগুলো স্বীকৃত।

(এক) কেউ তোমাকে কোনো একটা বিষয় জানাবে। অর্থাৎ অজানাকে জানার উপায় হলো, যে জানে সে যে জানে না তাকে জানিয়ে দেবে। তবে শর্ত হলো, যে জানাবে সে মিথ্যুক হতে পারবে না। সে বিশ্বস্ত হতে হবে। যে সংবাদ দিচ্ছে সে বিশ্বস্ত হলে তার কথাও বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

(দুই) জানার আরেকটা উপায় হলো ইতিহাস। ইতিহাস পড়লে অনেক অজানা বিষয় জানা যায়। এটাও সর্বস্বীকৃত উপায়। তবে এটার জন্যও শর্ত হলো, ইতিহাস সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে।

(তিন) পঞ্চ ইন্দ্রীয়ের সাহয্যে কোনো কিছু অবলোকন করে তার পরিচয় জানা। যেমন একটা আপেল হাতে নিলেই তার আকৃতি, রঙ দেখে, তার স্বাদ চেখে বলে ফেলা যায় এটি আপেল। এটি খেজুর। এটি আম।

এ ভূমিকার পর বললাম, একশ মনীষীর জীবনীগ্রন্থসহ পৃথিবীর বড় বড় পণ্ডিত-মনীষীদের অভিমত অনুযায়ী পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও শ্রেষ্ঠ মানব হলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সব ধর্মের মানুষ একথা মানে মুহাম্মদ (সা.)-ই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্যবাদী; যার পুরো জীবনে একটিও মিথ্যা নেই। তিনি সংবাদ দিয়েছেন, ইসলাম সিরাতুল মুস্তাকিমের ধর্ম। সুতরাং এ সংবাদ কখনো মিথ্যা হতে পারে না।

কোরআনুল কারিম একটি জীবন্ত ইতিহাস। নবীদের ইতিহাস। পৃথিবীর সৃষ্টির ইতিহাস। কোরআনের ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোতে কোনো প্রকারের সংশয়ের অবকাশ নেই। কোরআনে বর্ণিত ইতিহাস সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ইতিহাস। কারণ আল্লাহ তায়ালা দেয়া সংবাদ এগুলো। অন্যান্য ধর্মগ্রন্থগুলো একটা আরেকটার সঙ্গে মিলে না। কিন্তু কোরআনের এমন একটা কপিও পাওয়া যাবে না যেটাতে চুল পরিমাণ ব্যবধান আছে অন্যান্য কপির সঙ্গে। তাই কোরআনের চেয়ে বিশুদ্ধ কোনো কিতাব এ পৃথিবীতে নেই। শুদ্ধতম ইতিহাসসমৃদ্ধ এ কিতাব বলে, ইসলাম হলো সিরাতুল মুস্তাকিমের ধর্ম।

ইসলাম এমন একটি ধর্ম যার একটি হুকুমও মিথ্যা বা অবিশ্বাস্য প্রমাণ করা সম্ভব নয়। ইসলামের হুকুম হলো, এবাদত করা, সৎ কাজ করা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা, সত্য কথা বলা, পরস্পরে সহমর্মিতা প্রদর্শন করা, মিথ্যা না বলা, অন্যায় কাজ না করা, জুলুম না করা মানবজীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ইসলাম এমন মহানুভতার কিছু হুকুম বেঁধে দিয়েছে, যেগুলো অস্বীকার করা বা ত্রুটিযুক্ত বলে আখ্যা দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ইসলামের মৌলিকত্ব জানলে, দেখলে, উপলব্ধি করলেই বলে দেয়া যায় এই ধর্ম কিছুতেই সিরাতুল মুস্তাকিম বহির্ভূত হতে পারে না।

আমার এ তিনটি উত্তর শুনে ইহুদি খ্রিস্টানের প্রতিনিধি দলটি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমাদের কালিমা পড়িয়ে দাও। সত্যি বলতে মানুষ ইসলাম কী জানেই না। পুরো পৃথিবীর মানুষ ইসলাম সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। ইসলামের মৌলিকত্ব না বোঝার কারণে তারা ইসলাম থেকে দূরে সরে আছে। কারণ আমরা মুসলমানরা তাদের পর্যন্ত ইসলামের সঠিক দাওয়াত পৌঁছাতে পারছি না।

আরেকটা ঘটনা বলি, আমেরিকায় এক আলেম আরেক আলেমকে দেখে একে অপরকে সালাম দিলেন, মুসাফাহা করলেন, মুআনাকা করলেন। তাদের এ কাণ্ড এক আমেরিকান খ্রিস্টান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন এগুলো কী করলেন আপনারা?

তারা বললেন, আমরা একে অপরের জন্য শান্তি ও কল্যাণের দোয়া করলাম। তারপর একজন অপরজনের জন্য ক্ষমার দোয়া করলাম। অতঃপর একজনের প্রতি অপরজনের ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রার্থনা করলাম মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে। লোকটি অবাক হয়ে বললেন, ইসলাম ধর্মের হুকুম এতো সুন্দর? আমাকে এখনই মুসলমান বানিয়ে নিন।

এরকম লাখ লাখ দুর্বলমনা মানুষ আছে পৃথিবী জুড়ে যারা ইসলামের মাহত্ম্য জানে না। ইসলামের সৌন্দর্য আর বিপুলতার ব্যাপারে তারা অজ্ঞ। আমরা তাদের ইসলামের সঠিক বার্তাটি ঠিকভাবে পৌঁছিয়ে দিতে পারছি না। আমাদের দায়িত্বের বিপুলতার ব্যাপারে অসচেতনতা, আমাদের দৈন্যতা, আমাদের অকর্মন্যতা, আমাদের যোগ্যতাহীনতার কারণে সারা পৃথিবীতে মানুষ ইসলামের সৌন্দর্যের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকা সত্তেও আমরা তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতে পারছি না। এমনকি একই কারণে দুর্বলমনা মুসলমানরাও বিপুলহারে খ্রিস্টান হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হলো, আগে আমাদের নিজেদের ঈমান পরিশুদ্ধ করা, সুন্নতি জীবন গঠন করা এবং সেসব মানুষের দরদ বুকে নিয়ে দাওয়াতি কার্যক্রমের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করা।

মহান রাব্বুল আলামিন কোরআনের এক আয়াতে বলেছেন, ‘হে নবী! আমার বান্দারা যদি আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে তাহলে বলে দিন আমি অতি নিকটেই আছি।’ এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বান্দাদের ব্যাপারে বলেছেন যে, তিনি তার প্রিয় বান্দাদের খুবই কাছে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা সেইসব বান্দাদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি  রাখেন সবসময়। যেন তিনি সবসময় তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।

সুবহানাল্লাহ! ইশকের এ এক এমন নজির যা যে কোনো আশেককে পাগল করার জন্য যথেষ্ট। কোনো আশেক যদি জানতে পারে, তার মাশুক তার দিকেই সবসময় তাকিয়ে থাকে, তাকে নিয়েই ভাবতে থাকে তাহলে সেই আশেকের মনে কী বিপুল আনন্দের ঝর্ণা বয়ে যাবে! তার তো একদম পাগল হয়ে যাওয়ারই দশা হওয়ার কথা!

আল্লাহ তায়ালা এতো মহান রব হওয়ার পরেও, এতো বিরাট ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার পরেও, এতো বিশাল সাম্রাজ্যের রাজাধিরাজ হওয়া সত্তেও একজন সামান্য আল্লাহ পাগল আশেকের প্রতি এতোটা গভীর দৃষ্টি, এতো ভালোবাসা! অথচ আমরা একবারও ভাবি না, যে আল্লাহ আমাকে এতো ভালোবাসছেন তার জন্য আমি কী করছি? তার সত্তার সম্মান-মর্যাদা কতটুকু রক্ষা করতে পারছি? আমি সামান্য একজন দাস হওয়ার পরও আমাকে এভাবে যিনি ভালোবাসছেন তার দাসত্ব আমি কি সঠিকভাবে পালন করছি? আমি কি তার ভালোবাসারই সাড়া দিচ্ছি? তার ভালোবাসার দাবি ঠিকভাবে আদায় করছি?

হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে আপনার মহব্বতের স্বচ্ছ উপলব্ধি দান করুন। আমিন!

লেখক : প্রিন্সিপাল, জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ি, ঢাকা। আমীর, দাওয়াতুল হক, বাংলাদেশ। সংগ্রহ : নুসরাত জাহান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে