Alexa সালাত ও জাকাতে অলসতাকারীর পরিণতি ১ম পর্ব

সালাত ও জাকাতে অলসতাকারীর পরিণতি ১ম পর্ব

প্রিয়ম হাসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৪৬ ১৮ জানুয়ারি ২০২০  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

সালাত অলসতাকরীর পরিণতী: ইচ্ছাকৃতভাবে যে ব্যক্তি একেবারেই সালাত ছেড়ে দেবে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে কাফির হয়ে যাবে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‘আমাদের মাঝে ও তাদের অর্থাৎ- কাফিরদের মাঝে অঙ্গীকার হলো সালাত। সুতরাং যে ব্যক্তি সালাত ছেড়ে দেবে সে কাফির হয়ে যাবে। (আত তিরমিযী অধ্যায়: কিতাবুল ঈমান, হা:২৬২১)।

রাসূল (সা.) আরো বলেন,

‘মহান আল্লাহর বান্দা এবং কাফির-মুশরিকের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত ছেড়ে দেয়া।’(সহিহ মুসলিম-অধ্যায়: কিতাবুল ঈমান-১৩৪,(৮২)।

তবে যে ব্যক্তি সালাতের ব্যাপারে অলসতা করবে, চাই সে অলসতা যথাসময়ে  আদায় না করার মাধ্যমে হোক বা ঘুমের মাধ্যমে হোক কিংবা শরীয়াত সম্মত পদ্ধতিতে সালাত আদায়ে ক্রটির মাধ্যমে হোক, সে কাফির না হলেও তার ব্যাপারে কঠিন শাস্তির হুমক রয়েছে।

সহিহুল বুখারীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর স্বপ্নের দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেন,

‘আমরা এক শায়িত ব্যক্তির কাছে আসলাম। তার মাথার কাছে পাথর হাতে নিয়ে অন্য একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। দাঁড়ানো ব্যক্তি শায়িত ব্যক্তির মাথায় হাতের পাথর নিক্ষেপ করছে। পাথরের আঘাতে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং পাথরটি বলের মত গড়িয়ে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। লোকটি পাথর কুড়িয়ে আনতে আনতে আবার শায়িত ব্যক্তির মাথা ভালো হয়ে যাচ্ছে। দাঁড়ানো ব্যক্তি প্রথম বারের মতো আবার আঘাত করছে এবং তার মাথাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে। (সহিহ বুখারী-হা: ৬৬৪০)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সফরসঙ্গী ফেরেশতাদ্বয়কে জিজ্ঞেস করলেন, কী অপরাধের কারণে তাকে এভাবে শাস্তি দেয়া হচ্ছে? 

উত্তরে তারা বলল, ‘এই ব্যক্তি কোরআন শিক্ষা করেছিল। কিন্তু কোরআন অনুযায়ী আমল করেনি এবং সে ফরজ সালাতের সময় ঘুমিয়ে থাকত।’ (সহিহ বুখারী-হা: ৬৬৪০)।

কেয়ামত পর্যন্ত তাকে এভাবে শাস্তি দেয়া হবে। এ মর্মে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ

الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ

‘ধ্বংস ওই সমস্ত সালাত আদায়কারীদের জন্য যারা সালাতের ব্যাপারে উদাসীন।’ (সূরা: আল মাঊন,আয়াত: ৪-৫)।

হাফিয ইবনু কাসির (রা.) এই আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘তারা হয়তো প্রথম ওয়াক্তে সালাত আদায় না করে সব সময় বা অধিকাংশ সময় দেরী করে সালাত আদায় করে থাকে। অথবা সালাতের রুকন ও শর্তসমূহ যথাযথভাবে আদায়ের ব্যাপারে গাফিলতি করে থাকে অথবা তারা সালাতে মনোযোগ দেয় না এবং সালাতে কোরআন তেলাওয়াতের সময় তারা এর অর্থের মাঝে গবেষণা করে না।’ (তাফসীর ইবনু কাসীর-৪র্থ খন্ড)

সালাত প্রসঙ্গে রাসূলূল্লাহ (সা.) আরো বলেন,

‘যে ব্যক্তি সালাতের হিফাযত করবে কেয়ামতের দিন সালাত তার জন্য আলো, তার ঈমানের দলীল এবং নাজাতের উপায় হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি সালাতের হিফাযত করবে না কেয়ামতের দিন তার জন্য আলো থাকবে না, তার ঈমানের পক্ষে কোনো প্রমাণ এবং তার নাজাতের কোনো উপায় থাকবে না। কেয়ামতের দিন সে ফেরাউন, কারুন, হামান এবং উবাই ইবনু খালফের সঙ্গে হাশরের মাঠে উপস্থিত হবে।’ (মুসনাদ আহমাদ-হা: ৬৫৭৬)।

উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় হাফিজ ইবনুল কাইয়্যিম (রা.) বলেন, সালাত অলসতাকারীকে উক্ত চার শ্রেণীর নিকৃষ্ট মানুষের সঙ্গে হাশরের মাঠে উঠানোর কারণ হলো মানুষ সাধারণত; ধন-সম্পত্তি নিয়ে ব্যস্ত থেকে সালাত পরিত্যাগ করলে কুখ্যাত ধনী কারুনের সঙ্গে হাশর হবে। রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে ব্যস্ত থেকে সালাত পরিত্যাগ করলে ফেরাউনের সঙ্গে হাশর হবে। মন্ত্রিত্ব নিয়ে ব্যস্ত থেকে সালাত নষ্ট করলে ফেরাউনের মন্ত্রী হামানের সঙ্গে হাশর হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত থেকে সালাত ছেড়ে দিলে মক্কার কাফির ব্যবসায়ী উবাই ইবনু খালফের সঙ্গে হাশর হবে। (ফিকহুস সুন্নাহ-১ম খন্ড,৭২ পৃঃ)।

স্বর্ণযুগের ইমামদের বক্তব্য:

(১) ইমাম ইসহাক বিন রাহবিয়া (রা.) বলেন, নবী (সা.) হতে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, সালাত ত্যাগকারী কাফির। আর নবী (সা.) এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত ইমামদেরর মত এটাই যে, ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত ত্যাগকারী কোনো কারণ ব্যতীত সালাতের ওয়াক্ত অতিক্রম করে দিলে সে কাফির।

(২) ইমাম ইবনু হাযম (রা) উল্লেখ করেন যে, সালাত ত্যাগকারী কাফির। একথা ‘উমার ফারুক,‘আবদুর রহমার,‘মু‘আয ইবনু জাবাল, আবূ হুরাইরাহ (রা.) প্রমুখ সাহাবি হতে বর্ণিত হয়েছে। (আত তারগীব ওয়াত তারহীব)।

(৩) ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রা.) বলেন, সালাত ত্যাগকারী কাফির হয়ে যায়, আর এমন কুফরীতে নিমজ্জিত হয়, যা দ্বীন ইসলামের সীমানা হতে বহিস্কার করে দেয়। তাকে হত্যা করা হবে যদি সে তাওবাহ করে সালাত প্রতিষ্ঠা না করে। এ ধরনের অপমানকর অবস্থা থেকে মহান আল্লাহর কাছে আশ্যয় প্রার্থনা করছি-আমীন।

এক নজরে সালাত আদায় না করার পরিণতি:

(১) সালাতের হেফাযত না করার কারণে কেয়ামতের দিন তার জন্য কোলো আলো থাকবে না, তার ঈমানের পক্ষে কোনো প্রমান এবং নাজাতের কোনো উপায় থাকবে না।

(২) ইচ্ছা করে সালাত পরিত্যাগকারী কাফির।

(৩) অলসতাবশতঃ সালাত পরিত্যাগকারী জাহান্নামী।

সালাতের উপকারীতা ও শিক্ষা: সালাত একটি ফরজ ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা প্রতিদিন সব মুসলিম এর জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা ফরজ করেছেন। এ সালাত পরকালের মুক্তি লাভের অন্যতম মাধ্যম। কারণ পরকালে সর্বপ্রথম সালাতের হিসেব গ্রহণ করা হবে। যে ব্যক্তি সালাতের হিসেব সুন্দরভাবে দিতে পারবে, তার পরবর্তী হিসেব সহজ হয়ে যাবে। আবার সালাত দুনিয়ার সব ধরনের অশ্লীন ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। শুধু তাই নয়, সালাতের মাধ্যমে ব্যক্তি অনেক শারীরিক উপকার লাভ করে। যার  কিছু তুলে ধরা হলো-

ক্বিয়াম বা দাঁড়ানো: মানুষ যখন সালাতে দাঁড়ায; তখন তার দৃষ্টি সাজদার স্থানে স্থির থাকে। ফলে তার একাগ্রতা ও মনোযোগ বৃদ্ধি পায়।

রুকু: সালাত সম্পাদনকারী ব্যক্তি যখন রুকু করে এবং রুকু থেকে ওঠে সোজা হয়ে দাঁড়ায় তখন মানুষের কোমর ও হাঁটুর ভারসাম্য রক্ষা হয়। রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায়। ফলে কোমর ও হাঁটুর ব্যাথা উপশম হয়।

সাজদাহ: সালাতে যখন সাজদাহ করা হয় তখন সালাত সম্পদানকারী ব্যক্তির মস্তিস্কে দ্রুত রক্ত প্রবাহিত হয়। ফলে তার স্মৃতি শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আবার  সাজদাহ থেকে ওঠে যখন দুই সাজদার মাঝখানে বসে এতে তার পায়ের উরু, হাঁটু ও কোমরে ব্যথা উপশম হয়।

ওঠা-বসা: সালাতের সময় সালাত সম্পদানকারী ব্যক্তিকে দাঁড়ানো, রুকুতে যাওয়া, রুকু থেকে ওঠে সোজা হয়ে স্থির দাঁড়ানো, আবার সাজদায় যাওয়া, সাজদাহ থেকে ওঠে স্থিরভোবে বসা, আবার সাজদাহ দিয়ে দাঁড়ানো বা বসা। এ সবই মানুষের শারীরিক বহুবিধ উপকার সাধিত হয়।

বিশেষ করে: সালাত মানুষের মানসিক, স্নায়ুবিক, মনস্তত্ত্বিক, অস্থিরতা, হতাশা-দুশ্চিন্তা, হার্ট অ্যাটাক, হাড়ের জোরার ব্যথা, ইউরিক এসিড থেকে সৃষ্ট রোগ,পাকস্থলীর আলসার, প্যারালাইসিস, ডায়াবেটিস,মেলিটাস, চোখ এবং গলা ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।

পরিশেষে...সালাতের উপকারিতায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,
 
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاء وَالْمُنكَرِ

‘নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীন ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সূরা: আল আনকাবূত, আয়াত: ৪৫)।

শুধু তাই নয়, সালাত মানুষের শারীরিক, মানসিক ও আত্নিক পবিত্রতা সাধনের অনন্য হাতিয়ার। সুতরাং প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত সম্পাদন করা একান্ত অপরিহার্য। এর ব্যতিক্রম হলে পরকালে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে সম্পাদন করার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন।

জাকাত না দেয়ার পরিণতি: আল্লাহ তায়ালা বলেন,

 وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلاَ يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ

يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَـذَا مَا كَنَزْتُمْ لأَنفُسِكُمْ فَذُوقُواْ مَا كُنتُمْ تَكْنِزُونَ

‘আর যারা স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করে রাখে আর তা হতে আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক আজাবের সুসংবাদ দিন। সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার মাধ্যমে তাদের ললাটসমূহে, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশসমূহে দাগ দেয়া হবে। বলা হবে এগুলো ওই সব সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করে রেখেছিলে। সুতরাং এখন স্বাদ গ্রহণ করো জমা করে রাখা বস্তুর।; (সূরা: আত তাওবাহ, আয়াত: ৩৪-৩৫)। চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে