সাহিত্য দিয়ে দেশের সেবা করছি

সাহিত্য দিয়ে দেশের সেবা করছি

ড. তপন বাগচী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:৪২ ৪ মে ২০২০   আপডেট: ১৫:২৭ ৭ মে ২০২০

অলঙ্করণ: আশিস সরকারের প্রোট্রেইট অবলম্বনে আদিল হোসেন

অলঙ্করণ: আশিস সরকারের প্রোট্রেইট অবলম্বনে আদিল হোসেন

নব্বই দশকের শীর্ষস্থানীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. তপন বাগচী। জন্ম ১৯৬৮ সালের ২৩ অক্টোবর মাদারীপুরে। বাবা তুষ্টচরণ বাগচী ও মা জ্যোতির্ময়ী বাগচী। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় এমএ-পিএইচডি। বর্তমানে বাংলা একাডেমির উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। ‘আমার ভেতর বসত করে’, ‘কলঙ্ক অলঙ্কার হইল’, ‘দিয়েছি এই বুকের আসন’, ‘কূলের আশায় কূল হারাইছি’ এমন অনেক বিখ্যাত গানের রচয়িতা তিনি। তার উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ: শ্মশানেই শুনি শঙ্খধ্বনি, কেতকীর প্রতি পক্ষপাত, অন্তহীন ক্ষতের গভীরে, সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল। প্রবন্ধগ্রন্থ: সাহিত্যের এদিক-সেদিক, সাহিত্যের কাছে-দূরে, চলচ্চিত্রের গানে ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, লোকসংস্কৃতির কতিপয় পাঠ, বাংলাদেশের যাত্রাগান : জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত, মুক্তিযুদ্ধে গোপালগঞ্জ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ : চন্দ্রাহত অভিমান, নির্বাচন সাংবাদিকতা, নজরুলের কবিতায় শব্দালঙ্কার, তৃণমূল সাংবাদিকতার উন্মেষ ও বিকাশ। পুরস্কার ও স্বীকৃতি: তার সময়ের সবচেয়ে বেশি পুরস্কারে ধন্য হয়েছেন তিনি। গান লিখে তিনি ৪বার পেয়েছেন স্টান্ডার্ড চার্টার্ড দ্য ডেইলি স্টার সেলিব্রেটিং লাইফ গীতিকার পুরস্কার (২০১৯, ২০১৬, ২০১৪, ২০১৩)। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য পদক (২০২০), নজরুল পুরস্কার (চুরুলিয়া, ২০১৯), নজরুল অ্যাওয়ার্ড  (মেমারি, ২০১৯) অগ্রণী ব্যাংক বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১৮), কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার (২০১৭), সুফিসাধক আরকুম শাহ স্মৃতি পদক (২০১৭),  অনুভব বহুমুখি সমবায় সমিতি সাহিত্য পদক (২০১৩);  সাংস্কৃতিক খবর সম্মাননা (২০১২); নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার (কোলকাতা, ২০১১); ২ বার বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ফেলোশিপ (২০১২ ও ২০১০), মহাদিগন্ত সাহিত্য পুরস্কার (কোলকাতা, ২০০৮); মাইকেল মধুসূদন পদক (২০০৮), এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৮); জেমকন সাহিত্য পুরস্কার (২০০৮); নটসম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস স্মৃতি পদক (২০০৮); পাক্ষিক ‘মুকসুদপুর সংবাদ’ সম্মাননা (২০০৭); জসীমউদ্দীন গবেষণা পুরস্কার (১৯৯৬); (২৮) মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১)। এয়ড়া জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের আরও পদক-পুরস্কার রয়েছে তার সংগ্রহে।

তপন বাগচীকে নিয়ে সাহিত্য পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ এবং  গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। তার পঞ্চাশ বছরকে কেন্দ্র করে বীরেন মুখার্জীর ‘দৃষ্টি’, অনাদিরঞ্জন বিশ্বাসের ‘বাকপ্রতিমা’, নীলাদ্রিশেখর সরকারের ‘কথাকৃতি’ এবং রুবেল আনছারের ‘রিভিউ’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।  তার উপর রচিত হয়েছে পাঁচটি গ্রন্থ: শ্যামাপ্রসাদ ঘোষের ‘শিশুসাহিত্যে তপন বাগচী বর্ণময় আলোকদ্যুতি’, হরিদাস ঠাকুরের ‘কবি তপন বাগচীর মনন-দর্শন’, ড. অনুপম হীরা মণ্ডলের ‘সাহিত্যের তপন বাগচী- বিচিত্র বিভাকর’, মনীষা কর বাগচীর ‘মূলসন্ধির কবি তপন বাগচী- নিবিড় অনুধ্যান ও নরেশ মণ্ডলের ‘তপন বাগচীর সাহিত্য- চকিত বীক্ষণ’। তার উপর আরো কিছু গবেষণা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সমকালের আলোচিত এই সাহিত্যব্যক্তিত্বের সমৃদ্ধ ঝুলি থেকে সঞ্চয়ের প্রয়াসে মুখোমুখি হয়েছিলেন সাংবাদিক ও কথাশিল্পী রনি রেজা

 

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনার লেখার রসদ কিভাবে সংগ্রহ করেন?

তপন বাগচী: খুব কঠিন প্রশ্ন। তবে এইটুকু বুঝি চোখ কান খোলা রাখলে রসদের অভাব হয় না। চোখ খুলে প্রকৃতিকে পড়তে হয়। মন খুলে মানুষকে পড়তে হয়। তবেই রসদ চলে আসে। সৃজনশীল রচনার রসদ তো অনুভব ও উপলব্ধি থেকেই আসে। মানুষের প্রতি, দেশের প্রতি প্রগাঢ় প্রেম থেকেই তো রসদ সংগ্রহ করা যায়। এর জন্য আমেরিকা-কানাডা ঘুরতে হয় না। কেবল প্রিয় দেশের প্রতি চোখ বুলালেই হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ: এবার দেশীয় সাহিত্য নিয়ে শুনতে চাই। কোনো অতৃপ্ততা আছে কি?

তপন বাগচী: সাহিত্য দেশকালের ঊর্ধ্বে। ভাষার কারণে একটা দূরত্ব তৈরি হয় বটে। অনুবাদকের কল্যাণে সেই ঘাটতি আংশিক লাঘব হয়। আমি এখনো বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যেরই পাঠক। বাংলাসাহিত্য এখনো দুর্বল হয়ে ওঠেনি। জীবিত লেখকদের মধ্যেই যদি বলি, এখনো আমাদের একজন আহমদ রফিক আছেন, যতীন সরকার আছেন, আনিসুজ্জামান আছেন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আছেন, সনৎকুমার সাহা আছেন, শামসুজ্জামান খান আছেন, সুব্রত বড়ুয়া আছেন, আবুল আহসান চৌধুরী আছেন, স্বরোচিষ সরকার আছেন। কবিতায় আসাদ চৌধুরী, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, মাহবুব সাদিক, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, অসীম সাহা, আবিদ আনোয়ার আছেন। কথাসাহিত্যে হাসান আজিজুল হক, আবুবকর সিদ্দিক, রাবেয়া খাতুন, সেলিনা হোসেন, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, মঈনুল আহসান সাবের, ইমদাদুল হক মিলন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, হরিপদ দত্ত, হরিশংকর জলদাস আছেন। শিশুসাহিত্যে সুকুমার বড়ুয়া, হায়াৎ মামুদ, তপন চক্রবর্তী, কাইজার চৌধুরী, লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, আসলাম সানী, ফারুক নওয়াজ, সুজন বড়ুয়া, রাশেদ রউফ আছেন। এদের লেখা পাঠ করেই তো জীবন পার করতে পারব। আমার কেন অতৃপ্তি থাকবে?

ডেইলি বাংলাদেশ: আমাদের দেশের লেখকরা বিশ্বসাহিত্যে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারছেন না। এর কারণ কী? আপনার মতামত জানতে চাই।

তপন বাগচী: এর একমাত্র কারণ অনুবাদ সংকট। বিশ্বমানের সাহিত্য রচয়িতা আমাদের দেশে রয়েছেন। অনুবাদের মাধ্যমে তাদেরকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা হলেই তার স্বীকৃতি আসবে। অনুবাদের সংকট কাটিয়ে লালন সাঁই, হাসন রাজা, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল ইসলাম কি বিশ্বদরবারে পৌঁছেননি মনে করছেন? আমাদের দেশের শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, সেলিনা হোসেনের সাহিত্য যতটুকু অনূদিত হয়েছে, তা কি বিশ্বসাহিত্যের অংশ নয়? এদের প্রভাবকে অস্বীকার করার সুযোগে আছে বলে আমি মনে করি না।

ডেইলি বাংলাদেশ: আপনার লেখক-জীবনে অনেক মজার ঘটনা আছে। সে সম্পর্কে বলুন।

তপন বাগচী: বিখ্যাত লেখকের জীবনে অনেক মজার ঘটনা ঘটে। আমি সে ধরনের খ্যাতি অর্জন করিনি। আমি যখন স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমার কয়েকটি বই বেরিয়ে গেছে। আমাদের ক্লাসের খুব জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী। চমৎকার বলেন তিনি। মনে হলো, স্যার লিখলে ভালো করবেন। তার প্রতিটি কথাই তো কবিতা। এই স্যার কেন কবিতা লিখবেন না? বিষয়টি ভাবতে-ভাবতে একদিন স্যারের কক্ষে গিয়ে স্যারকে কবিতা লেখার অনুরোধ জানাই। স্যার মুচকি হেসে বললেন, ‘আমি তো পড়েই আনন্দ পাই। সবাইকে লিখতে হবে কেন? এই তো কালকে এসএম হলে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে গিয়েছিলাম। ফল ঘোষণার পরে ছেলেরা ধরল কবিতা পড়তে। আমি তো তোমার কবিতা আবৃত্তি করে এসেছি। এই যে তোমার বই আমার ড্রয়ারে।’ স্যার টেনে বইটি বের করে দেখালেন! এই তো আমার জন্য পরম পাওয়া! আমার কবিজীবনের এক বড় স্বীকৃতি। মজার ব্যাপার হলো, অবসরে যাওয়ার পরে স্যার কবিতা লিখছেন। কবিতার বইও বেরিয়েছে। এটি আমার জীবনের এক মজার ঘটনা বলেই মনে করি। একই ক্লাসে আমাদের পড়াতেন আখতার সুলতানা আপা। তিনি একদিন ক্লাসেই বলে ফেললেন, ‘আজ সকালে আমার মেয়েকে তোমার গল্প পড়ে শুনিয়েছি। ওর ভালো লেগেছে।’ কয়েকদিন আগে আমার ‘শুভর শখের গোয়েন্দাগিরি’ বইটি আপাকে দিয়েছিলাম। আপা সেটি পড়েছেন এবং তার মেয়েকে পড়ে শুনিয়েছেন। এটিও আমার জন্য অনেক বড় স্বীকৃতি। এই দুটি মজার ঘটনা আমার সাহিত্যজীবনের প্রেরণাদায়কও বটে!

ডেইলি বাংলাদেশ: লেখক-জীবনে কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে কি?

তপন বাগচী: প্রতিবন্ধকতা সবার জীবনেই থাকে। সেগুলো পেরিয়ে আসার নামই জীবন। আমার যখন শুরু করি, তখন তো আর ফেসবুক ছিল না! অশুদ্ধ বাক্য লিখেও নিজের নাম প্রচারের সুযোগ ছিল না। ডাকযোগে লেখা পাঠিয়ে বসে থাকতাম। সব লেখা কি আর ছাপা হতো! সাহিত্যপৃষ্ঠা প্রকাশের দিন, নিজের লেখা খুঁজে না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসতাম। বন্ধুরা বলত যে, পরিচয় না থাকলে লেখা ছাপাবে না। কিন্তু আমার তো পরিচিত হতেই লজ্জা লাগে। নিজের তো কোনো পরিচয় নেই। গ্রাম থেকে উঠে আসা কলমচি একজন। আমাকে কেন পাত্তা দেবেন! লেখা ছাপা না হলে কী-ই বা পরিচয় দেব! একবার দৈনিক বাংলায় উঠে আহসান হাবীবকে দূর থেকে উঁকি মেরে দেখেই ফিরে এসেছি। লেখা রেখে আসার সাহস হয়নি। ডাকেই তখন লেখা পাঠাই। লেখা তো ছাপা হয় না! কী করি? মনে হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ঠিকানা দেখলে ছাত্র মনে করে গুরুত্ব নাও দিতে পারে। তাই আজিমপুরের এক পরিচিত বাসার ঠিকানা ব্যবহার করলাম। এরপর দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক শক্তি, দৈনিক দেশ, দৈনিক খবর, দৈনিক সমাচার, দৈনিক আজাদ, দৈনিক নব অভিযান প্রভৃতি পত্রিকায় কবিতা ছাপা হতে শুরু হলো। দৈনিক বাংলা, দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে অনেক পরে। পরবর্তী প্রজন্মের আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, বাংলাবাজার পত্রিকা, জনকণ্ঠ, প্রথম আলো, যুগান্তর, কালের কণ্ঠ, আমাদের সময়, সমকাল, বাংলাদেশ প্রতিদিন-সহ সকল পত্রিকায় আমার কবিতা ছাপা হয়েছে। বলা যেতে পারে সংগ্রাম, ইনকিলাব, দিনকাল ছাড়া প্রায় সকল পত্রিকায়ই আমার লেখা ঠাঁই পেয়েছে। তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়নি। কিন্তু এখন প্রজন্মের কোনো কোনো সাহিত্য সম্পাদক দেখি তোয়াজ চায়! সেটি তো আর এই বুড়ো বয়সে সম্ভবপর নয়, বাপু! আরেকটি বিষয়! আমি কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ ও শিশুসাহিত্য রচনা করি বলে আমার অনেক কবিবন্ধু আমাকে কবিতার অঙ্গন থেকে সরিয়ে রাখতে চায়। কবিতার আলোচনায় আমাকে বাদ রাখার অপচেষ্টা করে। সংকলনে আমার কবিতাকে রাখতে চায় না। মজার বিষয় হলো, দুই দশক পেরোতেই তাদের অনেকেরই দম ফুরিয়ে গেছে। সাহিত্যের অঙ্গন থেকে তারাই একে একে নির্বাসিত হয়েছে। তাদের কাব্যহিংসা অমর হোক।

ডেইলি বাংলাদেশ: লেখক না হলে কী হতেন?

তপন বাগচী: লেখক কি হয়েছি? লিখলেই কি লেখক হওয়া যায়? তাহলে দলিল-লেখকও লেখক হতেন! আমি এখনো নিজেকে লেখক ভাবি না। এখনো লেখক হওয়ার সাধনা করে চলছি। আমার সাহিত্যজীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. তরুণ মুখোপাধ্যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. অনুপম হীরা মণ্ডল, কলকাতার ‘সব্যসাচী’ পত্রিকার সম্পাদক কবি নরেশ মণ্ডল, নদিয়ার ‘তিতলি’ পত্রিকার সম্পাদক শিশুসাহিত্যিক শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ, কুমিল্লা জাতীয় সমবায় অ্যাকাডেমির উপাধ্যক্ষ প্রাবন্ধিক হরিদাস ঠাকুর, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল এন্ড কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক প্রাবন্ধিক ড. আখতারুজ্জাহান প্রমুখ খ্যাতিমান গবেষক। তারপরেও নিজেকে লেখক ভাবতে কুণ্ঠাবোধ হয়। আমার পঞ্চাশ বছরকে উদযাপন করার মানসে কবি বীরেন মুখার্জীর ‘দৃষ্টি’ (ঢাকা), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রুবেল আনছারের ‘রিভিউ’ (খুলনা), ভারতীয় সাহিত্য আকাদেমির সদস্য কবি অনাদিরঞ্জন বিশ্বাসের ‘বাকপ্রতিমা’ (আন্দামান) এবং কবি নীলাদ্রিশেখর সরকারের ‘কথাকৃতি’ (নদিয়া) বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া কবি গোবিন্দ ধরের ‘স্রোত’ (ত্রিপুরা) পত্রিকাও আমার সাহিত্যচর্চা নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এর পরেও নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সাহস পাই না। মনে হয়, আরো অনেক দূর পথ হাঁটতে হবে! আর লেখক না হলে কী হতাম, তা কেবল জ্যোতিষীরাই বলতে পারতেন। তবে ‘রাজনীতিবিদ’ হতাম না, এটা নিশ্চিত।

ডেইলি বাংলাদেশ: ছাত্রজীবনে রাজনীতিও করেছেন, জানি। 

তপন বাগচী: ছাত্রজীবনে রাজনীতি না করে উপায় ছিল না। স্বৈরাচার যখন চেপে বসেছিল, তখন তাকে না তাড়িয়ে ঘরে ফেরার উপায় ছিল না। আমাদের সেই রাজনীতি নেতা হওয়া বা প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়নি। সেটি ছিল একাবেরই দেশকে ভালবাসার সংগ্রাম। অশুভ শক্তিকে বিনাশ করার সংগ্রাম। গাঁটের পয়সায় কলা ও রুটি খেয়ে সারাদিন মিছিল মিটিং করার সেইসব দিনের কথা এখনো স্মরণ করি। এখন নাকি রাজনীতি করলে পকেট ভারি থাকে। তখন তো ছাত্ররাই চাঁদা তুলে পোস্টার ছাপাতাম, দেওয়ালে লিখতাম। চেতনা শাণিত ছিল আমাদের। অশুভকে প্রশ্রয় দিইনি। খুব ফিরে যেতে ইচ্ছে করে রাজপথের সেই দিনগুলোতে।

ডেইলি বাংলাদেশ: রাজনীতিটা ছাড়লেন কেন?

তপন বাগচী: রাজনীতি ছেড়েছি কে বললো? রাজনীতি এখনো ছাড়িনি তো! আমি কোনো সংগঠনের সদস্য নই, কোনো দলীয় কর্মসূচিতে নেই, তার মানে এই নয় যে আমি রাজনীতিতে নেই। আমি যে আমার দেশের কল্যাণ চাই, এটাই তো রাজনীতি। আমি যে আমার সংস্কৃতিকে লালন করি, এটাও তো রাজনীতি। আমি যে মাটি ও মানুষকে ভালবাসি, এই ভালবাসাটা কি রাজনীতি নয়! আমি এখনো রাজনীতির ভেতরেই বসবাস করি। আমার বিশ্বাস রাজনীতর বাইরে কোনো মানুষ থাকতে পারে না।

ডেইলি বাংলাদেশ: রাজনীতিতে নিয়মিত থাকলে হয়তো এখন এমপি, মন্ত্রীও হতেন। সেটাই ভালো হতো? নাকি বর্তমানে ভালো আছেন বলে মনে করেন?

তপন বাগচী: মোটেও তা নয়। আমি তো রাজনীতি করেছি অধিকার-সচেতন থাকার জন্য। আমি তো নেতা হতে চাইনি। আমার বয়সীরা তো বটেই আমার ৭/৮ বছর জুনিয়র নেতারাও এখন এমপি-মন্ত্রী আছেন। সেটা তাদের যোগ্যতা! আমি তো ওই পথে হাঁটিনি। আমার তিনজন সহপাঠী এখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আছেন। তাদের নিয়ে আমি গর্ব করি। তবে দলীয় রাজনীতিতে থাকলেও আমার দ্বারা এমপি-মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখা হতো না। এই বেশ ভালো আছি। আমার দেশপ্রেম বলবৎ থাকলেই হলো। আমার দেশকে ভালবাসি এটাই গর্ব। দেশের সেবা কেউ মন্ত্রী-এমপি হয়ে করে, কেউ শিক্ষা দিয়ে করে, কিউ চিকিৎসা দিয়ে করে। আমি করছি আমার সাহিত্য দিয়ে। সেবাই মুখ্য। পথ ভিন্ন হতে পারে। আমার পথকেই আমার জন্য যোগ্য বিবেচনা করি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর