‘সালাম-বরকতের মৃত্যুর খবরে রক্ত গরম হয়ে যায়’

‘সালাম-বরকতের মৃত্যুর খবরে রক্ত গরম হয়ে যায়’

এমএম আরিফুল ইসলাম, নাটোর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:৫৭ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৯:৫৮ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

১৯৫২ সাল। তখন তিনি নবম শ্রেণিতে পড়েন। ওই সময় তিনি ক্লাস ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হন। একই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি তাদের কাছে খবর আসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শহিদ হয়েছেন রফিক, সালাম, বরকত ও জব্বার। এমন খবরে তার রক্ত গরম হয়ে যায়। ছাত্র নেতা হয়ে কিছু একটা করতে চান। এ ভেবেই তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলনে নামেন।

দুর্বার ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি হাতড়ে কথাগুলো প্রতিবেদকের কাছে এভাবেই বলেন ফজলুল হক। তিনি নাটোরের নাম করা ওষুধ ব্যবসায়ী।

ফজলুল হক বলেন, সেই দিন মেমোরিয়াল হাইস্কুলের (সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) সব ছাত্র মিলে মিছিল নিয়ে নাটোর গালর্স হাইস্কুলে যাই। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছাত্রীদের ছাড়তে রাজি নন। পরে কথা বললে স্কুল ক্যাপ্টেন শামসুন্নাহার রাজি হন। এরপর ছাত্রীদের দায়িত্ব নিয়ে সবাই বেরিয়ে পড়ি। মিছিল নিয়ে যাই মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে। তিন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী মিলে বাংলার দাবিতে শহরের আমতলায় জড়ো হই। সেখানে সমাবেশে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দেয়ার দাবি রাখি।

তিনি বলেন, আমি ছাড়াও ওই সমাবেশে শামসুন্নাহার, ফজলুল হক শাহ, অরুণ রায়সহ অনেকেই বক্তব্য রাখেন। সমাবেশ শেষে বাড়ি ফিরলে মা-বাবা কিছুই বলেননি। পরে জানতে পারি, আমাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট হয়েছে। এমন খবরে পালিয়ে যাই নলডাঙ্গা উপজেলার পিপরুল গ্রামের শেখ নজরুল ইসলামের (বর্তমানে চিত্র পরিচালক) বাড়িতে। অনেক দিন সেখানে আত্মগোপনে থাকার পর শুনি পুলিশ কাউকে ধরেনি। পরে বাড়িতে চলে আসি। এরপর ওভাবে আর মিছিল করা হয়নি।

ভাষা সৈনিক ফজলুল বলেন, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে যেসব আন্দোলন-সমাবেশ হয়েছে তার মাইকিংসহ সামগ্রিক প্রচারের কাজগুলো আমরাই করেছি। নাটোরে রাজনৈতিকভাবে ভাষা আন্দোলনের কর্মসূচি পালিত হয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে। তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের ব্যানারে পালিত হতো সব কর্মসূচি।

তিনি আরো বলেন, আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন সোহরাওয়ার্দী। কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে নিয়মিত আমতলায় জড়ো হতাম। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে শহর ঘুরে একই জায়গায় সমাবেশ করতাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন গোলাম ইয়াজদানী মজু, সৈয়দ মোতাহার আলী, মকছেদ আলী, মো. সিরাজুল ইসলামসহ অনেকে। সেই সময় আন্দোলনকে গতিশীল করতে সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, মানিক পীর এলেন নাটোরে। মধু চৌধুরীর কাচারির পাশে ফাঁকা জায়গায় সমাবেশ হলো। মওলানা ভাসানী সভাপতিত্ব করেন।

ফজলুল বলেন, তৎকালীন ছোট মহকুমা শহর নাটোরেও লেগেছিল ভাষা আন্দোলনের হাওয়া। স্কুল ছেড়ে সড়কে বেরিয়ে শিশু শিক্ষার্থীরাও স্লোগান দিয়েছিল ‘গুলি এলে আসুক, পিছ-পা হবো না। পুলিশের ভয় উপেক্ষা করে সেদিনের শিশুরা ভাষা সৈনিকরা মাইক হাতে পোস্টার নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। ঘোষণা করতেন কর্মসূচি। এছাড়া আন্দোলনে যথাসময়ে অংশ নেয়ার আহবান জানাতেন। এদের প্রেরণা ছিল রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সিনিয়র নেতারা। নাটোরের তৎকালীন এমপি কাজী আবুল মসউদ, কাজী আব্দুল মজিদও ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রেরণাদাতা।

১৯৩৮ সালে ২৩ জুলাই সিংড়া উপজেলার দমদমা গ্রামে ভাষা সৈনিক ফজলুর হকের জন্ম হয়। তিনি চার সন্তানের বাবা। বর্তমানে নাটোর শহরে থাকেন তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর