Alexa সমুদ্রের মাঝে ভুতুড়ে নগরী

সমুদ্রের মাঝে ভুতুড়ে নগরী

ধ্রুব ইকরামুল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:২৪ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১২:৪২ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সমুদ্রের মাঝে কি সত্যিই ভুতুড়ে নগরী রয়েছে? অনেকেই হয়তো ভেবে বিস্মিত হবেন! তবে সত্যিই এমন এক নগরী রয়েছে তো বটেই। আবার সেখানে ঘুরতে যাওয়ারও ব্যবস্থা রয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস যেন রহস্যের দিকে মোড় নেয়। আজ আমরা এমন এক ঐতিহাসিক রহস্যময় স্থান ‘নান মাদলের’ কথা জানবো। রহস্যময় এ নগরী অস্ট্রেলিয়া থেকে এক হাজার ৬০০মাইল এবং লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে দুই হাজার ৫০০মাইল দূরে অবস্থিত। 

পরিত্যক্ত নগর নান মাদলের অবস্থান প্রশান্ত মহাসাগরের অন্তর্ভুক্ত মাইক্রোনেশিয়ার পোহ্নেপী দ্বীপের পূর্ব তীরে। মানবসৃষ্ট ৯২টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই নগর, যা আয়তনে প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ ও অর্ধ কিলোমিটার প্রশস্ত। এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে ‘ভ্যানিস অব প্যাসিফিক’ নামেও ডাকা হয়।

সমূদ্রের মাঝে ভূতের নগরীআনুমানিক ৯০০ থেকে ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালীন এটি ‘সৌদিলুর রাজবংশ’-এর রাজধানী ছিলো। জায়গাটি বৃহতাকার বেসাল্ট পাথর এবং উঁচু দেয়ালের জন্য দৃষ্টি কেড়ে নেয়। ধারণা করা হয় এখানে প্রায় এক হাজার মানুষের বসবাস ছিলো। তবে সেখানে এতো দূরবর্তী একটি এলাকায় কেন মানুষ বসতি গড়ে তুললো? আর কীভাবেই সে সময় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যতীত এতো সুসজ্জিত একটি নগর গড়ে তোলা সম্ভব হলো? সেটি আসলেই আশ্চর্যের বিষয়।

পোহ্নেপী এর কেউই এর সঠিক তথ্য জানেনা যে কীভাবে প্রাচীন মানুষেরা এতো বৃহৎ একটি নগর গড়ে তুলেছিলো। বিজ্ঞানীরা বলেন, এককটি ব্যাসাল্ট পাথরের ওজন প্রায় ৫০ টন, কোনো কোনো পাথর ২৫ ফুট উঁচু আর ১৭ ফুট চওড়া। সেগুলোকে নাকি ভেলায় করে নান মাদলে আনা হয়েছিলো।

তবে স্থানীয়দের মতে, নান মাদলের ব্যবহৃত পাথরগুলোকে কালো জাদুর মধ্যমে সেখানে একত্রিত করা হয়েছিলো। প্রত্নতত্নবিদগণও সেখানে গবেষণা চালান তবে, কীভাবে নান মাদলের নির্মাণ সামগ্রী সে সময় বহন করা হয়েছিলো তার সঠিক কোনো তথ্যই এখন পর্যন্ত নির্ধারিত হয়নি। পহন্বী দ্বীপে শিলা কাঠামোর আয়তন প্রায় ১৬ মিটার। বিজ্ঞানীদের মধ্যে কেউ কেউ ধারণা করেন, নান মাদল তৈরি করতে প্রায় এক হাজার শ্রমিক শতাধিক বছর সময় নিয়েছিল।

সমূদ্রের অতলে নগরী আজো অবশিষ্টবেসাল্ট কলামগুলো থেকে তৈরি শহরের একটি অংশ ছিল পুরোহিত এবং শাসকদের জন্য; বাকি অর্ধেক ছিল প্রশাসন কেন্দ্র। সেখানে ছিলো মন্দির, সমাধি, মিলন ঘর, গণ স্নানকক্ষ এবং কচ্ছপ, বানমাছ সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ সংবলিত পুকুর। তবে বেশিরভাগ দ্বীপপুঞ্জ আবাসিক অঞ্চল ছিলো। এরই মধ্যে কিছু জায়গা খাবার ও নারিকেল তেল উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হতো। সেখানে ডিঙি নৌকাও তৈরী হতো। 

নান মাদলের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল মাদুর পাওয়েতে ৫৮ টি দ্বীপ রয়েছে। পুরো কমপ্লেক্সের কেন্দ্রস্থলটিতে রয়েছে সেখানকার শাসক নন্দৌবাস-এর রাজকীয় সমাধি, যার চারপাশে ৭ দশমিক ৫ মিটার উঁচু দেয়াল রয়েছে। নান মাদল একটি ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল। পোহ্নেপী এর বাদশাহ-রা এখানে ধর্মচর্চা করতেন। কিন্তু তারা কীভাবে উপাসনা করতেন তার রহস্য দেয়ালভেদ করতে পারেনি। মন্দিরগুলোতে সাকাউ নামক এক প্রকার আনুষ্ঠানিক পানীয় তৈরি হতো। এখনো নাকি পোহ্নেপীর লোকেরা তাদের আচারকে পবিত্র করতে এই পানীয় ব্যবহার করে।

পানির নীচে আবিষ্কৃত প্রতিকৃতিভূতের নগর

নান মাদল সম্পর্কে সঠিক ইতিহাসের অভাব-ই জনমনে যত রহস্যের জন্ম দিয়েছে। এর শুরু কিংবা শেষ, এর উদ্দেশ্য কিংবা পতনের কারণ কোনো কিছুতেই বিশেষজ্ঞরা একমত হতে পারছেন না। ১৯ শতকের শুরুর দিকে ইউরোপীয়রা নান মাদল পরিত্যাক্ত ঘোষনা করেন। তাদের ধারণা ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে ‘সৌদিলুর রাজবংশ’ এর পতন ঘটে। বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাদ্যের অভাবেই তাদের ওই নগর ছাড়তে বাধ্য করে। আবার কেউ মনে করেন ইউরোপীয়দের এই ধারনার পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

জনমত রয়েছে, এই নগর তৈরির সময় বিশাল পাখি অথবা দৈত্য ব্যাসেল্ট পাথর বহন করে এনেছিলো। আবার কেউ মনে করেন দেবদেবীদের উপাসনার জায়গা তৈরি করতে যমজ যাদুকর ওলোসোহপা এবং ওলোশিহপা কালো যাদুর মাধ্যমে এটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে মাইক্রোনেশীয় দ্বীপ পোহ্নপেইতে ৩৬ হাজার লোকের বসবাস। এমনকি স্থানীয়দের মধ্যেও এই স্থানটি কুখ্যাত। এই স্থানটি তাদের কাছে ‘ভুতুড়ে নগর’ হিসেবে পরিচিত।

অনেকেই এই স্থানটিতে অ্যাডভেঞ্চার করতে পছন্দ করেনওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায়

১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার নান মাদলকে জাতীয় ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে নান মাদল ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটির তালিকায় স্থান পায়। 

পর্যটন ব্যবস্থা

নান মাদল এখনো সর্বসাধারণের জন্য পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত নয়। কিন্তু কিছু সংখ্যক মানুষ যারা অ্যাডভেঞ্চার করতে ভালোবাসেন তারা স্ব-ব্যবস্থাপনায় নৌকায় সেখনে ভ্রমণে যান। জন সমাগম কম থাকার ফলে মনোরম নিরিবিলি পরিবেশের সঙ্গে রহস্যের গন্ধটা একটু গভীরভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস