সাধারণ ফ্লু থেকে ‘পোলিও’ অতঃপর পঙ্গুত্ব, প্রাণ কাড়ে আড়াই লাখ মানুষের!

সাধারণ ফ্লু থেকে ‘পোলিও’ অতঃপর পঙ্গুত্ব, প্রাণ কাড়ে আড়াই লাখ মানুষের!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:৫৩ ৩০ মার্চ ২০২০   আপডেট: ২১:২৮ ৭ মে ২০২০

ছবি: পোলিওতে আক্রান্তরা

ছবি: পোলিওতে আক্রান্তরা

সবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। ১৯৫০ এর দশক। এসময় পুরো যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে দেখা দেয় এক ভাইরাস। যাতে আক্রান্ত হতে থাকে একের পর এক মানুষ। পুরো আমেরিকায় সৃষ্টি হয় আতঙ্ক। এতে করে তৈরি হয় সামাজিক দূরত্ব। ১৯৪৯ এ প্রথম এটি টেক্সাস শহরের সান অ্যাঞ্জেলোতে দেখা দেয়। 

এরপর বাড়তে থাকে একের পর এক আক্রান্তের সংখ্যা। সেইসঙ্গে মারা যেতে থাকে মানুষ। এতে আরো বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সবাই। সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বাড়ানো হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় শহরের সব স্কুল, কলেজ, সুইমিং পুল, থিয়েটার, সিনেমা হল, গির্জাসহ সব জনসমাগম স্থানগুলো। 

২০১৯ এর ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রথম দেখা দেয়া করোনাভাইরাস এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরোবিশ্ব। এরই মধ্যে এ ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় ২০০টি দেশ। এ মহামারিতে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৩৫ হাজার। আক্রান্তের সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। যুগে যুগে এমন অনেক ভাইরাস পৃথিবীতে হানা দিয়েছে।  

তেমনই এক ভাইরাস ছিল পলিওমিলাইটিস বা পোলিও। এটিও অনেকটা সাধারণ ফ্লুর মতোই। গলা ব্যথা, জ্বর, ক্লান্তি, মাথা ব্যথা, ঘাড়, পেটে ব্যথাসহ শ্বাসকষ্ট ছিল এর বিশেষ কয়েকটি লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রে এ ভাইরাস মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডে গিয়েও আঘাত হানতো। এতে করে আক্রান্তদের অনেকেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা প্যারালাইজড হয়ে যেত। তবে এর সংখ্যা ছিল ২০০ জনের মধ্যে একজন। 

পোলিও রোগে অনেকেই মারা যায়পক্ষাঘাতগ্রস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে দুই থেকে ১০ জনের শেষ পরিণতি ছিল মৃত্যু। এই ভাইরাসটি আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমেও ছড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তির মল থেকেও ছড়াতে পারে পোলিও ভাইরাস। এ ভাইরাসটি মলে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

সংক্রমিত হওয়ার ছয় থেকে ২০ দিনের মধ্যে এর লক্ষণ দেখা দেয় শরীরে। অনেকটাই করোনাভাইরাসের ন্যায় পোলিও রোগটি। ১৮৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এই রোগটি প্রথম প্রকাশ পায়। পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে প্রথম এটি মহামারি আকার ধারণ করে। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, তখন এ ভাইরাসে মারা গিয়েছিল দুই লাখ ২৭ হাজার মানুষ। যার  প্রায় এক তৃতীয়াংশই ছিল নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। জলাতঙ্ক এবং গুটিবসন্তের পর পোলিও ছিল তৃতীয় মহামারি রোগ। যার কারণ বিজ্ঞানীরা তখনো আবিষ্কার করতে পারেননি।

মার্কিন লেখক ডেভিড ওশিংসসি তার লেখায় এ ভাইরাসের জন্য ইতালিয়ান অভিবাসীদের দোষারোপ করেছেন। আবার কেউ কেউ দাবি করেন সান অ্যাঞ্জেলোতে অন্য শহর থেকে আসা মানুষ গাড়ি থামিয়ে গ্যাস নেয়ার সময় এ ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়াও অনেককে এ ভাইরাসের জন্য বিড়ালকে দায়ী করেন।

অনেক শিশুরাই পঙ্গু হয়ে যায়আমেরিকান অ্যানটমোলজিস্ট ভিনসেন্ট সিরিলো বলেন, বসন্তের শেষের দিকে এবং গ্রীষ্মের শুরুতে পোলিও ভাইরাস বেশি ছড়ায়। তার মতে, এ ভাইরাসে বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত আমেরিকানরা আক্রান্ত হয়েছিল। কারণ তারা মশা, মাছি, ময়লা এবং দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করত। আর শীতকালে মশা মাছির উৎপাত কম থাকায় পোলিও ভাইরাস কম দেখা যেত। 

এ্যালেনা হিস্টোরিজ জার্নালে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকানরা পোলিও ভাইরাস ধবংস করতে বাড়ির চারপাশে বিষাক্ত কীটনাশক ডিডিটি স্প্রে করত। তবুও ঠেকানো যাচ্ছিল না এ ভাইরাস। দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে এর প্রাদুর্ভাব। 

ডেভিড ওশিংসসি লেখায় পাওয়া যায়, ১৯৪৬ সালে এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা যেখানে ছিল ২৫ হাজার। সেখানে ১৯৫২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ হাজারে। মার্কিন বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসক জোনাস সালক পোলিও ভ্যাকসিন তৈরি করেছিলেন। 

১৯২২ সালে উঠতি রাজনৈতিক তারকা ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টও পোলিওতে আক্রান্ত হন। সবে তিনি তখন ডেমোক্র্যাটিক ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন। ক্যাম্পোবেলো দ্বীপে নিজের গ্রীষ্মের বাড়িতে অবকাশ কাটাতে গিয়ে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হন ফ্র্যাঙ্কলিন। এতে মাত্র ৩৯ বছর বয়সেই ভবিষ্যত এ রাষ্ট্রপতির এক পা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। 

শিশুকে পোলিওর টিকা দেয়া হচ্ছেতিনিই প্রথম এ ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরির জন্য তহবিল গঠন করেন। ১৯৩৮ সালে হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পাঁচ বছর পর ‘রুজভেল্ট ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইনফেন্টাইল’ প্যারালাইসিস তৈরি করেন ফ্র্যাঙ্কলিন। পরবর্তীতে এটির নামকরণ করা হয় মার্চ অব ডাইমস ফাউন্ডেশন। 

বহু বিজ্ঞানী রাত-দিন কাজ করেছেন এ ভাইরাসে প্রতিষেধক তৈরিতে। অবশেষে ১৯৫২ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসক জোনাস সালক এর প্রতিষেধক আবিষ্কার করেন। প্রথমে এ প্রতিষেধক কয়েক হাজার বানরের উপর পরীক্ষা করা হয়। এটি সফল হলে সালক ১৯৫২ সালে মানুষের উপর এই প্রতিষেধক পরীক্ষা করার ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। 

জানেন কি? এই প্রতিষেধক বিজ্ঞানী তার পরিবারেই প্রথম প্রয়োগ করেন। বিজ্ঞানী তার স্ত্রী এবং তিন ছেলেকে এ ভাইরাসের প্রতিষেধক দেন। এর পাশাপাশি পিটসবার্গ-অঞ্চলের দুটি প্রতিষ্ঠানে বাচ্চাদের এ ভ্যাকসিন দেয়া হয়। ১৯৫৩ সালের ২৬ শে মার্চ প্রাথমিক মানব পরীক্ষার সাফল্য ঘোষণা করা হয়। এজন্য ১৯৭৭ সালে জোনাস সালক রাষ্ট্রপতি পদক লাভ করেন।

 ১৯৫৫ সালে এসে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেন, পোলিও ভাইরাস মশা এবং মাছি থেকে ছড়ায়নি। তবে এ ভাইরাস কীভাবে এসেছিল তা এখনো অজানা। জোনাস সালকের প্রতিষেধক আবিষ্কারের পর থেকে আজ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায় পোলিওমুক্ত বলেই ধরে নেয়া যায়। এছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এই রোগের প্রকোপ নেই বললেই চলে।

সূত্র: হিস্টোরিডটকম

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/