Alexa সাধারণ নারী থেকে যেভাবে রানী বনে গেলেন তারা

সাধারণ নারী থেকে যেভাবে রানী বনে গেলেন তারা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:১৬ ২৯ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৪:২৯ ২৯ আগস্ট ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মানুষের ভাগ্য কখন খুলে যাবে তা অতি রহস্যময়। আবার কার কপালে দুঃখ আছে তাও নেই কারো জানা। ইতিহাসের অনেক সাধারণ মানুষই ভাগ্যক্রমে হয়ে ওঠেছেন অসাধারণ। আবার অনেক অসাধারণ মানুষও নিয়তির কাছে পরাজিত হয়ে সাধারণ মানুষের কাতারে দাড়িয়েছেন। তেমনি ইতিহাস সেরা কয়েকজন নারী ভাগ্যক্রমে বনে যান রানী। জেনে নিন তাদের সম্পর্কে-

দেহরক্ষী যখন রানী

দেহরক্ষীকে বিয়ে করে চারদিকে আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন থাইল্যান্ডের রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ন। নিজের নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর উপ-প্রধানকে বিয়ে করে রানী ঘোষণা করেছেন ৬৬ বছর বয়সী এ রাজা। তাদের দু’জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাজকীয় এক বিবৃতিতে তাদের বিয়ের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, জেনারেল সুথিদা আয়ুধ্যাকে রাজকীয় সঙ্গী হিসেবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ন। তাকে রানীর মর্যাদা দেয়া হয়েছে। এখন থেকে তিনি রাজ পরিবারের উপাধি ধারণ করবেন এবং রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসনে আরোহণের আগেই রাজা ভাজিরালংকর্ন ব্যক্তিগত দেহরক্ষী সুথিদা আয়ুধ্যাকে বিয়ে করলেন। ২০১৬ সালে মাহা ভাজিরালংকর্নের বাবা ভূমিবল আদুলাদেজের মৃত্যু হয়। থাইল্যান্ডের এ রাজা ৭০ বছর ধরে অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে সিংহাসনে ছিলেন। 

থাইল্যান্ডের রাজা মাহা ভাজিরালংকর্ন ও তার স্ত্রী সুথিদা আয়ুধ্যাতার মৃত্যুর পর দেশের সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন মাহা ভাজিরালংকর্ন। এর আগে আরও তিনবার বিয়ে করেছেন মাহা ভাজিরালংকর্ন। তবে তিনবারই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে তার। সাত সন্তান রয়েছে এই থাই রাজার। সুথিদাকে দীর্ঘদিন ধরেই রাজার সঙ্গে জনসম্মুখে দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু তাদের সম্পর্ক নিয়ে  আনুষ্ঠানিকভাবে এর আগে কিছুই জানানো হয়নি। থাই টিভি চ্যানেল তাদের বিয়ের ফুটেজ প্রকাশ করেছে। সেখানে রাজপরিবারের অন্য সদস্যদেরও দেখানো হয়েছে। সে সময় রাজাকে সুথিদার মাথায় পবিত্র পানি ছিটাতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে, তারা বিয়ের রেজিস্ট্রিতে স্বাক্ষর করেন। ২০১৪ সালে থাই এয়ারওয়েজের সাবেক বিমানবালা সুথিদাকে নিজের দেহরক্ষীর একটি ইউনিটের উপ-কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেন রাজা ভাজিরালংকর্ন।

সাধারণ ঘরের মেয়ে ভুটানের রানী

২০০৬ সালে বাবা জিগমে সিংহে ওয়াংচুক সিংহাসন থেকে সরে তাতে বসান ছেলে জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুককে। রাজা জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুক এ রাজবংশের পঞ্চম রাজা। এরপর অতিবাহিত হয় ৫ বছর। ২০১১ সালে সাজ সাজ রব পড়ে যায় ভুটানে। বিয়ের আনন্দে ভাসছে তখন পুরো দেশ। রাজার বিয়ে বলে কথা। ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুকের বিয়ের কথা বলা হচ্ছে। কনে এক বৈমানিকের ২১ বছর বয়সী কন্যা। নাম জেৎসুন পেমা। অতি সুন্দরী এ কনের সঙ্গে এর আগে অনেকগুলো বছর প্রেম করেছেন ভুটানের বর্তমান রাজা। সম্পর্কের শুরুটা ছিল কিশোর বয়সেই। এর মধ্য দিয়েই সাধারণ পরিবারের মেয়ে হয়েও ভুটানের রানী বনে যান পেমা। 

এই প্রেমিক যুগলের বিয়ে হয় ভুটানের প্রাচীন রাজধানী পুনাখায়, রাজকীয় প্রথায়। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রাচীন একটি সুরক্ষিত দুর্গে অনুষ্ঠিত হয় বিয়ের মূল অনুষ্ঠান। প্রাচীন রাজধানীতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বর্তমান রাজধানীতে বসবাস করছেন এ রাজদম্পতি। তাদের বিয়ে উপলক্ষে একটি বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় থিম্পু স্টেডিয়ামে। ওই অনুষ্ঠানেই প্রথম জনগণের সামনে আসেন রাজা জিগমে এবং হবু রানী পেমা। রাজস্থানের পাথরপরিখা জঙ্গলেই রাজকীয় মধুচন্দ্রিমা উদযাপন করেন এ দম্পতি। রণথম্ভোরের আকাশ ছোঁয়া কেল্লা আর উদয়পুরের দুধপুকুর হয় রাজা-রানির ভালোবাসার সাক্ষী। তাই রাজস্থানের প্রতি বিশেষ অনুরাগ রয়েছে রাজা রানী দুজনেরই।

ভুটানের রাজা রানী ও রাজপুত্রভুটানের এ রাজা সংসদে তার রানী সম্পর্কে বলেন, ‘জানি না, সাধারণ মানুষের তাকে কেমন লাগবে। কিন্তু আমার কাছে পেমা-ই এক এবং একমাত্র। সে যুবতী। দরাজ এবং উষ্ণ হৃদয়ের অধিকারিণী। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানও বাড়বে। দেশের কাজেও যোগ দিতে পারবে সে।’জেৎসুন পেমা এমনিতে নিছকই সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা মেয়ে। ভারতের সঙ্গে তার যোগাযোগও অল্প বয়স থেকেই। ২০ বছর বয়সী পেমা হিমাচলের সানোয়ারে লরেন্স স্কুলে পড়েছেন ২০০৮ পর্যন্ত। সেখান থেকেই দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা পাস করেছেন। হিন্দি এবং ইংরেজি দুটি ভাষাতেই তুখোড় পেমা। পটু বাস্কেটবল খেলাতেও।

বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ যুবরাজের জন্ম দেন জেৎসুন পেমা। দেশটির রাজধানী থিম্পুতে অবস্থিত রাজপ্রাসাদ লিঙ্কন প্রাসাদে তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। সন্তান জন্মদানের সময় রাজা রানীর পাশেই ছিলেন। নিজেদের মধ্যে প্রেম চলার সময়েই গণমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এ দম্পতি। প্রকাশ্যেই নিজের হবু বধূর হাত ধরে তার প্রতি প্রেম নিবেদন করেন এবং গালে চুমু খেয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিলেন তারা। রক্ষণশীল ভুটানে এ ধরনের ঘটনা দেখা যায় না বললেই চলে। বিশেষ করে রাজ পরিবারের মধ্যে।

রাজার ঘোড়া বশ করে হয়েছিলেন চীনের রানী

চিনের রানী উ জেটিয়ানচিনের রানী ছিলেন উ জেটিয়ান। এ রানী চিনের একমাত্র রানী যিনি নিজের অধিকার কড়ায়গন্ডায় বুঝে ক্ষমতায় আরোহণ করেছিলেন। খুবই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে শাসন করেছিলেন চীন সাম্রাজ্য। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করা এ রানী মাত্র ১৩ বছর বয়সে উপস্থিত হয়েছিলেন রাজ দরবারে। রাজার একটা ঘোড়া ছিল, তাকে কেউ বশ মানাতে পারছিল না। তখন উ জেটিয়ান একটা দড়ি, হাতুড়ি আর লোহার দন্ডের মাধ্যমে সেই ঘোড়াকে বস করে সবার নজর কেড়েছিলন। অতি বুদ্ধিমতি উ জেটিয়ান পরবর্তীতে ক্ষমতায় আরোহণ করেন। রাজার মৃত্যুর পর নতুন রাজার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। এ প্রেমের সম্পর্ক শেষে বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। রানী অবস্থায় খুব প্রভাবশালী ছিলেন উ জেটিয়ান।  

বন্ধুত্ব থেকে প্রেম তারপর বিয়ে

প্রেমের আগে বন্ধুত্ব খুবই জরুরি। তাহলে বাকি সবটুকু অনেক সহজ হয়ে যায়। এ কথা সবচেয়ে ভালো জানবেন জর্ডানের রাজা হুসেইন। আর্কিটেক্ট লিসা নাজিব হালাবির সঙ্গে তার প্রথমে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল একটি এয়াপোর্টের ডিজাইন করার সময়। তারপর সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রেমের দিকে গড়ায়। অবশেষে বিয়ের মাধ্যমে পরিণতি পায়। দুজন দুজনকে অসম্ভব ভালোবাসতেন বলে জানা যায়। বিয়ের সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন লিসা হালাবি। নতুন নাম হয় নূর আর হুসেইন।

জর্ডানের রাজা হুসেইন ও রানী নূর১৯৫১ সালে ওয়াশিংটনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন লিসা হালাবি। তার বাবা ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা নেভি পাইলট। যিনি পরবর্তীতে ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টর ডেপুটি সেক্রেটারি হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট কেনেডির সময়ে। লিসা হালাবি ১৯৭৮ সালে বিয়ে করেন জর্দানের রাজা হুসেনকে। যে এয়ারপোর্টের ডিজাইন করতে গিয়ে রাজার সঙ্গে তার পরিচয় হয় সেই এয়ারপোর্ট তৈরি করা হচ্ছিল রাজার আগের স্ত্রীর নামে। যিনি হেলিকপ্টার এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিলেন। এই এয়াপোর্ট তৈরির সময় রাজা হুসেইনের কাছাকাছি আসেন লিসা হালাবি।

টেনিস খেলতে গিয়ে পরিচয় সম্রাটের সঙ্গে

জাপানের সম্রাট আকিহিতো এবং সম্রাজ্ঞী মিশিকোকে বলা হয় সবচেয়ে সফল রাজ দম্পতি। গোটা বিশ্বেই রয়েছে এ রাজ দম্পতির সুনাম। প্রায়ই তাদের দেখা যায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুড়ে বেড়াতে। সম্প্রতি  নাগানো এবং গানমা অঞ্চলে ভ্রমণের আগে টোকিও স্টেশন ত্যাগের আগমুহূর্তে বয়স আর অসুস্থতায় ভারাক্রান্ত সম্রাট জাতির উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বর্তমানে ক্ষমতায় আরোহণ করেছেন এ রাজ দম্পতির সন্তান হিরোহিতো। আকিহিতো-মিশিকো দম্পতির শুরুটা এত সুন্দর ছিল না। আকিহিতো তখন তরুণ। রাজ পরিবারের পক্ষ থেকে তার জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু বিষয়টি মোটেই এত সহজ ছিল না। রাজ পরিবারের পুত্রবধূকে হতে হবে সব দিক থেকেই সেরা। তাই আকিহিতোর জন্য মেয়েও দেখা হচ্ছিল সেভাবেই। 

জাপানের সম্রাট আকিহিতো এবং সম্রাজ্ঞী মিশিকোকেএরই মধ্যে একদিন টেনিস কোর্টে দেখা হয়ে যায় মিশিকোর সঙ্গে। প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায় আকিহিতোর। তারপর দু’জনের প্রেম জীবন চলতে থাকে। কিন্তু বাধ সাধেন আকিহিতোর মা। তিনি স্পষ্ট করে বলে দেন, এ সম্পর্ক মেনে নেবেন না। তারপর অনেক জল গড়ায়। মিডিয়ায় প্রচুর লেখালেখি হয়। সে সময় এ প্রেমের সম্পর্ক মিডিয়া ‘রোমান্স অব টেনিস কোর্ট’ শিরোনামে অভিহিত করে। ধীরে ধীরে বরফ গলতে থাকে। রাজ পরিবার এক সময় এ সম্পর্ক মেনে নেয়। অবশেষে এ যুগলের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৯ সালে। ইতিমধ্যে এ রাজ দম্পতি ৬০ বছর একসঙ্গে অতিবাহিত করেছেন। দাম্পত্য জীবনে কোনো ধরনের কলহের খবর জানা যায়নি। দীর্ঘ সময়জুড়ে ভালোবাসায় আবদ্ধ এ দম্পতি।

ব্রিটেনের রানী

ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ হচ্ছেন বিশ্বের ১৬টি সার্বভৌম রাষ্ট্র অর্থাৎ কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলোর বর্তমান রানী ও রাষ্ট্রপ্রধান। কমনওয়েলথ প্রধান ছাড়াও তিনি ৫৪ সদস্যবিশিষ্ট কমনওয়েলথ অব নেশনসেরও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় এলিজাবেথ যুক্তরাজ্যের শাসনকর্তা এবং চার্চ অব ইংল্যান্ডেরও প্রধান। বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এরই মধ্যে ব্রিটিশ রাজ সিংহাসনে আরোহণের ৬০ বছর পূর্ণ করেছেন। ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপ গত বছর ২০ নভেম্বর তাদের ৭১তম বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করেন। বিয়ের সময় রানীকে দেয়া প্রিন্স ফিলিপের আংটিটি ছিল ‘ওয়েলস সোনা’ দিয়ে তৈরি। 

ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপএ সোনা ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম ওয়েলসের একটি সোনার খনি থেকে সংগ্রহ করা হয়। সোনার দলাটি খাঁটি ও দুস্প্রাপ্য হওয়ায় মহামূল্যবান। চার সন্তানের মধ্যে তিনজনেরই (চার্লস, অ্যানি ও অ্যান্ড্রু) বিবাহ বিচ্ছেদ হলেও এ রাজ দম্পতি কয়েক দশক ধরে একই সঙ্গে বসবাস করে আসছেন। তাদের দাম্পত্য জীবনে কোনো ধরনের কলহের কথা কখনো জানা যায়নি। কিন্তু অদ্ভুত হলেও এ কথা সত্যি যে এত বছরে রানী কখনো তার শ্বশুরবাড়ি গ্রিসে যাননি। অবশ্য বিয়ের আগে গিয়েছিলেন। এখন তারা সাত দশকপূর্ণ করা দম্পতিদের কাতারে। গত বছর বিয়ের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গ্রিনিচ মান সময় একটায় ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের ঘণ্টা বাজানো হয়। এ রাজ দম্পতির চার সন্তান, আট নাতি-নাতনি রয়েছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস