Alexa ২৫ বছর ধরে খবরের কাগজ পৌঁছে দিচ্ছেন শেরু ফকির

২৫ বছর ধরে খবরের কাগজ পৌঁছে দিচ্ছেন শেরু ফকির

নাজমুল হাসান, গুরুদাসপুর (নাটোর)  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:২৬ ২৮ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৪:০৫ ২৮ জানুয়ারি ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

প্রতিদিন সকালে ভোরের আলো ফোটার পরপরই বাইসাইকেল নিয়ে ছুটে চলেন কাছিকাটা বাসস্ট্যান্ড হয়ে উপজেলা সদর থেকে শুরু করে ইউনিয়ন সদরে। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে খবরের কাগজ পৌঁছে দেন তিনি।  

সাইকেলের সামনে একটি ঝুঁড়ি ও পেছনের কেরিয়ারে করে দেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও বিভিন্ন ম্যাগাজিন। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার পৌর সদরের উত্তরনারীবাড়ি মহল্লার সাখাওয়াত সরদারের ছেলে শেরু ফকির কথা। 

স্থানীয়দের কাছে যার পরিচয় ‘হকার’। টানা ২৫ বছর যাবৎ রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে স্থানীয় উপজেলা সদরের বাজারসহ ইউনিয়ন বাজারগুলোতে পত্রিকা বিক্রি। পত্রিকা বিক্রির আয় দিয়েই চলে তার সংসার।

প্রত্যেক মানুষ তার ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডির মধ্যে দৈনন্দিন কিছু না কিছু কাজ করে সাংসারিক জীবনমানের উন্নয়নের চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে কারো সাংসারিক জীবনে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসে, আবার কারো আসে না। সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনার একমাত্র চাবিকাঠি হলো ইচ্ছাশক্তি, শ্রম আর আত্মবিশ্বাস। 

নিজের ইচ্ছা শক্তি, শ্রম আর আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে পত্রিকা বিক্রি করে জয় করতে পেরেছেন পরিবারের অভাব-অনটনকে। শেরু ফকিরের এক ছেলে দুই মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। পত্রিকা বিক্রি করেই ছেলেকে স্নাতক পাশ করিয়েছেন। কমতি নেই সচেতনতারও। 

পত্রিকা বিক্রি করেই দুই মেয়েকে এসএসসি পাশ করিয়েছেন। বিয়ের বয়স হওয়ার পরেই তাদের বিয়ে দিয়েছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসা করে সংসার চালিয়েও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছেন তিনি। দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করলেও স্ত্রী সন্তানদের তিনি কিছুই বুঝতে দেননি। এ কারণেই তিনি পরিবার ও সমাজের মানুষের মাঝে একজন আদর্শ পুরুষ হিসেবে পরিচিত লাভ করেছেন। 

শেরু ফকির জানান, প্রতিদিন সকালে ভোরের আলো ফোঁটার আগেই পত্রিকা বিক্রির উদ্দেশ্যে সাইকেল চালিয়ে উপজেলার কাছিকাটা বাস কাউন্টারে যেতে হয়। সেখান থেকে গাড়িতে আসা পত্রিকাগুলো প্রয়োজনীয় ভাজ দিয়ে পত্রিকাগুলো নিয়ে বিরামহীনভাবে ছুটে চলতে হয় গুরুদাসপুর উপজেলা শহরে। 

চাঁচকৈড় বাজার, গুরুদাসপুর বাজার, উপজেলার সব সরকারি-বেসরকারি অফিসে পত্রিকা বিলি করে আবার যেতে হয় নাজিরপুর ইউপির নাজিরপুর বাজারে পত্রিকা বিক্রি করতে। দুপুরের খাবার রাস্তায় করতে হয়। প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ ঘুরে পত্রিকা বিক্রি করতে গিয়ে কখনো সন্ধা হয়ে যায়। 

তিনি আরো জানান, বিগত ২৫ বছর যাবৎ পত্রিকা বিক্রি করছেন। প্রথমে অল্প কিছু জাতীয় দৈনিক দিয়ে শুরু করলেও এখন অনেক দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক নিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ কপি পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মিলে মাসিক কিছু গ্রাহক রয়েছে তার। যারা মাস শেষে টাকা পরিশোধ করে। 

এছাড়াও হাটবাজারে নগদ অর্থেও পত্রিকা বিক্রি করেন। পত্রিকা বিক্রি করে তার মাস শেষে আয় হয় প্রায় ১০-১২ হাজার টাকা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দিবস ছাড়া তার কোনো অবসর নেই। প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা বিক্রি করা অনেক কষ্টের বলেও তিনি জানান। তবে অনেক দিনের অভ্যাস আর পত্রিকার খবরের প্রতি তার ভালবাসায় এখনও এই পেশাতেই আছেন।

শেরু ফকিরের কাছ থেকে পত্রিকা নেয়া একজন গ্রাহক গুরুদাসপুর রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজের প্রভাষক মো. মাজেম আলী মলিন জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ তার কাছ থেকে পত্রিকা ক্রয় করি। তার সততা আর পরিশ্রমে সে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে পরিচিত। পরিশ্রম করলে সাফল্য নিশ্চিত। তার এই কাজের প্রতি ভালবাসা আর সততাকে সম্মান জানাই। প্রতিটি মানুষ যেন এমন পরিশ্রম করে সততার সঙ্গে জীবন যাপন করে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে