সাত বছর ধরে মমি হয়ে সাগরে ভেসেছেন তিনি

সাত বছর ধরে মমি হয়ে সাগরে ভেসেছেন তিনি

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:২৮ ১৭ মে ২০২০   আপডেট: ১৭:৫৫ ১৭ মে ২০২০

ছবি: ম্যানফ্রেডের মৃতদেহ

ছবি: ম্যানফ্রেডের মৃতদেহ

প্রশান্ত মহাসাগরে মাছ ধরতে ব্যস্ত দুই জেলে। সেখানে উদ্দেশ‍্যহীনভাবে তারা একটি ইয়টকে ভাসতে দেখেন। তাদের মাছ ধরার নৌকাটিকে ইয়টের কাছে নিয়ে যান।

ঘটনাটি ২০১৬ সালের। ফিলিপিন্সের সুরিগাও ডেল সার থেকে ৫০ মাইল দূরে ওই দুই জেলে মাছ শিকার করছিলেন। অনেক ডাকাডাকি করেও কারো সাড়া পাননি তারা। অগত্যা ইয়টটির গায়ে নৌকা ঠেকিয়ে তারা উঠে পড়েন ডেকে। 

ঢেউয়ের তালে তালে নাচছিল আধডোবা সায়ো নামের ইয়টটি। সেটির পিছনের অংশ পানিতে ডুবে গিয়েছিল। আর ইয়টের পিছন দিকটা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তাতে বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় ইয়টটি ডুবে যাওয়ার কথা। তারপরও কী করে ভেসে আছে ইয়টটি, বুঝে উঠতে পারছিলেন না দুই জেলেরা। তবে ইয়টটি ডুবে গেলে হয়ত পৃথিবীর অজানা থাকত এক মর্মান্তিক ঘটনা। 

জেলেরা ইয়টের ভাঙা মাস্তুলের পাশ দিয়ে নীচে নেমে যান। চিৎকার করে ডাকতে থাকেন। তবে কোনো সাড়া মেলে না। সিঁড়ি ধরে দুজনে নীচে নেমে যেতে থাকেন। সামনেই ক্যাপ্টেনের কেবিন। কেবিনটি পুরোই অন্ধকার। টর্চের আলো জ্বেলে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করছিলেন তারা। কেবিনের ভেতর টর্চের আলো ফেলতেই, আঁতকে উঠেন দুজন। ক্যাপ্টেনের কেবিনের মাঝখানে রাখা একটি টেবিল। তার ওপর রেডিও সেট রাখা।

রেডিও সেটের সামনে খালি গায়ে মাথা হেলিয়ে বসে আছেন একাকী ক্যাপ্টেন। সামনে খাতা আর কলম। একটা হাত বাড়ানো ছিল রেডিও সেটের দিকে। ক্যাপ্টেনের ছাই রঙা মৃতদেহে পচন ধরেনি। ঘরে এতটুকু দুর্গন্ধ নেই। দুর্গন্ধ হওয়ার কথাও নয়। কারণ মমি হয়ে গিয়েছিলেন ৫৯ বছরের ম্যানফ্রেড বাজোরাট। মৃত্যুর আগে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন স্যাটেলাইট রেডিওর মাধ্যমে তীরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। পারেননি, তার আগেই ঢলে পড়েছিলে তিনি মৃত্যুর কোলে।

ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেড বাজোরাট ছিলেন ইন্সিওরেন্স কোম্পানির সেলসম্যান। জার্মানির রেইন-ওয়েস্টফালিয়া স্টেটের রাজধানী ডুসেলডর্ফ থেকে কিছু দূরে আছে ভেলবার্ট। সেখানে সাততলা অফিসের বড় জানালা দিয়ে, হ্রদের নীল জলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন ম্যানফ্রেড। অফিসে বসে বসেই স্বপ্নের নীল সমুদ্রে নিজের জাহাজ নিয়ে নেমে পড়তেন। সমুদ্রে ভাসার শখ সেই ছোটবেলা থেকেই। 

একবার বাবা মার সঙ্গে ছুটিতে বেলজিয়াম বেড়াতে গিয়ে মোটরবোটের স্টিয়ারিং ধরায় তার হাতেখড়ি। তারপর বড় হয়ে রীতিমতো ছোট ও বড় ইয়ট চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেলেন তিনি। তবে তার বীমা ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠায় জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে সমুদ্রে আর ভাসা হয়নি। ছোট্ট ইয়ট জাতীয় জলযানে বিশ্ব ভ্রমণ করার অদম্য ইচ্ছা ছিল ম্যানফ্রেডের। প্রতিদিনই বাড়ি ফিরে স্বপ্নের কথা মেয়ে আর স্ত্রীকে শোনাতেন ম্যানফ্রেড। 

স্ত্রী ক্লডিয়া কখনোই তাকে বাধা দেননি। মেয়ে নিনাও তাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। তবে ব্যবসার জন্য কিছুই করে উঠতে পারছিলেন না ম্যানফ্রেড। ১৯৮০ সালে ম্যানফ্রেডের ব্যবসায়ী রেনর কার্সনারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিন ম্যানফ্রেডের বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে বারবিকিউ পিকনিক হত তাদের। সেখানে বিয়ারের গ্লাস ঠুকে শপথ করতেন ম্যানফ্রেড, সাগরে একদিন ভাসবই। এরকমই এক রঙিন সন্ধ্যায় ম্যানফ্রেড বন্ধু রেনরকে বলেছিলেন তার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। 

এরপর ২০০৪ সাল, চালু ব্যবসা বিক্রি করে দেন ম্যানফ্রেড। সেই অর্থ দিয়ে কিনে ফেলেন ৪০ ফুট লম্বা অত্যাধুনিক ও বিলাসবহুল একটি ইয়ট। নাম রাখেন সায়ো। যা জাপানি শব্দ সায়োনারা থেকে ছোট করে রাখা। যার অর্থ বিদায়। মেয়ে নিনাকে নামী স্কুলের হোস্টেলে রেখে স্ত্রীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন সাগর অভিযানে। ছোট ছোট অভিযান দিয়ে শুরু হয়েছিল বড় স্বপ্নকে অবয়ব দেয়ার চেষ্টা। 

ম্যানফ্রড ও তার স্ত্রীএভাবেই সুখের সাগরে ভেসে কেটে যাচ্ছিল বছরের পর বছর। হঠাৎ একদিন ঝড় উঠেছিল সংসারে, ৩০ বছরের বিবাহিত জীবন কাটানোর পর স্বামী ম্যানফ্রেডের কাছে বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে বসলেন স্ত্রী ক্লডিয়া। ম্যানফ্রেডের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গিয়েছিল সেদিন। কোনো অনুরোধই শোনেননি ক্লডিয়া। ম্যানফ্রেডকে ছেড়ে চলে যান ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মার্টিনিকে নতুন প্রেমিকের কাছে। মেয়ে নিনা তখন কলেজে পড়ে।

সব সম্পত্তি মেয়েকে বুঝিয়ে দিয়ে সায়োকে নিয়ে সমুদ্রে গা ভাসান ম্যানফ্রড। এতদিন পর্যন্ত সব অভিযানে, ক্যাপ্টেনের পাশের চেয়ারে বসতেন ক্লডিয়া। জলে ভাসার দিন সেই চেয়ারে ম্যানফ্রেড রাখেন ক্লডিয়ার একটা ছবি। তারপর দুরন্ত গতিতে উত্তর সমুদ্রে ঢেউ তুলে অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের দিকে ছুটতে থাকে ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রডের সায়ো। এরপরের দুইবছর ম্যানফ্রেডের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। 

২০১০ সালে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মার্টিনিকে প্রেমিকের বাড়িতেই ক্যান্সারে ভুগে মারা যায় ক্লডিয়া। স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে মেয়ে নিনার কাছ থেকে খবরটি পেয়েছিলেন ম্যানফ্রেড। চুপ করে ছিলেন কিছুক্ষণ। তারপর, ভালো থাকিস বলে ফোনটা কেটে দিয়েছিলেন। নিনা বাবার সঙ্গে এরপর আর যোগাযোগ করতে পারেননি। হবু স্বামীকে নিয়ে নিনা যোগ দেন মায়ের শেষকৃত্যে। 

জেলেরা ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেডের মৃতদেহ স্পর্শ করতেই, ধুলার মতো গুঁড়া হয়ে ঝরে পড়ছিল। মৃতদেহটির পোস্টমর্টেম হয়েছিল বুতুয়ান সিটিতে। ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেড বাজোরাটের মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বলা হয়, ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেডের মৃত্যু হয়েছিল কমপক্ষে সাত বছর আগে। 

বিখ্যাত ফরেনসিক ক্রিমিনোলজিস্ট ড. মার্ক বেনেসকে বলেছিলেন, যেভাবে ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেড বসেছিলেন, তা থেকে বোঝা যাচ্ছে মৃত্যু এসেছিল অকস্মাৎ। পুলিশি তদন্তে জানা যায়, ম্যানফ্রেড বাজোরাটকে জীবিত অবস্থায় শেষ দেখা গিয়েছিল ২০০৯ সালে। স্পেনের মাল্লোর্কা বন্দরে। মৃত ক্যাপ্টেনকে নিয়ে সায়ো সমুদ্রে ভেসেছে পুরো সাত বছর। জুরিখের, ইনস্টিউট অব ইভোলিউশনারি মেডিসিনের ডিরেক্টর, প্রফেসর ফ্রাঙ্ক রূহলি বলেছিলেন, মৃতদেহ অনেকসময়ই প্রাকৃতিকভাবে মমি হয়ে যেতে পারে। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মমি হওয়া মৃতদেহের টিস্যু, জলশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে টিস্যুতে থাকা কোষগুলো সংকুচিত হয়, শুকিয়ে যায়। এছাড়াও সমুদ্রের নোনা ও নির্দিষ্ট গতির বাতাস মৃতদেহকে মমি হতে সাহায্য করে। একবার মমি হওয়া ধাপগুলো নিখুঁতভাবে হয়ে গেলে ও আবহাওয়ার পরিবর্তন না হলে, মৃতদেহে আর পচন ধরতে পারে না।অনির্দিষ্ট কালের জন্য মৃতদেহটি মমি হয়ে থাকতে পারে।
 
পুলিশ ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেড বাজোরাটের মমির পাশ থেকে উদ্ধার করেছিল একটি চিঠি। চিঠিটি ক্যাপ্টেন লিখেছিলেন, তার প্রাক্তন স্ত্রীকে। চিঠি লেখার সময় ম্যানফ্রেডের মনে ক্লডিয়ার প্রতি কোনো অভিমান ছিল না। কারণ তিনি জানতেন, তার স্ত্রী ক্লডিয়া ভোরের শুকতারা হয়ে গিয়েছেন। স্ত্রীর সঙ্গে ২০০৮ সালে বিচ্ছেদ ঘটে গেলেও মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও ক্লাডিয়াকে ভুলতে পারেননি তিনি। তাই ক্লাডিয়াকে লিখেছিলেন চিঠি। যদিও তিনি জানতেন সে চিঠি কোনো দিনই পৌঁছাবে না ক্লডিয়ার কাছে। ম্যানফ্রেড লিখেছিলেন, 

প্রিয়তমা, 

৩০ বছর ধরে আমরা একসঙ্গে জীবনের পথে হেঁটেছিলাম। বিধাতার বিচিত্র খেয়ালে অশুভ শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছিল আমাদের জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলো। আমি জানি তুমি চলে গেছ। তোমার আত্মা শান্তি খুঁজে পাক। আমিও আসছি ক্লডিয়া, শুধু সময়ের অপেক্ষা, হয়ত এই মাসেই। 

তোমার ম্যানফ্রেড 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস