Alexa সামাজিক ব্যবসা শুধুই কি তত্ত্ব?

সামাজিক ব্যবসা শুধুই কি তত্ত্ব?

প্রকাশিত: ১৬:৩১ ৩০ জুলাই ২০১৯  

ড. ফারজানা আলম, ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলদেশের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং সহযোগী অধ্যাপক। তিনি যুক্তরাজ্য থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। তার গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে সমজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ উন্নয়ন।

ব্যবসার গতানুগতিক সংজ্ঞাটা কম-বেশি সবাই জানেন। প্রশ্ন যখন `মুনাফাহীন নিঃস্বার্থ ব্যবসার তখন মনে হতে পারে, এও কি সম্ভব! বাংলাদেশ এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে সামাজিক ব্যবসা, সাফল্য আসছে জোয়ারের মতো, স্বাক্ষর হচ্ছে শত শত সমঝোতা চুক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খোলা হচ্ছে সামাজিক ব্যবসার পাঠ।  `সামাজিক ব্যবসা’ নামক পরশপাথরটি আসলে কী? শুধুই একটি তত্ত্ব?

পৃথিবীর জন্মের সময় থেকেই নানান সমস্যার জন্ম। পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, মানুষ বাড়ছে, প্রযুক্তি বাড়ছে। সমস্যার ধরণ এবং প্রতিকারও বদলে যাচ্ছে। কলেরা, ডাইরিয়ার মতো মহামারি রোগ; যা এক সময় গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে দিতো, তা আজ নিতান্তই এক মামুলী রোগ। এমনকি আজকাল এই রোগে আমরা ডাক্তারের কাছেও যাই না। তিন আঙ্গুলের এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় এবং আধা সের  খাবার পানির মিশ্রণ কিংবা মাত্র তিন টাকার ওরাল স্যালাইন দিয়ে ঘরোয়াভাবেই এর চিকিৎসা সেরে ফেলি। এই পদ্ধতিতে একজন কলেরা রোগীর চিকিৎসা যেমন সম্ভব, তেমনি পুরো গ্রামের চিকিৎসাও সম্ভব। ওষুধ সেই একই। যেই রোগ এক সময় ট্রাজেডি উপন্যাসের বিষয়বস্তু ছিল, সেই রোগ আজকাল আমাদের প্রাত্যহিক কথাবার্তাতেও জায়গা পায় না। কারণ একটাই, এই রোগের কারণ এখন আমাদের জানা, ওষুধও হাতের মুঠোয়। অথচ যতদিন আমরা এই রোগের প্রতিকার জানতাম না, রীতিমতো শীতলাদেবীর পূজা করতাম। একটি প্রবল প্রতাপশালী সমস্যা রাতারাতি পরিণত হলো একটি মামুলী সমস্যায়।

তেমনি, আধুনিক পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থার একটি মারাত্মক রোগ হলো বেকারত্ব। যতই আমরা উন্নত এবং শিক্ষিত হচ্ছি, বেশ পরিষ্কার হচ্ছে যে, ধনী-দরিদ্রের আয় এবং সম্পদের বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েই চলছে। মানুষ বাড়ছে, শিক্ষিতের হার বাড়ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে কিন্তু শ্রমের চাহিদা সেই অনুপাতে বাড়ছে না।  পাশের হার এবং বেকারত্ব যেন পাল্লা দিয়ে পাশাপাশি বাড়ছে। এর কারণ আমাদের প্রচলিত ত্রুটিযুক্ত পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা। আজকাল এমনকি উন্নত দেশগুলোতেও চাকরি প্রার্থীর সংখ্যা রীতিমতো হতাশ হওয়ার মতো। বেকারত্ব রোগ যেন দিনদিন স্থায়ী, প্রায় অপ্রতিরোধ্য এবং মহামারি আকার ধারণ করছে, অনেকটা সেই সংক্রামক এশিও কলেরার মতই। বেকারত্ব হলো আধুনিক বিশ্বে এশিও কলেরা। এই রোগের দ্রুত এবং সহজ চিকিৎসা প্রয়োজন। 

ভয়াবহ এই সামাজিক সমস্যার সমাধানে পরশপাথর হয়ে উদ্ভাবিত হলো এক নতুন ধরণের তত্ত্ব, সামাজিক ব্যবসা। সামাজিক ব্যবসা হচ্ছে এমন এক ধরণের ব্যবসা যেখানে উদ্যোক্তা বা বিনিয়োগকারী একটি সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যাক্তিগত লাভের আশা ছাড়াই বিনিয়োগ করেন। সামাজিক ব্যবসাকে নিজের আয়েই নিজের যাবতীয় ব্যয় মেটাতে হবে। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য ব্যবসা থেকে অর্জিত মুনাফাও পুনঃবিনিয়োগ করা হয়। এর মূল কথা হলো-কোনোরকম লোকসান না দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা, বিশেষ করে যারা সবচে সুবিধাবঞ্চিত তাদের সর্বোত্তম উপায়ে সেবা করা। 

সাধারণ মনে প্রশ্ন আসতে পারে- ‘ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন না করে নিঃস্বার্থ লক্ষস্থির করে কেউ কি সামাজিক ব্যবসা চালু করতে আগ্রহী হবেন? হলে কেন হবেন? ইচ্ছা করলেই কি উপায় হবে? সামাজিক ব্যবসা করতে চাইলেই কি করা সম্ভব? বিনিয়োগের টাকা আসবে কোথা থেকে? প্রফেসর ইউনূস নিশ্চিত করেছেন বিনিয়োগের টাকা সকল স্তরের মানুষের কাছ থেকেই আসবে। যেহেতু তারা স্বার্থহীন সামাজিক ব্যবসা চালু করে মানসিক সন্তুষ্টি অর্জন করবেন। অনুদান নির্ভর কর্মসূচির একটি সমস্যা হলো এটি পরনির্ভরশীল। এধরনের প্রতিষ্ঠানের মেরুদণ্ড এবং স্থায়িত্ব থাকে না। তারা কখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। মানবকল্যাণে যে টাকা খরচ হয়ে যায় তা এককালীন। কিন্তু দাতব্যকর্মসূচিকে যদি সামাজিক ব্যবসায় রূপান্তরিত করা যায়, তাহলে তা সামাজিক কল্যাণে একটি স্থায়ী এবং শক্তিশালী কাঠামোতে পরিণত হবে। কারণ- “A charity dollar has only one life, a social business dollar can be invested over and over again”. সামাজিক ব্যবসার টাকা অমর। এটাই সামাজিক ব্যবসার শক্তি। 

সন্দেহ জাগতে পারে, মুনাফা নেবার উপায় নেই, সব শ্রম-সব বুদ্ধি পরের জন্য, নিজের জন্য কিছুই না। এরকম ব্যবসা কতটুকু বাস্তবসম্মত? কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলেই মনে পড়বে, নিঃস্বার্থ ব্যবসা শুধু নয়, অনেক মানুষই রীতিমতো নিঃস্বার্থ অনুদানে অভ্যস্ত। তারা মসজিদ মন্দিরে, বিভিন্ন দুর্যোগে জনহিতকর কাজে, কিংবা মানব কল্যাণে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল তৈরির জন্য বড় বড় অংকের টাকা দান করে আসছেন। কতো মানুষ তার নিজের ভিটামাটি পর্যন্ত বিক্রি করে মানুষের জন্য কাজ করেছেন, প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। হাজি মুহাম্মদ মহসিন কিংবা দাতা হাতেম তাঈকে কে না চেনে? এরকম মানুষ বইতে শুধু নয়, আমাদের আশেপাশেও আছে। তারা সামাজিক ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে পারে। দান সবসময় একমুখী এবং অস্থিতিশীল। বিপরীতে সামাজিক ব্যবসার টাকাটা কিন্তু ফেরত আসবে। ফেরত আসার পরেও কিন্তু ব্যবসা কার্যক্রম চলতে থাকবে, মুনাফা আসতে থাকবে। এ চক্র কখনো শেষ হবে না। কারণ, ব্যবসাটা শুরুই হয়েছে মানব কল্যাণের জন্য। বিনিয়োগকারী কেবল বিনিয়োগের টাকা ফেরত নেবেন, অন্য কিছু নয়। চাইলে সেই টাকা তিনি আবার কোনো সামাজিক সমস্যা সমাধানে বিনিয়োগ করতে পারেন। সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে বড় ব্যবসায়ীদের অনেক গুলো মুনাফা সর্বস্ব ব্যবসার সঙ্গে সহজেই একটি সামাজিক ব্যবসা থাকতে পারে। 

সামাজিক ব্যবসার বিনিয়োগ কোন সমস্যা হবার কথা নয়। কারণ এই পুঁজিবাদী সমাজে ধনী থেকে মহাধনীদের সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে  Self-Actualization Need. বিখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক আব্রাহাম মাসলোর Needs Hierarchy অনুযায়ী প্রয়োজনের অনুক্রমের সর্বোচ্চ স্তর হলো Self-Actualization Need বা আত্মোপলব্ধি। এই স্তরে মানুষ লাভক্ষতি বিশ্লেষণের উর্দ্ধে গিয়ে তার সম্পূর্ণ সৃজনশীলতাকে ব্যাবহার করে অন্য কোন মাত্রায় নিজেকে নিয়ে যেতে চায়। যে মাত্রায় সে থাকে স্বতন্ত্র এবং সুমহান। তারা খুব আগ্রহ নিয়েই সামাজিক ব্যবসা করবে। সামাজিক ব্যবসার মূল শক্তি কিন্তু এটাই, সীমাহীন সৃজনশীলতার শক্তি। মানব কল্যাণের লক্ষ্যর এই ব্যবসা তখন তাকে মৃত্যুর পরও মানুষের মাঝে বাঁচিয়ে রেখে অমর করে তুলবে, করে তুলবে সত্যিকারের Self-Actualized. 

এই ব্যবসার ৭টি মূলনীতিও সংজ্ঞার মতই সরল। তারমধ্যে ৭ নম্বর এবং শেষ নীতিটি হলো, সামাজিক ব্যবসা হবে আনন্দের সঙ্গে ব্যবসা।  ‘Do It With Joy!’ এখানেই এই ব্যবসার সার্থকতা। এই ব্যবসা মানুষকে দেবে এক পরম আনন্দ-যা কখনো গতানুগতিক ব্যবসা দিতে পারবে না। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর

Best Electronics
Best Electronics