পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর

সিনেমাভ্যান কর্মী থেকে টাকার কুমির আইইএম’র আক্তার

দেলোয়ার মহিন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২২:০৮ ১৫ এপ্রিল ২০১৯   আপডেট: ০৯:৩৯ ১৬ এপ্রিল ২০১৯

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের ইউনিট প্রজেক্টশনিস্ট (গ্রেড-১৭) আক্তারুজ্জামানের দুর্নীতির কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে আইইএম প্রকল্প। অধিদফতরের সাবেক পরিচালক গণেশ চন্দ্র সরকারের ছত্রছায়ায় আইইএম ইউনিটের যত ধরনের সরকারি ও বিদেশি দাতা সংস্থার বাজেট সংক্রান্ত কাজ, সবই বাগিয়ে নেন এই আক্তারুজ্জামান। এখনো চলছে তার রাম রাজত্ব।

গেল ২২ বছর ধরে ওপি, জিওবি, আরএফপি ও জাইকা, ইউএন এফপি, ইউনিসেফ, বিকেএমআই, ইউএসআইডি এবং ডব্লিউএইচও দাতা সংস্থাসহ আরো বিভিন্ন সংস্থার প্রায় ২৩০ কোটি টাকার অর্থ সংশ্লিষ্ট কাজের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। 

আইইএম ইউনিটের সব কর্মচারীর অর্থ সংশ্লিষ্ট নথি ক্ষমতা দেখিয়ে আক্তারুজ্জামান রেখেছেন নিজের কবজায়। বিভিন্ন ফাইলে নামমাত্র নোট রেখে, ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে দাতা সংস্থা ও সরকারি অর্থের হরিলুট খুলে বসেছেন তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের বিশেষ অনুতদন্ত-১ এ অভিযোগের এসব নথিপত্র রয়েছে। বর্তমানে এক পরিচালককে ম্যানেজ করে আক্তার দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

আক্তারুজ্জামান প্রায় ২২ বছর ধরে একই টেবিলে বসে দুর্নীতির স্বর্গ সাজিয়েছেন বলে দুদকের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে।  

ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল থানাধীন আহমেদাবাদ গ্রামের মো. খালেকের ছেলে আক্তারুজ্জামান। ১৯৯০ সালে এসএসসি পাশের পর বাবার দোকানে কাজ করতেন। গ্রামে একটি চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৯৯৩ সালে ঢাকায় আসেন আক্তার। পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরে কর্মরত এক নিকট আত্মীয়ের হাত ধরে ১৯৯৪ সালে আইইএম ইউনিটের প্রজেক্টশনিস্ট পদে ১১২৫ টাকা বেতনে চাকরি নেন। চাকরির ধরণ ছিল ঢাকা ও এর আশেপাশের জনবহুল এলাকায় সিনেমা ভ্যানে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি প্রর্দশন। ওই কাজের পাশাপাশি ২০০১ সাল থেকে অফিসের নথিপত্রের কাজ করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের আইইএম ইউনিটের তৎকালীন পরিচালক গণেশ চন্দ্র সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে শুরু করেন এসব কর্মকাণ্ড। যা দিনে দিনে ফুলেফেপে হয়েছে দুর্নীতির মহাসাগর। 

অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল, এ ১০ বছরে আক্তার শত কোটি টাকার মালিক হন। নিজস্ব একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন তার অপকর্ম। মারধর ও হত্যার ভয় দেখিয়ে সবাইকে জব্দ করে রাখেন আক্কারুজ্জামান।  

আক্তারুজ্জামানের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক সিবিএ নেতা এ প্রতিবেদককে বলেন, আক্তারের চাকরি আমার হাত দিয়ে হয়েছে, কিন্তু চাকরি শেষে আমি চায়ের দোকান করি আর আক্তার টাকার কুমির হয়েছেন। বানিয়েছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এসব দেখেও যেন না দেখার ভান করে, ক্ষোভ ওই সিবিএ নেতার। 

আইইএম ইউনিটের ২৩০ কোটি টাকার ওপি অনুযায়ী বিজ্ঞাপনগুলো সরাসরি জাতীয় পত্রিকায় দেয়ার বিধান থাকলেও, নিজস্ব ব্যক্তি কেন্দ্রিক বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কমিশনের মাধ্যমে কয়েক বছরে শত কোটি টাকা কামিয়েছেন আক্তার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেয়া বিজ্ঞাপনের বিল-ভাউচার তারই প্রমাণ। এসব বিষয়ে যেন অডিট আপত্তি না আসে, সে জন্য অডিট টিমকে ম্যানেজ করে রাখেন বলে অভিযোগ আছে। 

আইইএম ইউনিটের ফাইল সরবরাহের বেশির ভাগ কাজ আক্তারুজ্জামান করেন তার প্রমাণ ও বিভিন্ন কাগজপত্র অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। ক্রয়ের নামে ভুয়া স্টক রেজিস্টার রিসিভ এবং বিল ভাউচার দাখিল করে সরকারি অর্থ লুটপাট করেছেন, যার প্রমাণ রেজিস্টারে উল্লেখিত ব্যক্তির নাম, পদবী এবং স্বাক্ষর যাচাই করলে পাওয়া যাবে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। 

এসব বিষয়ে অভিযুক্ত আক্তারুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলতে কাওরান বাজারে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের  অফিসে গেলে অভ্যর্থনা ডেস্ক থেকে জানানো হয়, সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। 

পরবর্তীতে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে এসব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন আক্তার। পরে প্রতিবেদকের দু-একটা প্রশ্ন শুনেই আক্তারুজ্জামান বলেন, আপনি যা বলবেন আমি বুঝতে পেরেছি। নিউজ করবেন না, অফিসে আসেন আমি দেখতেছি কি করা যায়।

এ বিষয়ে কথা বলতে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে জানানো হয় তিনি মন্ত্রণালয়ে মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন। দু’দিন যোগাযোগ করেও একই বক্তব্য পাওয়া যায় তার দফতর থেকে।

আক্তারুজ্জামানের দুর্নীতির আরো খবর থাকছে পরের পর্বে।

ডেইলি বাংলাদেশ/ডিএম/এলকে/এসআই