সা’দত স্যারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি 

সা’দত স্যারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি 

প্রকাশিত: ১৫:৩২ ১ মে ২০২০   আপডেট: ১৫:৩২ ১ মে ২০২০

আফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিভি`তে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

সিভিল সার্ভিসের আইডল, অমিত মেধাবী, তেজস্বী ড. সা’দত হুসাইন চলে গেলেন। ২৩ এপ্রিল রাত ১০.৩০ মিনিটে ইউনাইটেড হাসপাদালে ইন্তেকাল করেছেন তিনি। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজেউন। ড. সা’দত কিডনি জটিলতা ও ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস রোগে ভুগছিলেন।

তিনি ১৯৪৬ সালের ২৪ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ও যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি) যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে যশোরে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রীর পিএস ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে ভারত থেকে তৎকালীন মন্ত্রিসভার সদস্যদের বহনকারী একই বিমানে তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

বর্ণাঢ্য চাকরিজীবনে তিনি পরিচালক, সিভিল অফিসার্স ট্রেনিং একাডেমি; মহাব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক; মহাপরিচালক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক; মহাপরিচালক বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড); রেজিস্ট্রার, কো-অপারেটিভ সোসাইটি অব বাংলাদেশ; মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও রেডিও বাংলাদেশ ; মহাপরিচালক, বিসিএস (অ্যাডমিন) একাডেমি, চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানসহ  অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

ড. সা’দত হুসাইন স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় সিভিল সার্ভিসে আসার আগে। তিনি যশোর বেল্টে চাকরি করেছেন। আমার জন্মস্থান নড়াইল। অগ্রজ সাঈফ মীজানুর রহমান সিভিল সার্ভেন্ট ছিলেন। বড়দার কারণে নড়াইল যশোর এলাকার এসডিও ম্যাজিস্ট্রেট অনেকের সঙ্গেই আমাদের পরিচয় হতো। অনেকেই আমাদের বাড়িতে আসতেন। সেভাবেই স্যারের সঙ্গে পরিচয়। আমি তখন স্কুলের ছাত্রী। বড়দা একাত্তরের বীর শহিদ । ২০১৪ সালে সরকার তাকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করেছে। বড়দার সঙ্গে স্যারের ঘনিষ্ঠতা ছিল। স্যার বড়দার চেয়ে বয়সে সামান্য ছোট ছিলেন। আর বয়সে অল্প বড় ছিলেন মেজদা সাঈফ হাফিজুর রহমান খোকন (আইনজীবী ও সাবেক এমপি) ও ছোটদা সাঈফ ফাতেউর রহমান (লেখক, সাবেক পরিচালক উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও জিএস এসএমহল) এর চেয়ে। এই দু’ভাইয়ের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ছিল স্যারের। প্রথমত বাম রাজনৈতিক ধারা, দ্বিতীয়ত সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের কারণে। স্যার এসএস হল সংসদের জিএস ছিলেন। দেখা হলেই বলতেন, ‘খোকন মোহন কেমন আছে?’ (দাদাদের ডাকনাম)। আমার বড়বোন প্রয়াত সুফিয়া বারি বুলবুলকে তিনি খুবই শ্রদ্ধা করতেন ভাষাসংগ্রামী হিসেবে। ভালো জানাশুনা ছিল দুলাভাই (ভাইয়া) প্রয়াত হাসানুল বারির সঙ্গেও। আমার স্বামী যুগ্মসচিব প্রয়াত লতিফুর রহমান তার চাকরিজীবনের শুরুতে ১৯৮৩ সালের এপ্রিল মাসে শাহবাগের কোটায় সা’দত স্যারকে পেয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে যোগদানের পর কোটায় প্রশিক্ষণ প্রহণ করতে হয়েছিল ম্যাজিস্ট্রেটদের। এরপর লতিফ শিক্ষক হিসেবে স্যারকে পেয়েছিল বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ ও বার্ডে প্রশিক্ষণকালে। পিএসসিতে থাকাকালীন তিনি লতিফকে পরীক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। লতিফ ছিল স্যারের একনিষ্ঠ ভক্ত। সে হিসেবে বলতে গেলে আমাদের পুরো পরিবার স্যারের ঘনিষ্ঠ। দাদাদের কাছেই জেনেছিলাম স্যারের ডাকনাম ‘মানিক’।  

সিভিল সার্ভিসে যে দু’চারজন কর্মকর্তা আমার ডাকনাম জানতেন তার মধ্যে স্যার একজন। ওটা ওই দাদাদের কারণে। দেখা হলে বলতেন ‘পপী কেমন আছো? লেখালিখি কেমন চলছে?’ 

পারিবারিক কারণ, ভাই স্বামী এবং আত্মীয়-স্বজন প্রশাসনে কাজ করায়, নিজে সিভিল সার্ভিসের সদস্য হওয়ায় সিএসপি ইপিসিএস, বিসিএস অনেক কর্মকর্তার সাক্ষাৎ পেয়েছি। অনেককে কাছ থেকে দেখেছি। অনেকের অনেক উজ্জ্বল আর অনুজ্জ্বল দিক জেনেছি। সা’দত স্যারের সঙ্গে আমি কাজ করিনি। তবে তার ক্লাস করেছি বুনিয়াদি প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণে। অসাধারণ ছিল তার পড়ানোর দক্ষতা। শব্দচয়ন ছিল তুলনাহীন। ইংরেজিতে দক্ষতা ছিল বাড়তি রকমের। তিনি শিখিয়েছেন নেতৃত্ব কাকে বলে, প্রতিষ্ঠান কী, সিভিল সার্ভেন্টদের কেমন হওয়া উচিত। তাকে কাছ থেকে দেখেছি নানান সূত্রে। জানতাম স্যার শক্ত ধাঁতের মানুষ। তদবির তেলবাজি তোষামুদি মোটেও পছন্দ করতেন না। কোন আপ্যায়ন বা আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে কখনই তাকে প্রীত করা যেত না।  তাই কখনোই তদবিরে যাইনি। বই দিতে গিয়েছি, লেখা চাইতে গিয়েছি।  হাসিমুখে কথা বলেছেন। তবে না চেয়েও স্যারের কাছে একবার বড় সহযোগিতা পেয়েছিলাম। আমার ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ আর ‘রাজপুত্র’ উপন্যাস অলিখিতভাবে ব্যান্ড করা হয়েছিল। কেনার পরও বিতরণ করেনি। সরকার আমার বই কেনায় ঈর্ষান্বিত একটা মহল বই দুটোর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ উত্থাপন করেছিল। পর পর দুটো কমিটি আমার বইয়ের পক্ষে মত দিলেও, দেশের কমপক্ষে দশজন বুদ্ধিজীবী বইটির পক্ষে জোরালো কলাম লিখলেও, পত্র-পত্রিকায় দিনের পর দিন নিউজ হলেও প্রভাবশালী চক্রের কারণে সে রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। বই দুটিও অবমুক্ত হয়নি। তখন পত্রিকায় খবর পড়ে সা’দত স্যার আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি তখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব। নিজে আমার বই দুটো পড়ে বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এমন দুটি বই কেন আটকা থাকবে!’ সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের এই করুণ পরিণতি দেখে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার মনে বেদনা জেগেছিল। অনেক চেষ্টা করেছিলেন আমার বই দুটোকে আলোর মুখ দেখাতে। সে কৃতজ্ঞতা আমার আছে, থাকবে আমৃত্যু। আমি বরাবরই লক্ষ্য করেছি লেখা আর লেখকদের প্রতি স্যারের ছিল বাড়তি দুর্বলতা।

স্যার ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতি করতেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার যেদিন থেকে তিনি চাকরিতে যোগদান করেন সেদিন থেকেই হয়ে যান পুরোদস্তুর সিভিল সার্ভেন্ট। অনেক সরকারি কর্মকর্তা চাকরি আর রাজনীতি দুটোকে এক পাল্লায় রেখে কাজ করেন। তিনি তা করেননি। বরং যখন যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন সেই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য অবদান রেখেছেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকার সময় তিনি দক্ষিণাঞ্চলে কিছু স্কুল নির্মাণ করেছিলেন যা ছিল একাধারে শিক্ষালয় এবং জলচ্ছ্বাসের সময়  উপকূলবাসীর আশ্রায়ালয়। সমবায়ের রেজিষ্টার থাকার সময় তিনি বার্ডের উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেছিলেন। পিএসসির চেয়ারম্যান থাকাকালীন আটকে থাকা অনেকগুলো পরীক্ষার জট খুলেছিল শুধুমাত্র তার কারণেই। তার জন্যই পরীক্ষাগুলো নেয়া সম্ভব হয়েছিল। এইভাবে যেখানেই তিনি গেছেন, সোনা ফলাতে চেষ্টা করেছেন। তিনি চাইতেন অফিসাররা হবে অফিসারের মতো। কথাবার্তা চালচলন পোশাক আশাকে। প্রত্যেকে তার নিজের কাজটি করবে। ফাঁকি দেবে না। অফিসিয়াল শৃঙ্খলা আর নিয়ম-কানুনের ব্যাপারে স্যার কঠোর ছিলেন। ছিলেন অনেকের চোখে কট্টর। তবে আমি বলব, আজকাল নিয়ম শৃঙ্খলার বিষয়টি সেভাবে প্রতিপালিত হয় না বলে অনেক ক্ষেত্রে ‘চেন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ছে। অনেক অফিসার রাজনীতি করছে, কাজ করছে না।  

সা’দত স্যার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আজকাল সর্বত্র ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ছড়াছড়ি। সিভিল সার্ভিসের যে ক’জন কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন তার একজন তিনি। আপাত কঠোর, বিশাল ব্যক্তিত্বের এই মানুষটির ভিতরটা ছিল বাংলার মাটির মত কোমল, পলল। কিন্তু সেটা বোঝা কঠিন ছিল অনেকের পক্ষেই। আপোসহীন, নির্লোভ এই মানুষটির চারপাশের দুর্লঙ্ঘ দেয়াল টপকে যে মানুষগুলি তার কাছে যেতে পেরেছে তারাই শুধু চিনতে পেরেছে তাকে। 

এই বীর মুক্তিযোদ্ধার পড়াশুনার পরিধি ব্যাপক। মেধা, প্রজ্ঞা অতলান্ত। স্পষ্টবাদিতায় অনন্য। মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য কর্মযজ্ঞের কিছু নমুনা পাওয়া যাবে তার লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধের দিন দিনান্ত’ গ্রন্থে। তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে আছে, ছেঁড়া কথার উড়াল ফানুস, নীচু স্বরে উঁচু কথা, স্মৃতি প্রীতির সজীব পাতা, রুক্ষ সূক্ষ্ম হীরে মুক্তা।

কলাম লিখতেন স্যার। আমি তার কলাম নিয়মিত পড়তাম। টকশোতেও আসতেন। তার ভাষা, শব্দের গাথুনি ছিল ঋজু। কী বলায়, কী লেখায়। এককথায় অনেক কথা বলতে পারতেন তিনি। যা বলতেন স্পষ্ট করেই বলতেন। কোন রাখ ঢাকা ছিল না। ছিল না কাউকে খুশি করার চেষ্টা।

তিনি একজন স্কাউট। স্কাউটিং আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য তাকে স্কাউটিং-এর সর্বোচ্চ সম্মান ‘দ্য সিলভার টাইগার’ প্রদান করা হয়।

স্যারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধাকে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ এ দেশে কম। স্যালুট বীর যোদ্ধা। চির শান্তিতে থাকুন!

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর